মধুর ক্যান্টিন: এক হৃদয় ছোঁয়া গল্প

মধুর ক্যান্টিন – এরই চত্ত্বরে প্রতি সন্ধ্যায় মঙ্গল প্রদীপ এবং ধুপ জ্বেলে লোবানের শোকার্ত ধোয়ায় শহীদ বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অরুণ কুমার দে। ১৯৭২ সাল থেকে মধুর ক্যান্টিন পরিচালনায় দায়িত্বে আছেন শহীদ মধুসূদন দে’র একমাত্র জীবিত পুত্র অরুণ। তার কাছেই জানা গেল মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাস, বেড়ে ওঠা, ১৯৭১ এর ভয়াবহ ২৫ শে মার্চের স্মৃতির সবকিছু।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর আদিত্য চন্দ্র দে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ছোট ব্যবসা চালাতে লাগলেন। অল্প বয়সেই তিনি পৰাঘাতে মারা যান। এই সময় কিশোর পুত্র মধুসূদন দে হাল ধরেন সেই দোকানের। পরবর্তীকালে ডাকসু কার্যক্রম পরিচালনা ও তার ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া হলে সেটা পরিচালনা করার দায়িত্ত্ব দেয়া হয় মধুসূদনকে। এভাবেই ইতিহাসে ঢুকে পড়েন তিনি। তার অমায়িক ব্যবহার আর অকৃত্রিম সেবার মনভাবের কারণে মধুর ক্যান্টিন হয়ে উঠে সবার মিলনকেন্দ্র। সবার প্রতি ভালবাসার প্রতিদানস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে তৎকালীন আমতলা প্রাঙ্গনে আনুষ্ঠানিকভাবে “আমাদের প্রিয় মধুদা” নামে ভূষিত করেন। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখ।

৫২’র ভাষা আন্দোলনে মধুর ক্যান্টিন ছিল শিক্ষার্থীদের একমাত্র আশ্রয়। আর সদা হাসিমুখে মধুদা ছিলেন সবার কাছাকাছি। এরপর ‘৬৬ -এর ছয়দফা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, তারপর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, মধুদা তৎকালীন ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন-কে একটি ডিম ভেজে খাইয়ে বলেছিলেন, “দাদা পরিস্থিতি ভাল না। নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।” মেনন এবং অন্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারলেন, আর মধুদা!

শিববাড়িস্থ কোয়ার্টার। পরদিন ২৬ মার্চ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেন মধুদা। স্নান সেরে পুত্রবধূ রানী দে’কে বললেন উনুনে চায়ের জল বসাতে। তখন সবে সকালের নাস্তা তৈরীর আয়োজন চলছিল। এমনি সময়ে হঠাৎ দরজায় লাথির শব্দ। খুব জোরে জোরে দরজায় লাথি মারছে আর উর্দূতে বলছে, ’দরজা খোল, কোই হ্যায়।’ সারা রাত কার্ফ্যু এবং গুলির আওয়াজে উদ্বিগ্ন পরিবারটি ভীত হয়ে পড়ল। পরিবারের কর্তা মধুদা আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজা খুলতেই দুজন পাকিস্তানি সেনা ঘরে প্রবেশ করল। মধুদার দিকে স্টেনগান তাক করে তাঁকে বাইরে যেতে বলা হল। তাকে নিয়ে যাওয়া হল পাশের কক্ষে। তারপর আবার ঘরে ঢুকেই তারা আটক করে পুত্রবধূকে। মধুদার ছেলে রণজিৎ চিৎকার করে তাকে বলতে থাকেন হাত তোলো, হাত তোলো। তখনই সেনাদ্বয় তাদের দুজনকে ব্রাশ ফায়ার করে ঝাঝরা করে ফেলে। বাকি সবাই ভয়ে চুপসে যায়। এরপর পাকিস্তানী সেনারা পাশের কক্ষে যায়। তাদেরকে যেতে দেখে গৃহকর্তী যোগমায়া দে দ্রুত ওপাশে গিয়ে মধুদাকে জড়িয়ে ধরেন। আবারও শুরু হয় ব্রাশফায়ার। গৃহকর্তীর দু’হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি সাথে সাথেই মারা যান, মারাত্বকভাবে আহত হন মধুদা। এরপর পাকসেনারা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রক্তে ভেসে যায় পুরো বাড়ি। মধুদা তাঁর স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বিলাপ করতে থাকেন; “আমার সব শেষ হয়ে গেল, ওরা সব শেষ করে দিল।”

বেলা বাড়তে থাকল। ঘরে তিনটা লাশ পড়ে আছ। মধুদা হাতে ও পায়ে গুলি খেয়ে মারাত্বকভাবে আহত। কিন্তু সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর পাকিস্থানি সেনারা আবার ফিরে এল মধুদা’কে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এটা বুঝতে পেরে ছেলে মেয়েরা কান্নাকাটি শুরু করে পাক সেনাদের পা জড়িয়ে ধরে। পাকিস্তানীরা বাচ্চাদের বলল যে, তাদের বাবাকে নিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিলেন মধুদা। এটাই ছিল শিববাড়ির কোয়ার্টার থেকে মধুদার শেষ যাওয়া। মধুদাকে নিয়ে যাওয়া হল জগন্নাথ হলের মাঠে। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক জি.সি. দেবের সাথে এক লাইনে দাড় করিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সবাইকে একসাথে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।

মধুদা’র ছিল পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। মধুদা’র সাথে তাঁর স্ত্রী বনমায়া দে, বড় ছেলে রনজিৎ কুমার দে এবং পুত্রবধূ রীতা রানী দে শহীদ হোন। তখন মধুদার দুইমেয়ে প্রভাতী ও সুষমা বড় মেয়ে অনিমার শাখারী বাজারের বাসায়। বাকি ছেলে মেয়েরা তাদের বাবার অপেৰায় দেড় দিন তিনটি লাশের সঙ্গে থেকে মধুদার বন্ধু হীরালাল এর বাসায় চলে যায়। পরে শোনা গিয়েছিল সেই তিনটি লাশ পাকসেনারা বাইরে ফেলে গিয়েছিল। যা পরে মিনিউসিপ্যালটির গাড়ি নিয়ে যায়। আর মধুদাকে জগন্নাথে নিহত সবার সাথে সেখানেই গণকবরে সমাহিত করা হয়।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন হয়েছে অনেক গতিময়। অরুণ দে জানান, বাংলাদেশের সব স্বাধিকার আন্দোলন হয়েছিল মধুর ক্যান্টিনকে কেন্দ্র করে। সে অর্থে মধুর ক্যান্টিন নামটিও ছিল চেতনাবহ। স্বাধীন দেশেও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র বিন্দু ছিল এটি। বর্তমান ও অতীতের মধুর ক্যান্টিনের মধ্যে কোন তফাৎ নেই বলে দাবী করেন অরুণ কুমার দে। তিনি বলেন যতটুকু পার্থক্য তা আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। মধুর ক্যান্টিন আগেও যেমন ছিল সবার মিলনকেন্দ্র, এখনো তেমনি আছে।

সকালে মধুর ক্যান্টিনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে আসবে তুলসী গাছের ঘ্রান। প্রতিদিনের মত আজও ধোয়ামোছা করা হয় মধুর ক্যান্টিন। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো হয়। একটু পরেই ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে ক্যান্টিনের আঙ্গিনা, চায়ের কাপে ঝড় তুলবেন কোন ছাত্রনেতা, জমে উঠবে সংগঠনকর্মীদের আড্ডা। ক্যান্টিনের সামনে মধুদা’র ভাস্কর্য যেন কথা বলে, আশির্বাদ করে ক্যান্টিনে আসা সকলকে; সৃষ্টির উল্লাসে মেতে উঠো সবাই। ভুলে যেও না যেন ১৯৭১।

মাজেদুল হক

[ad#co-1]