বই হতে পারে হাতিয়ার

মফিদুল হক
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা চাড়া জাতীয় বিকাশ অর্জিত হতে পারে না। আর তাই সাক্ষরতা ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্ববহ। এটি লক্ষণীয় যে, নবঘোষিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০১২ সালের মধ্যে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে। সে সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে প্রসারিত করে ৮ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

আমরা যদি জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমকে বিবেচনায় নেই তবে এক্ষেত্রে গ্রন্থের বিশাল ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে এটিও স্মর্তব্য, প্রাথমিক শিক্ষার ধারণার সঙ্গে সরকার এখন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাও সংযুক্ত করতে চলেছে। ফলে যে বিপুলসংখ্যক পাঠ্যবই প্রয়োজন হবে সরকার তা বিনামূল্যে সরবরাহের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এটি বিশেষ বিবেচনা দাবি করে যে, কোনো স্তরেই কেবল পাঠ্যপুস্তক দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হতে পারে না, চাই পাঠসহায়ক নানা বই। এমন কি প্রাক-প্রাথমিক স্তরেও শিক্ষার্থীদের জন্য দরকার বিভিন্ন ধরনের বই। উন্নত দেশে শিশু পর্যায়ে রয়েছে কত না বই, কোনোটি কেবলই রঙ করার, কোনো বই আছে খেলা করার জন্য, পপ-আপ বুকস হিসেবে যা পরিচিত, আবার কোনো বই আছে শিশুকে পড়ে শোনানোর জন্য। একই কথা প্রযোজ্য অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সম্প্রসারিত প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে। এর প্রতিটি স্তরে চাই বিভিন্ন বই, চাই ঝলমলে বিশাল গ্রন্থসম্ভার, নানা পর্যায়ের নানা বিষয়ের আকুতি মেটানোর জন্য। তো এটিও অনুমান করা যায় আমাদের মতো দেশে সরকার একা এত বিশাল শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক গ্রন্থের ভা ার তৈরি ও শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করতে পারবে না। লেখক-চিত্রকর, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, প্রকাশক, পুস্তক সরবরাহকারী সবার সম্মিলিত উদ্যোগ তথা সামাজিক উদ্যোগেই সম্ভব হতে পারে এমনি দায়িত্ব পালন। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহায়ক গ্রন্থের ভা ার তৈরি করাও অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য কাজ। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে রিসোর্স সেন্টার তৈরি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি গ্রন্থাগারে সহায়ক গ্রন্থের ভা ার তৈরি, বেসরকারি গ্রন্থাগারে শিশুদের বিভাগ চালু ইত্যাদি কার্যক্রম দ্বারা এ প্রয়াসকে সমর্থন দেওয়া যেতে পারে। সহায়ক গ্রন্থের ভা ার যদি সামাজিকভাবে ব্যবহার্য ভা ার হয়ে ওঠে, তবেই স্বল্প সম্পদ দিয়ে অর্জিত হতে পারে অনেক বড় কাজ।

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বলা হয়েছে, সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার স্থাপন করা হবে, তবে যতদিন সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হবে ততদিন দেশের প্রতিটি উপজেলা সদরে গণগ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে, যার একটি দায়িত্ব হবে প্রাথমিক স্তরে বই সরবরাহ করা। এখানে বিষয়টি আরও তলিয়ে দেখা দরকার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের জাতীয় উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে পারে না। তদুপরি বই পড়া একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ এবং প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিশুর সৃজনশীল বিকাশে গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, অঙ্কন, বিজ্ঞান ও পরিবেশ জ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্নমুখী কর্মকা ের অংশ হিসেবে সহায়ক বইয়ের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। সেক্ষেত্রে কেবল উপকরণ নয়, তার সঙ্গে চাই উপযুক্ত কর্মকা এবং তাই সংস্কৃতি মহলের অনেকে প্রস্তাব করেছেন ইউনিয়ন কাউন্সিল দফতরের সঙ্গে এমনি একটি কক্ষ সংযুক্ত করা, যেখানে থাকবে গ্রন্থের ভা ার যা ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার হিসেবেও বিদ্যালয়-সম্পৃক্ত ভূমিকা পালন করবে। ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার হিসেবে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর যে সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে তা হবে সাংস্কৃতিক কর্মকা ের অবলম্বন। অর্থাৎ গ্রন্থপাঠকে হোলিস্টিক বা সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং গ্রন্থকে ঘিরে নিতে হবে নানা শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা ।

এই সমগ্রদৃষ্টিতে দেখলে আমরা শিক্ষার সর্বস্তরে সহায়ক গ্রন্থের কার্যকর ভূমিকা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারব। শিক্ষানীতিতে প্রস্তাব করা হয়েছে শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার জন্য। আমরা আশাবাদী হতে পারি আগামী বছরগুলোতে শিক্ষাসম্পৃক্ত বইয়ের খাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধি পাবে। বইবাবদ অর্থের বরাদ্দই বড় কথা নয়, বই কতটা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটাও একইরকম বড় প্রশ্ন। তাই সৃজনশীল ভাবনা ও উদ্যোগ এক্ষেত্রে একান্তভাবে কাম্য।

সুদূরপ্রসারী এই লক্ষ্যমালার সঙ্গে আশু করণীয়সমূহ মিলিয়ে নেয়া দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই সরবরাহ নিয়ে বিগত বছরগুলোতে যে চরম দুর্নীতি ঘটেছে সে-কারণে কর্মসূচির মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটা নতুনভাবে প্রবর্তনের আগে তাই নীতিমালার দিকটি খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই-ব্যবহারের কর্মসূচির নিরিখে নির্ধারিত হবে বই বাছাইয়ের কার্যক্রম। কেন্দ্রীয়ভাবে তালিকা প্রস্তুত করে সব বিদ্যালয়ে একই বই প্রেরণ এমন এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যে তালিকায় বই অন্তর্ভুক্ত করবার জন্য শুরু হয় স্বর্গ-মর্ত্য আলোড়িত করা প্রচেষ্টা। এমন প্রচেষ্টায় দেবতারও ধ্যান-ভগ্ন হয়, তালিকা প্রণয়ণ কর্তৃপক্ষ তো সেই তুলনায় মর্ত্যের মানুষ। অথচ আমরা চাইবো যথাযথ বই পেঁৗছুক যথাযথ জায়গায়। এক্ষেত্রে সূচনা হিসেবে যদি কর্তৃপক্ষ সুপারিশকৃত বইয়ের একটি সল্ফপ্রসারিত তালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করে এবং বিষয়ওয়ারিভাবে তাদের নির্বাচনের ভিত্তিতে বই প্রেরণ করে, তবে তালিকায় বাজে বইয়ের অনুপ্রবেশ খারিজ করা সহজতর হবে। যদি কোনো অপ্রয়োজনীয় বই তালিকাভুক্ত হয়, আশা করা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তা ধোপে টিকবে না, কিংবা টেকানোর প্রচেষ্টা হয়ে পড়বে অনেক কঠিন। সেই সাথে এ-কথাও মনে রাখতে হবে যে, সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগারিকের স্থায়ী পদ এখনও সৃষ্টি করা যায়নি, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত কোনো শিক্ষককে উপযুক্ত পারিতোষিকের ভিত্তিতে খ কালীনভাবে এই দায়িত্বে নিযুক্ত করা যায়। বর্তমানে দেশব্যাপী বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যেসব বই সরবরাহ করা হয়েছে তার অধিকাংশই নিম্নমানের অথবা ভিন্নমানের। তদুপরি উপযুক্ত সহায়ক ব্যবস্থার অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বই তালাবদ্ধ হয়ে থাকছে প্রধান শিক্ষকের ঘরে, এর কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা থাকছে না। বই ও শিক্ষার্থীর মধ্যে বিলুপ্ত হওয়া যোগসূত্র পুনঃস্থাপনে একটি কর্মসূচির ভিত্তিতে যদি উপযুক্ত বই সরবরাহ করা হয় তবে আমরা পাঠপ্রবণতা প্রসারে কিছুটা হলেও উদ্যোগ লক্ষ্য করবো। আর এটা তো সর্বজনবিদিত সত্য, কোনো শিক্ষার্থী যখন গ্রন্থপাঠে আনন্দ খুঁজে পাবে তখন স্বশক্তিতেই সে খুঁজে নেবে বই, বইকে আর পাঠক খুঁজে পেতে হবে না। গ্রন্থের এই অমিত শক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টম্ফূরিত করতে পারলে আমরা শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবো। এই সাথে প্রবর্তিত হওয়া উচিত গ্রন্থপাঠের বাৎসরিক ক্যালেন্ডার, নিয়মিতভাবে আয়োজিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক সপ্তাহের অঙ্গ যদি হয় গ্রন্থ-বিষয়ক আলোচনা ও উপস্থাপন তবে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে গ্রন্থ পালন করবে যথোচিত ভূমিকা। এমনি আরো নানাবিধ কর্মকা ের কথা আমরা ভাবতে পারি।

একই কথা প্রযোজ্য দেশব্যাপী গ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক প্রসার ও সল্ফপ্রসারিত করবার প্রশ্নে। দেশব্যাপী গ্রন্থসংস্কৃতি বিকশিত করবার লক্ষ্যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং গ্রন্থাগারসমূহ বড় অবলম্বন ঠিকই, তবে বইয়ের সঙ্গে মানুষের তথা গোটা সমাজের সংযোগ বহন করে বিশেষ গুরুত্ব। এখানেও সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিকাশের দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে। আর একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে অগ্রসর হতে পারলে অচিরেই আমরা দেখতে পাব বিকাশের কুঁড়িসমূহের পলল্গবিত হওয়া, যা পরিণামে বয়ে আনবে সমাজের জাগরণ ও শক্তিবৃদ্ধি।

সৃজনশীল বইয়ের বিকাশ ও পাঠমনস্ক সমাজ তৈরি বহন করে বিশেষ গুরুত্ব। এর ফলে যে বিশাল সামাজিক অভিঘাত সৃষ্টি হতে পারে তা অর্থমূল্যে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। একদিকে আমরা যেমন চাইবো তথ্যমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে, তেমনি চাইবো মানবিক শক্তির প্রসার। উন্নত শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে মানবিক চেতনা প্রসারের কোনো বিকল্প নেই, আর এখানেই আমরা লক্ষ্য করি বইয়ের বিশাল ভূমিকা, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বই পালন করে যায় যে-ভূমিকা।

তবে বইয়ের শক্তিময়তা ব্যবহারের জন্য চাই উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ। এক্ষেত্রে বড়ভাবে দৃষ্টি দেয়া দরকার গ্রন্থাগার আন্দোলন গড়ে তুলবার দিকে। বাংলাদেশের সরকারি গ্রন্থাগারের নেটওয়ার্ক বিশেষ সল্ফপ্রসারিত নয়, যেটুকু তার প্রসার সেই তুলনায় গভীরতা অনেক কম অর্থাৎ এই গ্রন্থাগারসমূহ সমাজের জন্য আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারছে না। অপরদিকে বেসরকারি গ্রন্থাগারসমূহের দশা ক্রমে আরো করুণ হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে বলা যায় গ্রন্থাগার বিকাশের জন্য আমাদের বড়ভাবে ভাবা দরকার। সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে-থাকা ছোট-বড় কয়েক হাজার গ্রন্থাগারকে একটি সুসংবদ্ধ আন্দোলনে সামিল করতে পারলে স্বল্প-সময়ের মধ্যে বড় ধরনের মোড়-ফেরা আমরা অর্জন করতে পারি। বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর দুর্দশার বিপরীতে সরকারি গ্রন্থাগারের রয়েছে কাঠামোগত ঔজ্জ্বল্য। তাদের ভবন নতুন, ঝকঝকে, শেলফে বই পরিচ্ছন্ন ও হালফিল, কিন্তু পাঠক বিশেষ নেই। অন্যদিকে বেসরকারি গ্রন্থাগার জীর্ণ, মলিন, পুরনো বইয়ের সংগ্রহই বেশি, তবে আছে পাঠকের বিচরণ। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় বিশেষভাবে কাম্য। সরকারি গ্রন্থাগারের পরিকাঠামো সমাজের ব্যবহারের জন্য সল্ফপ্রসারিত করতে হবে। বই নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠানের আয়োজন, পাঠক-লেখক মুখোমুখি, গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিভিন্ন আয়োজনে সরকারি গ্রন্থাগার রমরমা হয়ে-ওঠা দরকার। সরকরি গণগ্রন্থাগারগুলোকে হয়ে উঠতে হবে পাঠক-সৃষ্টির কেন্দ্র। বইয়ের বাজার সল্ফপ্রসারণে তাদের উদ্যোগী হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের বইমেলা, একুশে বইমেলা এসব কর্মকা ে স্থানীয়ভাবে তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে কাম্য। সেই সাথে এটাও লক্ষণীয় নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের প্রকাশনা ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে এবং বিষয়-বৈচিত্র্যেও প্রকাশনা সমৃদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু পাঠকের কাছে বই নিয়ে যাওয়ার পথ হয়ে আছে সঙ্কীর্ণ। এই পথের প্রসারতা সবার কাম্য এবং সেজন্য চাই নানামুখি উদ্যোগ। এক্ষেত্রে সরকারের রয়েছে নানাবিধ করণীয়। গ্রন্থমেলার প্রসার, ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থমেলা চালু, গ্রন্থবিষয়ক আলোচনা বৃদ্ধি, বইয়ের বিপণন সুযোগ প্রসার, বইয়ের দোকান স্থাপনে সহায়তা ইত্যাদি অনেক ধরনের পদক্ষেপ বিপুল সফলতা বয়ে আনতে পারে।

২০২০ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বার লক্ষ্য ব্যক্ত করেছে সরকার। এই রূপকল্প সামনে রেখে যে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ-আয়োজন ও প্রস্তুতি চলছে, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দ্রুত যেসব পরিবর্তন ঘটে চলেছে, সেই নিরিখে বলা যায় দ্রুত পাল্টে যাবে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তবতা। অন্য দেশের তুলনায় আমরা হয়তো পিছিয়ে থাকবো, কিন্তু আমাদের সমাজেও তথ্যপ্রযুক্তি বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে চলেছে ও চলবে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার সল্ফপ্রসারণের পাশাপাশি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে মানবসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে ঘাটতি। প্রযুক্তি অভাবিত সব তথ্য মানুষের দুয়ারে বয়ে আনছে, মানুষ তথ্যের সমুদ্রে ভাসছে, কিন্তু জ্ঞানী হয়ে উঠছে কিনা সন্দেহ। ইনফরমেশন সে পাচ্ছে অনেক; তুলনায় নলেজ বাড়ছে কিনা বলা মুশকিল। জ্ঞান যদিও বাড়ে, প্রজ্ঞার বিচারে ঘাটতি হয়ে পড়ছে উদ্বেগজনক। আধুনিক পৃথিবী যে ক্রমেই হয়ে পড়ছে আরো বেশি হানাহানি ও সংঘাতময়, নির্মানবিক হয়ে পড়ছে সমাজ, তার সঙ্গে পৃথিবীর ডিজিটালকরণের যোগসূত্র একেবারে দুর্নিরিক্ষ্য নয়। এই কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলায় চাই দূরপ্রসারী দষ্টিভঙ্গি ও গভীরতর উপলব্ধি অর্থাৎ অগ্রগতির সঙ্গে সমতালে চাই মানবিক সংস্কৃতির বিকাশ। মানবিক শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষার সমন্বয় ক্রমেই হয়ে উঠছে জরুরি। কেবল প্রযুক্তির সওয়ারি হয়ে দিনবদল সত্যিকার অগ্রগতি রচনা করতে পারবে না, যদি এর সঙ্গে মানব চেতনার মিলন না ঘটানো যায়। অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন সংস্কৃতির সম্মিলন। আর এ-কারণেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে মানবিক সংস্কৃতির প্রসারও একান্ত জরুরি। আর এক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অপরিহার্য। দিনবদলের জন্য বইয়ের তাৎপর্য তাই অর্জন করেছে নতুনতর মাত্রা।

[ad#co-1]