বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে শৈল্পিক দ্রোহ

মাহমুদুল বাসার
মানুষ এমনই, সমাজও এমন। মানুষ ও সমাজ ঘড়ির কাঁটা নয় যে, বারোটার সময় ঠিক বারোটা বাজবে। পত্রিকা মেলে ধরে কী দেখি সমাজের চেহারা? দেখি মুখ ব্যাদান করা জগদীশ গুপ্তের ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’-এর মুখ। সমাজের কাপট্য এবং ভণিতার ওপর চরম আঘাত করেছেন বুদ্ধদেব বসু, শৈল্পিক আঘাত যা শৈল্পিক দ্রোহে পরিণত হয়েছে।

ত্রিশের অসামান্য কথাশিল্পী বুদ্ধদেব বসু। তিনি মূলত সাহিত্যশিল্পী এবং আপাদমস্তক সাহিত্যের মানুষ। তার সিদ্ধিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। তার দুর্ভাগ্য, তিনি এ যুগের ড. হুমায়ুন আজাদের মতো ঠোঁটকাটা হওয়ায় নিদারুণ, নির্মম ঈর্ষার আর অবিচারের শিকার হয়েছেন। সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘উপন্যাসের কালান্তর’ বইটি অখ্যাত ঔপন্যাসিকদের আলোচনায় ভরে ফেলেছেন, আর বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে এক ইঞ্চি আলোচনাও করেননি।

এ সঙ্কীর্ণতা অধিকাংশ মার্কসবাদীর। অবশ্য বুদ্ধদেব বসু মুসলমান এবং মার্কসবাদী উভয় তরফের ক্ষোভের, রোষের শিকার হয়েছেন; তাই তার কবিতা ও সমালোচনা সাহিত্যের ওপর দু’এক ফালি পাওয়া গেলেও গল্প-উপন্যাস সম্পর্কে কোনো আলোচনাই পাওয়া যায় না।

কথাসাহিত্যে বুদ্ধদেব বসুর মৌলিক-নিকষিত অবদান তার ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসটিতে রূপালী-ধারালো-জোছনার মতো ছড়িয়ে আছে। এ উপন্যাসে তিনি উপন্যাসের সীমাকে সাহসের সঙ্গে ছাড়িয়ে গেছেন। উপন্যাসটি পড়ার সময় বারবার ডিএইচ লরেন্স এবং নভকবের কথা মনে পড়ছিল। বঙ্গবিবেক আবুল ফজল লরেন্সের লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার এবং নভকবের ‘লোলিটা’ উপন্যাসের ওপর সুবিস্তৃত আলোচনা করেছেন। আবুল ফজল যে অনেকের চেয়ে মুক্তমনের মানুষ, তার প্রমাণ রেখেছেন উল্লিখিত প্রবন্ধে।

পত্রিকায় দেখেছি নভকবের ‘লোলিটা’ বিশ্বসাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম উপন্যাসের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সেখানে লক্ষ্য করেছি, নারী-পুরুষের সম্পর্কের বাস্তব চিত্র শিল্প সুষমার তুলিতে অসাধারণ কৌশলে অঙ্কন করতে।
বুদ্ধদেব বসু মূলতই সাহিত্যশিল্পী। তার হাতে মেধা ও মননের জারকরসে বাংলা কথাশিল্প আধ্যাত্মিক বাহুল্যতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। আধ্যাত্মিক রেশ ও প্রভাবম-নমুক্ত করে বাংলা কথাশিল্পকে বাস্তবের পলিমাটিতে দাঁড় করাতে যারা শ্রম বিলিয়ে দিয়েছেন, বুদ্ধদেব বসু তাদের প্রথম কাতারের একজন। ইংরেজবিরোধী হওয়া যতোটা সাহসের দরকার, তার চেয়ে বেশি সাহসের দরকার অনাধ্যাত্মিক হওয়া এবং অধ্যাত্মবিরোধী হওয়া। রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ কেউই পুরোপুরি আধ্যাত্মিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত নন। এ ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু পুরোমাত্রায় সাহসী।

বাংলাদেশের কোনো কোনো মার্কসবাদী কথাশিল্পী যখন সচেতন কষ্টকল্পিত প্রয়াসে নারী-পুরুষের প্রেম, মনোজ-দেহজ বিষয়কে উপেক্ষা করে শ্রেণীবন্দনা করেন, তখন মনে হয় গির্জার পাদ্রিদের মতো নীতির বয়ান উগড়ে দিচ্ছেন।

বুদ্ধদেব বসু বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ ও তার সমাজলগ্নতা ছিন্ন করে চৌঠা আসমানে বসে গল্প-উপন্যাস লেখেননি। ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসে নগর সমাজের মধ্যবিত্তের কঠিন সঙ্কটের রক্তাক্ত দ্বান্দ্বিক চিত্র তুলে এনেছেন। এ উপন্যাসে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রবীন্দ্র-শরৎ-বিভূতিভূষণের সীমা চূর্ণ করে আধুনিকতম প্যারাডক্স তৈরি করেছেন।

মানুষের ভাত-কাপড়ের সমস্যা যতোটা বাহ্যিক, যতোটা সমাধানসাপেক্ষ, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট অতোটা সমাধানসাপেক্ষ নয়। মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটের ত্রিশঙ্কু গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয় নারী-পুরুষের দেহকে কেন্দ্র করে। আর এটি এমনই আত্মমুখী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক যে, এটা নিয়ে রাস্তায় মুষ্টি উত্তোলন করে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ বলে স্লোগান দেয়া যায় না।

মানুষের চাহিদা দেহের ও মনের অভিন্ন। মানুষের ক্ষুধা দেহের ও মনের, মানুষের তৃষ্ণা দেহের ও মনের অভিন্ন। মানুষের অতৃপ্তি, বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, ছলনা, অভিনয়, কান্না, নিঃশব্দ বুকফাটা চিৎকারও থাকে মন ও দেহকে কেন্দ্র করে। এই অদৃশ্য-গোপন মনোবাস্তবতা কোনো যুগেই উপেক্ষণীয় ছিল না। অন্য দেশের কথা ছেড়ে দিলাম, আমাদের চর্যাপদে নারী-পুরুষের দৈহিক সম্ভোগজনিত শিল্পময় আকুলতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। আমাদের সাহিত্যে প্রথম নারী-পুরুষের দেহজ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে। সেখানে শ্রীরাধিকা যখন কৃষ্ণের সঙ্গে দৈহিক মিলনের পিপাসায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, তখন কৃষ্ণ ব্যঙ্গ করে বলেছেÑ ‘পুটুলি বান্ধিয়া রাখ লহুলী যৌবন’।

অর্থাৎ যৌবনের উদ্বেগকে পুটুলিতে বেঁধে রাখা সম্পূর্ণ অসম্ভব। দেহবাঞ্ছা এবং মনোবাঞ্ছা নিয়ে মানুষ সমাজে বসবাস করে। তার সমতা ও বৈষম্য থাকে, তার শ্রেণীচেতনা থাকে, বৈষম্যবোধ থাকে, প্রেম-বিরহ সন্তানবাৎসল্য থাকে, এমনকি রাজনৈতিক চেতনাও থাকে। এমন সূক্ষ্মতর বিস্তৃত বাস্তবতা বুদ্ধদেব বসু এনেছেন ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসে।

এ উপন্যাসের চরিত্র তিনটি। নয়নাংশু, মালতী এবং জয়ন্ত। মালতী-অংশুর মেয়ে বুন্নির কথা এসেছে ওদের জবানবন্দিতে। বুন্নি স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে জেগে ওঠেনি।

মালতী বলেছে নয়নাংশুর কথা আর নয়নাংশু বলেছে মালতীর কথা। ওদের দাম্পত্য জীবনের গভীরে ফাটল ধরেছে একে অপরকে খাপে খাপে অনুধাবন না করার কারণে। যখন মালতী নয়নাংশু সম্পর্কে আত্মজবানিতে অভিযোগ তুলে ধরে, তখন তার সামাজিক অবস্থান, পুরুষতান্ত্রিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, মালতীর প্রতি ঔদাসীন্য প্রখর-অগ্নিশিখার মতো প্রজ্বলিত হয়। নয়নাংশু ইংরেজিতে বিদ্বান, কলেজের দামি শিক্ষক, পারফেক্ট লেকচারার, পড়–য়া, অনুবাদক, পত্রিকা সম্পাদক, চোখা ভদ্রলোক; তা অনেকটা শ্রেণী দেয়ালের মতো মালতীর মনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়; এমন জবানবন্দি দেয় মালতী। আবার নয়নাংশু যখন মালতী সম্পর্কে বিবৃতি প্রদান করে, তখন যেভাবে সে আত্মপক্ষ সমর্থন করে, পরন্তু মালতীর কড়াপাকের আত্মসচেতনতা, স্বতন্ত্রতা নয়নাংশুকে ছাপিয়ে তাচ্ছিল্যের পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। এ মনোযন্ত্রণা নয়নাংশু পরিশীলিত সহিষ্ণুতার দূরত্ব বজায় রেখে হজম করে যায়। বরং এক পর্যায় নয়নাংশুকেই মালতীর চেয়ে অসহায় মনে হয়।

মালতীও বিএ পাস। আধুনিকা। কলেজে নয়নাংশুরই ছাত্রী ছিল। উভয়েই উভয়কেই পছন্দ করে, প্রেম করে বিয়ে করেছে। সংসার গড়েছে, মেয়ে হয়েছে। এরপর মালতী উপলব্ধি করে যে, নয়নাংশু যেন ভালোবাসার আইডিয়া, যেন বাইয়ের পোকা, যেন শুকনো কঙ্কাল, যেন নিরক্ত, যেন উত্তাপ বিবর্জিত, যেন জীবনানন্দের ‘আকাশ লীনা’ কবিতার লাইন ‘বাতাসের ওপরে বাতাস’। যেন তার দিকে নয়নাংশুর ব্যাগ্র-ব্যাকুল আগ্রহ নেই। বাসায় একপাল বন্ধু-বান্ধব আসে। তার মধ্যে মালতী ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে, ডুবে যেতে থাকে। এতে নয়নাংশুর ঈর্ষা নেই, আকুলতা নেই। মালতীকে দেহে-মনে-কামনায়-লালসায়-যৌনতায় পাওয়ার অনুপম তীব্রতা নেই।

মালতী বলে, ‘মুগ্ধ, তবু যেহেতু আমার স্বাভাবিক বুদ্ধিসুদ্ধি খানিকটা আছে, তাই সেই তখনই, যখন পর্যন্ত আমার গা থেকে নতুন বিয়ের গন্ধ কাটেনি, তখনই আমার মনে হয়েছিল অংশু যেন বড্ড বেশি বই পড়া মানুষ, যা কিছু বইয়ে পড়ে তার ভালো লেগেছে তাই যেন তার জীবনেও খাটাতে চায়।’

আরো সূক্ষ্মভাবে মালতী অভিযোগ তুলেছে, “আমার অবাক লাগছে যে, মানুষ হাতে-কলমে প্রেম করতে পারে, সে প্রেমের কবিতা পড়বে বা শোনাবে কেন বা কথা বলবে কেন, তা নিয়ে আর অবশেষে সে যখন আমাকে কাছে টানে সেটাও এমন নরম হাতে তার সন্তর্পণে যে, আমার একসময় মনে হয়, ‘এই প্রেম করাটাকেও সে যেন মনে মনে কোনো বই থেকে তর্জমা করে নিচ্ছে অবশ্য মুখে আমি প্রায়ই বলি, উঃ কী অসভ্য! বর্বর! এই বুঝি দস্যুপনা শুরু হলো আবার।’ ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা যা যুগে যুগে মেয়েরা বলে এসেছে পুরুষটিকে আরো বেশি তাতিয়ে তোলার জন্য, কিন্তু ওর দস্যিপনার চরম মুহূর্তেও হঠাৎ খুব আবছাভাবে আমার মনে হয় যে, অংশু ঠিক আমাকে ভালোবাসছে না, ও যে আমাকে ভালোবাসে সেই ধারণাটাকে ভালোবাসছে। অথচ এই ‘ভালোবাসা’ নিয়ে কতোই না লম্বা-চওড়া বক্তৃতা ওর।”

হ্যাঁ, মানুষ যে আইডিয়ার ফানুস নয়, রক্তমাংসে গড়া মানুষ তার প্রতি জোরালো সমর্থনটা বুদ্ধদেব বসু মালতীর অভিযোগের ভাষায় প্রকাশ করেছেন। আইডিয়ার ফানুসের প্রতি রবীন্দ্রনাথেরও বিরক্তি কম ছিল না।

এবার আমরা লক্ষ্য করবো, নয়নাংশু মালতীর বিরুদ্ধে যে সূক্ষ্ম, শুভ্র, সুনীল অভিযোগ তুলেছে, তা সংস্কৃতিবানের মতো শরবিদ্ধ পাখির ব্যথিত-প্রমিত ভাষায় ব্যক্ত করেছে। বলেছে যে, ‘এই কথাটাই আমি বলার চেষ্টা করেছিলাম মালতীকে অনেক কষ্টে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো আমি কেন তা অনুভব করি না? …একটা দেয়াল, বোবা দেয়াল, মাথা ঠুকলে শুধু মাথা ঠোকার প্রতিধ্বনি বেরোবে।’

এই যন্ত্রণা ট্র্যাজেডির। এ উপন্যাসে ট্র্যাজেডির মুখোচ্ছবি নয়নাংশু। তারই ডুয়িং অ্যান্ড সাফারিং। সেই তুলনায় মালতী বেপরোয়া, স্বাধীন, নারী হয়েও জীবনের পিপাসা চরিতার্থ করার সিদ্ধান্ত নিতে দ্ব্যর্থহীন। সে অক্লেশে জয়ন্তকে বেছে নিতে পেরেছে। তাকে নিষ্কুণ্ঠচিত্তে দেহদান করেছে। তাতে তার কোনো পাপবোধ নেই, গ্লানি নেই। সে লরেন্সের লেডি চ্যাটার্লির চেয়েও খোলামেলা মনে জয়ন্তকে নয়নাংশুরই বিছানায় লেডি চ্যাটার্লির মতো জঙ্গলে গিয়ে নয়Ñ শরীর দান করে মনের অকথ্য পিপাসা মিটিয়েছে, সে কারণে তার ট্র্যাজিক ভোগান্তি নেই।
এর এক ফাঁকে নয়নাংশুর গড়ে ওঠা মূল্যবোধ নিকষিত উদারতার অনাবিল স্রোতের ধারায় জয়ন্ত এসে পড়েছে মালতীর জীবনে। সে ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত, কম শিক্ষিত, কম ভদ্রলোক, কম মার্জিত চকচকে। কম বিদ্যাবাগীশ। রক্ত-মাংসের মানুষ, এমনকি মাতালও। মালতী তাকেই দেহদান করেছে। নয়নাংশু জানতো, নয়নাংশু যে জানতো তাও মালতীর অজানা ছিল না। এতে মালতী সঙ্কুচিত হয়নি, এটা ঠিক মালতীর কোনো ভান নেই। বরং কুণ্ঠা, জড়সড় ভাব দেখা যায় নয়নাংশুর মধ্যে। মালতী সক্রোধে নয়নাংশুর অবহেলা, অমনোযোগী অনুসন্ধান করেছে, নয়নাংশু সে তুলনায় হাল ছেড়ে দেয়া নাবিকের মতো অসহায়ভাবে উত্থাপন করেছে মালতীর তাচ্ছিল্য।
নয়নাংশু বলেছে, ‘ঐ আর এক কথা তোমার মুখে, মালতী হিংসে যেন সেটা আমারই একচেটে সম্পত্তি বা স্বামীদের বা পুরুষ জাতির কোনো বৈশিষ্ট্য দাড়ি-গোঁফের মতো কিছু একটা যা তোমার বা মেয়েদের মধ্যে কখনোই বর্তাবে না।’

এরপর নয়নাংশু দার্জিলিংয়ের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেছে যে, সেখানে দরিয়া নামের একটি মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল, মন খুলে গল্প করেছিল। মালতী তা সহজভাবে নিতে পারেনি। এমন ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল যে, তাতে ভ্রমণের আনন্দ মাটি হয়ে গিয়েছিল। নয়নাংশু বলেছে, ‘কী বলে একে? স্বামী হলে হিংসে, আর স্ত্রী হলে সুবুদ্ধি, তাই না?’

নয়নাংশু কিন্তু সত্যি সত্যিই আইডিয়ার ছায়া নয়। সেও প্রায় উত্তীর্ণ কৈশোরকাল থেকে বিভিন্ন বাস্তব অভিজ্ঞতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে পার হয়ে এসেছে। তার জীবনে যৌবনবতী এসেছে, তাদের দেহের রেখা দেখেছে, উঠন্ত পুরুষ্ট বুক দেখেছে। তার নির্জন ঘরে বিয়ের পরেও নীলিমা এসেছিল, কিন্তু তথাকথিত সাধুসাধ্বীর মতো নয়, তার সাংস্কৃতিক-রুচিশীলতা তাকে সৌন্দর্যের-বিবেকের-স্বাভাবিকের-অবিকৃতির সীমায় আটকে রেখেছে।

অর্থাৎ চোখ অন্ধ করলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। নেকাব দিয়ে চোখ ঢাকা যায়, মন ঢাকা যায় না। মনই আসল। নয়নাংশুর চোখ খোলা ছিল, মন ছিল সজীব, প্রহিষ্ণু এবং পবিত্র। নয়নাংশুর চোখ রক্ষণশীলতা ছিল না, তাই মনে ছিল সৌন্দর্য, সেখানে কদর্যের স্থান নেই। সে জানতো মালতী জয়ন্তর দিকে ঝুকে পড়েছে। তাতে তার মনে কষ্ট পিন ফুটিয়েছে। রক্ত ঝরিয়েছে। সে ধৈর্য হারায়নি। রুচিবানরা তা হারায় না। সে ভেবেছে অমার্জিত ক্রোধ প্রকাশ করলে জয়ন্তকে দূরে ঠেলে দেয়া যাবে, কিন্তু মালতীর মন পাওয়া যাবে না। তাই সহজভাবে তাকে এই বিসদৃশ দৃশ্য মেনে নিতে হয়েছে, মালতীর ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে মানতে হয়েছে একজন নারীর কি বাড়তি আকাক্সক্ষা থাকতে পারে না?

মালতী যে নয়নাংশুকে এবং নয়নাংশু যে মালতীকে চোখে আঙুল দিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ করেছে, তাতে নারী সমাজ ও পুরুষ সমাজের গলদ ফুটে উঠেছে। আমাদের বাঙালি সমাজে মনোপলি আছে। যেন পুরুষরাই প্রতিক্রিয়াশীল। নারীরাও প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে। নারী ও মানুষ এবং সমাজে বসবাস করে তাহলে তার মধ্যে যন্ত্রের মতো কেবল ভালোত্ব থাকবে কেন? মন্দত্ব, একনায়কত্ব, পতিতাবৃত্তি, দ্বিচারিণীবৃত্তি থাকতে পারে না? নয়নাংশুই জবানবন্দি দিয়েছে, অনেক সময় তার গুপ্ত অঙ্গ মহারাজকে বশে রাখা মুশকিল হতো। সে বেশ্যা বাড়িতে হাজির হয়েছিল। তা মেয়েরা কোথায় যাবে? মেয়েরা জয়ন্তকে বাসায়, নয়নাংশুর বিছানায় আশ্রয় দিয়েছে। এটা জীবনের দাবি। শওকত ওসমানের ‘জননী’ এবং ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসে সব সংস্কারের গাঁথুনি আলগা করে জীবনের দাবি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।

নয়নাংশুর একটা অভিমত তুলে ধরি, ‘স্ত্রী-পুরুষের সম্বন্ধ নিয়ে আগে অনেক কথা হতো তোমার সঙ্গে আমার। তুমি সব সময় বলছো মেয়েরা উৎপীড়িত, নির্যাতিত, স্বামীবিমুখ হলে এখনো তাদের দাঁড়ানোর জায়গা নেই আমাদের সমাজে, তাদের তিলতম স্খলনের ক্ষমা নেই, …আমি বোঝাতে পারিনি যে, সমাজ যেহেতু পুরুষের দ্বারা শাসিত তাই পুরুষের কাছেই দাবি করা হয় বিশেষ এক ধরনের উদারতা ও সৌজন্য আশা করা হয় সে স্ত্রীর সব কথা বিশ্বাস করবে, কোনো ছলনা টের পেলেও চেপে যাবে, সেটা মেয়েদের দুর্বলতার ক্ষতিপূরণস্বরূপ তারা পেয়েছে এক অসাধারণ সম্মান, সব সময়ই এই ভান আমরা চালিয়ে যাবো যে আমাদের স্ত্রীরা সমালোচনার অতীত।’
এখানে বুদ্ধদেব বসু এই গতানুগতিক মিথ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন, মেয়েরা কেবলই ভালো, পুরুষরা কেবলই মন্দ। মেয়েরাই যদি মেয়েদের মানুষ না ভাবে তাহলে তাদের দুর্গতি ঘুচবে কেমন করে? রবীন্দ্রনাথের সাধনা ছিল দেবীকে মানবী করা।

ওদিকে জয়ন্ত কিন্তু মালতীর জীবনে খাপছাড়া, বেঢপ, স্থূলভাবে আসেনি। যেমন উপন্যাসের সামগ্রিক শিল্পগুণের আধার হিসেবে অনিবার্য গতিতে এসেছে, তেমনি নয়নাংশু মালতীর নারী জীবনে যে দিকটি অপূর্ণ রেখেছে তার ছিদ্র দিয়ে। ওদের সংসারের সামগ্রিক প্রয়োজনের মূলতত্ত্ব অনুসারে আবশ্যিক উপাদান হিসেবে জয়ন্ত মালতীর দেহ-মনের কুঠুরিতে ঢোকার কুসুমাস্তীর্ণ পথ পেয়েছে। এটাকে নয়নাংশুও মন থেকে বিবমিষা বলতে পারেনি।
মালতীর ডাক নাম লোটন। জয়ন্ত ওই নাম ধরে ডেকেছে, যা নয়নাংশুর মন থেকে আসেনি। জয়ন্তর সাড়া দেয়ার মধ্যে ছিল জীবন নিংড়ানো উত্তাপ, যা নয়নাংশুর ছিল না, জয়ন্ত খুঁটিনাটিভাবেও মালতীর দেহের-মনের-স্পন্দনের কাছাকাছি ছিল, যা নয়নাংশু ছিল না। ওদের একমাত্র মেয়ে বুন্নি অসুস্থ হলো নিঃস্বার্থপরভাবে জয়ন্ত সেবা করেছে। অর্থাৎ জয়ন্ত লেফাফাদুরস্ত ছিল না, রক্তে-মাংসের মানুষ ছিল। জয়ন্তর প্রতি মালতীর মোহই ছিল না শুধু, দরদও ছিল মানুষ হিসেবে। জয়ন্তকে মালতী মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। নয়নাংশু যখন জয়ন্তকে মাতাল বলে উপেক্ষা করার কিংবা শীতল মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছে, তখন মালতী নিঃসঙ্কোচ প্রতিবাদ করেছে। জয়ন্তর পক্ষ নিয়ে নয়নাংশুকে রীতিমতো কাঁদিয়ে ফেলেছে। নাইবা হলো জয়ন্ত অত উচ্চশিক্ষিত, কবিতা আওড়ানো, ওও মানুষ। জয়ন্ত অনেক পরিশ্রম করে, সংসারে বেঢপ স্ত্রী, তাই ওকে মদ খেতে হয়। ভদ্রলোকরা মদ খায় না? ভদ্রলোকদের ত্রুটি নেই? ‘তুমিও তো যথার্থ সৃজনশীল লিখিয়ে নও, করো অক্ষম অনুবাদ। এর মূল্য আছে নাকি?’ বলেছে মালতী নয়নাংশুকে।
প্রতিবাদটা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির নয় মাত্র, সামাজিক অবস্থানের বিরুদ্ধেও। ভদ্রলোকদের ইংরেজি শিক্ষিত অবজ্ঞার বিরুদ্ধে অইংরেজি সাধারণদের প্রতিবাদ বলা চলে।

এ উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু সমাজের ওপর তীর্যক আলো ফেলতে ভুল করেননি। সমাজ রাজনীতিকে বাদ দিয়ে নয়, তাও স্মরণ করতে ভুল করেননি।

মালতীর একটি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি সমাজ সচেতনতার তীর্যকতা বোঝাতে “আমার বিয়ের পর পিসিমা বলেছিলেন, ‘সোয়ামির মতো ধন আর নেই, বুঝলি?’ নয়নাংশুর পিসিমার কথা বলছি। ওর মুখে ও কথা শুনে আমার একটু হাসি পেয়েছিল, কেননা শুনেছিলুম উনি তের বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন (বিয়ে হয়েছিল বারোতে), ‘স্বামী’ ব্যাপারটা গোল না চৌকো না তেকোনা তাও উনি ঠাহর করবার সময় পাননি একটা ফাঁকা আওয়াজ, একটা ফ্যাকাসে, ময়লা, মরচেপড়া রঙচটা-মাখা ধারণা ওর কাছে ‘স্বামী’ কথাটা হলো তাই, অথচ তারই কী সাংঘাতিক প্রতাপ।”

আঘাতটা করেছেন বুদ্ধদেব বসু বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনের বিরুদ্ধে যে শক্ত কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে।

শেষ পর্যন্ত মালতী ও নয়নাংশু কেউ বিচ্ছিন্ন ও কেন্দ্রচ্যুত হয়নি। দুজন একই সংসারে পাশাপাশি অবস্থান করেছে ওদের মেয়ে বুন্নিকে শেকড়ের মতো ধরে নিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র রোহিনীকে গুলি করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের বিনোদিনী কোনো পাপই করেনি, শুধু মন টলে গিয়েছিল, শরৎচন্দ্রের অচলাকে শরৎচন্দ্র আশ্রিতার শিবিরে নির্বাসন দিয়েছিলেন, মানিকের কপিলা কুবেরকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ময়না দ্বীপে; কিন্তু মালতী নয়নাংশুর ঘরে এক বিছানায় রয়ে গেল একটা ঝড়ো হাওয়ার ঝাপটা হজম করে।

নয়নাংশু বলেছিল, ‘আমার আমি জমিয়ে রাখা রাগ আর কষ্টের ছায়া ফেলে তোমার জীবন আমি কালো করে দেবো।’

কিন্তু সে প্রতিজ্ঞাও টেকেনি। তারপর বলেছে, ‘সেই জমিতে ফুটে উঠবে আমার কষ্ট, আমার ঘৃণা, এক আশ্চর্য বিশাল বিদেশি কোনো ফুলের মতো। ক্যাকটাসের মতো সুন্দর ও কাঁটায় ভরা, ক্যাকটাসের ফুলের মতো মহার্ঘ, সাপের ফণার মতো বিষাক্ত ও সুন্দর। এই আমার প্রতিশোধ।’

মালতী বলেছে, ‘আমি এই সংসার ভেঙে দেবো। তা কী করে হয়, আমি তো বুন্নির মা। আমার জামাই হবে একদিন, কুটুম্ব হবে, নাতি-নাতনি হবে। এই সংসার আমার তিলে তিলে আমি একে গড়েছি, সাজিয়েছি, বাড়িয়েছি। আমি অংশুরই স্ত্রী থাকবো চিরকাল সব জেনে, সব বুঝেও অংশুকে থাকতে হবে আমার স্বামী সেজে। এই ওর শাস্তি, এই আমার শাস্তি। আর শান্তিও এতেই।’

মানুষ এমনই, সমাজও এমন। মানুষ ও সমাজ ঘড়ির কাঁটা নয় যে, বারোটার সময় ঠিক বারোটা বাজবে। পত্রিকা মেলে ধরে কী দেখি সমাজের চেহারা? দেখি মুখ ব্যাদান করা জগদীশ গুপ্তের ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’-এর মুখ। সমাজের কাপট্য এবং ভণিতার ওপর চরম আঘাত করেছেন বুদ্ধদেব বসু, শৈল্পিক আঘাত। শৈল্পিক দ্রোহে পরিণত হয়েছে।

[ad#co-1]