নবাবি রংমহলের শেষচিহ্ন

১৯৬৬ সাল থেকে এ ভবন মধুর ক্যান্টিন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আমাদের কাছে ছবি : শেখ হাসান
মধুর ক্যান্টিন
নবাবি রংমহলের শেষচিহ্ন ঢাকার নবাব এবং তাঁদের বিশিষ্ট অতিথিরা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে এ রংমহলে আসতেন নাচ-গান উপভোগ করতে। এসব ছাড়াও এখানে বসত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সভা। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের প্রথম কর্মিসভা হয় এখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা এ রংমহলটিকে তাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। ভারত বিভাগের পর ঢাকার নবাবদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমে গেলে রংমহলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে দীর্ঘদিন

স্বপন কুমার দাস
নবাবী আমলে ঢাকাই বিনোদনের একটা আলাদা চেহারা ছিল। ছিল অফুরন্ত অবসর আর প্রাচুর্য। নবাবদের জীবনটা ছিল আগাগোড়া ভোগবিলাসে মোড়া। তারই অংশ হিসেবে ঢাকায় তাঁরা নির্মাণ করেন জাঁকজমকপূর্ণ কিছু রংমহল। অবসরে বিনোদনের জন্য সুদূর লক্ষ্নৌ থেকে বাইজি এনে জলসা বসাতেন সেখানে। কালের করালগ্রাসে সেসব আজ অস্তিত্ব হারিয়েছে, কিন্তু সাক্ষী হিসেবে ভিন্ন নামে আজও টিকে আছে সেগুলোর একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের উত্তর দিকে দুটি পাকা গোলাকার ঘরসহ যে স্থাপনাটি মধুর ক্যান্টিন হিসেবে পরিচিত, এটিই সে ভবন। এর আছে বহু ইতিহাস, বিস্তর কাহিনী।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ আমলে খাজা আলীমুল্লার হাত ধরে ঢাকার নবাবদের উত্থান। তাঁর সুযোগ্য ছেলে নবাব আবদুল গণির সময় ঢাকার নবাবদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। জমিদারি, ধনদৌলত, আভিজাত্য বা বিলাসবহুল জীবনযাপন; সেকালে তাঁদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কলাভবন, রেজিস্ট্রার ভবন, মধুর ক্যান্টিন, চারুকলা অনুষদ এবং কাঁটাবন এলাকার জমির মালিক ছিলেন নূরুদ্দীন হোসাইন। তিনি নায়েব-নাজিম নুসরাত জংয়ের দরবারে কিতাব পাঠ করতেন। নবাব আবদুল গণি তাঁর ছেলের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে এ অঞ্চলের সমুদয় জমি কিনে নেন। তারপর এ এলাকার নামকরণ করেন শাহীবাগ। পরে এ শাহীবাগই শাহবাগ নামে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন নবাব এ এলাকায় ইসরাত মঞ্জিল ও নিশাত মঞ্জিল নামে দুটি বাগানবাড়ি এবং একটি রংমহল নির্মাণ করেন। রংমহলটি ছিল বাগানবাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, শিখসঙ্গতের উত্তর দিকে।

নিরিবিলি ও মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা এ রংমহলের নির্মাণশৈলী ছিল অপূর্ব। শব্দ ও তাপ নিরোধক বিশেষ ধরনের টিন দিয়ে এর ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ছাদের নিচে ছিল কাঠের তৈরি চমৎকার ফ্রেম। দেয়ালে ছিল নকশা করা। জানালাগুলো নানা রঙের কাচ দিয়ে শোভিত। ঘরের জমিন মূল্যবান শ্বেতপাথরে নির্মিত। এ জমিনেই সুরের মূর্ছনা তুলে নাচত বাইজিরা। ঘরটিতে আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য ছিল পর্যাপ্ত জানালা-দরজা। দরজাগুলো ছিল কারুকাজ খচিত। প্রবেশের মূল ফটক উত্তরদিকে। অবশ্য বাইজি এবং নর্তকীরা প্রবেশ করত দক্ষিণের দরজা দিয়ে।

এ জলসাঘরের অদূরে দক্ষিণে ছিল দুটি সাজঘর। নর্তকী ও শিল্পীরা এ ঘর দুটি ব্যবহার করত। এর অলংকরণও ছিল চমৎকার। একসময় এ সাজঘরে প্রবেশের জন্য দুটি দরজা ছিল। এখন আছে একটি করে। প্রায় দুই বিঘা জমির ওপরে গড়ে ওঠা এ রংমহলের পূর্বদিকে ছিল একটি ফুলের বাগান। দেশ-বিদেশি নানা জাতির গোলাপ, হাসনাহেনা, বকুল, শিউলি, বেলি, গন্ধরাজ ফুলের সুবাসে এলাকাটি বুঁদ হয়ে থাকত। নিম, শিমুল, জলপাই, সুপারি, নারিকেল গাছ দিয়ে স্থানটি ছিল সুশোভিত। শরীরচর্চার জন্য ছিল নানা ধরনের সরঞ্জাম। দোল খাওয়ার জন্য ছিল দোলনা, নিরিবিলি আর উপভোগ্য পরিবেশে রংমহলটিকে স্বপ্নপুরী বলে মনে হতো।

ঢাকার নবাব এবং তাঁদের বিশিষ্ট অতিথিরা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে এ রংমহলে আসতেন নাচ-গান উপভোগ করতে। এসব ছাড়াও এখানে বসত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সভা। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের প্রথম কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয় এখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা এ রংমহলটিকে তাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। ভারত বিভাগের পর ঢাকার নবাবদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমে গেলে রংমহলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে দীর্ঘদিন। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নবাব পরিবারের পক্ষ থেকে শাহবাগের যে জমি দান করা হয়, তার মধ্যে ওই রংমহলটিও ছিল। ১৯৬৪ সালে রংমহলের পশ্চিম দিকে কলাভবন নির্মিত হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে রংমহলটি মধুর রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। আর তখন থেকেই রংমহলটি তার জৌলুশ পুরোপুরি হারায়।

নতুন নামেও এ রংমহলটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। মধুর ক্যান্টিন পরিণত হয় এ দেশের ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যান্টিন মালিক মধুসূদন দে-কে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তখন ক্যান্টিনের ফ্লোর থেকে কে বা কারা মূল্যবান শ্বেতপাথর তুলে নিয়ে যায়। নয়নাভিরাম ফুলের বাগানটি হয় গরু-ছাগলের অবাধ চারণভূমি। সাজঘরগুলো নারী নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশ স্বাধীন হলে মধুর ক্যান্টিন আবার চালু হয়। শহীদ মধুসূদনের পুত্র-কন্যারাই এর হাল ধরেন নতুন করে। তবে ঢাকাই নবাবদের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থাপনাটির সে কালে যে সৌন্দর্য ছিল, এখন আর তা নেই।

[ad#co-1]