এমডি এস.ইসলাম নান্নু : সফল মানুষের প্রতিকৃতি

রাহমান মনি
দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশিরা পাড়ি জমায় প্রবাসে। বিভিন্ন প্রতিকূলতায় কেউ হয় নিঃস্ব। আর সততা, নিষ্ঠা এবং একাগ্রতায় কেউ জয় করে বিশ্ব। কর্মস্পৃহায় সন্তুষ্ট হয়ে নিজে দমে না থাকলেও হাসি ছড়ায় পরিবারে, সমৃদ্ধ করে দেশকে এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে বাংলাদেশের। জাপান প্রবাসীদের প্রিয়মুখ নান্নু ভাইয়ের নাম মোঃ শহীদুল ইসলাম নান্নু। পিতা আব্দুল জব্বার মিয়া এবং মাতা মমতাজের প্রথম সন্তান তিনি। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলায় ডহুরী নওপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী নান্নু ছোটবেলা থেকেই ঢাকার গে-ারিয়াতে বড় হন। পড়ালেখার পাঠও শেষ করেন ঢাকাতেই। গে-ারিয়া হাইস্কুল থেকে ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করার পর আর পড়ালেখায় মন বসাতে পারছিলেন না তিনি। এ পাড়া ও পাড়া, এ বাড়ি ও বাড়ি এবং মহল্লার ওলিগলি কিংবা বাড়ির ছাদে আড্ডা মেরে তো আর ভবিষ্যৎ গড়া যাবে না। সেই বয়সে পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ব্যবসায় মনোনিবেশ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। বয়সটাও অনুসন্ধিৎসু। সব কিছুতেই একটা এ্যাডভেঞ্ঝার ভাব। ১৯৮৫ সালে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ি জমান পশ্চিম জার্মানি। তখনো দুই জার্মানি এক হয়নি। কিছুদিন কাটান সেখানে। কোনো কাজ নেই। নিয়মিত এবং সীমিত খাবার দাবার সব কিছুতেই একটা বাধাধরা নিয়ম। তার ওপর তথাকথিত উন্নত জাতির দাবিদার ব্লু ব্লাডখ্যাত জার্মান জাতির ব্যবহার তার ভালো লাগেনি। তাই বেশি দিন জার্মানিতে থাকা সম্ভব হয়নি। চলে আসেন ব্যাঙ্কক। পরিচয় হয় অন্য দুই বাংলাদেশির সঙ্গে। তখন জাপান আসার ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যাঙ্কক অনন্য। বাংলাদেশে না ফিরে দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৮৫ সালে নান্নু মাত্র ১৯ ডলার সম্বল সঙ্গে করে জাপানে পা রাখেন। ওঠেন এক বন্ধুর এক রুমবিশিষ্ট বাসায়। যেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয়েছে ছয় জনকে। অনেক রাত কাটাতে হয়েছে পার্কের বেঞ্চে। সেই নান্নু নিজের যোগ্যতায় আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, পুরো পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

১৯৮৮ সালে Asian Peoples Friendship Society (APFS) প্রতিষ্ঠা পায়। নান্নু এপিএফএস-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৯০ সালে তিনি তার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যার সভাপতি হলেন MR. KATSUO YOSHINARI। ১৯৯৪ সালে এপিএফএস-এর ব্যানারে টোকিওর ইতাবাসি ওয়ামা শপিং এরিয়াতে মূলত বাংলাদেশি এবং ফিলিপিনোদের নিয়ে এশিয়ান ফেয়ার নামে মডেল শো আরম্ভ করেন। বাংলাদেশি খাবারের সারি সারি দোকান স্থান পায় মডেল শোকে ঘিরে। বেশ জনপ্রিয় ও উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল তখন আয়োজনটি।

১৯৯৫ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলায় এপিএফএস-এর সহযোগিতায় নন-ফরমাল প্রাইমারি স্কুল নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯৭ সালে একোব্যাক নামে একটি এনজিও, জেআরএস (জাহান রিহ্যাবিলিটেশন সার্ভিস)-এর মাধ্যমে খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেন। এপিএফএস-এর সভাপতি YOSHINARI KATSUO তার সঙ্গে ছিলেন।

ইতোমধ্যে তিনি রেস্তরাঁ ব্যবসা শুরু করেন টোকিওর প্রাণ কেন্দ্রে। এই সময় তিনি বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন এবং সখ্য গড়ে তুলেন। যাদের অধিকাংশই গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ১৯৯২ সালে রেস্তরাঁ ব্যবসার পাশাপাশি গাড়ি ব্যবসার হাতেখড়ি নেন। দিনে নিজ ব্যবসা ঠিক রেখে রাতে গাড়ি ব্যবসায়ের বিভিন্ন দিক আয়ত্তে আনেন। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় YOKOHAMA এবং KAWASAKI পোর্ট থেকে ৫টি গাড়ি রাশিয়ান জাহাজে তুলে দিয়েই গাড়ি ব্যবসায়ের সূচনা করেন।

প্রচুর চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে এন কে ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে জাপান-রাশিয়া দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও বর্তমানে পৃথিবীর ২৪টি দেশে তিনি আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিমাসে এন কে ইন্টারন্যাশনাল হাজারেরও বেশি গাড়ি বেচাকেনা করে থাকে। প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার প্রতি বছর লেনদেন করে থাকে এই কোম্পানি। নান্নুর কোম্পানিতে চাকরিরতদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। জাপানসহ অন্যান্য দেশের শোরুমটির কর্তাব্যক্তি বাংলাদেশি। তারা নিয়মিত বাংলাদেশে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। বেকারদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। দেশ লাভবান হচ্ছে।

গত ডিসেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশ, জাম্বিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, নামিবিয়া, তানজানিয়াসহ আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেন। উদ্দেশ্য নতুন বাজার তৈরি করা। শোরুম প্রতিষ্ঠা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ব্যবসা আরো বিস্তৃত করা। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে নান্নু বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকলে প্রবাসীরা বাংলাদেশে আরো বেশি বেশি বিনিয়োগ করত। কোম্পানির অনুমতি নিতে মাত্র ৩ দিন সময় লাগে থাইল্যান্ডে, জাম্বিয়ায় লাগে ২ দিন। সেখানে আমাদের দেশে লাগে এক থেকে দেড় মাস। বিদেশিদের বেলায় নিশ্চয়ই আরো বেশি।’

বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী গত বছর ১.৫ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়ে সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। বাংলাদেশ সরকারের সুযোগ আছে নান্নুদের মতো মানুষদের গুরুত্ব দেয়ার। তারা নিজের যোগ্যতায় কষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছেন নিজের ব্যবসা। সুযোগ পেলে বাংলাদেশের হয়ে তারা আরো ভূমিকা রাখতে পারেন। দূতাবাসগুলোর উচিত বিদেশী বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনার জন্যে নান্নুদের মতো মানুষদের কাজে লাগানো। কারণ, নান্নু সৎ, যোগ্য, দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক। তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান।

তিনি মনে করেন প্রবাসীদের বাংলাদেশে ছোট করে হলেও বিনিয়োগ করা উচিত। তা হলেই দেশ একদিন মালয়েশিয়া বা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শ্রমমূল্য এখনো কম এবং এই কম পারিশ্রমিকে বাঙালি শ্রমিকরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। কাজেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ লাভজনক।’ বাংলাদেশের জন্য কিছু করা প্রসঙ্গে নান্নু বলেন, ‘বাংলাদেশে কিছু করার জন্য আমি সদাপ্রস্তুত। তিন চাকার সিএনজি, বাইক মাত্র এক বছরের মধ্যে বাজারজাত করা সম্ভব বাংলাদেশে প্রস্তুত করে। কিন্তু সে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করার প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। মেড ইন বাংলাদেশ বাইক বা সিএনজি তা হলেই সম্ভব হবে। তবে শুধু সরকারের ওপর দোষ চাপালেই চলবে না। আমাদের মধ্যেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছেন যারা স্বল্প বিনিয়োগে অল্প সময়ে অধিক মুনাফা লাভে ব্যস্ত হয়ে যান। ফলে পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের ক্রেতারা বিদেশি পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং বাংলাদেশি পণ্য গুণগত মানের জন্য বিদেশি বাজারে টিকে থাকতে পারে না।’

২০০৭ সালে টোকিওর প্রসিদ্ধ স্থান OTAKU-তে NK বিল্ডিং নামে কোম্পানির নিজস্ব জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করেন এবং NK International-এর হেড অফিস স্থানান্তর করেন।

সততা, নিষ্ঠা এবং কর্মস্পৃহা আর তার সঙ্গে অধ্যবসায়ের সমন্বয় থাকলে একজন মানুষকে যে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এমডি এস ইসলাম নান্নু। অত্যন্ত সাদাসিধে এবং উদারচিত্তের এই মানুষটি যে শুধুই ব্যবসায়ী তা কিন্তু নয়। তিনি একজন সফল সংগঠক, সংস্কৃতিমনা এবং দানশীল ব্যক্তি। ব্যক্তি জীবনে তিনি বিবাহিত এবং ২ কন্যা সন্তানের গর্বিত পিতা। স্ত্রী ফারজানা ইসলাম বেবী এবং কন্যা নাফাস ইসলাম ও ইউস্রা ইসলামকে নিয়ে জাপানে বসবাস করছেন।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]