কৃষক কন্যা যেভাবে ডিআইজি

জন্মের দুই বছর পর মাকে হারিয়েছেন। ওই বয়সে মা হারানো শিশু ফাতেমার দিন কেটেছে কষ্টকে সঙ্গী করে। কৃষক বাবা একেন আলী শেখের ঘরে তখন ফাতেমার সৎ মা। কৃষক পিতা একেন আলী শেখের ঘরে সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ফাতেমাই যে একদিন এদেশের মহিলা পুলিশ জগতে এক পথিকৃৎ হবেন তা কেউ ভাবতে পারেননি।

১৯৫৮ সালের এপ্রিলে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাসাইল গ্রামে জন্ম নেয়া ফাতেমা ১৯৮৬ সালে বিসিএস পরীড়্গার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে যোগ দেন। এখন তিনি বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)’র ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত তার আগমনের সময় থেকেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বিশেষ করে পুলিশে নারীদের পথচলা শুরম্ন হিসেবে ধরা হয়। তার বেড়ে ওঠা, কর্মময় জীবনের বর্ণনা তিনি করছিলেন এভাবে- হাসাইল সরকারি প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাসের পর পড়াশোনার পথ রম্নদ্ধ হতে বসেছিল। নিকটবর্তী বানারী হাইস্কুলে ছিল না সহ-শিড়্গার সুযোগ। তবে দমে যাইনি। বরং মেয়ে সহপাঠীদের নিয়ে ভর্তি ছাড়াই ক্লাসে যাওয়া আসা চালিয়ে গেলাম। যা হওয়ার তাই হলো। কর্তৃপড়্গের হুঁশ হলো। বিশেষ ব্যবস্থায় আমাকেসহ সকল সহপাঠিনীকে দেয়া হলো বানারী হাই স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রীর মর্যাদা। ফাতেমা বলেন, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ, কলেজ থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ।

তারপর ১৯৮৪ সালে বিসিএস পরীড়্গার মাধ্যমে মেধাবী এ তরম্নণী নাম লেখান পুলিশের খাতায়, সেটা ১৯৮৬ সালের ২১শে জানুয়ারির কথা। তবে বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম, নিজ ব্যাচে একমাত্র নারী এএসপি হিসেবে তার পথচলা আদৌ কুসুমাসত্মীর্ণ ছিল না। ফাতেমা বলেন, আজ থেকে ২৪ বছর আগে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর অবস্থানের প্রেড়্গাপট আর যা-ই হোক নারীবান্ধব ছিল না। ফাতেমা বলে চলেন, মা হারানোর শোক ও বেদনা আমার নিজের চেতনাকে জাগিয়ে দিলো, সেই চেতনা আমার এ জীবনের সফলতা। তবে আমার এ পথচলা যে খুব মসৃণ ছিল তা নয়। ঘাটে ঘাটে নানা প্রতিবন্ধকতা ও কটূক্তিকে জয় করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পন্ন করে প্রশাসনে চাকরি নিয়েছি।

১৯৮৬ সালে এএসপি হিসেবে চাকরিতে যোগদান করার পর তার ট্রেনিং সময়কার কথা বলছিলেন ফাতেমা বেগম। ‘আমাদের সঙ্গে ২৩ জন পুরম্নষ সহকর্মী আর আমি ছিলাম একমাত্র নারী। আমাদের ইন্সট্রাক্টরসহ অন্যরা বলাবলি করতেন লাগল আমি পারবো কি না। অল্পের মধ্যে সবার ধারণা ভেঙে গেল। ট্রেনিংয়ে দুর্জয় ও দুর্বার নামে দু’টি দুষ্ট ঘোড়া ছিল। ওই সময় এ দু’টি ঘোড়ায় প্রশিড়্গণ নিতে পুরম্নষ সহকর্মীরা যেখানে ভয় পেতেন সেখানে দৃঢ়তা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে দুষ্ট ঘোড়া নিয়ে প্রশিড়্গণ নিয়েছি। পুরম্নষদের সঙ্গে ম্যারাথন ফার্স্ট হয়েছি। নিজে কখনও হারতে হবে এ চিনত্মা মাথায় আসেনি। ফাতেমা বলেন, পুলিশে যোগদানের পর সারদার দিনগুলোতে অনেকটা অনমনীয়তার কারণে কর্তৃপড়্গ তাকে নারী হিসেবে বিবেচনা না করে একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অন্য পুরম্নষ অফিসারদের সঙ্গে একই কাতারে শারীরিক প্রশিড়্গণ, অস্ত্র ও অশ্ব চালনা প্রশিড়্গণসহ সব প্রশিড়্গণই নিয়েছেন তিনি। কর্মজীবনে বাংলাদেশ পুলিশে ফাতেমা বেগমের বিচরণ দেখা গেছে, কখনও বা এএসপি হিসেবে খাগড়াছড়ির প্রত্যনত্ম অঞ্চলে, পুলিশ সুপার, ঠাকুরগাঁওয়ে ঈড়সসধহফ চড়ংঃ-এ, কখনও বা পরিচালক র‌্যাব হিসেবে, কখনও বা ডিআইজি (আর এম অ্যান্ড টি) হিসেবে পুলিশ সদর দপ্তরে, কখনও বা ডিআইজি (এসবি)-র গুরম্নদায়িত্বে। এক কথায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে সমগ্র বাংলাদেশে বিচরণ ছিল ফাতেমার। দেশের বাইরে যুদ্ধবিধ্বসত্ম সিয়েরা লিয়নে জাতি সংঘের পতাকাতলে শানিত্মরড়্গীর গুরম্নদায়িত্ব পালন করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। নিজ যোগ্যতায় অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলেইড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর পড়্গ থেকে গতকাল আনত্মর্জাতিক নারী দিবস উপলড়্গে ফাতেমা বেগমসহ ঢাকার সকল মহিলা পুলিশ সদস্যদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।

মিলি বিশ্বাস, ফাল্গুনী পুরকায়স্থ ও মিনা মাহমুদার কথা

গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের দেয়া সংবর্ধনা ও সম্মাননায় অতিরিক্তি ডিআইজি মিলি বিশ্বাস বলেন, পারিবারিক সহযোগিতা না পেলে এত দূর আসতে পারতাম না। তবে এ পেশায় ঘাটে ঘাটে অনেক কটূক্তি শুনতে হয়েছে। সিলেট থেকে এসেছেন ফাল্গুনী পুরকায়স্থ। সিলেট এপিবিএন-এর এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা, যখন ইউনিফর্ম শরীরে জড়াই তখন আর কিছু মনে থাকে না। কোন অস্বসিত্মও আমাকে আটকায় না। প্রথম প্রথম যে অস্বসিত্ম ছিল তা কেটে গেছে। পাশাপাশি আমার অধীনে যারা আছেন তারা সবাই পুরম্নষ কর্মী। তাদের কাছ থেকে ভাল সহযোগিতা পাই। ঢাকার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সহকারী কমিশনার মিনা মাহমুদা বলেন, পুলিশ পেশাকে আমি খুব এনজয় করছি। এটা অনেক চ্যালেঞ্জের।
ইমরান হোসেইন সুমন:

[ad#co-1]

Comments are closed.