হিমাগার সিন্ডিকেট বাড়তি গুনছে

আলু নিয়ে কৃষক মহাবিপদে : হাজার হাজার বস্তা আলু খোলা আকাশের নিচে : ক্ষেতের আলু ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে
সৈয়দ মিজানুর রহমান/মাহবুবুর রহমান ,মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে
ক্ষেতে ফসলের ফলন ভালো হলে খুশি হওয়ার কথা কৃষকদের। কিন্তু এবার আলুর বেশি ফলন চাষীদের মুখে হাসি কেড়ে নিয়েছে। ক্রেতার অভাবে ক্ষেতের আলু ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। বাম্পার ফলনের সুযোগ নিয়েছে হিমাগার সিন্ডিকেট। সরকারও কৃষকদের কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। ফলে আলু চাষ করে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন মুন্সীগঞ্জের কয়েক হাজার কৃষক। দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন কৃষকরা, এখন আলু বিক্রির অর্থ থেকে তা শোধ করাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। ক্ষেতে আলু, বস্তায় আলু, বাড়ির উঠানেও আলু। তবে এগুলো কেনার ক্রেতা নেই, সংরক্ষণের জায়গা নেই কোল্ড স্টোরেজে। তার ওপর পদে পদে ফড়িয়া আর চাঁদাবাজের হামলা। এত আলুর ফলন অনেকেই প্রত্যাশা করেননি। আলুর বাম্পার ফলনের সুযোগ নিয়েছেন হিমাগার মালিকরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে ৭/৮ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন কৃষক। অথচ এক কেজি আলুর উত্পাদন খরচ প্রায় সাড়ে ১১ থেকে ১২ টাকা পড়েছে।

মুন্সীগঞ্জে হাজার হাজার বস্তা আলু পড়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। উত্পাদন খরচ তো দূরের কথা, আলু বাজারে আনতে যে খরচ পড়ে তা ওঠাতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কৃষরা জানিয়েছেন, এ বছর হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণের ভাড়াও বস্তাপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া নভেম্বর-ডিসেম্বরেই অধিকাংশ হিমাগার মালিক অগ্রিম কোটা বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে জেলার প্রকৃত কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, মুন্সীগঞ্জের ৬৯ হিমাগারের মধ্যে এখন ৬৩টি চালু আছে। এসব কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করা যাবে মাত্র ৪ লাখ ৭৫ হাজার টন। তবে এ বছর জেলায় আবাদকৃত ৩৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৭০ হাজার টন আলু উত্পাদন হয়েছে। গত বছর ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ৯ লাখ ৬৫ হাজার টন উত্পাদন হয়েছিল।

সরেজমিন টঙ্গীবাড়ী উপজেলার কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আলু চাষীরা ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন না। কারণ হিসেবে কৃষকরা জানান, এবার প্রতি মণ আলুর উত্পাদন খরচ পড়েছে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারমূল্যে বিক্রি করা যাচ্ছে প্রতি মণ সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। টঙ্গীবাড়ীর আলু চাষী আফসারুল গতকাল আমার দেশকে জানান, বরাবরই আলু মৌসুম শুরু হতে না হতেই ক্রেতাদের ভিড় লেগে যায়। গত বছরও ক্ষেতেই অনেকে আলু বিক্রি করেছেন। কিন্তু এবার কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা তাদের নিজস্ব লোকজন দিয়ে আলু কিনছেন। তাদের বাইরে কেউ আলু কিনে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

গতকাল জেলার সদর উপজেলার মুক্তারপুরের নিপ্পন হিমাগারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত কৃষক হিমাগারের সামনে অপেক্ষা করছেন টোকেনের জন্য। তবে কেউ টোকেন পাচ্ছেন না। রমজান বেগ গ্রামের আবুল হাশেম জানান, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবার ফলন যথেষ্ট ভালো হয়েছে; কিন্তু ক্রেতা না থাকায় প্রতিদিনই আলুর দাম কমছে। তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ হিমাগারের কোটা দুই মাস আগে বস্তাপ্রতি ১২০/১২৫ টাকায় অগ্রিম বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা আলু রাখতে পারছেন না।

হিমাগারের কোটা বিক্রি বিষয়ে জানতে চাইলে নিপ্পন হিমাগারের ম্যানেজার মনোরঞ্জন সাহা আমার দেশকে জানান, ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে আলুর মৌসুম শুরুর আগেই তারা কোটা বিক্রি করে দেন। পরে যারা কোটা কিনে নেন, তারাই কৃষকদের কাছে বেশি দামে সে কোটা বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ১ লাখ ৪০ হাজার বস্তা ধারণক্ষমতা আছে তাদের কোল্ড স্টোরেজে। কিন্তু এ বছর দ্বিগুণের বেশি আলু এসেছে।

আলু চাষীরা অভিযোগ করেছেন, মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চল খাসের হাটের নূরানি কোল্ড স্টোরেজে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে কৃষকদের কাছ থেকে দালাল-ফড়িয়ারা ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন। কেউ বাড়তি টাকা না দিলে তার আলুর বস্তা ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

এছাড়া কোল্ড স্টোরেজের মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে কৃষকদের কয়েক দফা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের মুখে পড়তে হচ্ছে।

হিমাগারে মাইকিং করে আলু রাখা বন্ধ ঘোষণা

রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে আমাদের প্রতিনিধি ফজলুর রশিদ সাজু জানিয়েছেন, গঙ্গাচড়ায় হিমাগার সঙ্কটের কারণে উত্পাদিত ১০ লাখ বস্তা আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবারে ৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ৬ হাজারেরও বেশি হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গঙ্গাচড়ায় একমাত্র বিডি হিমাগারে ১ লাখ ৩০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ ধারণক্ষমতা থাকলেও উত্পাদিত আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ১০ লাখ বস্তা আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে বাজারে আলুর দাম কম, অন্যদিকে হিমাগারে ঠাঁই না থাকায় আলু চাষীরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। চাষীরা জানান, হিমাগার কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে বস্তাপ্রতি বাড়তি ৩০/৪০ টাকা বেশি নেয়ার নিয়ম করছে। এতে করে প্রকৃত আলু চাষীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা হিমাগারের গেটে ৩/৪ দিন ধরে অপেক্ষা করেও হিমাগারে আলু রাখতে পারছেন না।

দেশের সবচেয়ে অভাবী এলাকা বলে পরিচিত রংপুরের গঙ্গাচড়ার আলু চাষীরা সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক তামাক চাষ ছেড়ে দিয়ে বুকভরা আশা নিয়ে কোমড় বেঁধে নেমেছিল আলু চাষে। প্রতিকূল আবহাওয়া আর সময়মতো পরিচর্যার ফলে এবারে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজারে আলুর বস্তা সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাতে উত্পাদন উঠছে না।

উপজেলার দক্ষিণ কোলকোন্দ গ্রামের আলু চাষী আতাউর রহমান দুলু জানান, তিনি এবারে ১৫ একর জমি লিজ নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন। সব মিলে বস্তাপ্রতি তার খরচ হয়েছে ৫০০ টাকা। বর্তমান বাজারে আলু বিক্রি করলে তার লক্ষাধিক টাকা লোকসান হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে পানির দরে আলু বিক্রিও করতে পারছি না এবং হিমাগারেও আলু রাখতে পারছি না। আলু নিয়ে মহাবিপদে আছি।

এদিকে উপজেলার একমাত্র বিডি হিমাগারে গিয়ে দেখা গেছে, সারিবদ্ধভাবে ট্রাক্টর, ট্রলি, ঘোড়ার গাড়ি ও রিকশা-ভ্যানের দীর্ঘলাইন। নোহালী ইউনিয়নের আলু চাষী আবদুল কাদের জানান, ‘কী আর কমো বাহে, আলু নিয়ে ৪ দিন ধরে রাস্তায় পড়ে আছি। তবু হামার আলু নেওছে না।’ গঙ্গাচড়া বিডি হিমাগারের ম্যানেজার গোলাম সারোয়ার অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমিও শুনেছি বাইরে নাকি লেবাররা ২০/২৫ টাকা অতিরিক্ত নিচ্ছেন। সেটা বাইরের ব্যাপার। হিমাগারে আলু রাখার জন্য একটি টাকাও বেশি নেয়া হচ্ছে না।

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. হায়রে আলু…ক’দিন পরে দেখব আলু নেই, থাকলেও ৩০/৪০ টাকা!!!