দুইজনায় বাঙালী ছিলাম, আমারে কও ইন্ডিয়ান…

সত্যেন সেনের জন্মবার্ষিকীতে উদীচীর গণসঙ্গীত উৎসব
‘দুইজনায় বাঙালী ছিলাম/ দেখো দেখি কা-খান/ তুমি এখন বাংলাদেশী/ আমারে কও ইন্ডিয়ান…’ হাসতে হাসতেই প্রতুল মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখা নতুন এ গানটি গেয়ে শোনালেন সাংবাদিকদের। তবে এ নিয়ে তাঁর মনের ভেতর যে অনেক ৰোভ ও দুঃখ জমে আছে, তা আর আড়াল রইল না। স্পষ্টভাবেই তা ফুটে উঠল তাঁর চোখেমুখে। এ প্রসঙ্গে আরও বললেন, অনেকেই বলেন এ গানটা বাবুর গান বলেই তো মনে হচ্ছে, ঐ যে ইন্ডিয়ান বাবু। আমি যে বাঙালী, এটা এখানকার কেউ আর বলেন না। কিন্তু আমার পিতৃভিটা এই বাংলাদেশেই, বরিশালে। আমি আপাদমস্তক বাঙালী। উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী সত্যেন সেনের ১০৪তম জন্মদিন উপলৰে আয়োজিত দু’দিনব্যাপী গণসঙ্গীতের উৎসবে এসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। গণসঙ্গীত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যতদিন মানুষের সংগ্রাম থাকবে, মানুষ নির্যাতিত হবে, ততদিন গণসঙ্গীত থাকবে। গণসঙ্গীত হলো গনের সঙ্গীত, অর্থাৎ জনগণের সঙ্গীত_আর নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের ৰোভ ও না পাওয়ার বেদনা থেকেই জন্ম নেয় এই গণসঙ্গীত। আর এই লিখেন আমার মতোই অল্প শিৰিত ব্যক্তিরা। বিশ্বের যেখানেই মানুষ আগ্রাসীর স্বীকার হয়েছে, সেখান থেকেই উঠে এসেছে কোন না কোন সঙ্গীত, আর তা-ই হলো গণসঙ্গীত।

কখনও কখনও কোন দেশের মুক্তিটা যখন বড় হয়ে দেখা দেয়, সেখানে সবাই যখন এক হয়, যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিব বলেছেন_’যে যেখানে আছ সবাই এক হও, যার যা আছে, তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর_এই যে এই আহ্বান এ সময়ে যা-ই রচিত হয়েছে, তা-ই গণসঙ্গীত। আমি আমার গানে আন্দোলনকারী সেই সব বিপ্লবী মানুষের চিন্তাভাবনাগুলোকেই গ্রন্থিত করেছি। আজ সে গান ছড়িয়ে গেছে মানুষের কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে। আমাদের এখন এমন গান তৈরি করতে হবে, যে গান নাড়া দেয় মানুষের প্রাণে। তবে বর্তমান প্রজন্মের শিৰিত তরম্নণেরা গণসঙ্গীত চর্চায় খুব উৎসাহী হচ্ছে তা বললে ভুল বলা হবে, তবে কেন এমনটি হচ্ছে তা আমার জানা নেই। ৩৮ বছর পর গণসঙ্গীতের এই উৎসবে এসে তিনি আরও বলেন, আমি এখানে কোন উৎসব উদ্বোধন করতে আসিনি। আমি এসেছি উদ্বুদ্ধ হতে। বাংলাদেশের গণসঙ্গীতের ঐতিহ্য জানতে এবং এখান থেকে নিতে এসেছি। শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত মঞ্চের সামনে উদীচীর শিল্পীরা জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা…’ এবং ‘আমরা মিলেছি আজকে সারা বিশ্বের কোটি বাঙালী…’ গান দু’টি পরিবেশনের সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উঠিয়ে এবং ঢাক-ঢোল ও মৃদঙ্গ বাজিয়ে, বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন খ্যাতিমান নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সুধীন দাস ও প্রতুল মুখোপাধ্যায়। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উদীচীর সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ইদু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, ফকির আলমগীর, মাহমুদ সেলিম প্রমুখ। মঞ্চে এসে উদীচীর শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে আরও গেয়ে শোনান_আরশির সামনে একা একা দাঁড়িয়ে…গানটি।

গণসঙ্গীতের এই উদ্বোধনী আসরে দেশের প্রথিতযশা গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর তাঁর ভরাট গলায় গেয়ে শোনান_নাম তাঁর ছিল জন হেনরী…, দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা… এবং সখিনারে দেশে রেখে মুক্তিযুদ্ধে যায়… গান তিনটি। আর তাঁরই সংগঠন ঋষিজের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করে_ ৰুদিরামের গল্প বলে না…, মানুষের মাঝে বসবাস করি মানুষে মিলেছে ঠাই… এবং ভয় কি মরণে… গানগুলো। এরপর সারগাম পরিবেশন করে তাদের দলীয় পরিবেশনা। শেষে উদীচী বিভাগ ওয়াইজ গণসঙ্গীত শিল্পী সংগ্রহের প্রতিযোগিতার বিজয়ী ৩৯ জনের হাতে তুলে দেয় পুরস্কার। আজ রবিবার এই গণসঙ্গীত উৎসবের সমাপনী দিনে দুই বাংলার বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় গান গাইবেন।

সৈয়দ সোহরাব

আরেকটু বিস্তারিত…

[ad#co-1]