বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেই রাতে

প্রবীণ সাহিত্যিক নয়ীম গহর পঁচিশে মার্চের ভয়াল রাতে প্রায় সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ছিলেন বঙ্গবল্পুব্দর সঙ্গে। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমআর সিদ্দিকীর সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্ঠতা। ‘কথা শেষ হলে সিদ্দিকী একটা টেলিফোন নম্বর দিলেন মুজিব ভাইকে পেঁৗছে দেওয়ার জন্য। তখন রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। রাস্তায় ততক্ষণে পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক বেরিয়ে গেছে।’

‘ঐ মহামানব আসে
দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে
মত্ত ধূলির ঘাসে ঘাসে…
জয় জয় জয় রে মানব অভ্যুদয়
মন্দ্রি্র উঠিল মহাকাশে।’

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান যেন শ্রেষ্ঠ সময়ের শ্রেষ্ঠ ভাষণটিই আদর্শে নিঃস্বপ্রায় বিশ্বকে উপহার দিলেন ৭ মার্চ ১৯৭১।

দেশের প্রতি মমতা যখন গভীরতম হয়ে যায়, সেই মমতার নিখাদ নির্যাস তখন নির্মলতম হয়ে জীবনকে সামান্য মনে করার পক্ষে আদর্শ যোদ্ধার মন কাজ করে। জীবন সামান্য হলেও আদর্শই প্রধান। আত্মত্যাগ তখন আর কোনো কঠিন বিষয় থাকে না। উৎসর্গের আদর্শের বোধ ও জৈব রাসায়নিক এই কঠিন সত্যটি আমরা আমাদের রণক্ষেত্রে দেখেছি, জীবনের মধ্যে দেখেছি, মৃত্যুর মধ্যে দেখেছি।

আমরা বরং পঁচিশে মার্চের রাত ৮টা থেকে ১১টাব্যাপী অত্যাসন্ন মুক্তিযুদ্ধের তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়কের সঙ্গে ওই কঠিন সময়টায় আমার উপস্থিতির কার্যকারণের প্রেক্ষাপট এবং বাকি বিস্তারিত জানাতে উদ্যোগী হই।

কথা ছিল, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর আমরা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা অবশ্যই শুনতে পাব। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে একমাত্র ‘মরাল’ ছাড়া অন্য কোনো ‘অস্ত্র’ আমাদের ছিল না। পাকিস্তানের পরিকল্পনা ছিল ংবিবঢ়রহম ধঃঃধপশ-এ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ঘাঁটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া এবং স্বাধীনতার পক্ষের বাঙালি বাহিনী অধ্যুষিত ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’কে প্রথম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশে যত ছাত্রাবাসের অস্তিত্ব ছিল, তা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, তাহলে যুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কী ছিল! আমাদের প্রস্তুতি ছিল নেতাকে আগে বিশেষ ব্যবস্থায় করে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া। শেখ মুজিব প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন চট্টগ্রামের এমএ আজিজ। চট্টগ্রামের দলীয় নেতৃত্বের ক্রমটা ছিল : এমএ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এমআর সিদ্দিকী, এমএ হান্নান। এমএ আজিজ আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত এমএনএ (কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য)। এতে করে স্বাধীনতা যুদ্ধের আওয়ামী লীগের যাবতীয় পরিকল্পনা এবং রণ-পরিকল্পনা চোট খায়। তবে এমএ আজিজের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য চট্টগ্রাম জাতীয় পরিষদ সদস্য এমআর সিদ্দিকীকে এগিয়ে আসতে হয়। এমএ আজিজের মতো আত্মনিবেদিত রাজনৈতিক চরিত্র এমআর সিদ্দিকীর ছিল না। তিনি ছিলেন সুটেড-বুটেড শৌখিন রাজনীতিক। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল ব্যবসায়িক। তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৬৮ সালে আমি ‘থেরাপিউটিকস’ নামের একটি ওষুধের ফ্যাক্টরি স্থাপন করি। সেই সূত্রে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আমার অস্থায়ী আবাস। ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই আমার ওষুধের ফ্যাক্টরি বন্ধ। আমরাসহ শ্রমিকদের সবাই তখন থেকেই যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছি। ইতিমধ্যে স্থানীয় অবাঙালিদের নেতৃত্বে পাহাড়তলী রেল কোম্পানিতে সংখ্যাগুরু বিহারিরা বাঙালিদের হত্যা করা শুরু করে দিয়েছে। ধনাঢ্য অবাঙালিরা চট্টগ্রাম ছাড়তে শুরু করেছে। জাহাজভর্তি করে তারা করাচি পাড়ি জমাচ্ছে। এরই মধ্যে ২২ মার্চ আমাকে ঢাকার দিকে রওনা হতেই হলো, কারণ ২৩ তারিখ থেকে সারাদেশে ট্রেন-বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ মুজিব। সুতরাং ঢাকামুখী শেষ ট্রেনে আমি যাত্রা করলাম। স্ত্রী ও শিশুসন্তানরা বাসায় রইল। ভোররাতের দিকে কুমিল্লার কাছাকাছি এসে আনন্দে-বিস্ময়ে নাচতে ইচ্ছা করল। সবুজ পটভূমির ওপর লাল সূর্য। সূর্যের মাঝখানে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র। হাজার হাজার বাংলাদেশের নিশান। রেললাইনের ধার থেকে শুরু করে যতদূর চোখ যায় কেবল নিশান আর নিশান। ঢাকা যতই কাছাকাছি আসছে, বাংলাদেশের নিশানের মেলা ততই বাড়ছে।

বিভিন্ন বাংলা দৈনিকে আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধের গানের কথা পুরোটাই শিল্পীদের অলঙ্করণে সমৃদ্ধ হয়ে ছাপা হয়েছে। মহল্লায় মহল্লায় মাইকে আমার লেখা এবং হিজ মাস্টার্স ভয়েসের বের করা দেশপ্রেমের দুটি গানই (জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো এবং পুবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময় জয় জয় জয় জয়বাংলা) বাজছে।
ওই সময়ে চট্টগ্রামে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করা হতো এমআর সিদ্দিকীর স্ত্রীর খালাতো বোন জিনাতের ঢাকার বাসার ফোন। ওরা মুজিব ভাইয়ের বাড়ির পেছনের বাড়িতেই থাকত। কিন্তু গত দু’দিন থেকে জিনাতের বাসা থেকে ওর স্বামী মোশাররফ এমআর সিদ্দিকীকে কোনো ফোনবার্তা পাঠাচ্ছিল না। এ নিয়ে সিদ্দিকী যেমন ঢাকার কোনো খবরাখবর না জানতে পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, তেমনি আওয়ামী লীগের যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য ভয়ঙ্কর একটা দুষ্ট ফাঁকের সৃষ্টি হচ্ছিল। আমি তখন বুঝতে পারলাম, কেন আমাকে ঢাকা আসতে হয়েছে। আমি তৎক্ষণাৎ এক বন্ধুর বাসা থেকে চাটগাঁয়ে সিদ্দিকীকে ফোন করি। সিদ্দিকী কখনও তাড়াহুড়ো করে কথা বলতেন না। এই প্রথম তাকে ব্যগ্র হয়ে দ্রুত কথা বলতে শুনলাম। অন্যান্য কথার মধ্যে আমাকে সিদ্দিকী বললেন, তাড়াতাড়ি শেখ সাহেবের বাড়ি যান এবং তার কী নির্দেশ তা জেনে আমাকে আবার ফোন করুন। শেখ মুজিবের বাড়ি থেকে কেন সরাসরি কাউকে ফোন করা ঝুঁকিপূর্ণ এমনকি বিপজ্জনকও ছিল, পাঠকমাত্রই তা বুঝতে পারছেন।

আমি মুজিব ভাইয়ের বাড়ি তৎক্ষণাৎ যাই এবং তার নির্দেশের অপেক্ষা করি। হিমালয় পাহাড়ের পুরো ভারটা যেন মুজিব ভাইকে বইতে হচ্ছে তখন। আমাকে দেখেই তিনি প্রায় চিৎকার করে প্রশ্ন করলেন, ‘চিটাগাংয়ের খবর কী?’ মুজিব ভাই ঘন ঘন তামাক নিভে যাওয়া পাইপেই টান দিচ্ছিলেন এবং বারবার ঠোঁট কামড়াচ্ছিলেন। তার অস্থিরতার মাত্রায় বুঝতে পারছিলাম, কত বিশাল এক দায়িত্বের ভার তার মাথায় তখন চাপানো। আমি জানালাম, জনতা সিদ্দিকীর পাহাড়ের বাংলো ঘিরে রেখেছে। লোকজনের হাতে কিছু অস্ত্রশস্ত্র আছে। বাকি সবার হাতে লাঠি। বাঙালি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে হেলিকপ্টারে ঢাকা নিয়ে গেছে পাকসেনারা। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চাটগাঁ শাখার সব বাঙালি আদেশমাত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। নেভির সব বাঙালি বিদ্রোহ করার জন্য তৈরি। তারা নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। তিনি বজ্রকণ্ঠে বললেন, ‘উড়হ’ঃ ংঁৎৎবহফবৎ ধৎসং, ষরনবৎধঃব ঈযরঃঃধমড়হম ধহফ ঢ়ৎড়পববফ ঃড়ধিৎফং ঈড়সরষষধ.’ আমি তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে আবার নির্ধারিত একটি ফোন থেকে চাটগাঁয়ে কথা বলার জন্য বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। মুজিব ভাই আবার ডাকলেন। বারবার তিনি ঠোঁট কামড়ে ধরছিলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘অনরফব নু সু বধৎষরবৎ ড়ৎফবৎং. খোদা হাফেজ।’

চাটগাঁয়ে সিদ্দিকীকে বঙ্গবল্পুব্দর নির্দেশগুলো জানিয়েই আমি চাটগাঁয়ে অরক্ষিত অবস্থায় পরিবারের সবাইকে রেখে এসেছি তা জানালাম এবং ওদের তার সঙ্গে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বললাম। কথা শেষ হলে সিদ্দিকী একটা টেলিফোন নম্বর দিলেন মুজিব ভাইকে পেঁৗছে দেওয়ার জন্য। তখন রাত প্রায় ১১টা। ঢাকার রাস্তায় ততক্ষণে পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক বেরিয়ে গেছে। সাহস করে একটি রিকশা নিয়ে ধানমণ্ডি ১ নম্বর রোডে ফিরে গেলাম। এরপর পৃথিবীর জঘন্যতম নরহত্যার ঘটনা ঘটে যায় ঢাকার পিলখানায় ইপিআর সদর দফতরে। তাদের কিছু পালিয়ে বাঁচলেও বাকিরা শত্রুর হাতে আত্মাহুতি দেন। আধুনিক ট্যাঙ্কের কামানের গোলার সামনে ইপিআরের বাঙালি সিপাহিরা শুধুই রাইফেল দিয়ে যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন।

আমি সারারাত জেগে রইলাম। সারারাতই নানাদিক থেকে শত্রুর ট্যাঙ্কের বিশাল গোলাবর্ষণের আওয়াজ, ঢাকা নগরী কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এই পৈশাচিক নরহত্যার ঘটনা ভীরু পাকিস্তানি সেনারা তাদের কাপুরুষত্ব পশু পর্যায়ের নেতৃত্বের ধারায় একনাগাড়ে নয় মাস (২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত) চালিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বীর বাঙালিদেরই জয় হয়েছে। সত্যের জয় হয়েছে। শত কূটচাল, ধর্মীয় গোঁড়ামির নানা অধর্ম, মীরজাফরীয় নানা চক্রান্ত সত্ত্বেও বাঙালিরা সত্যের পথ ধরে নিয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার পথ নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছে এবং নেবে।

হনয়ীম গহর : মুক্তিযোদ্ধা

আরেকটা লেখা