তিনি যে বাংলাদেশ চেয়েছিলেন

অনন্য আজাদ
বাঙালি জাতির জন্য ফেব্রুয়ারি মাস শুধু একটি মাস নয়, বাঙালি জাতির জন্য একটি ভাষার প্রাপ্তি। সেই ভাষার নাম ‘বাঙলা’ ভাষা। এই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই যেভাবে আমাদের ভাষাসৈনিকদের কথা মনে পড়ে তেমনি ভাষাবিজ্ঞানী প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের কথাও মনে পড়ে। তিনি শারীরিকভাবে নেই ঠিকই, তবে তার চিন্তা-চেতনা, দর্শন বাংলাভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। এ জন্য তার অবদান স্বীকার করা আবশ্যক। বইমেলা প্রাঙ্গণে তিনি থাকবেন না কোনোদিনই, তবে তার লেখা বইপত্র এখনও প্রমাণ করে দেয় মৃত হুমায়ুন আজাদ জীবিত ড. আজাদের চেয়ে কম নয়।

তিনি যেসব কথা বলে গেছেন, লিখে গেছেন, বক্তব্য দিয়ে গেছেন তা একে একে সত্য হয়েছে ঠিকই; কিন্তু বাঙালি জাতির বুঝতে সময় তো লাগেই। এই ক্ষণিক সময়টুকুই ব্যবহার করেছে একটি গোষ্ঠী।

তিনি স্বপ্ন দেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তারপরও তার লেখার মাধ্যমে প্রকাশ পায় তিনি স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন দেখতেন নিজেকে নিয়ে, স্বপ্ন দেখতেন তার জন্মভূমি বাংলাদেশকে নিয়ে, এ দেশের মানুষকে নিয়ে, স্বপ্ন দেখতেন বাংলার সাধারণজনের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম নিয়ে। আনন্দ-বেদনার মায়াময় অশ্রুমাখা সবুজ এক বাংলাদেশকে নিয়ে। তার মনের পটে আঁকা যে মায়াময় বাংলাদেশ ছিল তা বাস্তবের মতো নয়। সেখানে বদলে গেছে অনেক কিছু, বদলে যাচ্ছে সুন্দরভাবে দেশটি তার স্বপ্নের রেশ ধরে।

ছোট থেকে বড় হয়েছে যে দেশে, যে পরিবেশে সেই দেশ নিয়েই ছিল তার যত ভাবনা। এ ভাবনা তাকে কুরে কুরে খেত। ভাবাত প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। এই ভাবনা, এই উৎকণ্ঠা যেন তার নিজেরই বিধিলিপি। তাই তিনি বলেছিলেন অনেক কঠিন সত্য। দেশের দুর্দশায় কাতর হতেন। এ কারণেই তিনি লিখেছিলেন ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম।’ তিনি চেয়েছিলেন এ দেশ হবে আদর্শ জনগণতান্ত্রিক দেশ, নিষ্কলুষ হবে তার রাজনৈতিক অঙ্গন। নোংরা, দুর্নীতিপরায়ণ হীনমনা ক্ষমতালিপ্সু মানুষ পরিত্যক্ত হবে জনগণের দ্বারা। ধুরন্ধর সুবিধাভোগী চামচারা ঠাঁই পাবে না এ দেশে। ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আর হবে না এ দেশে। চিরতরে দূর হবে সন্ত্রাস, হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপের মতো নিত্যদিনের দুষ্কর্ম। মনের চোখে যে আদর্শ বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখতেন, সেখানে নেই ক্ষুধাতুর শিশুর অসহায় কান্না, নেই দিনান্তে অন্নহীন বৃদ্ধের ব্যর্থ হা-হুতাশ, নেই অকালে রাজরোষে প্রাণ হারানো ছাত্রের বাবা-মায়ের বুকফাটা আহাজারি। সুবিধাভোগী রাজনেতার, সর্বগ্রাসী থাবার প্রহার থেকে মুক্ত থাকবে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা_ এ রকম একটি বাংলাদেশে তিনি বাস করতে চেয়েছেন। তিনি বিচরণ করতেন সেই বাংলাদেশে, যেখানে নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মুক্তমনা ও মুক্তবুদ্ধির দেশপ্রেমী মানুষ প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেবে উন্মুক্ত আকাশতলে, করবে নিজ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ সাধন।

দেশদ্রোহীরা নিপাত যাবে বঙ্গোপসাগরের অতল জলে, দেশ মুক্ত হবে সব অসাম্প্রদায়িক শক্তি থেকে, রাজনীতির নামে রক্ত ঝরবে না কোনো নিরীহ ছাত্রের_ তিনি স্বপ্ন দেখতেন এ রকম একটি স্বপি্নল সুন্দর বাংলাদেশের। আশা করি, ভবিষ্যতে আমরা তার কম্পিত একটি দেশ পাব। যে দেশে থাকবে না কোনো বৈষম্য, থাকবে না দুর্নীতি; থাকবে শুধু উদারতা, মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের চর্চা।

– অনন্য আজাদ : হুমায়ুন আজাদের পুত্র

[ad#co-1]