স্বাধীনতার দায়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
পাকিস্তান একটি কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক রাষ্ট্র ছিল। সেই রাষ্ট্রের মধ্যে অধিকাংশ নাগরিক বাঙালি এবং বাঙালিরাই মূলত ভোট দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হল তখন দেখা গেল এই সাধারণ বাঙালিদের যেসব আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন ছিল তারা মুক্তি পাবে। সেই মুক্তি তারা পাচ্ছে না এবং এই মুক্তি না পাওয়ার অনেকগুলো লক্ষণ ছিল। সাধারণ মানুষ যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা ভেবেছিল, সে মুক্তি এলো না। মধ্যবিত্ত ভেবেছিল সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে, চাকরি পাবে, পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য করবে, সেগুলোর কিছুই হলো না। কি ঘটলো? অবাঙালিরা সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে।

চাকরিগুলো তাদের, ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের এবং কলকারখানা তৈরি হচ্ছে, যে পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে সেগুলোও তাদের। ফলে দারুণ একটা হতাশা সৃষ্টি হলো সমগ্র বাঙালি সমাজের ভেতর। তারপরে যখন উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হলো। এই রাষ্ট্রের মধ্যে বাঙালি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবেই থাকবে। সে একবার ইংরেজি শিখে যোগ্যতা অর্জন করেছিল। এখন ইংরেজি শিক্ষাটাও কাজে লাগবে না। তাকে উর্দু শিখতে হবে। কিন্তু উর্দু শিখে সে সুবিধা করতে পারবে না। কেননা উর্দু যাদের শেখা আছে তারাই ওখানে যোগ্যতা পাবে। কাজেই আবার সে পিছিয়ে পড়বে এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হবে। এটা হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপলব্ধি।

আর জনগণের উপলব্ধি হচ্ছে তারা দেখছে তাদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আসে নি। আগে হিন্দু জমিদার ছিল এখন মুসলমান জোতদার এসেছে, হিন্দু মহাজন ছিল এখন মুসলমান মহাজন এসেছে। অবাঙালিরা চলে এসেছে সর্বত্র প্রশাসনে ব্যবসা বাণিজ্যে শিল্পে। এই ব্যর্থতাবোধটাই চালিকা শক্তি ছিল রাষ্ট্রভাষা। যদি রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটা না উঠত তাহলে আন্দোলনটা হতো না। কেননা মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজি শিখে ফেলেছে। ইংরেজি তার অভ্যাসে আয়ত্ত হয়েছে এবং সে ব্যবহার করতে জানে, কাজেই মধ্যবিত্ত বাঙালি যে ইংরেজি বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার আন্দোলন করত সেটা ঠিক নয়। প্রশ্নটা হল রাষ্ট্রভাষা উর্দু হয়ে যাচ্ছে, সেজন্যই আন্দোলনটা হল। এটা ইংরেজির বিরুদ্ধে না, এটা হচ্ছে উর্দুর বিরুদ্ধে এবং উর্দুর চাপিয়ে দেয়া আধিপত্যর বিরুদ্ধে।

এটা একটা দিক ছিল এবং আরেকটা দিক হল এটা বুঝিয়ে দিল যে এই রাষ্ট্রটা একটা কৃত্রিম রাষ্ট্র, অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। এখানে অবাঙালিরাই বাঙালিদের উপর কতৃত্ব করবে এবং এটা একটা উপনিবেশ হবে। উর্দু উপনিবেশ। ব্রিটিশ উপনিবেশ মুক্ত হবার পর একটা স্বায়ত্তশাসন পেলাম ’৪৭-এ সেই সঙ্গে স্বায়ত্বশাসনের অধীনে আবার পুরোপুরি একটা ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির মধ্যে চলে যাচ্ছি। যে কারণে অবাঙালিরা বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা এখানে কতৃত্ব করবে দুই কারণে তারা সেনাবাহিনিতে আছে এবং সামরিক বাহিনি কতৃত্ব করবে এই রাষ্ট্রের এবং করতে থাকবে। পাঞ্জাবিরা আবার প্রশাসনেও আছে। তৃতীয় হচ্ছে তারা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সুবিধা করতে পারবে। পূর্ববঙ্গ একটা উপনিবেশ তৈরি হবে, কাজেই উপনিবেশের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন যে বিক্ষোভ সেটা এর মধ্যে জুটল। মধ্যবিত্তের বিক্ষোভ, মধ্যবিত্ত নেতৃত্বে ছিল, জনগণের যে হতাশাবোধ সেটা একত্র হয়ে বিস্ফোরণ ঘটল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কেবলমাত্র আন্দোলন ছিল না।

এটা ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান এবং এর মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রকেই প্রত্যাখ্যান করা হল এবং প্রত্যাখ্যান করার আরেকটি বদ কারণ হল যে জাতীয়তাবাদের উপর এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ছিল সেটা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। সেই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে তার জায়গায় চলে এল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বোধ। পাঞ্জাবি ও বাঙালি এক নয়, যদিও দুজনেই মুসলমান। কিন্তু একজন পাঞ্জাবি মুসলমান, অপরজন বাঙালি মুসলমান, দুজনেরই ভাষা ভিন্ন এবং এটাই প্রতিষ্ঠিত হল ভাষা হল জাতীয়তাবাদের প্রধান ভিত্তি, একক নয় কিন্তু প্রধানভিত্তি। ঐযে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বোধ সৃষ্টি হল এর সঙ্গে স্বায়ত্বশাসনের দাবিটাও চলে এসেছে, উপনিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। স্বায়ত্বশাসনের দাবিই নতুন জাতীয়তাবোধের এবং এ নতুন জাতীয়তাবোধই এর পেছনে রইল। এটা মিলে ক্রমাগত আমরা স্বাধীনতার দিকে এগুতে থাকলাম।

তারপরে রাষ্ট্র আন্দোলনেরই পরিণতি দেখা গেল। ১৯৫৪ তে এখানে প্রাদেশিক নির্বাচন হল, সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ যাদের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই মুসলিম লীগ জনগণ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখাত হল। এইবার প্রত্যাখ্যান আরও গভীরে চলে গেল যেটি উর্দু না রাষ্ট্রের প্রত্যাখ্যান হয়ে দাঁড়াল। এই প্রত্যাখানের মধ্যে দিয়ে পাঞ্জাবিরা বিচ্ছিন্নতার ভয় পেল যখন দেখল বাঙ্গালিরা দাঁড়িয়ে গেছে। তখন তারা সামরিক শাসন জারি করল, যুক্ত সভা ভেঙ্গে দিয়ে কেন্দ্রিয় শাসন প্রতিষ্ঠা করল। কেন্দ্রিয় শাসনেও সন্তুষ্ট না থেকে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের নির্দেশে সরাসরি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করল। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের তাৎপর্যটা হল, এটা সরাসরি পাঞ্জাবিদের আধিপত্যে চলে গেল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনি ছিল, পাঞ্জাবি বাহিনি। তাদের নেতৃত্ব ছিল পাঞ্জাবি। যেখানে বাঙালির সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগন্য। পাঞ্জাবিরাই কর্তা, তারা সবাই উচ্চপদস্থ, তাদের সাথেই আবার আমলাতন্ত্র একসাথে যুক্ত হল। এখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনটা হল সেই আন্দোলনটাই হল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ক্রমাগত আমরা স্বাধীনতার দিকেই এগুচ্ছি।

প্রথমে ছিল রাষ্ট্রভাষা চাই। তারপরে স্বায়ত্বশাসন চাই। তারপরে স্বায়ত্ত্বশাসন হল সেই অভ্যুত্থানে মানুষের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে দিল। পাকিস্তানি শাসকরা সংখ্যা সাম্য নীতির আরেকটা ষড়যন্ত্র করেছিল। এই যে আমাদের ৫৪ জন এবং ওদের ৪৪ জন এদেরকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান করে দিল। আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী অর্থাৎ সামনে সমান হয়ে গেল। এবং এই সংখ্যা সাম্যনীতিটা সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের সর্বত্রই আসবে। এখন পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬ জন পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৪ জন সমান হয়ে গেল। আবারও পূর্ববঙ্গকে সাংবিধানিকভাবেই কমিয়ে দেয়া হল। তখন দাবিটা উঠল যত মানুষ তত ভোট । তখন সংখ্যা সাম্যনীতি ভেঙ্গে দিয়ে ইয়াহিয়া খান এটা মানতে বাধ্য হল। প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার স্বীকৃতি পেল এবং ঐ স্বীকৃতির ফলে যে সংসদ হবে সেখানে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাধিক দেয়া হবে। আমাদের সংখ্যা অধিক থাকবে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায়। ’৬৯-এর অভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতন হল, আরেকটা সামরিক শাসন এল।

ইয়াহিয়া খানের শাসন। তারা বাংলায় আন্দোলনকে প্রশমিত করে সংখ্যা সাম্য ভেঙ্গে দিয়ে প্রত্যেককে ভোট দিল, নির্বাচন দিল। নির্বাচন সবসময়ই মানুষের বিদ্রোহ প্রশমনের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ফলে যে অভ্যূত্থনের মত হয়েছিল ৫৪ র নির্বাচন দিয়ে সেটাকে প্রশমিত করা হল। এবার ৬৯ যে প্রবল অভ্যুত্থান হল সেটাকে প্রশমিত করতে ৭০ এর নির্বাচন দিল। তাদের আশা ছিল যে এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটা বিভাজন তৈরি করা যাবে। পাকিস্তানপন্থী কিছু লোক আসবে এদের সাথে তাদের একটা ঐক্য হবে এবং এক ধরণের সমঝোতার মধ্যে আসবে। কিন্তু নির্বাচনের ফল সামরিক শাসকদের জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। এই নির্বাচনে শেখ মুজিব যে ছয় দফা দিয়েছিলেন সেটি কিন্তু স্বাধীনতার জন্য ছিল না । তখন মনে করা হচ্ছিল যে এই ছয় দফার বিষয়ে আপোষ করা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচনের পরে দেখা গেল তখন ছয় দফা না একদফা বেরিয়ে এসেছে। মার্চে স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা চলে এসেছে। তখন ওরা দেখল এখন যদি সংসদ অধিবেশন হয় তবে শেখ মুজিবুর রহমান হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং সব বদলে যাবে ।

ঢাকা হয়তো রাজধানী হবে। নৌবাহিনীর কেন্দ্র চট্রগ্রামে হবে বলাই ছিল। পাঞ্জাবিরা ভয় পেয়ে গেল যে তাদের হাতে তো ক্ষমতা থাকছে না। ভূট্টো আবার ষড়যন্ত্র করছে, সে ক্ষমতা চায় এবং প্রয়োজনে সে দুটো পাকিস্তান চায়। ভূট্টো উৎসাহিত করল এবং পাঞ্জাবি সেনারা এক হয়ে গণহত্যার পরিকল্পনা করল। আমরা দেখতে পাই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান, সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভ্যূদয় তারপর স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি পরে স্বাধীনতার দাবি এগুলো ধাপে ধাপে এগিয়ে ভিত্তিতে আসছে। মূল বিষয়টা হচ্ছে এখানে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটা রাষ্ট্র তৈরির দাবি এবং এর উদ্ভব ’৫২-এর কালেই। অর্থাৎ ১৯৫২ সালেই আমরা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে বেরিয়ে এলাম । এটা শুধু ভাষার ব্যাপার না এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।

এটা রাষ্ট্রকেই আঘাত করল। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা মানে রাষ্ট্রর মধ্যে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আমরা রাষ্টভাষা পেয়ে গেলাম কিন্তু যে মধ্যবিত্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেল তারা কিন্তু পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে এটা হল মূল সত্য। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এদেশে হয়েছে, সেটা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ছিল কিন্তু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ছিল না এবং কংগ্রেস-লীগ সবাই পুঁজিবাদে বিশ্বাস করত। পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হল সেই কর্তারাও পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে। তার প্রমাণ খুব পরিষ্কার। ব্রিটিশ ভারতে কম্যুনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। কারণ কম্যুনিষ্ট পার্টি পুঁজিবাদ বিরোধী। এটা ব্রিটিশ শাসকরা নিষিদ্ধ করেছে। ’৪৭-এ স্বাধীনতার পরে দেখা গেল যে ভারতে মুসলিম লীগ নিষিদ্ধ হয় নি। যদি মুসলিম লীগ ঐ অর্থে ভারত বিরোধী তারা তো পাকিস্তান চেয়েছিল, তারা সংসদে আছে, সবাই আছে কিন্তু কম্যুনিষ্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পাকিস্তানেও একই ঘটনা সেখানে কিন্তু কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ করা হয় নি। নিষিদ্ধ করা হয়েছে কম্যুনিষ্ট পার্টিকে ।

তার অর্থ কংগ্রেস লীগ সকলেই ছিল পুঁজিবাদের পক্ষে এবং পুঁজিবাদের যারা বিরোধী তাদের বিপক্ষে। তাদের শত্র“ ছিল পুঁজিবাদ, বিরোধীরা অর্থাৎ সমাজতন্ত্রীরা এবং সমাজতন্ত্রীরা যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্যে তড়িঘড়ি করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে ’৪৭-এর ভাগটা করা হল। কেননা ’৪৫-৪৬ সালে বিশেষ করে বাংলায় একটা প্রায় বৈপ্লবিক পরিস্থিতি ছিল। চর্তুদিক থেকে মানুষ ক্ষেপে উঠেছে। জেগে উঠেছে শ্রমিক কৃষক ছাত্র, তারা ধর্মঘট করছে। নৌবাহিনিতেও ধর্মঘট হয়েছে। ওদিকে সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ চলে এসেছিল। তারা কিন্তু আতœসমর্পন করেছিল। পরাজিতরা ভেঙে গেল তারা কিন্তু আছে তাদের যে চেতনা সেটা তো মানুষের মধ্যে আছে। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহটা খুব বড় ঘটনা।

সেটা বিশেষ করে বুঝিয়ে দিল এখন ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মধ্যেও বিদ্রোহ হতে পারে এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের কয়েকজনকে শাস্তি দিতে গিয়ে মামলা করে। আবার দেখ গেল সমস্ত জনগণ আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষে। তারা ভেবেছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের লোকদের কে ধিক্কার দেবে এবং ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখবে। উল্টো সমস্ত লোক তাদের পক্ষে । তাহলে দেখল একটা বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। এই সামরিক বিপ্লবে ভয়টা ১৯১৭ সালের পর থেকেই তাদের মনে শুরু হয়েছে স্বাভাবিকভাবে । কেননা ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব ঘটে গেছে এবং রুশ বিপ্লবের পটভূমিতেই ১৯২০ সালে গান্ধী ভারতে এসে কংগ্রেসকে আরও শক্তিশালী করলেন। তার আগে কংগ্রেস খুব ভাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। গান্ধীর পেছনে যত ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ছিল।

তিনি ব্রিটিশ বিরোধী অপরদিকে তারা গান্ধীকে পছন্দ করে এজন্য তিনি শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লব এবং এখানে রুশ বিপ্লব ঘটার যে সম্ভাবনা তার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং তিনি ধর্মকে নিয়ে এসেছেন রাজনীতিতে। তিনি যে পুঁজিপতিদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং তিনি শ্রমিক-কৃষকের দাবি কথা মোটেই বলছেন না; কংগ্রেসে কিন্তু শ্রমিকদের কোনও স্থান ছিল না, কৃষকদের কোনও স্থান ছিল না, পরবর্তীতে সেখানে দেখা গেল নেহেরুকে, কাজ করার জন্য গান্ধী তাকে কংগ্রেসের সভাপতি করে দিলেন এবং নেহেরু ঐ নির্বাচনের মধ্যে ঢুকে গেলেন। নেহেরু পুরোপুরি সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। সমাজতন্ত্রের কথা সুভাষ বসু বলতেন কিন্তু সেই সমাজতন্ত্র হল ভারতীয় সমাজতন্ত্র। সেটা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র নয় এবং তার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে আধ্যাত্মিক সমাজতন্ত্র। সেটা লেলিনের মত নয়, এটা ভারতীয় এবং ভারতীয় মানেই রামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দের সমাজতন্ত্র ।

ভয়টা ছিল সমাজতন্ত্রের। সেইজন্য ইংরেজরা একটা ষড়যন্ত্র করল সেটা হল কংগ্রেসরা যখন আন্দোলন করেছে তখন তারা দেখল বিশেষ করে ১৯০৫ সালে বঙ্গ বিভাগের পর থেকে কংগ্রেসের মধ্যে একটা তথাকথিত চরমপন্থী দল বের হল। যারা পূর্ব স্বাধীনতা দাবি করবে। তখন তারা মুসলিমদেরকে উৎসাহিত করল এবং বলল, তোমরা মুসলিম লীগ গঠন কর এবং স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবি কর। স্বতন্ত্র নির্বাচন হল, এই নির্বাচন সেই ক্ষেত্র যার উপর ভিত্তি করে ভারত বিভক্ত হয়েছে। অর্থাৎ মুসলমানরা মুসলমানদেরকে ভোট দেবে এবং হিন্দুরা হিন্দুদেরকে ভোট দেবে। এটা আলাদা হয়ে গেল। তারপরে শিখদেরকে ভোট আলাদা করে দিল। হিন্দুদেরকে আবার দুই ভাগে ভাগ করতে চাইল। বর্ণ হিন্দু এং তফসিলী হিন্দু। এইভাবে তারা ভাগাভাগি করে দিল অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতাটাকে ইংরেজরা রাজনীতিতে নিয়ে এল। এবং ঐ সাম্প্রদায়িকতাটা পরে উগ্র আকার ধারণ করল ।

তারপরে ওদেরই উস্কানিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে থাকল। এর ফলে যেটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে পরিণত হল এবং তারা তাদের নিজস্ব লোকদের কাছে ক্ষমতা দিয়ে গেল। মুসলিম লীগও তাদের নিজস্ব লোক কংগ্রেসও তাদের নিজস্ব লোক। কংগ্রেসের দাবি ছিল পূর্ণ স্বরাষ্ট্র চাই পূর্ণ স্বরাষ্ট্র তো দিলই না একটা দিল ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন। অর্থাৎ এরা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পার্লামেন্টে সংশোধিত হল এব কমনওয়েল্থ এর ভেতরে রইল। গর্ভনর জেনারেল নিযুক্ত হল রানীর দ্বারা। তারা এই ডমিনেন্ট স্ট্যাটাস নিয়েই খুশি রইল। তারা স্বায়ত্ত্বশাসন চাইল না এব সমাজবিপ্লবতো মোটেই চাইল না। ঐ জায়গাতেই আমরা দেখছি যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্যে সমাজ বিপ্লবী আকাঙ্খাটাও ছিল। অর্থাৎ ভাষা কিন্তু কোনও শ্রেণী বা বর্ণ বা ধর্ম মানে না। ভাষা সকল মানুষকে এক করতে চায় এবং ভাষার যে ঐক্য করার প্রচেষ্টা সেটা আমরা দেখেছি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে । সব বাঙালিই এক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এক হয়ে গেলে আবার বিপ্লবী হয়ে যাচ্ছে।

এই বিপ্লব প্রতিহত করার জন্য রাষ্ট্রের যে উপরি কাঠামো, মুসলীম লীগ, নির্বাচন দিয়ে ভাগাভাগি করা হয়। নির্বাচনে যখন সুবিধা হয় না তখন সামরিক শাসন আসে, সমস্তটাই হচ্ছে জনগণকে প্রতিহিত করা এবং সমাজবিপ্লবকে প্রতিহত করা। তারপর মুক্তিযুদ্ধের সময় সমাজতন্ত্রের কথাও সংবিধানে এল। লক্ষ্য হচ্ছে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তো বটেই, গনতন্ত্র তো বটেই , তার সাথে সমাজতন্ত্র বিষয়টিও চলে এসেছে। এই সমাজতন্ত্রই তো ভীতির কারণ, এবং বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো তখনই যখন একটি সমাজ বিপ্লব ঘটত, যে সমাজবিপ্লব এ দেশে ঘটে নি। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সে অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেটাই রয়ে গেছে। সেটা ভেঙ্গে ফেলে নতুন সমাজ গড়ার চিন্তা মনে হচ্ছিল, হবে কেননা তখন সব শ্রেণী এক হয়ে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেছে।

তারাই শরনার্থী হয়ে গিয়েছে বা তারাই গ্রামে গিয়েছে সবাই, ঐ যে সম্ভাবনা সেটিও নাকচ হয়ে গিয়েছে। আবার সেই পুঁজিবাদ। পুরোটাই পুঁজিবাদী নেতৃত্ব। ব্রিটিশ বিরোধী নেতৃত্ব পুঁজিবাদে বিশ্বাস করত, পাকিস্তান বিরোধীরা ও পুঁজিবাদে বিশ্বাস করত। সেটা আরও পরিস্কার হল যখন নতুন শাসকরা নিল সেনা শাসক, আওয়ামী লীগ, জিয়াউর রহমান, এরশাদ যারা এসেছে সকলেই কিন্তুু পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে। কেউ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সংবিধানের মূলনীতি থেকে যে সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেছে সেটা স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে কেউ আর এটার প্রত্যার্বতনে আগ্রহী নয়। এইটা হচ্ছে ইতিহাস। এই ইতিহাসের মধ্যে সম্ভাবনা ছিল, রাষ্ট্র ভাষা-আন্দোলনের মধ্যে কেবল একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নয় একটা জাতীয়তাভিত্তিক বাঙালির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয় একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সম্ভাবনা ছিল। রাষ্ট্রের মধ্যে মাতৃভাষা সকল কিছুর চর্চার মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না। ঐ রাষ্ট্রতো আমরা পেলাম না। ঐ আকাক্সক্ষাটা কিন্তু এখনও মার্চের উত্তাল চেতনার ভেতরে আছে এবং আমরা এখনও ঐ স্বপ্ন দেখি একদিন প্রকৃত মুক্তি আসবে। সেদিন ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে, বৈষম্য কমে যাবে।

[ad#co-1]