মৌচাকে শহীদ ফারুক ইকবাল

জয়নুল আবেদীন
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে জনতার উল্লাস এবং ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে জনতার ঢল নামে। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়াকে অ্যাসেম্বলি ডাকতে আহ্বান করলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ভুট্টোর পিপলস পার্টির বিরোধিতার কথা বলে অ্যাসেম্বলি ডাকলেন না। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করলেন। ব্যাংক, বীমা, অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেল। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামল। ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হলো এবং বঙ্গবন্ধু ভবন যেন পূর্ববাংলার অস্থায়ী সরকারের কার্যালয় হয়ে গেল। ইতিমধ্যে ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে বিশাল মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভবনে গেল। ঢাকার পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম পরিচালনার জন্য সংগ্রাম কমিটি গঠন শুরু হলো। খিলগাঁও এলাকার আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে সংগ্রাম কমিটি গঠন করলাম। ওয়াপদার এক ডিরেক্টর মরহুম মকবুল সাহেব সভাপতি এবং আমি সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হলাম। ডাকসুর খবর পেয়ে আমরাও খিলগাঁওয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ালাম ৩ মার্চ। ইতিমধ্যে আমরা এক মর্মন্তুদ খবর পেলাম। খিলগাঁও ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করেছে।

আমাদের ছাত্র ফারুক ইকবাল গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং পাক আর্মি অনবরত গুলি ছুড়ছে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়েছে। অলিগলিতে আশ্রয় নিয়েছে মিছিলকারীরা। ফারুক বেঁচে আছে কি-না আমরা জানি না, কারণ গুলি আর কাঁদানে গ্যাসের জন্য ফারুকের কাছে যাওয়া হচ্ছিল না। আমাদের মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন খিলগাঁও স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক অসীম সাহসী দেওয়ান মফিজউদ্দিন। আমরা আরেকটি মিছিল নিয়ে খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ভেতর দিয়ে ফারুককে নিয়ে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। কারণ হিংস্র হায়েনার দল রামপুরা টিভি ভবনের দিকে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফারুক ইকবাল ছিপছিপে গড়নের লম্বামতো তরুণটি অত্যন্ত সাহসী ছিল। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা শুনে কিছু তরুণকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল করে টিভি ভবনের দিকে যাচ্ছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা। কিন্তু তরুণদের মাথায় আসেনি টিভি ভবন পাক আর্মির অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ। দেওয়ান ভাই ও আমরা যুক্তি করলাম এভাবে প্রাণ দিয়ে লাভ নেই। আমরা রাতের আঁধারে কারফিউ ব্রেক করে ফারুকের লাশ নিয়ে আসব। আমরা মহল্লার অলিগলিতে জঙ্গি মিছিল করতে লাগলাম। রাত ৯টার দিকে তিন দিক থেকে মিছিল নিয়ে ফারুকের লাশ নিয়ে এলাম। ছাত্র-জনতার গগনবিদারী স্লোগান_ ফারুকের রক্ত বৃথা যেতে দেব না, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর ইত্যাদি। পাকিস্তান বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে বস্তির মহিলা ও শিশুসহ ৭ জন নিহত এবং আরও ৭-৮ জন আহত হয়। ডেসা ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে দেয়। পাকবাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের মধ্যে দেওয়ান মফিজ ফারুকের লাশ এবং কয়েকজন শ্রমিক বন্ধু শিশুদের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিলে অংশ নিলেন। সেদিন কারফিউ ভঙ্গ করে আমরা ছাত্র-জনতা-শ্রমিক মিলিতভাবে যে বিশাল মিছিল করেছিলাম তা আমার জীবনে অবিস্মরণীয় একটি করুণ স্মৃতিময় ঘটনা হয়ে থাকবে। দেওয়ান ভাই আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তার রাতের আঁধারভেদী গগনবিদারী স্লোগান আজও কানে বাজে। পুরো আন্দোলনে বলিষ্ঠ কণ্ঠে স্লোগান দিয়ে দেওয়ান ভাই মিছিলের অগ্রভাগে থাকতেন। মালিবাগ রেলগেটের কাছে ফারুকের বাসা। ওখানে ওর নামে একটি বিদ্যালয় হয়েছে।

শহীদ ফারুক ইকবাল হাইস্কুল। মৌচাকের সামনে যে গোলচত্বরে ওর কবর সবার চোখে পড়ে। খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাস করে ফারুক ইকবাল আবুজর গিফারী কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছিল। কলেজটি তখন মালিবাগের মোড়ে একটি ভাড়াবাড়িতে ছিল। কাজেই কলেজের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় ছাত্র-শিক্ষক ও জনতার দাবি অনুযায়ী মৌচাকের সামনের গোলচত্বরে ওকে কবর দেওয়া হয়। কয়েকদিন পরে আরও এক শহীদ তাসকিনকে ফারুকের পাশে কবর দেওয়া হয়। ৩ মার্চ কারফিউ ব্রেক করে রাতের আঁধারে লাশ কাঁধে নিয়ে আমরা যে অবিস্মরণীয় বিশাল মিছিল করেছিলাম আর দেওয়ান মফিজ ভাই যে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছিলেন তাতে ঢাকাবাসী, বিশেষ করে খিলগাঁও ও মালিবাগের মানুষ পরবর্তী যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়েছিল।