অমর একুশে দেশে দেশে

রাহমান মনি
অমর একুশে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাপান প্রবাসীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। তন্মর্ধে ছিল সকাল ৮টায় রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে টোকিও শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, দিনব্যাপী বিভিন্ন আয়োজন, প্রবাসী একুশে পদক তথা সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান, আলোচনাসভা এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সকালের প্রভাত ফেরিতে রাষ্ট্রদূতের শ্রদ্ধা জানানোর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী, আঞ্চলিক সংগঠনসমূহ স্থানীয় মিডিয়া এবং ধর্মীয় ও নতুন প্রজন্ম প্রবাস প্রজন্মের পক্ষ থেকে একে একে সারিবদ্ধভাবে ফুলের শ্রদ্ধা জানানো হয়। এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি রবিবার হওয়ায় প্রবাসীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষ্যণীয়। অনেকেই তাদের সন্তানদের নিয়ে আসেন বাংলা সংস্কৃতিতে একুশের চেতনা তাৎপর্য ও গুরুত্ব শিখানোর জন্য। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা এবং কন কনে শীত একুশের ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

একুশের প্রথম প্রহরে বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর ইচ্ছা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন নি। কারণ টোকিও শহীদ মিনার অন্যান্য শহীদ মিনারের মতো যখন ইচ্ছা শ্রদ্ধা জানানো যায় না। কারণ, এ শহীদ মিনারটি বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে হলেও এর নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় প্রশাসনের হাতে। কেবলমাত্র ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ঘোষিত নির্ধারিত সময় এক থেকে দেড় ঘণ্টার জন্য তালা খুলে দেয়া হয় তাদের উপস্থিতিতে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি কড়া নজরদারিতে প্রবাসীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে আবার নিজ দায়িত্বে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করে দিতে হয়। এ যেন অঘোষিত তিন স্তরের কড়া নিরাপত্তা বলয়। বছরের বাকি সময় তালা ঝুলানো থাকে। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস যদি পূর্ব থেকে আবেদন করে তা হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্টজনরা আসলেও শহীদ মিনারের ভেতরে প্রবেশ করানো যায় না। কাছ থেকে দেখানো হয়। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা স্টেনলেস স্টিলের তৈরি শহীদ মিনার। বাঙালির আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতার এবং অহঙ্কারের প্রতীক, নীরবতাই যেন সকল প্রতিবাদের ভাষা। আবার মুখ বুজে সহ্য করাও।

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু বাঙালি জাতিকে একুশের প্রথম প্রহরে যখন শ্রদ্ধা জানানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি তখন জাপানের মুক্ত পরিবেশ একুশের প্রহরে টোকিও শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাঙালির পদচারণা পড়বে এটাই স্বাভাবিক। হয়ে থাকে তাই-ই। যদিও শহীদ মিনার বেদীতে পুষ্প অর্পণ করতে পারা যায় না। তাতে কি। শহীদ মিনারের সামনে রেখেই অন্তত নিংড়ানো ভালোবাসা এবং বিনম্র শ্রদ্ধা জানান প্রবাসীরা। কিছুটা অসন্তোষ নিয়েই প্রবাসীরা এই কাজটি করে আসছেন ২০০৬ সাল থেকে। বাংলাদেশ দূতাবাস যেহেতু নিজস্ব জায়গায় স্থাপিত হবে তাই সেখানে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে এটাই এখন জাপান প্রবাসীদের প্রাণের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বলতে থাকেন বছরের মাত্র একটি দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শহীদ মিনারের ফটক খোলা রাখা ঠিক না। এতে ইচ্ছা থাকলে ও আমরা অন্যান্য সময়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারি না। প্রবাসীরা যেহেতু সবাই একই সময়ে কাজ করে না এবং সবার দুটিও একই দিনে থাকে না তাই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। হোক না তা রবিবার। তাই প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারের ফটকের কাছেই পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে দেখা যায়।

বরাবরের মতো এবারো পরবাস দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এসব আয়োজনের সহযোগিতায় ছিল সাপ্তাহিক পাঠক ফোরাম জাপান। একুশকে ঘিরে দিনভর আয়োজনের মধ্যে ছিল। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বইমেলা, চিত্রপ্রদর্শনী, সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান, আলোচনাসভা এবং সব শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রবাসী সমাজে বিভিন্ন অবদান রেখে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পরবাস এ প্রথমবারের মতো তিনজনকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করে। কমিউনিটিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য জনপ্রিয় দুইটি পোর্টাল www.deshbidesh web.com এবং www.bangladeshtigers.com ও জাপান বিদেশি সাংবাদিক ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনার জন্য প্রখ্যাত সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের জাপান প্রতিনিধি মনজুরুল হককে এই সম্মাননা জানানো হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রবাস প্রজন্মের শিশু-কিশোর, জাপানি সাংস্কৃতিক দল ‘আরাধনা’ অতিথি শিল্পী, স্থানীয় দুইটি জনপ্রিয় প্রবাসী সাংস্কৃতিক দল উত্তরণ এবং স্বরলিপি অংশ নেয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে দূতাবাস আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল সকাল সাড়ে নয়টায় দূতাবাস প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, ফাতেহা পাঠ, বিশেষ মোনাজাত, সন্ধ্যা ৬-৩০ মিনিটে বাণী পাঠ এবং আলোচনাসভা।
ওসাকা, নাগোয়া, সিগা, গিফু, সাপ্পোরো, মিয়ে এবং কোবে শহরগুলোতে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের খবর পাওয়া গেছে। সবগুলো আয়োজনেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক জাপানিজ এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকবৃন্দও অংশগ্রহণ করে বলে জানা গেছে।

জাপান প্রবাসীদের সাফল্য অনেক। সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি, রাজনৈতিক সক্রিয় অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন থেকেই চলে আসছিল জাপান প্রবাসীদের মধ্যে। তাদের বড় সাফল্য হচ্ছে টোকিওতে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করতে পারা। এই শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বর্তমানে প্রবাসীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি এবং অসন্তোষের দানা বাধতে শুরু করেছে।

এছাড়া জাপান বাংলাদেশ সোসাইটি একুশে ফেব্রুয়ারি আয়োজন করেছিল ‘পিঠাপুলির উৎসব’। শোকদিবসে পিঠাপুলির উৎসব নিয়ে জাপান প্রবাসীদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]