অ্যান এনরাইট শৈশব আর মাতৃত্ববোধের রূপকার

সরকার মাসুদ
অ্যান এনরাইটের লেখা পড়ার সময় বারবার মনে পড়েছে নাদিন গর্ডিমার, মার্গারেট অ্যাটউড, এলিস ওয়াকার প্রমুখ নারী লেখকের কথা। কেননা নারীর অভিজ্ঞতার জগৎ পুরুষ লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষভাবে আফ্রো-আমেরিকান মহিলা লেখক এলিস ওয়াকারের বেলায় যেমনটি ঘটেছে, তেমনি এনরাইটের ক্ষেত্রেও প্রায় সব লেখাজোখা ধারণ করে আছে ব্যক্তিজীবনের নিগূঢ় হর্ষ-বিষাদ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা।

অ্যান এনরাইটের (Anne Enright) বয়স এখন পঞ্চাশ বা পঞ্চাশের কাছাকাছি। আয়ারল্যান্ডের এই মহিলা লেখক বছর চারেক আগে ভূষিত হয়েছেন বুকার পুরস্কারে। এলিস ওয়াকার, জন ব্যানভিল, মার্গারেট এ্যাটউড, লয়েড জনস, আয়ান ম্যাকওয়ান প্রমুখ সমকালীন লেখকের মতোই ব্যতিক্রমী ভাবনা ও লিখনরীতির অধিকারী অ্যান। ইতিমধ্যে ৬/৭টি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। বুকার পেয়েছেন The Gathering উপন্যাসের জন্য। এটা তার চতুর্থ উপন্যাস। উল্লেখযোগ্য অন্য বইগুলো হচ্ছে What are you like, Hegertti family Making babies। এগুলোর মধ্যে ‘হোয়াট আর ইউ লাইক’ তাকে এনে দিয়েছিল ‘দ্য রয়াল সোসাইটি অফ অথরস এনকোর’ পুরস্কার (২০০০)। এনরাইট তার লেখক জীবনের বাইরে একজন টেলিভিশন প্রযোজক।

বুকারজয়ী উপন্যাস The Gathering-এর আলোচনায় যাওয়ার আগে তার অন্য দু-তিনটি বই সম্বন্ধে দু-চার কথা বলা যাক। এনরাইট সাহিত্যে একটি অত্যন্ত প্রিয় এবং পুনরাবৃত্ত বিষয় হচ্ছে শিশুর জন্ম ও মাতৃত্ববোধ। আধুনিক ইউরোপীয় উপন্যাসে যৌনতা একটি অতি ব্যবহৃত থিম। বিষয়টি অ্যানের লেখায়ও এসেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য ভঙ্গিতে। কেননা তিনি মনে করেন, জন্মের বিষয়টিও যৌনতার সঙ্গেই সম্পর্কিত। এই যৌনতার স্বাদ একজন নারী অনুভব করে থাকে ৯-১০ মাস ধরে। আর কেবল যৌনকর্ম নয়, মানুষ ভালোওবাসে জৈবিক কারণেই। প্রচলিত অর্থে যা প্রেম নামে পরিচিত, তার বাইরে ভালোবাসা ব্যাপারটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এই জৈবিকতা, অ্যান যাকে ‘biolotical bond’ বলে অভিহিত করেছেন। বিষয়টি ‘What are you like’ উপন্যাসে অনেকখানি জায়গাজুড়ে স্থান পেয়েছে। এখানে একই ধরনের ডিএনএসম্পন্ন দুটি যমজ শিশু দেখা যায়। এরা বড় হয়ে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু সহোদরের জন্য টান থেকে যায়।

Making babies গ্রন্থে এনরাইট বলেছেন মাতৃত্বের সুখানুভূতির ও বিড়ম্বনার কথা। একজন নারীর মা হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাটাই এখানে প্রধান। গর্ভবতী হওয়ার সময়ের কথা, সন্তান প্রসবকালীন অভিজ্ঞতা, বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে তার পরিচর্যা এসব বিষয়ই দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে বইটিতে। মাতৃত্বের ঘোরে আচ্ছন্ন একজন নারীর একান্ত নিজের জগৎ কেমন হতে পারে, গধশরহম নধনরবং তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

কিন্তু Hegertti family উপন্যাসে বিধৃত জগৎটি আবার ভিন্ন। এনরাইট এক অনিবার্য অন্ধকার পৃথিবীর কথা এখানে বলেছেন, যে পৃথিবী বৈরিতাপূর্ণ এবং আশাহীনতায় ঠাসা। শৈশবকাতরতা, শিশু নির্যাতন ও আত্মহননের মতো একাধিক স্পর্শকাতর জিন আছে এই মন খারাপ করে দেয়া উপন্যাসে। প্রধান চরিত্র লিয়াম মনে খুব দাগ কাটে। লিয়াম মদে আসক্ত, ভালোবাসা বঞ্চিত এবং ভুল বোঝাবুঝির শিকার। ‘misunder stood man’ বলতে যা বোঝায়, সে ঠিক তাই। তবে অ্যালকোহলের প্রভাব তার জীবনে খুব তীব্র নয়। লিয়ামের জীবনের পরিণতি অত্যন্ত ট্র্যাজিক। তার আত্মহত্যার যন্ত্রণাদীপ্ত প্রতিটি মুহূর্ত সংবেদী পাঠককে স্পর্শ করবে বলে মনে হয়।

অ্যান এনরাইটের প্রায় সব লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে পারিবারিক পরিবেশ। ফলে তিনি পরিচিত মানুষের আদলে চরিত্র নির্মাণ করেছেন। কখনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়েছেন, কখনোবা মিশিয়েছেন কল্পনার নানা রঙ। শৈশবকে ব্যবহার করার কাজে অ্যান যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। যৌনতাকে তুলে এনেছেন জীবনের স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে। The gathering উপন্যাসের বেলায় এসব কথা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। শৈশব ও আত্মহনন এ বইয়ের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের একটি পরিবারের মর্মন্তুদ গল্প অবলম্বন করে রচিত হয়েছে এই গ্রন্থ। লিয়াম নামে একটি চরিত্র আত্মহত্যা করার ফলে যে মানসিক বিপর্যয় নেমে এসেছে সংসারে, তারই নিপুণ চিত্র তুলে ধরেছে এ উপন্যাস। কাহিনী উত্তমপুরুষে বর্ণিত হয়নি। ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন ভেরোনিকা হোগার্তি নামে এক মহিলা। তিনি লিয়ামের বোন।

একজন বোন তার ভাইয়ের জীবন ও মৃত্যুর কথা বয়ান করছেন। বাস্তবে এ ক্ষেত্রে খুব আবেগী ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে; সচরাচর হয়ে থাকে। শিল্পের কাক্সিক্ষত সংযমের কারণে এনরাইট সেই আবেগের রাশ টেনে ধরেছেন। খুবই বাস্তবসম্মত উপকরণ প্রযুক্ত হয়েছে উপন্যাসটিতে। কিন্তু হৃদয়বৃত্তি আর বুদ্ধিমত্তার (যার সঙ্গে শিল্পরুচি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত) ভারসাম্য যেভাবে রক্ষিত হয়েছে এখানে, তা কথাসাহিত্যের আধুনিক বিশ্বেও খুব বেশি চোখে পড়ে না। উপন্যাসের গোড়ায় দেখা যায় একটি পরিবারের জীবন্ত ছবি। শিশু ভেরোনিকা, তার ভাই এবং তার দাদির সজীব উপস্থিতি লক্ষণীয়। কিন্তু এর চেয়েও যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হচ্ছে, এ চরিত্র সব পরিণত বয়সে ভালোবাসার নিদারুণ সঙ্কটে ভোগে। জীবনের এ পর্যায়ে ভালোবাসার প্রকাশ কীভাবে এতো কঠিন হয়ে পড়লো, তারই এক প্রাণবন্ত আলেখ্য The gathering। মানবিক সম্পর্কের সরলতা এবং জটিলতা একই সঙ্গে এখানে তুলে ধরা হয়েছে অননুকরণীয় দক্ষতায়।

উপন্যাসটি পড়ে শেষ করার পর অনেকেই এর ভেতরের বিনোদি উপাদান সম্বন্ধে আপত্তি তুলতে পারেন। কিন্তু দু-চারটি বিরল ব্যতিক্রম বাদে এ কথা কি খুবই সত্য নয় যে, যিনি যতো বড় লেখক, ততো বড় বিনোদনদাতা (entertainer)? তবে সেই entertainment অবশ্যই উন্নত স্তরের। হলিউডের দুনিয়া কাঁপানো একাধিক ছবি যারা দেখেছেন, আমার ধারণা, ওইসব চলচ্চিত্রের কাহিনীর সঙ্গে The gathering-এ সন্নিবেশিত গল্পের একটা অন্তর্গত মিল তারা খুঁজে পাবেন। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর সুগভীর জীবনদৃষ্টিÑ এ দুয়ের সংমিশ্রণে গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী সাহিত্যকর্ম এ উপন্যাস।

বিষয়বস্তু সিরিয়াস, কিন্তু সেটি উপস্থাপিত হয়েছে জনপ্রিয় ধারার কথাসাহিত্যের স্টাইলে, The gathering সম্বন্ধে অবশেষে এ কথাই মনে হয়েছে আমার। জীবনের কঠিন সব সমস্যাকে সাবলীল ও সৃজনী ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে পেরেছেন, এনরাইটের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই।

অ্যান এনরাইটের লেখা পড়ার সময় বারবার মনে পড়েছে নাদিন গর্ডিমার, মার্গারেট অ্যাটউড, এলিস ওয়াকার প্রমুখ নারী লেখকের কথা। কেননা নারীর অভিজ্ঞতার জগৎ পুরুষ লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষভাবে আফ্রো-আমেরিকান মহিলা লেখক এলিস ওয়াকারের বেলায় যেমনটি ঘটেছে, তেমনি এনরাইটের ক্ষেত্রেও প্রায় সব লেখাজোখা ধারণ করে আছে ব্যক্তিজীবনের নিগূঢ় হর্ষ-বিষাদ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা।

মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে ভালো বোঝে; আর বোঝে তার বন্ধু-স্বজনদের এবং বেড়ে ওঠার ও কর্মজীবনের পরিবেশকে। যাদের বহির্জগতের অভিজ্ঞতার পরিধি নানা কারণে অতি সীমিত, সেসব গদ্যলেখক বিচক্ষণতার সঙ্গে বেছে নেন নিজের জীবনের নানামাত্রিক অভিজ্ঞতাকে। এনরাইট সঠিক পথই বেছে নিয়েছেন বলে মনে হয়।

শুধু যাচাই-বাছাই নয়, পুরস্কার ব্যাপারটির সঙ্গে বিচারকদের ভোটাভুটির বিষয়টিও সম্পৃক্ত। সাহিত্যরুচি ও শিল্পকলা অনুধাবনের মাত্রার তারতম্য তো আছেই। সে জন্য পুরস্কার, তা যে মানেরই হোক না কেন, সবসময় সঠিক বিবেচনা থেকে দেয়া হয় এমন কথা বলা যাবে না। অ্যান এনরাইটের ক্ষেত্রে আমার ধারণা, সুবিচার হয়েছে। পুরস্কৃত করা হয়েছে সঠিক ব্যক্তিকে, একজন সত্যিকার গুণী লেখককে।