বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ – আন্তর্জাতিক ও লোকায়তিক মাত্রা

মফিদুল হক
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল সমাবেশের মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন তখন জাতীয় জীবনে টান টান উত্তেজনার গভীরতম যে সঙ্কটের পটভূমিতে তাঁর অবস্থান সেটা নানা সময়ে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে জাতীয় চেতনায় উদ্বেলিত ও ঐক্যবদ্ধ করে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এমন এক সন্ধিক্ষণে তিনি নিয়ে এসেছিলেন যেখানে বর্বর সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়ে আগামীর পথে অগ্রসর হওয়ার শক্তি ও সম্ভাবনা সম্পূর্ণতই নির্ভর করছিল তাঁর ওপর। একদিকে ছিল স্বাধীনতার জন্য অধীর বিপুল শক্তিধর বিশাল জনতা, বাংলার মানুষকে যে শক্তির যোগান তিনিই দিয়েছিলেন। আরেকদিকে ছিল অস্ত্রের আঘাতে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চিরতরে নস্যাৎ করতে উদ্যত পাক সামরিক চক্র, সামান্য ভ্রান্তি কিংবা শৈথিল্যের দেখা পেলে হিংস্র পশুর মতো যারা ঝাঁপিয়ে পড়বে এ দেশের মানুষের ওপর। আমরা জানি বঙ্গবন্ধু সেই ঐতিহাসিক দায় কীভাবে মোচন করেছিলেন এবং অবিস্মরণীয় এক ভাষণের মধ্য দিয়ে কীভাবে মুক্তিপথে এমন সংহত করে দাঁড় করিয়ে দিলেন বাংলার মানুষকে, যার ফলে সামনের দিনগুলোতে যাই ঘটুক না কেন অনন্য দৃঢ়তায় ঐক্যবদ্ধ জাতি তা মোকাবিলায় হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাবান। এই ভাষণের তাৎপর্য বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, বহুভাবে গুণীজন সেই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তারপরও এর ঐতিহাসিকতা আরো নানা কোণ থেকে পর্যালোচনা করা সম্ভব। সেই রকম একটি প্রয়াস থেকে বর্তমান আলোচনার গোড়াতে আমরা ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক মাত্রা বুঝে নেয়ার চেষ্টা করবো।

এক.
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬-দফা দাবিনামা উত্থাপন এবং তারপর থেকে পূর্ববাংলার মানুষ যে নিরন্তর সংগ্রামে রত হয়েছিল তাকে এককথায় অভিহিত করা যায় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে। তৎকালীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে পরিচালিত এই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে ছিল অভিন্ন ঐক্যসূত্র, সেই সাথে ছিল দেশে দেশে পরিচালিত সংগ্রামের মধ্যে বিভিন্নতা। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন বয়ে আনে এবং উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম লাভ করে নতুন প্রেরণা। কিন্তু উপনিবেশবাদের অবসান পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতার উন্মাদনা বয়ে আনলেও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্ররূপ কী হবে, ফেডারেল না এককেন্দ্রিক, সেটা তখনি বুঝতে পারা যায় নি। বাস্তবে যে দ্বিজাতিত্ত্বের সামপ্রদায়িক আদর্শের সওয়ারি হয়ে পূর্ববাংলার ওপর চেপে বসছিল আরেক ধরনের উপনিবেশবাদ সেটা বোঝার জন্য প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ও অনেকটা অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে সমসাময়িককালে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে মুক্তিসংগ্রাম অর্জন করে বিশেষ তীব্রতা এবং এর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন অং সান (১৯১৪-‘৪৭) হো চি মিন (১৮৯২-১৯৬৯), আহমেদ সুকর্ণ (১৯০২-৭০) প্রমুখ। প্যালেস্টাইনের মুক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন ধারাকে সংহত করে তাদের নেতা হয়ে ওঠেন ইয়াসির আরাফাত। ষাটের দশকে উপনিবেশবাদ বিরোধী আন্দোলনে তীব্রতা লক্ষ্য করা যায় আফ্রিকা মহাদেশে এবং একের পর এক আফ্রিকীয় দেশ অর্জন করতে থাকে স্বাধীনতা। এই প্রক্রিয়ায় পথিকৃৎ দেশসমূহ ছিল ঘানা, কেনিয়া, মিশর, তানজানিয়া, সেনেগাল, কঙ্গো, আলজেরিয়া ইত্যাদি। আন্দোলনের নেতা হিসেবে সমাদৃত হন কোয়ামে নক্রুমা (১৯০৫-৭১), জোমো কেনিয়াত্তা (১৮৯১-১৯৭৪), গামাল আবদুল নাসের (১৯১৮-‘৭০), জুলিয়াস নায়ারে, লিওপোল্ড সেংঘর, প্যাট্রিস লুমুম্বা, বেন বেল্লা ও হুয়ারি বুমেদিন প্রমুখ। এঁদের কেউ কেউ নিয়োজিত ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, কেউ-বা সশস্ত্র সংগ্রামে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল আরো আগে, তবে মহাদেশ জুড়ে মুক্তি আন্দোলনের মূল প্রবণতা ছিল পশ্চিমী বিশেষভাবে আমেরিকার অর্থনৈতিক আধিপত্য মোচন ও তাদের বশংবদ নিপীড়নমূলক সরকারের শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি। এই আন্দোলনে বিশেষ নজর কাড়ে কিউবা ও সে-দেশের মুক্তি আন্দোলনের নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো। ক্যাস্ট্রোর সাথী আর্জেন্টিনার নাগরিক চে গুয়েভারা দেশে দেশে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের ব্রত নিয়ে ঝাঁপ দেন সেই কাজে এবং বলিভিয়ার অরণ্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে স্মরণীয় হয়ে আছেন মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে।

ষাটের দশকে, তৃতীয় দুনিয়া যখন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে উত্তাল, পূর্ব-বাংলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারায় নিপীড়ন নির্যাতনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠছিলেন মুক্তি আকুতির প্রতীক। বৃহত্তর পটভূমিকায় বিশ্ব তখন বিভাজিত পশ্চিমী পুঁজিবাদী দুনিয়া ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, তা গণতান্ত্রিক অথবা সশস্ত্র, যেভাবেই পরিচালিত হোক না কেন, আন্তর্তাগিদ থেকে নিজেকে স্থাপন করেছিল জোট-নিরপেক্ষ ভূমিকায়। নেহেরু-নাসের-সুকর্ণ-টিটো প্রমুখের নেতৃত্বে জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন নিজেদের জন্য আলাদা স্থান করে নিতে পেরেছিল। ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারকারী দেশসমূহ ছিল পশ্চিমা শিবিরের সদস্য, তার ফলে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন স্বভাবতই পরিচালিত হয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে সেইসব প্রভু দেশের বিরুদ্ধে অথবা তাদের প্রতিষ্ঠিত পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক শিবির আপন প্রভাব বলয় প্রসারে ছিল উদগ্রীব এবং সাধারণভাবে জাতীয় স্বাধীনতার দাবির উৎসাহী সমর্থক। তবে স্বাধীনতার আন্দোলনে যদি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা দেখা দেয়, তার বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক উভয় শিবির ছিল সতর্ক ও সন্দিহান। কোনো স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে এমনি প্রবণতা ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে নতুন বিশ্বসঙ্কট সৃষ্টি করবে, এটা নিয়ে দুই পরাশক্তি ছিল শঙ্কিত। ১৯৬৭ সাল থেকে নাইজেরিয়ার দক্ষিণাংশে বায়াফ্রা নামক পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে ব্যাপক ও সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা এ-কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় ১৯৭০ সালের মধ্যে। একই সময়ে আরেক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল আফ্রিকার ব্রিটিশ উপনিবেশ রোডেশিয়ায়, তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে রোডেশিয়ার স্বাধীনতা প্রদানের কথা ঘোষণা করে বৃটেন যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সূচনা করতে যাবে, তখন সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীরা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের উপনিবেশিক সরকারকে এককভাবে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করে, যা পরিচিত হয় ইউডিআই বা ইউনিলেটারেল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স হিসেবে। এই ঘোষণা বিবদমান বিশ্বের কোনো পক্ষই মেনে নেয় নি, রোডেশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত হয় অবরোধ, তবে সেদেশের কালো মানুষকে আরো দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে অর্জন করতে হয় স্বাধীনতা।

এই পটভূমিকায় ষাটের দশকের শেষাশেষি ১৪ কোটি জনসংখ্যার একটি বৃহৎ এশীয় দেশের একাংশে তথা পূর্ব বাংলায় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধর্মকে হীন স্বার্থে ব্যবহার করে যে তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্র তৈরি করা হয়েছিল সেখানে জাতীয়তাবোধে বাঙালি জনসমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিনি। জনতাকে সাথে নিয়ে গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়েছিল তাঁর সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ প্রদানের জন্য তিনি যখন সভামঞ্চে এসে দাঁড়ালেন তখন শ্রোতৃম-লীর কাছে বড় হয়ে ছিল আশু সঙ্কটময়তা, গণতান্ত্রিক রায় পদদলনকারী পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে মুক্তির জন্য কী হবে চূড়ান্ত পদক্ষেপ তা জানতে সবাই ছিলেন উদগ্রীব। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ছত্রে ছত্রে সেই জাতীয় কর্তব্যের রূপরেখা মেলে ধরা হয়েছিল এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর কোনো আন্তর্জাতিক মাত্রা ছিল না। কিন্তু বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনাকালে আমরা এখন বুঝে নিতে পারি এই ভাষণ ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের জাতিসত্তার আশু মুক্তির দিগদর্শন, একই সঙ্গে তা ছিল বিশ্বপটভূমিকায় পরিচালিত জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অঙ্গাঙ্গী অংশী। জাতীয় মুক্তির জন্য কোনো দেশের সংগ্রামকে যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেতে হবে, সে-বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ছিল সম্যক উপলব্ধি। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক পটভূমিকায় বাংলাদেশের সংগ্রাম কোন্ রূপ গ্রহণ করবে, তা কি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত হবে, অথবা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মহিমা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে, সেটা নির্ভর করছিল ৭ মার্চের ভাষণের দিক-নির্দেশনার ওপর। ফলে প্রত্যক্ষভাবে ভাষণে আন্তর্জাতিক পটভূমিকার কোনো উল্লেখ না থাকলেও ছিল যথেষ্ট ইঙ্গিত ও উপাদান; যার ফলে ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা সূচনা করলে জাতি দিশেহারা হয়ে যায় নি এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধরত বাংলাদেশ হয় নি আন্তর্জাতিক মিত্রহারা। ৭ মার্চের ভাষণে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি উচ্চারিত অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণাকারী বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিপূর্ণ ন্যায্যতা নিয়ে আবির্ভূত হতে পারে এবং কূটনৈতিক বৈধতা তৎক্ষণাৎ অর্জিত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মানুষের স্বীকৃতি ও ভালোবাসা অর্জনে সমর্থ হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সশস্ত্রভাবে দমনের চেষ্টা হলে সশস্ত্র প্রতিরোধ তথা মুক্তিযুদ্ধ সূচনা করবার অঙ্গীকার ও উদ্দীপনা এই ভাষণ সঞ্চার করেছিল। তার ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সশস্ত্র রূপ ধারণ করেও লাভ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক সমর্থন ও নৈতিক বৈধতা। দেশে দেশে বাংলাদেশের সংগ্রামের সপক্ষে যে অভূতপূর্ব সংহতি আন্দোলন গড়ে ওঠে সেই ভিত্তি রচিত হয়েছিল ৭ মার্চের ভাষণে উত্থাপিত জাতির অধিকারের ন্যায্যতা এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও দর্শনের ধারাবাহিকতায় স্থাপিত করবার মধ্যে। শত্রুর সশস্ত্র আঘাত নেমে এলে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরের পথ বঙ্গবন্ধু উন্মুক্ত করে যান। জটিল এক পটভূমিকায় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ৭ মার্চের ভাষণ তাই পালন করেছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা, যা অনেক সময় থেকে যায় আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে।

জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আমরা পর্যালোচনা করি এর প্রতিটি বাক্য নিক্তিতে ওজন করে, সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ভাষণের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে। সেই সাথে এটাও লক্ষ্য করতে হয়, ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার বস্নাডের মনে হয়েছিল, তিনি লিখেছেন, “রোববার ৭ মার্চ প্রদত্ত মুজিবের ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন তার চেয়ে লক্ষণীয় হলো তিনি কি বলেন নি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন, আবার কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করবেন। এর বদলে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান তিনি জানালেন।” আর্চার বস্নাড ঢাকায় অবস্থান করে পরিস্থিতির গুরুত্ব ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তাৎপর্য ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এর আগের দিন ইসলামাবাদের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে তিনি গোপন বার্তা পেয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল, “৭ মার্চ মুজিব যদি ইউনিলেটারেল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স ব্যক্ত করেন এবং স্বীকৃতির জন্য ঢাকা দপ্তরে যোগাযোগ করেন তবে ঢাকা দপ্তরকে অবশ্যই তাঁর কথা শুনতে হবে এবং বিষয়টি ওয়াশিংটনে প্রেরণ করতে হবে।” আর এ-ক্ষেত্রে নিক্সন প্রশাসনের অবস্থান কি হতে পারে সেটা তো পরের ঘটনাধারা থেকে আমরা বুঝতে পারি এবং বঙ্গবন্ধুও তা জানতেন।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতীয় মুক্তির গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ভবিষ্যৎমুখী আন্তর্জাতিক মাত্রা ও গ্রহণযোগ্যতা যুগিয়েছিলেন উচ্চকণ্ঠে সংগ্রামের গণতান্ত্রিক অধিকার ও দাবি উত্থাপন করে। তিনি কথা বলেছিলেন কেবল বাংলার প্রতিনিধি হয়ে নয়, পাকিস্তানের ইতিহাসের ২৩ বছরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠিতা প্রাপ্ত দলের নেতা হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, “আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাঁকে (ইয়াহিয়া খানকে) অনুরোধ করলাম ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না।” আরেকবার তিনি বলেছিলেন, “আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।” গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের প্রত্যয় ব্যক্ত করেই বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন সম্ভাব্য সশস্ত্র আঘাত মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার। অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে তাঁর এমনি ঘোষণায়, যার ফলে বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রাম স্নায়ুযুদ্ধ-পীড়িত বিশ্বে কোনো এক পক্ষের সংগ্রাম না হয়ে অর্জন করে সার্বজননীন সমর্থন, যে সমর্থনের বীজ নিহিত ছিল ৭ মার্চের ভাষণে। তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এমনি সমর্থন সরকারিভাবে প্রদানের কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল সোচ্চার, আর এর প্রভাব পড়েছিল অনেক দেশের সরকারের ওপর।
স্পষ্টতই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ক্ষমতাবান সরকারসমূহ ও বিশ্ব-সমপ্রদায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। সকল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিরা ঢাকায় উপস্থিত থেকে ভাষণের বিবরণ প্রদান করেছেন। ‘নিউজউইক’ সাময়িকীর বিখ্যাত রিপোর্ট, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘পোয়েট অব পলিটিকস্’ হিসেবে, সে-কথা আমরা জানি। তবে এই ভাষণের তাৎপর্য পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারা তাৎক্ষণিকভাবে ছিল দুরূহ। কেননা অসাধারণ এই ভাষণের পরতে পরতে যে দূরদর্শিতার ছাপ ছিল তার উন্মোচন ঘটেছিল ক্রমান্বয়ে, চলমান অসহযোগ আন্দোলনের অসাধারণত্বে এবং পঁচিশে মার্চ রাতের অন্ধকারে আকস্মিকভাবে নৃশংস গণহত্যাভিযানের মুখোমুখি জন্ম নেয়া সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। সেই মুহূর্ত থেকে দেশবাসী জেনে গেল বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়ে উঠেছে স্বতঃসিদ্ধ, গ্রেফতার বরণের আগে স্বাধীনতার সেই বার্তাও দেশবাসীর জন্য রেখে গেলেন বঙ্গবন্ধু, কালরাত্রি বয়ে আনলো স্বাধীনতার সূর্যালোকিত ২৬ মার্চের দিন, যদিও সামনে রয়ে গিয়েছিল দুস্তর পথ, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দুরূহ সংগ্রাম; কিন্তু গোটা জাতি ছিল প্রস্তুত, দিকনির্দেশনা তাদের সামনে স্পষ্ট, আর প্রেরণা বুকের মধ্যে সদা-অনুরণিত, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা-কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম_এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

উপরোক্ত উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেন উন্নীত হয়েছিল ওরাকলের পর্যায়ে, তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এবং এই অমোঘ বাণী দেশবাসীর অন্তরে যে অনুরণন তৈরি করেছিল সেই শক্তিতে অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পরিণত হয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের কাতারে সামিল আরেক অনন্য নেতায়। এই স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন আরো পরে, যখন ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে এবং বরিত হয়েছিলেন হুয়ারি বুমেদিন, জুলিয়াস নায়ারে, লিওপোল্ড সেংঘর, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ইয়াসির আরাফাত প্রমুখ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ দ্বারা। তবে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, আন্তর্জাতিক পটভূমিকায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন একটি দেশকে জোট-নিরপেক্ষতা, ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক সমাজবাদী ধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ও তার অবদানের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা সচরাচর আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেই তাৎপর্য অনুধাবন ও যথাযথভাবে উপস্থাপনে এখনও অনেক কাজ আমাদের বাকি রয়ে গেছে।

দুই.
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক মাত্রা অনুধাবনের পাশাপাশি এর লোকায়তিক দিক আমরা বিবেচনায় নিতে চাই। আমরা এটাও স্মরণ করি আন্তর্জাতিক ও লোকায়তিক এই দুইয়ের সমন্বিত বিচারের মধ্য দিয়ে এই ভাষণের গভীরতা ও ব্যাপ্তির পরিচয় আমরা পেতে পারি। লোকজীবন সঞ্জাত যে দর্শন ও শিল্পপ্রকাশের পরিচয় আমরা পাই তাকে আধুনিক ফোকলোর চর্চায় লোকায়তিক অভিধায় চিহ্নিত করা হয়। রূপগতভাবে এর রয়েছে প্রাকৃত চরিত্র, প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে সংলগ্ন থেকে লোকায়তিক এইসব প্রকাশ কোনো জড়বৎ ধারণা নয়, আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসার মোকাবিলায় নিশ্চিতভাবে সক্রিয় ও সক্ষম, কিন্তু সেই রূপসনাতনকে চিহ্নিত করতে অনেক সময়ে আমরা ব্যর্থ হই। তার একটি বড় কারণ দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসনের ফলে শিক্ষিত নাগরিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রোথিত সমাজ-বিচ্ছিন্নতা, বিশেষভাবে যেসব প্রপঞ্চ ব্যবহার করে তারা সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প বিশ্লেষণের চেষ্টা নেন, অনেক ক্ষেত্রে তা’ আরো বেশি করে তাদের সমাজ-বিযুক্ত করে ফেলে। এই সংকট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও প্রভাব ফেলে। দেখা গেছে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম যুগের প্রবক্তারা অনেকেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন পশ্চিমী দুনিয়ায়, রপ্ত করেছেন উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর ভাষা ও জীবনরীতি, পরে হতাশ ও পীড়িত হয়েছেন বাস্তবের রূঢ়তায়। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দর্শনে প্রতিফলিত স্বাধীনতা ও মানবতার বাণী এবং উপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার দ্বন্দ্বে তাঁরা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এই নেতাদের মধ্যে, সমাজতাত্তি্বক আশিস নন্দী শনাক্ত করেছিলেন এক ধরনের বৈপরিত্যের, তাঁরা তুলে ধরেছেন জাতিসত্তার মুক্তির চেতনা, কিন্তু প্রকাশের ভাষা ছিল উপনিবেশিক-মানস সঞ্জাত।

আশিস নন্দী লিখেছিলেন, “এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় যে আমাদের কালের অনেক উপনিবেশবাদ-বিরোধী আন্দোলন সুনির্দিষ্ট যে-ধরনের ধারণাগুচ্ছ নিয়ে কাজ করেছে তা’ প্রায়শ ছিল সাম্রাজ্য-অধিপতির সংস্কৃতির ফসল এবং এমন কি এর বিরোধিতাকালেও ঐ সাংস্কৃতিক উৎসের প্রতি নিবেদিত হয়েছে শ্রদ্ধার্ঘ্য।” (ওঃ রং হড়ঃ ধহ ধপপরফবহঃ ঃযধঃ ঃযব ংঢ়বপরভরপ াধৎরধহঃং ড়ভ ঃযব পড়হপবঢ়ঃং রিঃয যিরপয সধহু ধহঃর-পড়ষড়হরধষ সড়াবসবহঃ রহ ড়ঁৎ ঃরসবং যধাব ড়িৎশবফ যধাব ড়ভঃবহ নববহ ঃযব ঢ়ৎড়ফঁপঃং ড়ভ ঃযব রসঢ়বৎরধষ পঁষঃঁৎব রঃংবষভ ধহফ, বাবহ রহ ড়ঢ়ঢ়ড়ংরঃরড়হ, ঃযবংব সড়াবসবহঃং যধাব ঢ়ধরফ যড়সধমব ঃড় ঃযবরৎ ৎবংঢ়বপঃরাব পঁষঃঁৎধষ ড়ৎরমরহং.)

আশিস নন্দীর এই উক্তি মনে হতে পারে বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনকাল সম্পর্কে প্রযোজ্য, তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই উক্তি উপনিবেশিক মানস সম্পর্কে প্রযোজ্য এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পঁয়ত্রিশ বছর পরের সমাজ সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। উপনিবেশিক চিন্তাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হওয়ার দুরূহতা বোঝাতে আশিস নন্দী ফ্রানৎজ ফাননের অবস্থান উল্লেখ করে লিখেছিলেন যে, ফরাসি উপনিবেশিকতার অমন তীব্র সমালোচকও লিখেছিলেন ফরাসি ভাষায়, জাঁ পল সার্ত্রের রচনারীতির আদলে। আর সেনেগালের মুক্তি আন্দোলনের নেতা, কবি ও রাষ্ট্রপতি লিওপোল্ড সেংঘর সম্পর্কে এক সেনেগালিজ যুবক আমাকে বলেছিলেন, লিওপোল্ড সেংঘর ফরাসি ভাষায় বক্তৃতা দেন, ফরাসিতে কবিতা লেখেন, এমন কি ফরাসিতে স্বপ্ন দেখেন। উপনিবেশিক মানসের বাইরে স্বাদেশিক ধারা তৈরিতে রাজনীতিবিদদের অবদানের ক্ষেত্রে নন্দীর বিশ্লেষণের একটি প্রধান অবলম্বন হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীর চিন্তাধারা এবং উপনিবেশিক চিন্তা-কাঠামো ভাঙা বা অতিক্রম করবার ক্ষেত্রে গান্ধীর অবদান। অন্য দিকে বঙ্গবন্ধুর জীবনকৃতি ও ৭ মার্চের ভাষণ বিবেচনাকালে আমরা এটা লক্ষ্য করি বঙ্গবন্ধু ছিলেন একান্তভাবে জাতীয় ঐতিহ্য ও জীবন থেকে উঠে আসা মানুষ, তিনি কেবল উপনিবেশিক মানস-মুক্ত ছিলেন না, সৃষ্টি করেছিলেন আন্দোলনের জাতীয় রূপ এবং লোকায়ত জীবনধারা থেকে বক্তৃতার এমন এক ভাষারূপ নির্মাণ করেছিলেন যা ছিল একান্তভাবে জাতীয় বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য-অনুগত, আর এর শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছিল ৭ মার্চের ভাষণে। ৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ক আলোচনাকালে এর পটভূমিকায় অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য-ভূমিকা কোনোভাবেই আমরা বিস্মৃত হতে পারি না। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত অসহযোগ ও সত্যাগ্রহী আন্দোলনের সাযুজ্য ও উত্তরণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি সূচিত হলে ৪ মার্চ থেকে তা সার্বিক অসহযোগ আন্দোলনের রূপ নেয়। ৪ মার্চ আওয়ামী লীগের মূলতবি সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরে বলেন, প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে সর্বোচ্চ ত্যাগ ছাড়া কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। এই উক্তি সত্যাগ্রহীদের কাছে সর্বোচ্চ ত্যাগ বরণে গান্ধীর প্রত্যাশা স্মরণ করিয়ে দেবে। এর পরের দিন থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সকল সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে এবং শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ভিত্তি ছিল সত্তরের নির্বাচনের অভূতপূর্ব গণরায়ের মাধ্যমে অর্জিত বৈধতা। নির্বাচনী রায় মেনে নিয়ে সংবিধান পরিষদের সভা আহ্বানে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের অনিচ্ছা ও ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু জনগণের অভূতপূর্ব অবস্থান গড়ে তোলেন শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে। এই অসহযোগ ছিল সর্বপ্লাবী, যেমন ব্যাপকতা গান্ধীর আন্দোলনে কখনো গড়ে উঠতে পারে নি। তদুপরি এই অসহযোগিতার ছিল এক সজাগ সক্রিয় প্রতিরোধের দিক, যা ছিল গান্ধীর অসহযোগ ধারণার অধিকতর সমপ্রসারিত রূপ। গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহীরা পুলিশের আক্রমণের মুখে নৈতিক অবস্থান থেকে পীড়নের শিকার হতে পিছ পা হয় না, প্রতিরোধহীনভাবে বরণ করে কারাবাস। কিন্তু চরম বর্বর ও স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসকগোষ্ঠীর মুখোমুখি বঙ্গবন্ধুর অসহযোগের আহ্বানে একদিকে ছিল শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের রূপরেখা, সামরিক আইন প্রত্যাহার করে অবিলম্বে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি, অপরদিকে ছিল সর্বাত্মক অসহযোগের প্রস্তুতি, ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমরা তোমাদের ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। সেই সাথে প্রায় এক নিঃশ্বাসে তিনি আরো বলেছিলেন, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন এভাবে পুননির্মিত হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, রাজনৈতিক প্রতিবাদ আন্দোলনে এর যে স্বকীয়তা তা পূর্ণ মহিমায় আবার জেগে উঠলো বাংলার বুকে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের রাজনীতির প্রচলিত কাঠামো ভেঙে এর বৃহত্তর ও নবতর যে রূপায়ন ঘটালেন বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে বলে মনে হয় না। ৭ মার্চের ভাষণে প্রতিরোধ আন্দোলনের এই লোকায়ত রূপ মেলে ধরবার পাশাপাশি প্রত্যাঘাতের ডাক এমন এক লোকভাষায় ব্যক্ত করলেন বঙ্গবন্ধু যে তিনি উন্নীত হলেন অনন্য লোকনায়কের ভূমিকায়, যার তুলনীয় নেতৃত্ব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের কাফেলায় বিশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলার লোকঐতিহ্য ও জীবনধারার গভীর থেকে উঠে আসা ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃভূমিকায়। জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তিনি যে কতটা সার্থক হয়ে উঠেছিলেন তার পরিস্ফূটন ঘটেছিল সঙ্কটময় মার্চ মাসে তাঁর অবস্থান ও ভূমিকা এবং ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে। তিনি বক্তব্যে যেমন গভীরভাবে জাতীয়তাবাদী, তেমনি আন্দোলনের স্বাদেশিক রীতির নব-রূপায়ন ও প্রসার ঘটালেন সার্বিক ও সক্রিয় অসহযোগের ডাক দিয়ে, যে অসহযোগে সামিল ছিল ব্যাপক জনতা এবং সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চের ভাষণের আবেদন উপচে পড়েছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোতে সামরিক-আধাসামরিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল বাঙালি সদস্যের ওপর এবং এর প্রতিফল জাতি লাভ করলো মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকেই। বক্তৃতার রূপ হিসেবেও প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষণের কাঠামো সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে বঙ্গবন্ধু এমন এক সৃজনশীলতার পরিচয় দিলেন যা দেশের মাটির গভীরে শেকড় জারিত করা ও গণ-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া অনন্য নেতার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল।

তিনি বক্তৃতা শুরু করেছিলেন ‘ভাইয়েরা আমার’ সম্বোধন দিয়ে, সবরকম পোশাকি রীতি ও আড়ম্বড় বর্জন করে লাখো জনতার মুখোমুখি হয়ে এমন অন্তরঙ্গ, প্রায় ব্যক্তিগত সম্বোধন যে সম্ভব, তা কে কখন ভাবতে পেরেছিল। ভাষণের প্রথম বাক্যটিও একান্ত ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে বলা, যেন ঘনিষ্ঠজনের কাছে মনের নিবিড়তম অনুভূতির প্রকাশ, “আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।” এরপর তিনি যখন বাংলার মানুষের আত্মদানের কথা বললেন, তাদের মুক্তি-আকুতির প্রকাশ ঘটালেন, তখন সেই অন্তরঙ্গ ভঙ্গি রূপ পেল জনসভার ভাষণের, কিন্তু তারপরও হারালো না বিষয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্তি। তিনি বললেন, “আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।”

এই অনন্য সূচনা বেঁধে দিয়েছিল বক্তৃতার সুর, তিনি সত্যোচ্চারণ করলেন অন্তরের সবটুকু আকুতি ঢেলে এবং নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে শ্রোতৃম-লীকে, যেন তার রক্তসম্পর্কের ভ্রাতৃপ্রতিম সবাই, একাত্ম করে তুললেন। গভীর প্রেমভাব উৎসারিত এই একাত্মতা নেতা ও জনতার মধ্যে আর কোনো ফারাক রাখলো না। দেখা গেল ভাষণে যখনই বলেছেন মানুষের কথা সেখানে আর কোনো নৈর্ব্যক্তিকতার অবকাশ থাকে নি, এই মানুষেরা যে তাঁরই মানুষ, একান্ত আপনজন। বুকভরা ভালোবাসা ও বেদনা নিয়ে তিনি বলেছেন, “৭ জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।” “আমার পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব, দুঃখী, আর্ত মানুষের মধ্যে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি।” “কার সাথে বসব, যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসব?” “গরীরেব যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে।” “আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়,” _ এভাবে বারংবার তিনি উচ্চারণ করেছেন আমার মানুষ, আমার দেশের গরিব-দুঃখি, আমার লোক। এই সব উচ্চারণ উৎসারিত হয়েছে মানুষের সঙ্গে নিবিড় একাত্মতার মধ্য দিয়ে এবং প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ ও কঠিন গণসংগ্রামের পথ বেয়ে বঙ্গবন্ধু অর্জন করেছিলেন গণমানুষের সঙ্গে এই বিশেষ সম্পৃক্ততা। ৭ মার্চের ভাষণে বারবার যে উত্থাপিত হয়েছে মানুষকে হত্যার প্রসঙ্গ এবং সেই কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসব ঘটনাকে চিহ্নিত করছেন আমার লোক, আমার মানুষকে হত্যা হিসেবে, তার পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক ধারাবাহিকতা এবং ইতিহাস-নির্মাতা জননেতার বিশিষ্ট মানসিক গড়ন। পাকিস্তানের তেইশ বছরের নিপীড়নমূলক শাসন এবং তার বিরুদ্ধে জনসংগ্রামের ইতিহাসের নির্যাস একটি বাক্যে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।” বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে শহীদের যে কাফেলা ইতিহাসের অগ্রপথ রঞ্জিত করেছে সেই শহীদদের অনেকের নাম আমরা জানি, অনেকের জানি না। তাঁরা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র, নানাভাবে এই শ্রদ্ধা জাতি প্রকাশ করে, যে শ্রদ্ধা-জ্ঞাপনের একটি পোশাকি ভাষা আছে, বহুল-ব্যবহারে সেই ভাষা ধার হারিয়ে নিবীর্য হয়ে পড়লেও আমরা প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ-ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত দায় অনুভব করেছেন, ১৯৬৬ সালে ৬-দফা ঘোষণা করে তিনি যখন জাতীয় অধিকারের আন্দোলনের নতুন পর্বের সূচনা করেন তখন এর নেতৃত্বে তিনিই অধিষ্ঠিত হয়েছেন অথবা বলা চলে জনমানুষই তাঁকে দিয়েছে নেতৃত্বের আসন। নেতৃত্বের আসনের রয়েছে কর্তব্য, আবার রয়েছে এক নিঃসঙ্গতা, যৌথভাবে কর্মকা- পরিচালনার পরও নেতার ওপর বর্তায় অনেক দায়ভার। এই দায়ভার পালনে নেতৃত্বের ভূমিকা দিয়ে অনেক কিছু যাচাই হয়ে যায়, অনেক নেতা দায়ভার পালনে সফলতার উদাহরণ তৈরি করে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন, কিন্তু দায়ভারকে পরম ভালোবাসা দিয়ে ম-িত করবার মতো অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা নেতৃত্বে খুব বেশি দেখা যায় না, মানুষও বোধহয় তেমন বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ধাঁচে, তাঁর অন্তর-মানসে মানুষের জন্য যে বিপুল ভালোবাসা সেটা তাঁর নেতৃত্বের ধরনেও উপচে পড়েছে। ৬-দফা ঘোষণার পর যে-কঠিন পথ বেয়ে তাঁকে ও জাতিকে চলতে হয়েছে সেখানে রাজপথে রক্ত-ঝরানো প্রতিজন শহীদের জন্য তিনি নিজেকে দায়বদ্ধ ভেবেছেন, তাঁর ঘোষিত ও পরিচালিত আন্দোলনেই যে এই মানুষেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনে ৬-দফার দাবিতে আহুত হরতালের সময় পুলিশ জনতার ওপর নারকীয়ভাবে হামলা চালায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে মনু মিয়া, মুজিবুল হকসহ এগারো জন শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে এবং এই প্রথম তাঁর নেতৃত্বে পরিচ

ালিত আন্দোলনে তরুণ-যুবকেরা ঢেলে দিল বুকের রক্ত। তাঁর কাছে এই ঘটনা যে পৃথক আবেদন ও আবেগের তীব্রতা সঞ্চার করে সেটা প্রকাশ পেয়েছে যখন ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, “৭ই জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।” এই শহীদেরা স্বাভাবিকভাবে তাঁর কাছে বিবেচিত হয়েছিল ‘আমাদের ছেলে’ হিসেবে।

এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্য, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মানুষকে বারবার রক্ত দিতে হয়েছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাবার যে আয়োজন জেনারেল আইয়ুবের সরকার করেছিল সেই ষড়যন্ত্র বানচাল করে তাঁকে মুক্ত করতে আরো অনেক বীর শহীদকে বুকের রক্ত ঢালতে হয়েছে। একাত্তরের মার্চ মাসের শুরু থেকে সূচিত প্রতিরোধ আন্দোলনেও বহু মানুষ অকাতরে বিসর্জন দিয়েছেন জীবন। জাতীয় অধিকার আদায়ের এই বিশাল গণ-সংগ্রামের যিনি অবিসংবাদিত নেতা তাঁর অন্তরে তো আলোড়ন জাগায় প্রতিটি শহীদী আত্মদান, সব রক্তনদীর ধারা বুঝি তাঁর বুকে জমা হয়ে তৈরি করে রক্তসমুদ্র, আর তাই সকল শহীদকে তিনি বরণ করেন আপন শহীদ হিসেবে, কথা বলেন এমন ভাষায় যা আহরিত নয়, নেতা ও জনতার দূরত্বসূচক নয়, এই আপনত্ব তিনি অর্জন করেন অপরিমেয় ভালোবাসা ও মমতার বলে, যেমনটি আর কেউ কখনো পারে নি।

নিবিড় প্রেমভাব থেকে স্রষ্টা অথবা দেশমাতার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রকাশ ঘটাতে বাংলার লোকমানসে সম্বোধনের পরিবর্তনময়তা আমরা লক্ষ্য করি, স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা নিবেদনে লোকসমাজে যেমন আপনি, তুমি বা তুই ব্যবহৃত হয়, অনুভূতির স্তর অথবা তীব্রতার প্রকাশক হিসেবে, তেমনি বঙ্গবন্ধুও ভাষণের উচ্চকিত মুহূর্তে আপনি থেকে অনায়াসে চলে গেছেন তুমি বা তোমরা সম্বোধনে।

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় এক গান এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্য সম্মেলনে সন্জীদা খাতুনকে যে গান গাইবার জন্য তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন, সেখানেও আমরা দেখি গানের কথায় সম্বোধনসূচক সর্বনামে এমনি পরিবর্তন ঘটে যাওয়া। স্বদেশকে তুমি সম্বোধন করে যে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে তা এক পর্যায়ে হয়ে ওঠে তুই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ওমা, আমার যে ভাই তারা সবাই, তোমার রাখাল, তোমার চাষি/ওমা তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে।’ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতে হয় এখানে কেবল সম্বোধনের পরিবর্তনময়তা নয়, বক্তব্যবিচারেও ৭ মার্চের ভাষণের অনুরণন যেন খুঁজে পাওয়া যায়।

বক্তৃতার একেবারে শেষে, বাংলার লোকায়ত ইসলামে সুফিবাদের প্রভাবে যে উপাসনা-পদ্ধতি বিশেষ স্থান পেয়েছে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলনে যে ফানা বা পরম উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়, যে নিবিড় সম্পৃক্তি-আকাঙ্ক্ষা লৌকিক ধর্মে আরো নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনিভাবে নেতা ও জনতা একীভূত হয়ে পড়েন বক্তৃতাকালে, উপলব্ধির নিবিড়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝি অন্তরের কোষে কোষে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে অনুভব করেছিলেন নেতা ও জনতার একাত্ম হয়ে ওঠার গভীর ব্যঞ্জনা, তাই তো অসাধারণ ও অনন্য বাক্যবন্ধ রচনা করে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ এখানে কেবল সম্বোধনের রূপবদল নয়, ঘটে যায় সত্তার রূপান্তর, মনে রাখবাার আহ্বান নিশ্চয় জনতাকে জানিয়েছেন নেতা, কিন্তু পরবর্তী উচ্চারণ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব’, এটা নেতা ও জনতার সম্মিলিত উচ্চারণ, উভয়ের সত্তা একীভূত হয়ে যায় যেখানে, তারপরে আবার ফিরে আসে নেতৃরূপ, ঘোষিত হয় প্রত্যয়, ‘এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব’। একই নিশ্বাসে ভবিষ্যৎবাদী প্রত্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্রষ্টার মহিমা কীর্তন করে তিনি উচ্চারণ করেন ‘ইনশাল্লাহ’, লোকধর্ম ও লোকরীতি সহজাত প্রকাশ পায় তাঁর উচ্চকিত রাজনৈতিক ভাষণে। এমন অসাধারণ বাক্য কেউ শিখে-পড়ে-লিখে বা বক্তৃতার পয়েন্ট হিসেবে নিয়ে আসতে পারে না, জীবনব্যাপী সাধনার মধ্য দিয়ে এমন বাক্যোচ্চারণের শক্তি অর্জন করতে হয়। আর তাই বক্তৃতার শেষে অমোঘ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,_এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ইতিহাস নির্মিত হয়ে যায় এমন মুহূর্ত খুব বেশি মিলবে না। তুলনীয় হিসেবে উল্লেখ করা যায় ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ সূচনা করতে মহাত্মা গান্ধীর ডান্ডি পদযাত্রার কথা। ব্রিটিশ সরকার লবণের ওপর কর আরোপ করলে গান্ধী এর প্রতিবাদ জানাতে উদগ্রীব হয়ে পড়েন। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে খুব উৎসাহ ছিল না, লবণের ওপর যৎসামান্য কর জাতীয় জীবনে কিই-বা প্রভাব রাখে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী একে বিবেচনা করেছিলেন অগণিত দরিদ্র ভারতবাসীর জীবনের ওপর উপনিবেশিক আঘাত হিসেবে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে জাগাতে চেয়েছিলেন দেশবাসীকে। একান্ত গান্ধীবাদী ধারায় তিনি আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে বিশ্বস্ত কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে শুরু করলেন ২৪১ মাইলের পদযাত্রা। যতই তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন ততোই স্ফীত হচ্ছিল পদযাত্রীদের সংখ্যা, দেশব্যাপী সূচিত হয়েছিল সমধরনের আরো পদযাত্রা এবং ক্রমে তা রূপ নিল বিপুল আন্দোলনের। ৬ এপ্রিল সকালে গান্ধী যখন ডান্ডির সমুদ্র তীরের লবণ বাঁধ থেকে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় জমে-ওঠা এক মুঠো লবণ তুলে তাঁর সাথীকে দিলেন লবণ আইন অমান্য করে, তখন, সেই মুহূর্তটিতে সৃষ্ট হলো লবণ সত্যাগ্রহের অভিনব ইতিহাস, কেঁপে উঠল সারা ভারত, গ্রেফতার হলেন গান্ধীসহ লাখো সত্যাগ্রহী, সূচিত হলো ব্যাপক আকারের আইন অমান্য ও অসহযোগ আন্দোলন।

মার্কিন সাংবাদিক লুই ফিশার ছিলেন লবণ সত্যাগ্রহীদের সঙ্গে। ডান্ডির উপকূলে গান্ধীর মুঠিতে লবণ তুলে নেয়ার দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘সেই মুহূর্তে ভারত হয়ে গেল স্বাধীন, যদিও আইনগত বা অন্য বিবেচনায় কিছুই পরিবর্তিত হয় নি।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের শেষ আহ্বান জানাবার দৃশ্যকেও সেভাবে চিহ্নিত করে বলা যায়, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশ হয়ে গেল স্বাধীন, যদিও আইনগত ও বস্তুগত ভিত্তি রচনা তখনও ছিল বাকি। তবে সর্বজনের মানসলোকে স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করে সেই পথ তো উন্মোচন করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তিন.
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও মাহাত্ম কেবল এর রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে না। এই ভাষণের পরতে পরতে মিশে আছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সেই ইতিহাস নির্মাণে লোকসাধারণের সুদীর্ঘ সাধনা। প্রাকৃতজন হিসেবে বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছিলেন লোকায়ত জীবনের ধারায় স্নাত হয়ে। সেই সাথে তিনি অর্জন করেছিলেন বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা। কলকাতা মহানগরীতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উন্মেষকালে নেতাজির আন্তর্জাতিকতাবাদী চিন্তা ও স্বাধীনতার প্রবল স্পৃহা দ্বারা তিনি আলোড়িত হয়েছিলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির সস্নেহ সানি্নধ্য এবং আপন কর্মোদ্যোগ তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির প্রধান কুশীলবদের সঙ্গে পরিচিত করেছিল। পঞ্চাশের দশকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি-প্রকাশক কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। বিশেষভাবে, গামাল আবদুল নাসের সুয়েজ খালের ওপর মিশরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করলে ব্রিটেনের ন্যাক্কারজনক আক্রমণের মুখে পূর্ববাংলায় গড়ে ওঠা সংহতি আন্দোলনের তিনি ছিলেন তরুণ নেতা। পঞ্চাশের দশকে গণচীন সফর করে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন সমাজ রূপান্তরে মহাচীনের বিপ্লবী ভূমিকার এবং তার নেতৃবৃন্দের সাথে। ১৯৫৭ সালে লিডারশিপ প্রোগ্রামে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন, পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল অবধি। ষাটের দশক থেকে বিশেষভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির প্রয়াণের পর তিনি হাল ধরলেন নেতৃত্বের এবং রইলেন কারাগারে অথবা বাংলার পথে-প্রান্তরে-জনপদে মানুষের সঙ্গে মিশে, মানুষকে সচেতন, সংগঠিত, উদ্বুদ্ধ ও আলোড়িত করবার কাজে। তিনি জনজীবনের সঙ্গে কি নিবিড়ভাবে মিশতে পারতেন, কত সুগভীর ভালোবাসা নিয়ে প্রতিটি মানুষকে আলিঙ্গন করেছিলেন সেসব নিয়ে নানা গল্পকথা রয়েছে। একবার কারো সঙ্গে পরিচিতি হলে, তিনি যে-ব্যক্তিই হন না কেন, গুরুত্বপূর্ণ অথবা গুরুত্বহীন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে আর কখনো বিস্মৃত হতেন না। এর সাক্ষ্য রয়েছে অগণন এবং এসব নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গল্পকথা, এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মিথ, প্রায় এক পৌরাণিক চরিত্র। এমনি জনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে তিনি নিয়ত আহরণ করেছেন লোকায়ত উপাদান ও লোকজ্ঞান। আপন বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে লোকজ্ঞানের সংমিশ্রণ আর সেই সাথে মানুষের জন্য অপার ভালোবাসা, যে মানুষ বলতে আর্ত দুঃখী নিপীড়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ও তাদের ব্যক্তিরূপই তাঁর কাছে ছিল মুখ্য, এসব মিলিয়েই শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং ৭ মার্চের ভাষণে সেই অনন্য জীবনবোধের প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন জাতির জনক।

ব্যতিক্রমী লেখক আহমদ ছফা বঙ্গবন্ধুকে বলতেন বাংলার ভীম, মধ্যযুগের বাংলার লোকায়ত যে নেতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীন রাজ্যপাট, নির্মাণ করেছিলেন মাটির দুর্গ, ভিতরগড়ে যে দুর্গ প্রাচীর এখনও দেখতে পাওয়া যায়, মাটির হলেও পাথরের মতো শক্ত। বাংলার ইতিহাসের এমন অনন্য নির্মাণ-কীর্তির তুলনীয় আর কিছু যদি আমাদের খুঁজতে হয়, তবে বলতে হবে ৭ মার্চের ভাষণের কথা। যেমন ছিল মধ্যযুগের বাংলার রাজা ভীমের গড়া পাথরের মতো শক্ত মাটির দুর্গ, তেমনি রয়েছে বিশ শতকের বাংলার লোকনেতা মুজিবের ভাষণ, যেন-বা মাটি দিয়ে গড়া, তবে পাথরের মতো শক্ত।

বিশ শতকের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস এখনও রচিত হয় নি, তবে অনাগতকালের ঐতিহাসিকরা যখন লিখবেন সেই ইতিহাস তাতে আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রইবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার অনন্য ভাষণ। এই ভাষণে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির পরতে পরতে মিশে ছিল মানুষের জন্য এমন অপার ও অশেষ ভালোবাসা যার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। কাদামাটির গাঙ্গেয় বাংলাভূমিতে এই ভালোবাসা দিয়েই তিনি গড়েছিলেন মাটির এমন দুর্গ, যা স্বদেশী সমাজ ও লোকায়তিক ধারা থেকে সংগ্রহ করেছে উপাদান এবং হয়ে উঠেছে প্রত্যয়দীপ্ত কীর্তিসৌধ। তিনি বিভ্রান্তি থেকে উদ্ধার করে একটি জাতিকে যুগিয়েছিলেন মুক্তিপথের দিশা এবং গণতান্ত্রিক, অসামপ্রদায়িক, কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে সার্থকতা দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বিশ শতকের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে এভাবে তিনি যোগ করেছিলেন আলাদা মাত্রা, গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এমন এক গণসংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন যা ছিল একান্তভাবে স্বাদেশিক এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ও বিপুল আবেদনময়। তাঁর সেই অনন্য ভূমিকা আজ ও আগামীর জন্য পাথেয় হয়ে আছে, বাংলাদেশের জন্য যেমন, তেমনি তৃতীয় দুনিয়ার জন্যও।

[৫ মার্চ, শুক্রবার ২০১০ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত সেমিনারে পঠিত]