অতীশ দীপঙ্করের ভিটায় নির্মিত হচ্ছে স্মৃতি কমপ্লেক্স পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল
সবুজ প্রান্তর চিরে চলে গেছে পথ। এ পথ ধরে চলতে চলতে হঠাৎই চোখে পড়বে দূর এক গাঁয়ে লাল লাল ছোপ। আরেকটু এগোলেই লাল ছোপ থেকে স্পষ্ট অবয়ব নেবে অপরূপ নির্মাণশৈলীর এক স্মৃতিমঠ এবং তাকে ঘিরে কয়েকটি লাল দালান। এ গাঁয়ের নাম বজ্রযোগিনী আর এই মঠটি বাঙালির অহঙ্কার অতীশ দীপঙ্করকে স্মরণ করিয়ে দেবে। এ ভিটাতেই জন্মেছিলেন তিনি। বৌদ্ধধর্মকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। মঠটির উত্তর দিকেই নতুন বিশাল এক অডিটোরিয়াম। এটি অতীশ দীপঙ্কর পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড অডিটোরিয়াম ভবন। অবশ্য এখনও এটি উদ্বোধন করা হয়নি। অচিরেই এখানে নির্মিত হবে আরও অনেক ভবন। অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হচ্ছে এখানে।

২৪ ফেব্রুয়ারি অতীশ দীপঙ্করের ১০৩০তম জন্ম উৎসবে মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কমপ্লেক্সের ভিত্তিফলক উন্মোচন করা হয়েছে। তিব্বতের অতীশ স্মৃতিমঠের আদলে এ আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মিত হবে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। চায়না বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান ঝু চেং চীনা ভাষায় বলেন, ‘বৌদ্ধধর্মীয় নেতা দীপঙ্করের জন্মভূমির রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তাতে এখানে নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে।’ চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জিয়াংসহ অতিথিবৃন্দ অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ মোশারফ হোসেন এ অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন, এই কমপ্লেক্স নির্মিত হলে এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়বে। অতীশের বহুমুখী প্রতিভার আলো বজ্রযোগিনী থেকে আবারও ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। এখানে এ কমপ্লেক্স নির্মাণের খবরে উজ্জীবিত বজ্রযোগিনী গ্রামবাসীও। বজ্রযোগিনী গ্রামের কৃষক মোঃ শহীদ বলেন, ‘আমাদের এই মাটির সন্তান অতীশ বিশ্বকে আলোকিত করতে নানা অবদান রেখেছেন। এখান থেকেই হয়তো তার যোগ্য উত্তরসূরি বের হবে।’

৯৮০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অতীশ দীপঙ্কর জন্ম নেন এই গ্রামে। অবশ্য কোথাও কোথাও তার জন্ম সাল ৯৮২ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জন্মস্থান হিসাবে সবাই বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামের উল্লেখ করেছেন। বিক্রমপুরের ইতিহাসে তার জন্ম নিয়ে সুম্পা রচিত ‘পাগ-সাম-জন-জাঙ্গ’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুরের বজ্রাসনের পূর্ব দিকে। অতীশ দীপঙ্করের পিতার নাম কল্যাণশ্রী ও মায়ের নাম প্রভাবতী। বাল্যকালে দীপঙ্করের নাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। সে যুগে দীপঙ্করের বাড়ির দুই কিলোমিটার উত্তরে শ্রীচন্দ্র (৯৩০-৯৮০) লডহর চন্দ্র, পূর্ণচন্দ্ররা রাজত্ব করেছেন। তারা সবাই বৌদ্ধ রাজা ছিলেন। অতীশ ১০৫৩ সালে ৭৩ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন তিব্বতের ন্যাথাং শহরে। তার সমাধি মন্দির ঝমৎড়সধ নামে পরিচিত। ১৯৮১ সালে এই জ্ঞানতাপসের দেহভস্ম রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

১৯ বছর বয়সে তিনি ওদন্তপুরী বিহারের বৌদ্ধাচার্য শীলরক্ষিতের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তখন তার নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ২৯ বছর বয়সে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। ১০৪১ সালে হিমালয় অতিক্রম করে তিনি তিব্বতে যান।

তার অসাধারণ পা-িত্যের কারণে তিব্বতিরা তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি তিব্বতে মহাযান বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। দীপঙ্কর শতাধিক গ্রন্থের প্রণেতা। বোধিমার্গপ্রদীপ ও মহাযানপথ-সাধনবর্ণসংগ্রহ, প্রজ্ঞাপারমিতা-পি-ার্থপ্রদীপ, শিক্ষাসমুচ্চয় অভিসময়, সূত্রার্থসম্চ্চুয়োপদেশ, সংগ্রহগর্ভ প্রভৃতি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তার নিজের গ্রামকে এবার আলোকিত করতে চান দীপঙ্করভক্তরা। পাশাপাশি এক বিশাল পর্যটন কেন্দ্র হিসাবেও গড়ে তুলতে চান তারা স্মৃতি কমপ্লেক্সটিকে। জেলা শহরের প্রায় ৫ কিলোমিটার এবং রাজধানী ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরের বজ্রযোগিনীতে ‘প-িতের ভিটা’য় একদিন হয়তো পর্যটকরা ছুটে আসবে বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে।

সাপ্তাহিক ২০০০

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. good news