লেনিন-রাকার ক্লান্তিহীন পথচলা

নান্দনিক হাতের স্পর্শে সাজানো সুদৃশ্য বসার ঘর। দেয়ালে টাঙানো কাইউম চৌধুরীসহ অন্যান্য শিল্পীর হাতে আঁকা নানা রকম ছবি। সেগুলোর মধ্যে একটি ফ্রেমে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীরাঙ্গনাদের রাইফেল কাঁধে প্যারেডরত একটি ছবি সদর্পে ঘোষণা করছে বাঙালির তেজস্বিতা। কয়েক মুহূর্তে আবিষ্কৃত হলো, ফ্রেমের ছবিতে প্যারেডে সবার সামনের নারীটি সামনের সোফায় বসা। তিনি কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ উল আলম লেনিনের সহধর্মিণী এই মুক্তিযোদ্ধা নারী।

পারিবারিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা লেনিনের জীবনও বর্ণিল এবং রাজনৈতিক ঘটনাবহুল। বাবা আবদুর রহমান মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা। মা মোমেনা খাতুনও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য। দেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে বাবার কারাগারের বন্দিত্ব দাগ কাটে শিশু লেনিনের মনে। তাই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্র লেনিন নেতৃত্ব দেন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের মিছিলে। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সম্পৃক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে। ‘৭১ সালে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। ‘৭৫-পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আত্দগোপনে থাকেন দীর্ঘদিন।

১৯৭৬ সালের ৪ ডিসেম্বর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহপাঠী মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শ্বশুরবাড়ি যশোরে। বিয়ের পর ঢাকায় আসার পরদিন ১০ দিনের জন্য লেনিন বের হন রাজনৈতিক জেলা সফরে। লেনিনের স্ত্রী রাকা বলেন, ‘বিয়ের পরদিনই ও জেলা সফরে যাওয়ায় আমি চাকরির ছুটি স্থগিত করে কাজে যাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘লেনিন রাজনৈতিক কাজে মাসের প্রায় ২৫ দিনই বাসার বাইরে থাকত। একবার বড় মেয়ে বাবাকে দেখে আমাকে বলে, দেখো দেখো মা, ওই লোকটি কে?’ তবে স্বামীর এই অনুপস্থিতি এবং সংসারের দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতাকে অভিযোগের দৃষ্টিতে রাকা দেখেননি কোনো দিন। নিজে চাকরি করে লেনিনকে দিয়েছেন রাজনৈতিক কাজের সুযোগ। পারিবারিক দায়িত্বও লেনিনের পরিবর্তে তিনিই পালন করেছেন।

দুই মেয়ে টুসি ও তৃষ্ণাকে নিয়ে সুখের সংসার লেনিন-রাকা দম্পতির। বড় মেয়ে টুসি লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপিকা এবং ছোট মেয়ে তৃষ্ণা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনার্সের ছাত্রী। মেয়েরা রাজনীতি-সচেতন, কিন্তু রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাদের নেই বলে জানান লেনিন। দুই মেয়ে এবং স্বামী-স্ত্রী মিলে বছরে দু-একবার কক্সবাজার, বিরিশিরি প্রভৃতি স্থানে বেড়াতে যান তাঁরা। পেশা ও নেশা রাজনীতি হওয়া সত্ত্বেও জীবিকা নির্বাহের জন্য লেনিন কখনো হয়ে ওঠেন লেখক, আবার কখনো কম্পানির কনসালট্যান্ট। বর্তমানে তিনি একটি হারবাল মেডিসিন কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। ওই কম্পানির দেওয়া গাড়ি তিনি ব্যবহার করেন। রাজনীতিসহ অন্যান্য কাজে আর কম্পানির দেওয়া বেতনে চলে তাঁর সংসার। স্ত্রী রাকাও বসে নেই। কথা প্রসঙ্গে জানান, দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে বর্তমানে কলাবাগানে ভাড়া বাসার কাছেই শিশুদের উন্নত নৈতিক জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষাদানের জন্য তিনি চালু করেছেন একটি বিদ্যালয়। লেনিন বলেন, ‘রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি আমার সবচেয়ে আরাধ্য।’ তিনি আরো জানান, গত এক দশকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারসহ প্রায় সব প্রকাশনাই তাঁর হাত দিয়ে হয়েছে। রাজনীতিবিষয়ক তাঁর রয়েছে অনেক বই। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে_’স্বাধীনতার সন্ধানে’, ‘স্বাধীনতা ও উত্তরকাল’, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির স্বপ্ন’, ‘সর্বব্যাপী বঙ্গবন্ধ’ু, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও প্রতিবাদের প্রথম বছর’, ‘আগামীর অন্বেষা, ব্রাত্যজন কথা’, ‘সম্মুখে শান্তি পারাবার’ প্রভৃতি।

লেনিন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় হিসেবে উল্লেখ করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসকে। আর সবচেয়ে বিষাদময় সময়ের কথা বলতে গিয়ে শিহরিত হয়ে ওঠেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী কয়েক বছর তাঁর জীবনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নিষ্ঠুরতম ভয়াবহতার। এই সময়টিকে তিনি সবচেয়ে দুঃসহ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আওয়ামী লীগের এই নেতা দল ও সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেন। তিনি মনে করেন, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের মাধ্যমে একটি নিরাপদ সুস্থ জীবন জনগণের জন্য নিশ্চিত করাই হবে এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

[ad#co-1]