শুধু আপনার ছেলে নই, সমাজেরও

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
শিরোনামের কথাটা একজন তরুণ ছাত্রের, রাজবন্দি হয়ে যাকে বিনাবিচারে একটানা চার বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। ছাত্রটির নাম শহীদ সাবের, যার কথা ভাবলে একই সঙ্গে দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ হতে হয়। দুঃখ এবং ক্ষোভ রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী চরিত্রটি দেখে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কেমন নিষ্ঠুর ছিল, তার অসংখ্য নিদর্শন আমাদের চারদিকে ছড়ানো রয়েছে; সেগুলোর একটি হলো শহীদ সাবেরের জীবন ও মৃত্যু। সে ঘটনা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী।

শহীদ সাবের জেলে যান ১৯৫০ সালে, যখন তিনি সদ্য ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছেন, চট্টগ্রামে। সেকালের অসংখ্য রাজবন্দির মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। তারপর বিনাবিচারে চার বছর আটক ছিলেন কারাগারে। বন্দি অবস্থায় থেকে আইএ পাস করেছেন, প্রস্তুতি নিয়েছেন প্রাইভেট প্রার্থী হিসেবে বিএ পরীক্ষা দেওয়ার। মুক্তি পেয়েছেন ১৯৫৪তে। কিন্তু আক্রান্ত হয়েছেন অর্থনৈতিক সংকটে, যে সংকট রাষ্ট্র তৈরি করেছে সাধারণ মানুষের জন্য। এ প্রসঙ্গে আবার আসা যাবে। আপাতত আমরা বন্দি ছাত্রটির বক্তব্যের কাছে ফিরে যাই।

ছাত্রটি চিঠি পেয়েছে তার পিতার কাছ থেকে। পিতা লিখেছেন, ‘পরিবার ভেঙে গেল। তোমার জন্য তোমার মা পাগল হয়ে গেছেন। তোমার ছোট ভাই-বোনদের যন্ত্রণাদায়ক প্রাণান্ত জিজ্ঞাসা আমারও জীবনীশক্তির মূলে আঘাত করছে। তুমি যদি ইচ্ছে কর তবে মুক্তিলাভ করতে পার অনায়াসে। সরকারের কাছে জানাও যে তুমি আর রাজনীতি করবে না। এটা আমাদেরই জাতীয় সরকার। আশা করি তুমি তা-ই করবে।’ ভয় দেখিয়ে বাবা এও লিখেছেন যে, কবরের এপারে ছেলের সঙ্গে তার হয়তো আর দেখা হবে না।
চিঠি পড়ে ছাত্রটি বিষণ্ন হয়ে পড়ে, স্তব্ধ হয়ে থেকেছে কিছুক্ষণ, তারপর ভেবেচিন্তে লিখেছে, পরিবারের ধ্বংসের যে চিত্র পিতা তাকে দিয়েছেন তাতে বেদনার্ত হয়েছে; কিন্তু সে তো নিজেকে কেবল পরিবারের সন্তান বলে মনে করে না, সন্তান সে সমাজেরও এবং সমাজের প্রতি রয়েছে তার আরও বড় কর্তব্য। পিতা যা বোঝেন না, বিশ বছরের যুবক সেটি বোঝে। সে লিখেছে, ‘আমি বাইরে এসে সমস্যার সমাধান করতে পারব না। বাইরে হাজার হাজার বেকার যুবক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তারা সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎহীন। এ সমাজকে ভেঙে নতুন দুনিয়া গড়তে হবে। আপনি অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বেতন পাননি চার মাসের। ভেবে দেখুন কতটা অমানুষিক এ ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী_ তার কাছে আমাকে আত্মসমর্পণ করতে আশা করি আপনি আর বলবেন না।’

অল্পবয়সী ছেলেটি কী পরিষ্কারভাবে সমাজব্যবস্থাটাকে বুঝে নিয়েছে। পিতা বলেছেন জাতীয় সরকার দেশ শাসন করছে, উল্টো সন্তান বলছে, ‘এটা আমাদের জাতীয় সরকার নয়, এ সরকার ইস্পাহানি-হারুনদের, পীরদের, মীরদের, বড় বড় ধনীদের। তারা জাতি নয়, তার বাইরে রয়েছে মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি বুদ্ধিজীবী শোষিত শ্রেণী। বর্তমান সরকার তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।’ শ্রেণী এবং জাতি যে এক নয় এবং পাকিস্তানি শাসকরা যে শ্রেণীশোষণকে আড়াল করার জন্যই জাতিগঠনের হট্টগোল বাধিয়েছিল, সেই সত্যটি ছাত্রটির কাছে মোটেই অস্পষ্ট ছিল না। অথচ সে তখন কলেজে পড়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত এবং সময়টা হচ্ছে বায়ান্নর আগে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তখনও হয়নি, স্বাধীনতা এনে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র।

আমরা উদ্ধৃতি দিচ্ছি শহীদ সাবেরের সর্বাধিক পরিচিত, ছোট কিন্তু চাঞ্চল্যকর ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের রচনাটি থেকে। এটি তিনি চট্টগ্রাম জেলে বন্দি অবস্থায় লিখেছেন। এবং তার কারামুক্ত হওয়ার আগেই তা তখনকার দিনে কলকাতার সবচেয়ে প্রগতিশীল বলে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাসিক পত্রিকা ‘নতুন সাহিত্যে’ প্রকাশিত হয়। কারারক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে এটি বাইরে পাঠানো হয়েছিল বাংলা ১৩৫৭ অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৫১ সালে, আর বলাই বাহুল্য শহীদ সাবেরের নিজের নামে তা প্রকাশিত হয়নি, লেখক হিসেবে নাম ছাপা হয়েছিল জনৈক জামিল হোসেনের। রচনাটি রাজবন্দির রোজনামচা ধরনের লেখা। উভয় বাংলার পাঠকরা লেখকের পরিচয় জানতে কৌতূহলী হয়েছিলেন; সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখাটির প্রশংসা করে এবং ওই নতুন লেখককে স্বাগত জানিয়ে পত্রিকার সম্পাদককে চিঠি লিখেছিলেন।

শহীদ সাবের ১৯৫৪তে কারাগার থেকে মুক্ত হন। কারাবন্দি জ্যেষ্ঠপুত্র এবং পিতার মধ্যে মতামতের আদান-প্রদান কেবল যে ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের লেখাটিতেই পাওয়া যাবে তা নয়, তার একটি গল্পেও এই যোগাযোগটি শান্ত অথচ মর্মস্পর্শী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গল্পটির নাম ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’। তিন বছর পর জেলগেটে রাজবন্দি পুত্রের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তার পিতা; সঙ্গে ছোট বোন এবং তার চেয়েও ছোট ভাইটি। পিতার সেই একই বক্তব্য, ‘দেখ, তুমি হচ্ছো আমাদের বড় ছেলে। বাপ-মায়ের বড় ছেলেকে ঘিরে কত আশা-ভরসা থাকে, সেটা তোমাকে বলে দেওয়ার দরকার নেই। আজ আমি শুধু তোমার সঙ্গে দেখা করতেই আসিনি। আমি এসেছি তোমার কাছে শেষ আরজ নিয়ে।’ আর আরজটা হচ্ছে, ছেলে আর রাজনীতি করবে না বলে একটা বন্ড লিখে দিক। তাহলেই সে মুক্ত হয়ে যাবে। তার যুক্তি, ‘তোমার জন্য তোমার মা পাগলের মতো হয়ে গেছে। ওর মুখে দিনরাত কেবল তোমার কথা। তোমার ভাই-বোনদের দিনরাতের জিজ্ঞাসা আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আর আমার স্বাস্থ্য তো দেখছই, এভাবে চললে আর বেশিদিন বাঁচার ভরসা নেই।’ যুক্তি আরও আছে। ‘যাদের সংস্থান আছে তাদের জন্যই রাজনীতি। আমার সম্বল চাকরি। আমাদের ওসব পোষায় না। তোমার মা-বোনের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।’ ছেলেটি শোনে। বাবার কথাগুলো তার বুকে তুফান তোলে। বাবার এক একটি শব্দ হাতুড়ির এক একটি ঘা হয়ে এসে পড়ে তার বুকে। বাবার দিকে তাকিয়ে মায়া হয়। বাবার জীবনটা কষ্টেই কেটেছে। অশেষ দুঃখ ও বেদনার মধ্যেও তিনি মিথ্যে বলেননি। অনেক লোভ ও প্রলোভনের ভেতরে থেকেও তিনি সাত্তি্বকের জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু ছাত্রটির পক্ষে তো সম্ভব নয় অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হওয়া। বাবা বলে গেলেন, সামনের বার যখন আসবেন ছেলের মাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।

শহীদ সাবের আইএ ক্লাসের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই উদ্বুদ্ধ হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দিতে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে। জেলের ভেতরে রাষ্ট্রের চেষ্টাটা হলো মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখতে, জেলের বাইরেও সেই একই চেষ্টা চলছিল। অথচ ছেলেটি বিচ্ছিন্ন হতে চায়নি, সে চেয়েছিল সংঘবদ্ধ হবে, আন্দোলন করবে, যোগ দেবে সমাজবদলের প্রচেষ্টায়। তাকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্র নিজের কর্তব্য করেছে, তাকে আটক করেছে জেলখানায়, যাতে সে বিচ্ছিন্ন থাকে সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে।

জেলখানায় যে তরুণ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেনি, জেলের বাইরে এসে সে কিন্তু দেখে ভিন্ন অবস্থা। যোগ দেবে যে এমন রাজনৈতিক আন্দোলন তখন দেশে নেই। হ্যাঁ, ১৯৫৪র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয় হয়তো তার মুক্তিকে সম্ভব করেছে; কিন্তু সে যুক্তফ্রন্ট তো টেকেনি, খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে; দেশে সামরিক শাসন চলে এসেছে, আবার আত্মগোপনে চলে গেছেন কমিউনিস্টরা; রাষ্ট্র যাদের এক নম্বরের দুশমন হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে, একেবারে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। অন্যদিকে তার ওপর দায়িত্ব এসে পড়েছে পিতাকে সাহায্য করার। এক কথায় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে উপার্জনের। সমাজের জন্য কাজ করবে কি, নিজের জন্যই কাজ করা জরুরি কর্তব্য হয়ে পড়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় উপার্জনের প্রয়োজন ছিল না, এখন উপার্জন ছাড়া চলবে না। অন্যদের থেকে তো বটেই, নিজের পরিবার থেকেই তার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম। সে তখন কলেজে ভর্তি না হয়েই বিএ পাস করেছে, চাকরি নিয়েছে স্কুলে। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপিরিয়র সার্ভিসের (সিএসএস) জন্য পরীক্ষা দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন; কিন্তু চোখের রোগের দরুন অযোগ্য বিবেচিত হবেন মনে করে পরীক্ষা দিলেন না। শহীদ সাবেরের যে মেধা তার রচনাগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে তা পাঠ করলে কোনো সন্দেহ থাকে না যে পরীক্ষা দিলে তিনি অকৃতকার্য হতেন না। চোখের চিকিৎসা অসম্ভব ছিল বলে অনুমান করি না; কিন্তু সে জন্য ব্যয় করার মতো অর্থসঙ্গতি তার নিশ্চয়ই ছিল না। কেন্দ্রীয় ইনফরমেশন সার্ভিসের জন্য পরীক্ষা দিলেন; সে বছরের কৃতকার্যদের ভেতর তার অবস্থান ছিল শীর্ষে; কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সংশিল্গষ্টতার দরুন তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো না। যে সংশিল্গষ্টতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য শহীদ সাবেরকে বিনাবিচারে চার বছর আটক করে রাখা হয়েছিল, সেই একই অপরাধে এবার সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হলো। বন্দি অবস্থায় তিনি দেশের যুবকদের জন্য বেকারত্বের সমস্যার কথা লিখেছিলেন, সেই সমস্যাটা যে সত্যি সত্যি কেমন ভয়াবহ_ ‘মুক্ত’ অবস্থায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সেটা তাকে বুঝে নিতে হয়েছিল।

তদুপরি রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিচ্ছিল। জেলে পাঠিয়ে শাস্তি দিয়েছে; শাস্তি দিয়েছে বেকার রেখে এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তি দিল তাকে হত্যা করে। একাত্তরের ৩১ মার্চ দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দৈনিক সংবাদ অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়; শহীদ সাবের তখন ওই অফিসে ছিলেন; অগি্নদগ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। সংসারী হওয়া তো পরের কথা, তার জন্য কোনো আশ্রয়ই ছিল না।

অথচ মেরুদণ্ড শক্ত ছিল, আশাবাদ ছিল প্রচণ্ড। ভাঙবেন তবু মচকাবেন না এমনই ছিল মনোভাব। কারারুদ্ধ অবস্থায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলোর প্রতিটিতে তার আশাবাদ দেখা যায়।

শহীদ সাবের লিখেছিলেন ইলা মিত্রের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করে। তার আশা ছিল আন্দোলন বেগবান হবে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম তীব্রতা পাবে; কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে সাবের দেখলেন আন্দোলন নেই। ওদিকে অভাব, দারিদ্র্য ও কর্তব্যবোধ দু’দিক থেকে তাকে তাড়া করছে। সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছিলেন, সেকালে সাংবাদিকতায় আয় ছিল সীমিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়মিত। ততদিনে তার পিতা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। কর্তব্যপরায়ণ জ্যেষ্ঠপুত্র দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছিলেন, বাসাভাড়া করে বাবা-মা, ভাই-বোনদের ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন; কিন্তু আয়ের স্বল্পতার দরুন সঙ্গে রাখতে পারেননি, তারা আবার গ্রামে ফিরে গেছেন। চাপ ও হতাশার ভেতর তাকে দিনপাত করতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটা হয়েছিলেন; তিনিও তেমনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। একাত্তরে তার জন্য থাকার কোনো জায়গা ছিল না, যে জন্য দৈনিক সংবাদ-এর ২৬৩ বংশাল অফিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আশ্রয়স্থলটি যে মোটেই বিপদমুক্ত ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে; তিনি শহীদ হয়েছেন। বুকের ভেতর আগুন ছিল, ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। অপচয় ঘটল উভয়েরই। তার নিজের কারণে নয়, রাষ্ট্রের দৌরাত্ম্যে।

কারাগারে গিয়ে শহীদ সাবের আশা পেয়েছিলেন, মনে করেছিলেন সমাজটা বদলাবে। সেজন্য করণীয় কী তাও জানা হয়ে গিয়েছিল। সংঘবদ্ধ হতে হবে, লেখার মধ্য দিয়ে তো বটেই, রাজনৈতিক কাজের মধ্য দিয়েও। জেলখানায় থাকাকালে তার খাতায় কয়েকটি উদ্ধৃতি লিখে রেখেছিলেন। উদ্ধৃতিগুলোর মধ্যে একটি ছিল, ‘কর্মই হচ্ছে চিন্তার উদ্দেশ্য। যে চিন্তাকে কর্মের দিকে প্রেরণা দেয় না, সে পণ্ডশ্রম। প্রবঞ্চনা মাত্র। অতএব চিন্তার সেবক যদি আমরা হয়ে থাকি, তবে কর্মেরও সেবক আমাদের হতেই হবে।’ উদ্ধৃতিটি লেনিনের লেখা থেকে নেওয়া। বোঝা যায় শহীদ সাবেরের চিন্তাধারাটা কোনদিকে অগ্রসর হচ্ছিল; তিনি কেবল চিন্তা নয়, কর্মের সঙ্গেও যুক্ত হতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি। কারণ রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং সমাজবিপল্গবীরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত।

লেনিনের আরেকটি উক্তিও তার খাতায় তোলা ছিল। সেটি এ রকমের : ‘কোনো জাতিই স্বাধীন হতে পারে না, যতক্ষণ তার জনসংখ্যার অর্ধেক লোক রান্নাঘরে দাসীবৃত্তি করতে বাধ্য থাকে।’ নারীর বিশেষ দুর্দশার কথা তার গল্পগুলোতে রয়েছে; তিনি নারীমুক্তির কথা খুব করে ভাবতেন।

‘আরেক দুনিয়া থেকে’ লেখাটি শেষ হয়েছে এভাবে_ ‘ভেতর-বাইরে সারা দুনিয়ায় আজ দ্বন্দ্ব। জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার পালা এসেছে। একদিন এ তিমির-তপস্যার অবসান হবে_ এ আশাটি ধুকধুক করে জ্বলছে সবার হৃদয়ে। বন্দীরা বেঁচে আছে।’ তা আছে বৈকি! বন্দিরা বেঁচে আছে; কিন্তু মুক্ত হতে পারেনি। সেই সত্যটিই শহীদ সাবেরের জীবন ও রচনাবলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ হই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নিষ্পেষণ দেখে।

নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাংলা একাডেমী তাকে ছোটগল্পের জন্য মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করে। সে কাজটি খুবই যথার্থ হয়েছিল বটে; কিন্তু তিনি বেঁচে থাকলে রাষ্ট্র কি পারত আগের রাষ্ট্রের কৃতকর্মের চিহ্নগুলো মুছে ফেলে শহীদ সাবেরের জন্য চিকিৎসার বন্দোবস্তকরণসহ তাকে পুনর্বাসিত করতে? মনে হয় না যে পারত, কেননা রাষ্ট্র ততটা বদলায়নি যতটা বদলাবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। বদলানোর দায়িত্বটা অবশ্য সেইসব ছেলেমেয়েরই, যারা কেবল নিজ নিজ পরিবারেরই সদস্য নয়, সদস্য সমাজেরও।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষাবিদ