বাংলার বিনোদিনী

বিনোদিনী চরিত্রে অভিনয় করেছেন মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফ ছবি : আবু সুফিয়ান
বিনোদিনী সেই প্রতিভাময়ী ও বিস্ময়কর অভিনয়শিল্পী, একই মঞ্চে যিনি অভিনয় করেছেন ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের সাত-সাতটি নারী চরিত্রে। লিখেছেন জুনায়েদ মহসীন
বিনোদিনী সেই প্রতিভাময়ী ও বিস্ময়কর অভিনয়শিল্পী, একই মঞ্চে যিনি অভিনয় করেছেন ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের সাত-সাতটি নারী চরিত্রে। একই কাব্যাভিনয়ের একই মঞ্চে সত্তার ভেতর কোনো এক ঐশ্বরিক শক্তির গুণে একই বিনোদিনী হয়ে উঠেছেন কখনো প্রমীলা, কখনো সীতা, কখনোবা চিত্রাঙ্গদা।

আবার অন্যত্র, অন্য সময়ে, অন্য মঞ্চে অভিনয় বিশ্বাসে দর্শকের কাছে হয়ে উঠছেন মনোরমা কিংবা বৈষ্ণব শিরোমণি ভগবান শ্রীচৈতন্যদেব। যার অভিনয়-দর্শনে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস নেচে-গেয়ে উঠলেন ‘হরি গুরু হরি গুরু’ বলে। শুধু তা-ই নয়, তার যুগল হাত এসে বিনোদিনীর মাথার ওপর আশীর্বাদ হয়ে উঠলো মা তোমার চৈতন্য হোক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সব অমর উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলোও বাস্তবে প্রাণ পেয়েছিল বিনোদিনীর অভিনয়গুণে। স্বয়ং বঙ্কিমবাবুর মুখ থেকে এ স্বীকৃতিও মিলেছে বিনোদিনীর জীবনে। এমনকি গিরিশ ঘোষের নাট্যাকৃতির মূলেও ছিলেন বিনোদিনী। এই নাট্যরচনার সেই নন্দিনী বিনোদিনী আমার মনে মোহ জাগিয়ে দিল। শতবর্ষেরও অধিককাল আগে নারী অভিনয়শিল্পী হিসেবে বিনোদিনী বাংলার মঞ্চে এসেছিলেন এক রক্ষিতা পরিবার থেকে। তার পর বাংলার নাট্যমঞ্চকে সমাজের চোখে সম্মানজনক স্থানে তুলে দিয়ে পুরুষ ও তৎকালের অভিজাত মানবসমাজ কর্তৃক প্রতারিত হয়ে আত্মাভিমানে মঞ্চ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন বহুদূরে।

কিন্তু বাংলার নাট্যমঞ্চ তার অভিনয়গুণে যে মর্যাদার আসন লাভ করে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে বাংলার নাট্যমঞ্চে নারীদের অনুপ্রবেশ সহজ হয়ে ওঠে। বিনোদিনী দাসীর জন্ম ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায়। প্রায় ১২ বছর বয়সে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম মঞ্চে বিচরণ করেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের শত্রুসংহার নাটকে ধ্রুপদীর সখীর ভূমিকায়। অতঃপর ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গ্রেট ন্যাশনাল, বেঙ্গল ন্যাশনাল ও স্টার থিয়েটারে তৎকালীন যাবতীয় শ্রেষ্ঠ নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে অসামান্য যশ লাভ করেন। মাত্র ২৩-২৪ বছর বয়সে তিনি তার খ্যাতি ও ক্ষমতার চরম সিদ্ধিরলগ্নে রঙ্গালয়ের সংশ্রব চিরতরে ত্যাগ করেন। বিনোদিনী মাত্র ১২ বছরে অভিনয় করেছেন প্রায় ৮০টি নাটকে ৯০টির অধিক ভূমিকায়। বিনোদিনীকে তখনকার সাময়িক পত্রিকাগুলো ফ্লাওয়ার অফ দ্য নেটিভ স্টেজ, প্রাইমা ডোনা অফ দ্য বেঙ্গলি স্টেজ, মুন অফ দ্য স্টার কোম্পানি ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেছিল। বিনোদিনী নাট্যের মুখ্য উপদেষ্টা প্রয়াত সেলিম আল দীনের ভাষায়, এ নাটক একেবারে অন্য ধাঁচের। গড়নেও ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গের খ্যাত যাত্রাপালায় নানাভাবে এই অসামান্য অভিনেত্রীর জীবনকথা উঠে এসেছে। বহু স্থানে বিনোদিনী দাসীর বাস্তব জীবনের ঐতিহাসিকতা নিরর্থক ভাষার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। বিনোদিনীর নাট্য রচয়িতা সাইমন জাকারিয়ার ভাষায়, অপেক্ষাকৃত আধুনিককালে নাট্যমঞ্চ অভিজাতকুলের নারীদের অংশগ্রহণ দুর্লেখ্য নয়, কিন্তু মঞ্চাভিনেত্রী নারীদের সেই শতবর্ষ পূর্বকৃত অধিকার-বঞ্চনার চিত্র বা একেবারে ভেতরে অন্তরক্ষত আজ শর্তবর্ষে পরেও তেমনভাবে পরিবর্তিত হয় না। বিনোদিনী চরিত্র মঞ্চে রূপদানকারী শিমুল ইউসুফের ভাষায়, তিনি তো নেচে-গেয়ে অভিনয় করে যান, আমি তো নিমিত্ত মাত্র। একবিংশ শতকে তিনি আবারো নেমে এলেন মর্ত্যভূমে, শোনালেন তার শিল্পজীবনের অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা ভালোবাসার ভাগ্য ফেরে না। বিনোদিনী নাটকের নির্দেশক নাসিরউদ্দীন ইউসুফের ভাষায়, বিনোদিনী নাট্যপ্রয়োগে ও অভিনয়রীতিতে লোকনাট্যরীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। বাংলার লোকনাট্যের সঙ্গে ভারতের ধ্রুপদী নৃত্য অভিনয় সংমিশ্রণে একটি ভিন্ন ধরনের অভিনয় সৃষ্টির চেষ্টা এ নাট্যে। বিশেষ করে সঙ্গীত, নৃত্য এবং সংলাপে এর প্রয়োগ যদিও সুদূর প্রাচ্যের জাপানের ‘কাবুরি’র কিছু শারীরিক ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর অভিনয়ের এবং সংলাপে দেখা যায়। শূন্যস্থানে অসম্পূর্ণ বৃত্তের ভেতরে বর্ণনা, সংলাপ, গীত, নৃত্য, রঙ, আলো, শব্দের সংঘাত ও সম্মিলনে সৃষ্টি হয় একটি নাট্যমুহূর্ত। আর এ সবকিছুকে ধারণ করে অসম্পূর্ণ বৃত্তের ভেতরে সচল হয়ে ওঠে যে ছায়ানারী, তিনি সেই বিনোদিনী। ১৮ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় বিনোদিনীর ৭৫তম সফল মঞ্চায়ন হয়। সাইমন জাকারিয়ার রচনায় ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনা একক অভিনয়, সুর ও সঙ্গীত দেন শিমুল ইউসুফ। এছাড়া সঙ্গীতের দলে ছিলেন চন্দন চৌধুরী, শান্ত চৌধুরী, আসাদুজ্জামান ও সাজ্জাদ রাজীব।

[ad#co-1]