নতুন প্রজন্মের হাতেই নির্মিত হবে মুক্তিযুদ্ধের মহত্ চলচ্চিত্র

চাষী নজরুল ইসলাম
চলচ্চিত্র হলো সবচেয়ে দ্রুত, গতিশীল এক গণমাধ্যম। শিল্পমাধ্যম হিসেবে এটি কনিষ্ঠ, এর সুবিধে অত্যন্ত বেশি। সর্বগ্রাসী মাধ্যম বলে অভিহিত করা হয় একে। গভীর অভিনিবেশে আমরা যদি পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখবো যে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এই শিল্পমাধ্যমটিতে তেমন সাফল্যের সঙ্গে উঠে আসেনি। অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধের খুঁটিনাটি দিক, রক্তাক্ত সেই সংগ্রামের শিল্প চলচ্চিত্রে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে, কেন এমনটা ঘটলো? সমাজের সবক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখছি আমরা, ঘুণে ধরে গেছে সবকিছু। চলচ্চিত্র অঙ্গনের আমরা যারা অধিবাসী, তারাও এর বাইরে নই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব চলচ্চিত্র এ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে সঠিক ইতিহাস বিধৃত হয়নি। অবশ্য সঠিক ইতিহাস তুলে ধরবার মতো সময় এখনো আসেনি। আমি তাই মনে করি। এটাও ঠিক, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতগুলো ছবি হয়েছে, তার সংখ্যাও প্রত্যাশার তুলনায় বেশ কমই। আরো আরো ছবি হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। সেটাও হতাশার চিত্রই এক অর্থে।
প্রকৃত ইতিহাসের কথা বলছিলাম। দেশকে এখন আমরা দু’টি অংশে বিভক্ত দেখতে পাচ্ছি। কোনো কিছু বলতে গেলে সেটা কারো পক্ষে যাবে, কারো বিপক্ষে যাবে। এক পক্ষ খুশি হলে, অন্য পক্ষ যাবে চটে। এখনকার সময় পরিসরে তাই একাত্তরের গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরতে গেলে সেই বক্তব্য নিয়ে অবধারিতভাবেই বিতর্ক হবে। সেইসব বিতর্ক বা ঝামেলা এড়ানোর জন্যেই অনেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বর্ণনা, চলচ্চিত্রে তার শিল্পরূপায়ণের প্রচেষ্টা গ্রহণের ব্যাপারে নীরব রয়েছেন। নানাবিধ কারণে আমাদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

আমার মতে, এই ক্রান্তিকাল পেরোতে আরো অন্তত ৫০ বছর সময় লেগে যাবে। তখন এ পৃথিবীতে থাকবো না আমরা কেউই। অনাগত সেই সময়কালে পক্ষ-বিপক্ষ বলে কেউ থাকবে না। সত্যিকারের নিরপেক্ষ পরিবেশ পরিস্থিতি বিরাজ করবে তখন। নির্মোহ, নিরাসক্তভাবে মূল্যায়ন হবে। প্রকৃত ইতিহাস উঠে আসবে। বিকৃত ইতিহাস নিক্ষিপ্ত হবে আঁস্তাকুড়ে। ভবিষ্যতের প্রজন্ম পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে আসল ইতিহাসের সত্য বের করে আনবে। পক্ষ-বিপক্ষের ধার তারা ধারবে না। ‘টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার’ বলে একটা কথা আছে। কথাটা খাঁটি। সেই সাফল্যের ব্যাপারে আমি অনেক অনেক আশাবাদী। সেই সময় ও সাফল্য আমার নিজের চোখে দেখে যেতে না পারলেও কোনো আফসোস নেই।

এটা সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধের অনেক মূল্যবান উপাদান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। তারপরও আমি আশাবাদী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক কাল পরে মহত্ মহত্ সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আমি সর্বান্তকরণে এটা বিশ্বাস করি যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও আগামী প্রজন্ম ভালো ভালো ছবি নির্মাণে সক্ষম হবে। সুনিশ্চিত হবে। প্রয়োজনীয় উপাদান বা মাল-মসলা তারা নিজেরাই খুঁজে পেতে নেবে। তাদের জন্যে উপাদান যোগ্য ইতিহাসবিদরা রেখে যাবেন। আগামী প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা কিন্তু হচ্ছে। নীরবে-নিভৃতে অনেক কাজকর্ম হচ্ছে এ সংক্রান্ত। বিভাজন বিভেদের কারণে আমরা সেসবের খোঁজখবর যতটা পাওয়া দরকার, ততটা পাচ্ছি না।
ইতিহাস কখনো জোরজবরদস্তি করে লেখানো যায় না। একা আওয়ামী লীগের লোকজনই মুক্তিযুদ্ধ করেনি। উনিশশ’ একাত্তর সালে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দা সাড়ে সাত কোটি মানুষের সবাই যুদ্ধ করেছেন। খুব অল্পসংখ্যক মানুষই স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। জান বাজি রেখে লড়েছেন তারা। জনগণ সেই লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন বলে একে বলা হয় জনযুদ্ধ। সেই রোমহর্ষক, বীরত্বমণ্ডিত, উজ্জ্বল ইতিহাস বের করে আনতে হবে।

নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যারা আজকাল ফিল্মে কাজ করছে, তাদের মধ্যে অনেকেই যোগ্য, সম্ভাবনাময় এবং মেধাবী। এটা দেখে মনে আশা জাগে। তারা একাত্তরের যুদ্ধ দেখেনি। ইতিহাস থেকে তারা মহান সেই জনযুদ্ধ সম্পর্কে জানবে। নিজেরাও গবেষণা করে দরকারি তথ্য-উপাত্ত উপকরণ খুঁজে বের করে নেবে। তাদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আমি উচ্চ ধারণা পোষণ করি। আগামীর বাংলাদেশ এবং বিশ্ব তাদের কাছ থেকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উন্নত মানের মহত্ চলচ্চিত্র পাবে।

একথা ঠিক যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে যে একটা জোয়ার এসেছিল, কালক্রমে তা স্তিমিত হয়ে এসেছে। সেই সময়টাতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, চলচ্চিত্রের ভুবনে এখনকার মতো বিভাজন, হানাহানি, ঈর্ষা বিদ্বেষ ছিল না। যতদিন না এসব ক্ষুদ্র স্বার্থজনিত ঈর্ষা হিংসা, বিভাজন দূর না হবে, সবাই মিলেমিশে একটি প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে না পারবে, ততদিন আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে স্বস্তির সুবাতাস বইবে না। দূর হবে না এই অস্বস্তিকর পরিবেশ। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কেন বিভাজন থাকবে? এটা খুবই খারাপ। রাজনৈতিক বিশ্বাস যার যা আছে, থাকুক। কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, চলচ্চিত্রের ভুবনের এর অপপ্রভাব কেন পড়বে?

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বিষয়ে সরকার কৃপণ। একথা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একদম নেই। যা আছে, তাকে সম্মানজনক বলা চলে না। সিনেমা তৈরির যন্ত্রপাতি নেই। হল নেই। মুক্তিযুদ্ধের ছবির ব্যাপারে সরকারকে উদার হতে হবে। ডেকে ডেকে যোগ্য মেধাবী পরিচালকদের বলতে হবে, এই নাও অর্থ, এই নাও সুযোগ-সুবিধা। ছবি বানাও। অল্পস্বল্প টাকা, নানান শর্তের বেড়াজাল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে তাদের যথাসম্ভব মুক্ত রাখতে হবে। তবেই না মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনের মতো ছবি তৈরি হবে। না হলে নয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছবি নির্মাণের জন্যে সরকার অনুদানের নামে যে অল্প পরিমাণ টাকা দেয়, তাতে কিছুই হয় না। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে, শিল্পসম্মত ছবি তৈরির জন্যে এ টাকা কোনোক্রমেই যথেষ্ট নয়। একজন ভালো নায়ক বা নায়িকাকে কাস্ট করার জন্যে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। ইউ নিড দ্য কাস্ট। না হলে লোকে ছবি দেখবে কেন? তো, সরকারের যে টাকা পরিচালক পান, তা দিয়ে এই কাস্ট মেলে না।

এতগুলো টিভি চ্যানেল, তারা মুক্তিযুদ্ধের ছবির ব্যাপারে যে ভূমিকা পালন করছে, তাকে প্রশংসা করতে পারলে খুশি হতাম। এক সময় বিটিভিতে এক ঘণ্টার নাটক হতো। তার জন্যে আমরা অধীর আগ্রহে উন্মুখ হয়ে থাকতাম। গুণে-মানে উন্নত ছিল সে নাটক। এখন সিরিয়ালের যুগ। সবার হাতেই রিমোট। একটু এই চ্যানেল দেখে অন্য চ্যানেলে ট্রান্সফার। তেমন জমাটি গল্প নাই। কাস্টও নাই। আর, বিজ্ঞাপনের এত হাঙ্গামা! লোকে তিতিবিরক্ত হয়ে যায়। মাসে একটা ভালো নাটকও তো হতে দেখছি না। ওই ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর এলেই তাড়াহুড়ো, তাড়াহুড়ো! মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে এই করব, সেই করব—বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কর্তারা নানা কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবচিত্র অন্যরকম। সব কথাই মুখে মুখে।

আর একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। নারীর মর্যাদা, অধিকার নিয়ে কত কথাই যে আমরা বলি। সেমিনার, স্লোগানে গলা ফাটিয়ে ফেলি। এনজিওগুলো এন্তার টাকা-পয়সা ব্যয় করছে নানা খাতে। কিন্তু কই, কেউ তো বলে না যে নারীদের নিয়ে ছবি করেন। বহু নারী প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তাদের কথা তো আসছে না।

সাক্ষাত্কার : আরিফ-উল-ইসলাম

বিস্তারিত

[ad#co-1]