মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহরীর ভূমিকা নিতে হবে : এসপি মাহবুব

মাহবুবউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম­ এসপি মাহবুব হিসেবে সমধিক পরিচিত। পুলিশ সুপার হিসেবে অবসর গ্রহণের পর বর্তমানে ব্যবসা এবং রাজনীতিতে ব্যস্ত। বঙ্গবন্ধু পরিষদের ঢাকা মহানগর সভাপতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কিংবদন্তিসম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মাহবুবউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা। ‘৬৪-৬৫ সালে তৎকালীন ঢাকা হল (শহীদুল্লাহ হল) ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

যদিও সে সময় এ হলটি ছিল সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন এনএসএফ-এর ঘাঁটি। অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৭ সালে এএসপি হিসেবে সারদা পুলিশ একাডেমিতে যোগদান করেন। ‘৬৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম পোস্টিং পান তৎকালীন গভর্নরের এডিসি হিসেবে। ১৯৭০ সালের মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ময়মনসিংহে এএসপি (ট্রেনিং) ছিলেন। জুন মাসের শেষে আবার আগের পদে ফিরে আসেন। সেপ্টেম্বর মাসে ঝিনাইদহের এসডিপিও হিসেবে পোস্টিং পান। একাত্তরের জানুয়ারি মাসে সেটেলমেন্ট ট্রেনিঙের জন্য তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। ৭ মার্চ সাতকানিয়া থেকে চট্টগ্রাম আসেন রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। কিন্তু রেডিওতে ভাষণ সম্প্রচার করা না হলে ঐ দিন সন্ধ্যায়ই পরিস্খিতি জানার জন্য রওনা হন ঢাকার উদ্দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। এ কারণে বঙ্গবন্ধুসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। ৭ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্খান করে নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। পুলিশে চাকরি করতেন­ তাই নিয়মিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যাতায়াত করতেন। এই সুবাদে সারা দেশের খবর পেতেন সহজেই। বুঝতে পারেন ঢাকার মতো সারা দেশই তখন বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে।

মাহবুব সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের কর্মস্খলে ফিরে গিয়ে জনগণকে সংগঠিত ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের। ১৮ তারিখ ফিরে গেলেন ঝিনাইদহ। ঐদিন স্খানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করেন। ঝিনাইদহে আন্দোলন তখন তুঙ্গে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে মাহবুব যখন সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন­ নেতারা খুবই আনন্দিত ও উৎসাহিত হলেন। বৈঠকে আলোচনার পর ছাত্রলীগের ছেলেদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন আনসার, মুজাহিদ ট্রেনিঙে।

২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের খবর ঝিনাইদহের পুলিশের ওয়্যারলেসেও ধরা পড়ে। মাহবুব থাকতেন ওয়াপদা রেস্ট হাউসে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে খবরটি জানিয়ে দেওয়া হয়। এ খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে যান থানায়। সেখানে নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ সদস্যদের ডেকে পরিস্খিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ঐ রাতে থানায় উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলার পতাকা। তার নিয়ন্ত্রণে ৪/৫শ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। এগুলো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করেন।

এ সময় যশোর থেকে টেলিফোন আসে যে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আসছে ঝিনাইদহের দিকে। খবরটি তিনি কুষ্টিয়াতে জানিয়ে দেন। এরই মধ্যে ঝিনাইদহ শহরের মোড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে পৌঁছে গেছে। মাহবুব ওয়াপদার অফিসারদের অনুরোধ করেন শহরে ‘ব্ল্যাক আউট’ করার জন্য। অফিসাররা সহযোগিতা করেন। শহর অন্ধকার হয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা এতে ভয় পেয়ে ফিরে গিয়ে শহরের বাইরে অবস্খান নেয়। সেখান থেকে একটা অগ্রবর্তী দল পাঠায় শহরে। ততোক্ষণে মাহবুব তার বাহিনী নিয়ে শহর থেকে খানিকটা দূরে একটা আখক্ষেতে গিয়ে অবস্খান নেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়ানো। পাকিস্তানি বাহিনী থানায় এসে কাউকে না পেয়ে মূল দলের সঙ্গে মিলে চলে যায় কুষ্টিয়ায়। ওরা চলে যাওয়ার পর মাহবুব তার দল নিয়ে আবার শহরে ফিরে আসেন। সিদ্ধান্ত নেন শহর রক্ষার লক্ষ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল বিঘিíত করার। সে অনুযায়ী যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের বিশখালি ব্রিজ ও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সড়কের গেরাগঞ্জ ব্রিজ অকার্যকর করে দিলেন। একই সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়ক ও ফরিদপুর থেকে রাজবাড়ী-কুমারখালী সড়কে স্খানে স্খানে গাছ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করলেন। এক কথায় ঝিনাইদহ অভিমুখী সবগুলো রাস্তা বন্ধ করে দিলেন।

এ সময় একটা সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিলেন, যশোর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের। এ লক্ষ্যে যশোরের দিকে অগ্রসর হয়ে বারোবাজার ব্রিজের কাছে অবস্খান শক্ত করেন। অন্যান্যদিক থেকেও ভিন্ন ভিন্ন দল যশোরের দিকে অগ্রসর হয়। চারদিক থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সে আক্রমণ আর হয়নি­ নানান কারণে।

এর আগে মার্চ মাচের ২৮ অথবা ২৯ তারিখ আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কুষ্টিয়া হয়ে ভারতে যান। মাহবুব ও তার বন্ধু মেহেরপুরের এসডিও তওফিক দুনেতাকে সীমান্তে পৌঁছে দেন। যশোর সেনানিবাস আক্রমণের জন্য কিছু ভারী অস্ত্রের ব্যবস্খা করতে তাজউদ্দিন আহমদকে অনুরোধ জানালে তিনি বিএসএফ-এর কাছ থেকে নিয়ে কিছু হাই এক্সক্লুসিভ গ্রেনেড এবং অন্যান্য অস্ত্র দেন। ১৩ এপ্রিল বারোবাজারে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অস্ত্র ও জনবলে অনেক শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাৎপসারণ করতে বাধ্য হন। মাহবুব তার দল নিয়ে ঝিনাইদহ ছেড়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে সরে যান। ১৬ এপ্রিল পাকিস্তান এয়ারফোর্স চুয়াডাঙ্গায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। মাহবুব তার সৈন্যদের নিয়ে বোমা বর্ষণের মুখে পড়েন। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তাদের। ঐ দিনই সদলবলে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্খান নেন। যাওয়ার পথে ট্রেজারি আক্রমণ করে নগদ ৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ও ২৫ কেজি স্বর্ণ সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পরে এগুলো মুজিবনগর সরকারের কাছে জমা দেন।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন মাহবুবউদ্দিন আহমেদ। এখানে অস্খায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অফ অনার প্রদানকারী দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯ এপ্রিল নিজ সৈন্যসহ বেনাপোল এলাকায় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে সংযুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাতক্ষীরা সাবসেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সেক্টরের অধীনে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেন। ২৮ মে মুক্তিবাহিনীর ভোমরা ডিফেন্সের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বৈকারী ঘাঁটির ওপর আক্রমণ করেন। ১০ ঘন্টা স্খায়ী এ যুদ্ধে গুরুতরভাবে আহত হন মাহবুব। এখানে তার অন্তত ৫০ জন সহযোদ্ধা শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ অবস্খায় পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোনোরকমে নিরাপদ অবস্খানে চলে যান মাহবুব। ভারতের ব্যারাকপুর সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সুস্খ হওয়ার পর ১৬ অক্টোবর আবার সেক্টরে যোগ দেন।

ডিসেম্বরের প্রথমদিকে ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে মিলে যশোর দখল করেন। তার ঘাঁটি স্খাপন করেন যশোরের মনিরামপুরে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করলে যশোর এলাকায়ও ছোট ছোট দল আত্মসমর্পণ করতে থাকে। মাহবুবউদ্দিন আহমেদ মনিরামপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন। ২৮ ডিসেম্বর নির্দেশ আসে মুক্তিযোদ্ধারা যে যার পূর্বতন কাজে ফিরে যাবে। মাহবুব ও তওফিক একসঙ্গে ঢাকায় গিয়ে সচিবালয়ে যোগদান করেন। পরে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য তাকে বীরবিক্রম উপধিতে ভূষিত করে।

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবউদ্দিন আহমেদ এ প্রতিবেদকের কাছে তার অনুভূতি ব্যক্ত করে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, একাত্তরে যে আলবদর, রাজাকার-জামাতিরা পাকিস্তানিদের দালালি করেছে, এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছে তারা আজ দেশের ক্ষমতায়­ একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে। তিনি বলেন, ইসলামের নামে ভাঁওতা দিয়ে ‘৭১ সালে জামাতিরা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে হত্যা করেছে। আজও তারা একই কায়দায় হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এখন এদের বিরুদ্ধে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করতে হবে। এদের চিরতরে উৎখাত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বৃহত্তর ঐক্য। মাহবুব বলেন, এই যে মহাঐক্য হচ্ছে­ এ ক্ষেত্রে আমারও একটা ভূমিকা আছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারাই প্রথম এই ঐক্যের ডাক দিয়েছিলাম। এখন এই ঐক্যমোর্চা যদি হয় তাহলে আন্দোলন সফল হবে। এই ঐক্যের মাধ্যমে যদি লক্ষ্য অর্জিত হয় তাহলে আবার যেন সেটা বিপথগামী না হয় সেজন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহরীর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

লেখার সোর্স

[ad#co-1]