ভরসার মানুষ, মানুষের ভরসা

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
হরিপদ দত্ত
তিনি আমাদের সেই আপনজন এবং জনগণের মঙ্গলচিন্তক, যিনি ১৯৭১ সালে দৈবক্রমে বেঁচে গেছেন। অন্যসব বুদ্ধিজীবীর মতো শত্রুর হাতে নিহত হতে পারতেন। তার বেঁচে যাওয়াটাই ছিল বিস্ময়ের। এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটলে এই জাতি ১৯৭২ থেকে আজকের ২০১০ সালের দীর্ঘ সময়াধারের তাঁর বিশাল সৃষ্টিশীলতা থেকে বঞ্চিত হতো। তিনি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আরজ আলী মতুব্বরেরা জাতীয় ভূম-লে বারবার জন্মে না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও তাই। বাংলাদেশের অন্যসব বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাঁর পার্থক্যটা এখানেই যে, প্রাতিষ্ঠানকি কর্মজীবন থেকে অবসরে গেলে গৃহবন্দি এবং চিন্তার বন্ধ্যত্বে পতিত হন তাঁরা; কিন্তু উল্টোটা ঘটেছে তাঁর জীবনে। কর্মজীবন (শিক্ষকতা) থেকে অবসরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুষ্টিমেয় ছাত্রছাত্রীর শিক্ষকের গ-ি ডিঙিয়ে তিনি বৃহত্তর জাতির শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন। সীমা হয়েছে সীমাতীত।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক চিন্তা কিংবা প্রগতিশীল সমাজ ধারণার শস্যভূমিতে তিনি একজন কর্ষক। হতভাগা দেশের প্রগতি চিন্তাশূন্য ভূমিতে বলতে গেলে একাকী এই একজন মানুষ নিরলস কর্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন। বয়স তাঁকে আনত করতে পারেনি। শারীরিক জীর্ণতাকে অতিক্রম করে গেছে তাঁর মানসিক শক্তি। ওই শক্তিই তাঁর সৃষ্টিশীলতার চালক। আধা উপনিবেশ অর্থাৎ পাকিস্তানি যুগের চিন্তার ক্ষেত্রে, বিশ্বাস আর ধারণার ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টিশীলতা এক প্রচ- আঘাত। পরাধীন যুগের ক্লেদ-গ্লানিকে অতিক্রম করে মানুষের মধ্যে এমন এক স্বপ্ন জাগাতে চান তিনি, যা সামনে চলার, পেছনে ফেরার নয়।

অধ্যাপক চৌধুরী এমনই এক চিন্তক, যাঁর ওপর ভরসার বদলে দেশীয় শাসক-শোষক শ্রেণী তো বটেই, সাম্রাজ্যবাদও একেবারে নাখোশ। আমাদের স্মৃতি যদি প্রতারণা না-করে তবে জোর দিয়েই বলা যায়, আজতক শাসক দল (যে নামেই হোক) নিরুপদ্রব মানুষ হিসেবে তাঁকে ভাবতে পারেনি। কেন এমনটা হলো? এমনটা হলো এ কারণেই যে, তিনি শাসিতের পক্ষের মানুষ। রাষ্ট্রের সর্বপ্রকার সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণীর গৃহপালিত বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি দাঁড় করালেই তাঁকে আলাদাভাবে স্পষ্ট শনাক্ত করা যায়। কেননা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্বেচ্ছা গৃহবন্দি কোনো বুদ্ধিজীবী নন। তাঁর হাতের কলম, কণ্ঠস্বর এবং পদযুগল সরোবরের মতো স্থবির নয়, নদীর মতো সতেজ বহমান। সভা-সমিতিকে পেছনে ফেলে বারবারই তাঁকে রাজপথের মিছিলে জনতার সঙ্গী হতে হয়। এ মিছিল তো রাজপথের শোভাবর্ধন নয়, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের।

আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মের দিকে তাকালে দেখতে পাব যদিও তিনি ষাট দশকের সৃষ্টিশীল প্রতিভা; কিন্তু স্বাধীনতা উত্তরকালই তাঁর মুখরিত জীবন। তাঁর এই নীরবতার বদলে মুখরতার পেছনে ইন্ধন দিয়েছে স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ। আমাদের স্বাধীনতা অপচয় আর অপব্যবহার কতটা হয়েছে, মানুষের প্রগতির স্বপ্ন কতটা মরীচিকায় পরিণত হয়েছে, তাঁর লেখাই সাক্ষ্য বহন করে। তিনি সর্বদাই উন্মুখ হয়ে থাকেন মানুষের কথা শুনতে এবং আপন কণ্ঠস্বর মানুষকে শোনাতে। তাঁর কণ্ঠস্বর তো গণকণ্ঠস্বরেরই প্রতিকল্প।

বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে মত কিংবা মতবাদের মিলের বদলে অমিলটাই স্বাভাবিক। সেই বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো কোনো মানুষের কাছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রাজনীতির মতামত বিষয়ে খানিকটা অসহিষ্ণু। আসলে বিষয়টা এমন নয়। আমরা যারা তাঁকে খুব কাছে থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দেখি বা জানি তাদের কাছে ওই কথিত অসহিষ্ণুতার ব্যাপারটির অন্য অর্থ আছে। তা হচ্ছে, সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র ক্ষোভ। ওই অসঙ্গতির ব্যাখ্যাটা তাঁর কাছে এতই স্পষ্ট যে, অন্য অনেকের কাছে তা তত স্পষ্ট নয় বলেই যুক্তিতর্কের ভেতর তাঁকে তারা অসহিষ্ণু বলে মনে করে।

আমরা বুঝি বা বুঝতে পারি, চলমান রাষ্ট্র-সমাজ তার সামাজিক বিধিবিধানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তাঁর কষ্ট হয়। তখনই জন্মে দ্রোহ, ক্ষোভ। তাঁর এই ক্ষোভ ব্যক্তিক নয় এবং গণদ্রোহেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় এই যে, যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে তিনি খাপ খাচ্ছেন না, সেই রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসও তিনি হারাতে রাজি নন। যত সংকট আর দুঃসময়ই বারবার নেমে এসেছে, তাঁর কথায়, লেখায় কখনো হতাশার ছায়ার চিহ্নও দেখা যায় না। তাঁকে আপেক্ষ করতে দেখা গেছে; কিন্তু হতাশ হতে দেখা যায়নি। তিনি বিশ্বাস করেন রাজনীতির ক্ষেত্রে হতাশা একটি রোগ। হতাশা গণমানসে সংক্রমিত হোক এমনটা তিনি কখনো চান না। তাঁর অভিভাষণ, চাই কি লেখার সমাপ্তি ঘটে আশার কথা নিয়ে। তাই তিনি গণবিচ্ছিন্ন কোনো বুদ্ধিজীবী নন। বারবার তিনি মানুষের কাছে ছুটে যান, তাদের কথা শোনেন এবং নিজের কথা শোনান। এবং আশা রাখেন অনাগত শুভদিনের।

প্রভাতী ভ্রমণ কখনো তাঁর ব্যক্তিক চিত্তবিনোদনের বিষয় নয়। রোগমুক্ত জীবন এবং দীর্ঘায়ু প্রত্যাশা তো একজন জীবন সচেতন মানুষেরই ধর্ম। কিন্তু এর বাইরে নীরবে একাকী প্রাতর্ভ্রমণের সময় তাঁর কান থাকে খাড়া, চোখ থাকে শানিত। অপরাপর প্রাতর্ভ্রমণকারী আলাপচারী মানুষেরা কি বলছে তা তিনি কান পেতে শোনেন এবং চারপাশের মানুষ ও প্রকৃতিকে চোখ দিয়ে দেখেন। এতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের ভাবনার যোগফলটা তিনি লাভ করেন। এভাবেই একজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রতিটি প্রভাত থেকে নতুন নতুন চিন্তা-দর্শনের সূত্র আবিষ্কার করেন। দেশ ও চলমান সময়কে বুঝে নেন মানুষের বলাবলির ভেতর।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবন-দর্শনের দায় হচ্ছে মানুষের সঙ্গে থাকা, মানুষের পাশাপাশি হাঁটা। নয় মোটেই বিচ্ছিন্নতা। মানুষের সঙ্গে থাকতে চান বলেই তিনি ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকা বের করেছেন। মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, চিন্তার কর্ষণের একটি উপাদান হিসেবেই এই পত্রিকাটিকে মনে করেন তিনি। তাই তিনি পত্রিকাটিকে বাণিজ্যের বদলে চিন্তার কর্ষণের দর্শনেই দাঁড় করিয়েছেন। ‘সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র’ নিয়ে তাঁর রয়েছে বড় একটি স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। নানা প্রতিকূলতায় হয়তো তা সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। তবু তাঁর স্বপ্নকে ছাড়তে রাজি নন তিনি। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো না-না প্রতিষ্ঠান খুলে এনজিও বাণিজ্যের ভেতর জ্ঞানচর্চাকে ঢুকিয়ে দেয়ার হীন মানসিকতা থেকে বহু দূরবর্তী মানুষ তিনি। এখানেই তিনি একাকী মানুষ অন্যসব বুদ্ধিজীবীর বিবেচনায়। একা, কিন্তু নিঃসঙ্গ নয়। তাঁর সঙ্গী গণমানুষ। ন্যায় এবং ঔচিত্যবোধ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে কারো কারো শ্রদ্ধামিশ্রিত কৌতূহল আছে। এই কৌতূহলের মূলে রয়েছে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটির সূত্র-ব্যাখ্যার বিষয়টি। তিনি কি কমিউনিস্ট? তিনি কি উদারবাদী বুর্জোয়া? না কি উদার গণতন্ত্রী? আমার বিবেচনায় তিনি বামগণতন্ত্রী। বিস্ময়ের এই, অতিবাম থেকে শুরু করে মধ্যবাম এবং প্রতিটি গণতন্ত্রী দলই তাঁকে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে এবং ভরসা রাখতে চায়। ভরসা রাখতে পারে না কেবল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এবং শাসকশ্রেণী। আর এখানেই আমাদের ও তাঁর উপর ভরসা ষোলআনা। তাঁর বক্তব্য, তাঁর যুক্তি তো মানুষের মুক্তিরই লক্ষ্যে। তাঁকে কাছে পেলে, পাশে পেলে মানুষ আশান্বিত হয়, সাহসী হয়, হতাশা থেকে মুক্তি পায়। অধ্যাপনা পেশার নিরস জ্ঞান বিতরণের বাইরে তাঁর উপর মানুষের এই যে আস্থার জায়গাটা সেখানেই মানুষটির আসল পরিচয়। একাত্তরের ঘাতক যাঁকে কেড়ে নিতে পারেনি, বর্তমানের দুঃসময়ের ভেতর তাঁর কাছেই আমাদের ভরসা। মানুষের ভরসা। জাতির ভরসা।

[ad#co-1]

Comments are closed.