রেস্টুরেন্ট ও তার পরিপার্শ¦

সরকার মাসুদ
রেস্টুরেন্টের ভেতরে
কাপে লিকার ঢালার সময় আক্কাছের নাকের পাশের চামড়া কাঁপে। বেশ কয়েকবার তিরতির করে কাঁপে। আক্কাছের মাথার ওপর পলিথিনে মোড়ানো টোস্ট বিস্কুট, ‘ঢাকার টোস্ট’ ঝোলে। চার/পাঁচটা কাপে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিকার ঢালার পর সে ব্লু-ক্রসের কৌটার পাছায় জালি লাগানো চা-ছাঁকনি ঠকাস করে রাখবে ছ্যাতরা সাইজের একটা প্লেটের ওপর। ওই ‘ঠকাস’ শব্দে দু/একজন চা-খোর ঘুম ঘুম আঠালো চোখ তুলে সামান্য তাকান। আক্কাছ গোরাপি যেখানে বসে ঠিক তার সামনে তিনটা বড় বড় বয়াম। বয়ামে কি? বয়ামে কিছু বিস্কুট আর বনরুটি। বন + রুটি = যে রুটি বনে গিয়ে খেতে হয় (বা খেতে হয়েছিল!)। নাকি জার্মানির বন শহরে এই রুটি (এ রকম রুটি) তৈরি হয়েছিল প্রথম! যার ফলে নাম বনরুটি? আচমকা একটা লোক রেস্টুরেন্টের ভেতরে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি বয়ামের ওপর। কোয়েল পাখির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা গৃহপালিত শিকারি কুকুরের একাগ্রতা তার দু’চোখে। বিস্কুটগুলি বালো অইবো?

হ। বিস্কুট বালো! যেটা মনে চায় লন।

ততক্ষণে লোকটার ডান হাত ঢুকে গেছে উঁচু বয়ামের পেটের ভেতর। এতে কী বোঝা যায়? সে দোকানির উত্তরের অপেক্ষা করেনি কিংবা হাত ঢুকিয়ে দেয়ার পরও তার আঙুল দুটি ‘বিস্কুট বালো’ শোনার অপেক্ষায় থাকেনি। তার আগেই সতর্ক ভঙ্গিতে তুলে এনেছে, যাতে না ভাঙে কামরাঙার গায়ের খাঁজের মতো কিন্তু ঘন ঘন ঝাঁঝরিকাটা কুলার আকৃতি সম্পন্ন দু’পিস বিস্কুট। আক্কাছ তার আসন থেকে উঠে রহিমের মুদির দোকানে গেল কি যেন আনতে। অপুষ্টি আক্রান্ত না-যুবক না-প্রৌঢ় লোকটা এখন তৃপ্তির সঙ্গে ঝাঁঝরিকাটা বিস্কুট খাচ্ছে। তৃপ্তিটা বোঝা যাচ্ছে তার জিভ বের করে ঠোঁটের চারপাশে লেগে থাকা গুঁড়ো চেটে খাওয়ার ধরন দেখে।
চা দিমু?

হঅ, বানান এক কাপ।
যেন বিস্কুট খাওয়ার পর চা না খেলে কেমন হয় কিংবা শুধু দুই পিস বিস্কুট খেলে কেমন দেখায় এ রকম কিছু ভেবে কথাটা বলল। পেছনে ভরা খাল বয়ে যাচ্ছে। পেছনের বেঞ্চে জানালা বরাবর বসলে কান পাততে হয় না এমনিতেই শোনা যায় ওই প্রবহমান সময়ের মর্মধ্বনিÑ কুল-কুল… কুল-কুল… কুল-কুল…।
আক্কাছ বামদিকের বড় কেতলির ঢাকনা খুলে ফুটন্ত পানিটা দ্যাখে। তারপর সকালের নাশতার জন্য কেটে রাখা তরিতরকারির ঝোলটা একপাশে সরিয়ে রাখে। তার মাথার ওপর বেড়ার পেরেকে ঝুলছে পচা রক্তের মতো কালচে লাল জামা।

চা বানামু?
টোস্ট চিবাচ্ছে যে লোকটা সে নিরুত্তর। তার অন্যমনস্কতার পাশ দিয়ে তিনজন ‘চাচামিয়া’ স্টলে ঢোকে। সবাই লুঙ্গি পাঞ্জাবি পরা। যারা লুঙ্গি ছাড়া অন্য কিছু পরে না তারা নতুন লুঙ্গি দেখলেই এগিয়ে আসে। স্টলে একজন লুঙ্গি-গামছা-গেঞ্জিওয়ালা বসে আছে। ওই ‘চাচামিয়া’রা লুঙ্গি শুধু দ্যাখে, দরদাম করে না। একজন রিকশাওয়ালা গায়ে কালো ডোরা লাল গেঞ্জি জিজ্ঞেস করে পাতলা গেঞ্জি আছে? ঠোঁট থেকে চায়ের পেয়ালা নামিয়ে কাপড়ওয়ালা বলে আছে। সে কয়েকটা গেঞ্জি রিকশাওয়ালার সামনে মেলে ধরল। শাদা, নীল, লাল। নীল ও লাল গেঞ্জিগুলোর গলা ও হাতে আবার সাদা বর্ডার দেয়া। রিকশাওয়ালা ২/৩টা গেঞ্জি উল্টে-পাল্টে দেখে বলে দুষি। তার মানে সামান্য ছেঁড়া আছে। কাপড়ওয়ালা সরলভাবে বলে হ দুষি। রিজেক্টেড মাল অল্প দামে কিনেছে লোকটা। সেসব বিক্রিও হবে কম দামে। কিন্তু রিকশাচালকের পছন্দ না হওয়ায় কিনল না। কাপড়ওয়ালা তার কাঁচাপাকা চাপদাড়ি, দাড়ির গোড়ার দিকটা শাদা যেন কেউ নিপুণভাবে পেইন্ট করেছে। আর আধাবাবরি নিয়ে অসন্তুষ্ট মনে হাসে। এক ঝাঁক পাখি কুঞ্জবিহারী কলেজের ওপর দিয়ে উড়ে ঘুরে গেল বাহেরকুচির খোলা মাঠের দিকে। পেছনের বেঞ্চে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকা-আফগানিস্তান নিয়ে তুমুল বাকযুদ্ধ। একজন (সে তার দুই ছেলেকেই মাদ্রাসায় পড়ায়) বলে সাদ্দাম একটা বাপের ব্যাটা! লাদেন আরেক বাপের ব্যাটা!

অন্যজন (সে হুজুরদের পছন্দ করে না। বহির্বিশ্ব সম্বন্ধে খোঁজ-খবর রাখে) মন্তব্য করে, বাপের ব্যাটাআÑ? বুশ শালা ঘাউরা আছে! বৌ মা মাইরা ছাতু কইরা দিবো যহন তহন বুঝবো!
এই লোকটার কথা পছন্দ হয়নি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা ‘চাচামিয়া’দের। তারা মুখ তুলে তার দিকে নিঃশব্দে তাকায়। একজন কিছু বলতে চেয়েও বলে না। আক্কাছ বিড়ি টানে আর হাসি-হাসি মুখে লোকজনের কথাবার্তা শোনে। পেছনের ভরা খালে বেলা বয়ে যায়, কুল-কুল… কুল-কুল… কুল-কুল….

রেস্টুরেন্টের বাইরে
একমাস পরেই নির্বাচন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচার-প্রপাগান্ডা তাই জমজমাট। এখন হাটে যাও, নির্বাচন। মাঠে যাও, নির্বাচন। নদীর ঘাটে, নির্বাচন। সেলুনে, নির্বাচন। চারদিকে নির্বাচনের নানা রং; কলতলায়, রান্নাঘরে সর্বত্র। চারপাশে নির্বাচনের বিচিত্র শব্দ, গন্ধ! কামাল হোসেন সন্ধানী চোখে মেলে নির্বাচনের রং ও তামাশা দ্যাখে। বড় বড় শ্বাস নিয়ে গন্ধ শুঁকে নির্বাচনের। মানুষের খেয়াল-খুশির কোনো মা-বাপ নেই। সে-যে কী চায় আর কী পায় অনেক সময় নিজেও জানে না! হোটেল-রেস্তোরাঁয় নানা কিসিমের নানা রুচির মানুষের আসা-যাওয়া। বিচিত্র সব মানুষের বিচিত্র কথা-বার্তা, তাদের হাসির ব্যক্তিগত ধরন, অন্যমনস্কতার ভঙ্গি, রাগের চেহারা, বিরক্তির অভিব্যক্তি এসব দেখতে ভালোবাসে কামাল। তাই সকালে-সন্ধ্যায় কলেজগেটের এ রেস্টুরেন্টে এসে বসে। চা শেষ হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ বসে থাকে। তাজপুর হাইস্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে চক্কর মেরে একটা মিছিল এলো এবার যাবে, নৌ-কা। পাস করিবে, নৌ-কা। সবাই বলে, নৌ-কা। বাঁশের চাটাই দিয়ে বানানো নৌকার মাঝখানে বৈঠা বাইতে বাইতে দ্রুত হাঁটছে একটা লোক। তার নাকে-মুখে-কপালে চুন-কালি লাগানো। আরেকজন লোক হনুমানের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে। কী তামাশা! সেøাগান ওঠে, মার্কা আছেএ…এ? সম্মিলিত কণ্ঠের জবাব শোনা যায়, আছেএ…এ…। কোন সে মার্কা? নৌ-কা। হনুমানের ডানে-বায়ে সামনে-পেছনে ছেলে-ছোকড়ার দল চলেছে নাচতে নাচতে। এবার সেøাগান ওঠে অন্য এক ভঙ্গিতে, এই-বারের নির্বাচনে, নৌকা চলে মনে মনে…; নৌ-কার নির্বা-চনে ভোট দিবে জনে জনে…।

মানুষের মনের নদীতে নৌকা চালিয়ে দিয়ে মিছিল এগিয়ে গেল দৃপ্ত পায়ে। প্রার্থীর প্রচারণায় নেমে কর্মীরা ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। এমনই এই উন্মাদনা! আগের মিছিলটা বোধহয় সিকি মাইলও যায়নি। এর মধ্যে আরেকটা মিছিলের মাথা দেখা যায়। হাতে হাতে ধানের শীষ নিয়ে দেখতে দেখতে মিছিলটা এসে পড়ল কলেজ মোড়ে। … মার্কা আছেএ… এ? আছেএ…এ…। কোন-সে মার্কা? ধানের শীষ। পাস করিবে। ধানের শীষ। দ্যাশ গড়িবেএ! ধানের শীষ…। মিছিলের পুরোভাগে দু’জন খালি-গা লোক হাতে-পায়ে কাদা মেখে ডান হাতের মুঠোয় ধানের গোছা নিয়ে সমানে চিৎকার করে চলেছে। … কাকা বলে, ধানের শীষ। কাকি বলে, ধানের শীষ। মামি বলেএ…। বিশাল মিছিল। আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রায় দ্বিগুণ লম্বা মিছিলটা দেখে আক্কাছ গোরাপি বলে, আমার মনে কয় এবার বিএনপিই পাস করবে। আরেকজন মন্তব্য ছাড়ে মিছিল দেইখা বুঝুম ক্যামনে? হেইদিন তো নৌকার মিছিল আছিলো এক মাইল লম্বা!

কামাল হোসেন কিছু বলেন না; হাসি-হাসি চেহারা নিয়ে শুধু নানা কিছু দ্যাখে। এ মুহূর্ত সে ভাবছে, দুই/চারজন মানুষের দিকে লোকজন ভ্রুক্ষেপ করে না; কিন্তু দু-চার শ লোক একখানে জড়ো হোক, মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখবেই। খাল দিয়ে মাটি বহনকারী একটা ইঞ্জিন বোট আসছিল। মিছিলের সেøাগানের শব্দে তার ভট্-ভট্… ভট্…ভট্ চাপা পড়ে যায়। এখন মিছিলটা এগিয়ে যাওয়ায় সেই শব্দটা জেগে উঠল। বাঙালির বুদ্ধি আছে বটে। নৌকার গায়ের সঙ্গে সেচ মেশিন সেট করে তার হুইলের সঙ্গে প্রপেলর লাগিয়ে সেটাকে স্পিডবোটে রূপান্তরিত করেছে। আর খালি কি বোট? যাত্রীবাহী ক্যারেজের সঙ্গে ওই একই মেশিন যুক্ত করে তাকে টেম্পোতে পরিণত করেনি কি বাঙালি? কামাল ভাবে বুদ্ধি কম ছিল না; কিন্তু হঠকারিতা আর দুনম্বরি জাতটাকে ডোবাল।
রাস্তার ওপারেই আক্কাছের টি-স্টলের প্রায় সামনাসামনি, কুঞ্জবিহারী কলেজের গেট। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিগ্রি কলেজ। বেশ বড় কলেজ। ক্যাম্পাসটাও সুন্দর। কিন্তু কলেজের ইমেজের তুলনায় গেটটা অনেক বেশি বড়। রাজবাড়ির গেটের স্টাইলে তৈরি। ওপরের দিকে লোহার পাতের ওপর লেখা আছে ‘মরহুম এ কে এম হাছান আলী চৌধুরী স্মরণে।’ তার একটু নিচে লেখা, ‘দাতা : ইমরান আলী চৌধুরী।’ হাছান আলীর আদম ব্যাপারী ছেলের টাকা হয়েছে। তাই লাখতিনেক খরচ করে স্থানীয় কলেজের তোরণ বানিয়েছে বাপের নামে। কিন্তু যখনই লক্ষ করে, কামাল হোসেনের চোখে ওই ‘স্মরণে’ বানানটা কাটার মতো বেঁধে। মূর্ধন্য-এর জায়গায় দন্ত্যনটা যেন এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা। কামাল ২৪ বছর আগের গ্র্যাজুয়েট। ভালো ছাত্র ছিল। ভুল বানান তার একদম অসহ্য। ঢাকা-মাওয়া রুটের এক বাসের গায়ে সে একবার দেখেছিল ‘জুলহাসরে ভ্রমণ করুন’। ভুল বানানের কথা মনে হলেই কামালের ওই ‘জুলহাসরে’ শব্দটা মনে পড়ে। মনে পড়ে আর ভেতরে ভেতরে কুটকুট করে হাসে। বাস মালিকটা বোধ হয় কাঠ মূর্খ। ঘর+এ = ঘরে। এই নিয়ম থেকেই অনুমান করি তার ধারণা হয়েছিল ‘জুলহাসে’ বোঝাতে লিখতে হবে ‘জুলহাসরে’। আর সেভাবেই বাসের গায়ে শব্দটা লিখতে বলেছিল।

১০টা বাজে। শাদা-নীল ইউনির্ফম পরা ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েদের মাথায় মাথায় স্কার্ফ। ১০টা বাজারের বেলাও। লুঙ্গি পরা এক বুড়ো টুপি পরা মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছে। তার দুই হাতে দুটি পলিথিনের ব্যাগ। সিঙ্গল আরোহী নিয়ে একজন রিকশাচালক হেঁকে গেল, ‘তালতলা একজন’। কলেজপাড়ায় শিশুদের আরবি পড়ায় যে ছেলেটা সেই আদিবাসী চেহারার, নাকের ডগায় চশমা ঝুলে পড়া মোকলেছকে এক ঝলক দেখা গেল। ঢোলা প্যান্টের ওপর পাঞ্জাবি চড়িয়ে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে কলেজ মোড়ে। আকাশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সোনার হারের মতো কাজ করা খাঁজ কাটা মেঘ। অদূরে অরুণ চৌধুরীর বাড়ির দিকের গাছাপালা ভেদ করে ভেসে আসছে ‘তোমার নেতা সি-ন-হা! আমার নেতা, সিন-হা! … পাস করিবে, সিন-হা…

রেস্টুরেন্টের ভেতরে-বাইরে

সন্ধ্যা ছ’টা/সাড়ে ছ’টা নাগাদ আক্কাছের চায়ের দোকান জমজমাট। সারাদিনের কাজকর্ম শেষে শ্রমজীবী মানুষ এ সময়টায় ভিড় করবে এখানে। কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুর রশিদ দোকানটার নাম দিয়েছে ‘প্রলেতারিয়েত রেস্টুরেন্ট’। আবদুর রশিদও এখানে চা খেতে আসে তবে সন্ধ্যাবেলায় নয়, বেলা ১১/১১-৩০ টার দিকে। কোনো কোনোদিন বিকেলে। কামাল হোসেনের সকাল-সন্ধ্যার ঠিকানা এই দোকান। কোনো কারণে সকালের দিকে যদি না-ও আসে সন্ধ্যায় তাকে এখানে পাওয়া যাবেই। খাল ও খালসংলগ্ন চকের দিকে পিঠ দিয়ে বসেছে সে। মুখের সামনে ‘নেভী’র প্যাকেট। কামালের মনটা ভালো না। আধাঘণ্টা আগেই বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বাজারে যাওয়া নিয়ে কথাকাটাকাটি থেকে ঝগড়া। ছেলে তার ক্লাস টেনএ পড়ে। বাড়ন্ত শরীর। বিকেলে মাছ-তরকারি আনার কথা ছিল তারই। ছেলে মানুষ। কোন খেয়ালে বাজার করার কথা ভুলে গিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে! আজকের বিবাদের মূলে ওই ছেলেটা। স্ত্রী ছেলেকে মনে করিয়ে দিল না কেন, এ কথা বলতেই কথাকাটাকাটির সুত্রপাত । ফলে কামালও বাজারে না গিয়ে রাগের মাথায় বেরিয়ে এসেছে। এসেছে সন্ধ্যার অনেক আগেই। এখন বসে আছে আক্কাছের দোকানে। চেহারাটা দেখাচ্ছে বিষণœ প্যাঁচার মুখের মতো। গরম পানি দিয়ে কাপ-পিরিচ ধুতে ধুতে আক্কাছ বলে, কামাল ভাই, সকালে দ্যাকলাম না-যে!

বেতকা গেছিলাম একটা কামে।

দোকানি জিজ্ঞেস করে, কি দিয়া গেলা? লঞ্চ বলে বন্ধ?

কেডা কয়? আমি তো লঞ্চেই গেলাম, লঞ্চেই আইলাম। উত্তরটা দিয়েই কামাল হোসেন সামনে তাকাল। তার চোখ এ মুহূর্ত কলেজে ঢোকার রাস্তার ওপরে টাঙানো ব্যানারের দিকে। লাল কাপড়ের ওপর শাদা রং দিয়ে লেখা হয়েছে ‘নবীনদের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’। তার নিচেই একটু ছোট অক্ষরে লেখা ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বিক্রমপুর কুঞ্জবিহারী ডিগ্রি কলেজ শাখা।’ বাতাস চলাচলের জন্য ব্যানারের ৬/৭টা জায়গায় ফুটো করা হয়েছে। যাতে হাওয়ার ধাক্কায় কাপড়টা ছিঁড়ে না যায়। মধ্যপাড়ার দিকে অনেক মানুষের কোলাহল। নির্বাচনী জটলার শব্দ থেকে-থেকে ফুঁসে ওঠে। হঠাৎ নৌকা মার্কার সেøাগান উঠল। মুখে বসন্তর দাগযুক্ত এক ব্যক্তি সামনে বসা সবুজ শার্ট পরা লোককে বলে, তোমাগে গেরামের খবর কি? কার জোর বেশি মনে অয়?

সবুজ শার্ট উত্তর দেয়, এবার দোনো দল সমান সমান। কিন্তু এসব আলাপ এখন কামালের কানে ঢুকছে না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে খালসংলগ্ন জলাভূমির দিকে। হাফ উদাস ভঙ্গি। উত্তর মধ্যপাড়ার প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই চক তার সজল সউদ্ভিদ পিঠের ওপর দিয়ে বইয়ে দিচ্ছে শেষ বিকালের মধুর মন্থর হাওয়া। ওই দিকে কাশফুল নড়ছে ফুর-ফুর… ফুর-ফুর… করে। কামাল হোসেনের আঙুলে একশলা ‘নেভী’ পোড়ে ধীর লয়ে। মধ্যপাড়া প্রসারী জলমগ্ন ‘চক’-এর কাল্চেসবুজ সৌন্দর্যের রহস্যে আত্মভোলা, আপাতত দৃশ্যাপ্লুত কামালের মাথার ভেতর হঠাৎ দ্বিখ-িত জিভ নাড়ায় বিষাক্ত সাপিনী। সে পর পর ৪/৫ বার জিভ বের করে। বহুদূর থেকে আগত ঝাঁঝালো বকুনির শব্দমালা মুহূর্তেই অপ্রস্তুুত করে তোলে। সে গলা ও ঘাড়ের সংযোগস্থল চুলকায় আর শোনে,… পাইছে এক চা-র দোকান। দিন নাই রাইত নাই খালি চা-র স্টলে গিয়া বইয়া থাকবো! বইয়া বইয়া কোন মাগির মুখ দ্যাখে কে কইবো? বাজারে যাইতে কইলে মরদের শুলায়…! চা খাইয়া থাকতে পারে না? ভাত খাইতে আহে ক্যা শকুন মরদ…?

অনেকক্ষণ ঘাড়-গলা চুলকিয়ে, ঠোঁট সরু করে বেজার মুখে বসে থাকে কামাল হোসেন। তার সামনে খালি চায়ের কাপ ধু-ধু করে। আজ রাতে বাড়ি ফিরলে নির্ঘাত আরো একদফা ঝগড়া হবে। ছেলেমেয়েরা কত বড় হলো! তবু মাগীর তেজ কমলো না। শরীলে মাংস নাই গোয়াভরা পাকাল!

দোকানের কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে একজন প্রৌঢ়। গালে ৪/৫ দিনের না কামানো দাড়ি। রাস্তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। হঠাৎ কথা বলে ওঠে, ভোট দিয়া কী লাভ? আমাগো মিহি তো কেউ চাইয়া দ্যাহে না!

কথাটা বলেই লোকটা অন্যমনস্ক হয়ে যায়। আরেকজন লোক প্রৌঢ়ের কথা সমর্থন করল, হ। ঠিকই। বড় লোকেরা আরো বড় হইতাছে। গরিবের চিন্তা করার সময় কই হ্যাগো?

কামাল কমপক্ষে আরো আধঘণ্টা বসবে, আরো এক কাপ চা এবং গোটা দুই নেভী খাবে। তারপর উঠবে। বাড়িতে তার মন টেকে না। বউটা দজ্জাল। ছেলেটা মুখে তেমন কিছু না বললেও মনে-মনে যে তার ওপর চটা তা সে বোঝে। তাকে ভালোবাসে কেবল মেয়েটা। কামাল যেটুকু প্রশ্রয় পায় তা ওই মেয়ের কাছেই। কন্যা তার সেভেন-এ উঠেছে এ বছর। মেয়ে মানুষের শরীর। নতুন মাটিতে গজানো পুঁইয়ের ডগার মতো খালি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।
…মাইয়াডা আমার শখ করছে। জাহাঙ্গীরের দোকান থাইক্যা এক বাটি হালিম লইয়া যাইতে অইবো। কলেজের প্রাসাদশোভন গেটের দিকে তাকিয়ে কামাল এবার ছেলের কথা ভাবে, ম্যাট্রিক পাস করলে কামরানরে এই কলেজে ভর্তি করামু? নাহ্ হাতের কাম শিখামু অরে। জেনারেল লাইনে লেখাপড়া কইরা আইজকাইল ফায়দা নাই…। একটা সিগারেট বের করে ধরানোর উদ্দেশ্যে কামাল হাত বাড়াল দোকানির দিকে, আক্কাছ, ম্যাচটা ল’ তো।

কলেজ গেটের ‘মডার্ন ফার্নিচার’এর মিস্ত্রিরা একটা টেলিভিশন চালায়। কাজের চাপ না থাকলে ওরা যন্ত্রটা অন করে। তখন পথচারীরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিভি দ্যাখে। সবচেয়ে বেশি ভিড় লাগে সন্ধ্যা ৭.৩০-এ ইটিভির খবর হয় যখন। এখন অবশ্য টেলিভিশন ঘিরে বসেছে কিশোর-যুবকরা। বয়স্ক লোক আছে ২/৩ জন। সাড়ে সাতটা বাজতে মিনিট দশেক বাকি। টিভিতে কি দেখাচ্ছে? দেখাচ্ছে ‘ওয়াটার ওয়ার্ল্ড’ নামে একটা প্রামাণ্য ছবি। পানির নিচে উদ্বেড়াল শিকারের উদ্দেশ্যে মাছের পেছনে পেছনে ছুটছে। একটা ১২/১৩ বছরের ছেলে আনন্দে-উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে ওঠে, ‘ধরবো ধরবো! মাছটারে ধইরা ফালাইবো দেহিছ!’ আজ শেষবারের মতো চায়ের অর্ডার দেয় কামাল হোসেন। শেষ বিকাল শেষ হয়েছে আসছে। আধাঘন্টার মধ্যেই অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়বে গাছগাছালির ঘন পাতার ফাঁকে ফাঁকে, দালানকোঠার কোণে-ফোকরে লুকিয়ে থাকা অবশিষ্ট রোদের কণার ওপর। আক্কাছ কেরোগ্যাসের চুলায় পাম্প দেয় বেশ কিছুক্ষণ ধরে। পাম্প দেয়ার সময় তার সারা শরীর দোলে। মাথার ওপর পেরেকে ঝুলানো জামাটা নামিয়ে পকেট থেকে বিড়ি বের করে। জামাটা আবার যথাস্থানে রেখে দেয়। কুঞ্জবিহারী কলেজের গেটের ওপাশে, লোহার শিকের ভেতরে দিয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন অধ্যাপককে। তারা দল বেঁধে বাজারের দিকে চলেছে। দলের মধ্যে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক আব্দুর রশিদকেও দেখা গেল। কে যেন বলল ‘ওয়, পানি নাই।’ একটু পরেই একজন মাঝবয়সী লোক প্লাস্টিকের নীল ড্রাম থেকে পানি জগে ভরে কাস্টমারের দিকে এগিয়ে দেয়। যে ব্যক্তি পানি দিল সে আক্কাছের কেউ নয়। আক্কাছ একা মানুষ। সবদিকে সামলে উঠতে পারে না। আবার ব্যবসাটাও তার বড় নয় যে একটা লোক রাখবে। তাই কাস্টমারই ছোট-খাটো কাজে তাকে সাহায্য করে থাকে।

ঈমান আলী নামে একটি ২৮/৩০ বছরের ছেলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিল। কামাল তাকে ডাক দিয়ে থামায়, কিরে ঈমান? ভোটের লাইগ্যাতো জানটা এক্কেরে দিয়া দিলি। তোগো ক্যামভাসের খবর কি কহ?

অনিচ্ছা সত্বেও ঈমান বেঞ্চিতে বসে পড়ে। বসে বলে খবর তো বালোই। তয় আমার জানি ক্যামুন ক্যামুন ঠ্যাকে!
বুঝলাম না। কি কবি পরিষ্কার কইরা ক।

ঈমান সামান্য ইতস্তত করে। তারপর বলে কী কমু বাই? আগে বিএনপি করছি তো অহন নৌকার ভোট চাইতে শরম করে! তাচ্ছিল্যের অদ্ভুত হাসি দিয়ে অন্য একজন বলে, কতো বড় বড় ন্যাতারা দল বদল করলো; হ্যাগো শরম করে না, তোর শরম করে!

নৌকা মার্কার কর্মীটি এখন বলে, আরেএ হ্যারা হইলো গিয়া বড় লিডার। হ্যাগো লাজ-শরম নাই। আর আমরা হইলাম চুনাপুঁটি শরম ছাড়া আমাগো আর কী আছে?

কাপে দুধ-চিনি দেয় আর সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায় আক্কাছ গোরাপি। চা-বিক্রেতা আক্কাছের মাথার ভেতর যে আরেকজন পোড় খাওয়া নাগরিক আক্কাছ আছে সে জেগে উঠে নিঃশব্দে বলে, মাইনশের আইজকাইল ঈমান-আমান নাই; সব ফালতু হইয়া গেছে। ন্যাতাগো কথা আর কী কমু? হ্যারা আছে নিজেগো স্বার্থ লইয়া! হেই জন্য তো দ্যাশের কুনো উন্নতি অয়না!

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমেছে চারদিকে। রাস্তায় চলাচলকারী লোকজনের মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। লোকেরা আলাপ করতে করতে বাজারের দিকে চলেছে। মাঝে-মধ্যে দু-একটা রিকশা প্রায় নিঃশব্দে কলেজ মোড় অতিক্রম করে। আক্কাছের দোকানে বসে গ্রামের সরল, অসচেতন মানুষ বিস্কুট খায়, বনরুটি খায়, কলা খায়। আধময়লা ফাটা কাপে শব্দ করে চা খায়। কাপ-যে ভালো করে ধোয়া হয়নি, কালচে দাগ লেগে আছে; কাপ-যে ফাটা সেজন্য তারা কোনো প্রতিবাদ করে না। তারা আসলে প্রতিবাদ করতে জানে না কারণ ওটা তারা শেখেনি। মূলত হতাশ, কিন্তু সামান্য আলো দেখে আগুনের ফুলকির মতো উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠা, মরীচিকার পেছনে ছুটে বেড়ানো এই পাড়াগাঁ-র মানুষদের খটখটে চোখে-মুখে ক্ষণশান্তির প্রলেপ দেয়ার জন্য এখন, সন্ধ্যা ও রাতের সন্ধিক্ষণে, ঝিল থেকে উঠে আসছে ঝির ঝির আর্দ্র বাতাস। পেছনে বর্ষার ভরা খাল আপন মনে বয়ে চলেছে কুল-কুল… কুল-কুল… কুল-কুল…। একটু পরে অন্ধকারে শুধু কোষা নৌকার বৈঠার ছপাৎ-ছপাৎ… ছপাৎ-ছপাৎ… শোনা যাবে। কামাল হোসেন আজ সেই শব্দটা শুনবে নিজের ঘরে, দু’হাতের তালুতে মাথা রেখে, চিৎ হয়ে শুয়ে।

[ad#co-1]