একুশে ও বাজার অর্থনীতি

মফিদুল হক
অর্থনীতির প্রসারে সমাজে পণ্যভোগীর সংখ্যা বাড়ছে, আর পণ্যভোগের মাত্রাবৃদ্ধি অর্থনীতিতে যোগাচ্ছে শক্তি। এই চক্র বয়ে আনছে প্রবৃদ্ধি, সেই সাথে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এমন এক পণ্যভোগী মানসিকতার দিকে যা তার মানবসত্তাকে আবৃত করতে উদ্যত হয়েছে এবং পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছে পণ্য ভোগ ও উৎপাদনের চাহিদা মেটাবার নিরন্তর প্রক্রিয়া দ্বারা পরিবেশ বিপন্ন করে

এবারের একুশে অনেক দিক থেকে ছিল ভিন্নতর। দেশের ও সমাজের অভ্যন্তরে যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে, ভাষা-জাতিচেতনায় দেশবাসী যে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত, একুশে উদযাপন ঘিরে দেশব্যাপী নানা উদ্যোগ আয়োজন এবং সেসবে সর্বস্তরের মানুষের সম্পৃক্তি সেই পরিচয় মেলে ধরে। একুশে তো নিছকই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের দাবি ছিল না, ছিল তার চেয়েও গভীরতর চেতনার বাহক। রাষ্ট্রভাষার দাবি তো ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে মেনে নেয়া হয়েছিল, ১৯৬২ সালের আইয়ুবি সংবিধানেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি। তবে সেসব তো ছিল পাকিস্তানিদের বাধ্য হয়ে পিছু-হটা, জাতিকে শৃঙ্খলিত ও শোষিত হিসেবে বজায় রাখতে তাদের চেষ্টার অন্ত ছিল না। শত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে একাত্তরে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে ভাষার অধিকারের দাবি পায় সার্থকতা, স্বতঃসিদ্ধভাবে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে বাংলা অর্জন করে স্বীকৃতি, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় থেকে যে-আন্দোলনের সূচনা তা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্জন করে সার্থকতা। কিন্তু একুশে তো নিছক ভাষার অধিকারের সীমিত দাবি ছিল না, ভাষা ছিল ঘুরে দাঁড়াবার অবলম্বন, ভাষা-আন্দোলন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জাতির জেগে-ওঠার জন্য মরণপণ সংগ্রাম। তদুপরি ভাষার রয়েছে সেই শক্তি, যা জাতির মধ্যে বৃহত্তম ও ব্যাপকতম ঐক্য গড়বার ক্ষমতা রাখে। আর তাই ভাষা আন্দোলন সহজেই রূপান্তরিত হয়েছিল পদানত জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। যে-কারণে কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতিতে ভাষা আন্দোলন সীমিত ও সার্থক হয়ে ওঠে না, হয় অধিকার আদায়ের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমণে একটি সাফল্যের স্বীকৃতি-লাভ। আর তাই বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন একবিংশ শতকে নতুন তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। সেই বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা ও নতুন যুগে নবতর দায়িত্ব-বোধে উজ্জীবিত হওয়ার মধ্যেই মিলবে একুশের সার্থকতা, আর সেখানে আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে অনেক।

ঘাটতি তৈরি হচ্ছে অনেক দিক থেকে। তার একটি প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখছি একুশের মুখ বিজ্ঞাপনে ঢেকে যাওয়ার দশা পেয়েছে। তার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে কোনটা বিজ্ঞাপন ও কোনটা সামাজিক উদ্যোগ সেই সীমারেখা ধূসর হয়ে একাকার করে ফেলছে সবকিছু। বাজার অর্থনীতির আছে এক অন্তর্গত তাগিদ, বিপণন সাফল্য অর্জনের জন্য সকল সুযোগ চাতুর্য্যরে সঙ্গে ব্যবহারের তাগিদ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতা, উৎপাদন-ক্ষমতার বিপুল বিকাশের কারণে, প্রযুক্তির সুবিধার কল্যাণে সংখ্যায় স্বল্পতর শিল্পশ্রমিক অধিকতর উৎপাদনে পারঙ্গম হয়েছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাহুল্য তৈরি হচ্ছে সমাজে। এমন কি যে-সমাজ পশ্চাৎপদ, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সেখানেও অর্থনীতিতে বাহুল্যের উপকরণ জায়গা করে নিচ্ছে। স্থায়ী বা বারংবার ব্যবহার-উপযোগী পণ্যের চেয়ে একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের প্রচলন এখন অনেক বেশি। কলম হয়ে উঠেছে সস্তা, ব্যাপক মানুষের নাগালের মধ্যে এইসব বলপয়েন্ট ব্যবহার শেষে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। তেমনি আছে টিস্যু পেপার, হাত বা মুখ মোছার জন্য রুমালের বিকল্প, উৎপাদকের সুবিধা হলো এ-আর দ্বিতীয়বার ব্যবহারযোগ্য নয়, তাই চাহিদাও কখনো ফুরোবার নয়। অর্থনীতির প্রসারে সমাজে পণ্যভোগীর সংখ্যা বাড়ছে, আর পণ্যভোগের মাত্রাবৃদ্ধি অর্থনীতিতে যোগাচ্ছে শক্তি। এই চক্র বয়ে আনছে প্রবৃদ্ধি, সেই সাথে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এমন এক পণ্যভোগী মানসিকতার দিকে যা তার মানবসত্তাকে আবৃত করতে উদ্যত হয়েছে এবং পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছে পণ্য ভোগ ও উৎপাদনের চাহিদা মেটাবার নিরন্তর প্রক্রিয়া দ্বারা পরিবেশ বিপন্ন করে।

কিন্তু সেসব বৃহত্তর পটভূমি আমাদের বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রে মনে হতে পারে অপ্রাসঙ্গিক, তবে এর উপজাত হিসেবে পরিচালিত তৎপরতার অন্যতর এক প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য রয়েছে। পণ্য ব্যবহার প্রসারের জন্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মের দুই ক্ষেত্র হয়েছে ব্র্যান্ডিং এবং সি.এস.আর বা করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে দুটি পৃথক ধারা, কিন্তু করপোরেট মানসে এর রয়েছে পরম সাযুজ্য, যদিও সেই সাযুজ্য রাখঢাক করে রাখাটাই দস্তুর। ব্র্যান্ডিং হচ্ছে কোম্পানির বিশেষ ইতিবাচক ইমেজ দাঁড় করাবার প্রয়াস, যে ইমেজের সঙ্গে ব্যাপক সংখ্যক ভোক্তা নিজেদের সম্পৃক্ত ভাবতে পারবেন এবং সেই বিশেষ পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। এই ব্র্যান্ডিং-এর ধ্যান-ধারণা গড়ে তোলবার জন্য নিয়োজিত হয় কর্মীদল, অত্যন্ত দক্ষ, স্মাটর্, কুশলী তবে নির্মম। নির্মম এই অর্থে যে, ব্র্যান্ডের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সুকৌশল ব্যবহারে এদের কোনো পরোয়া নেই এবং সমাজমানস নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ব্র্যাণ্ড স্ট্রাটেজি তারা প্রণয়ন করেন। এই কাজ বাজার অর্থনীতির সহজাত দিক, আশা করা হয় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ভোক্তাও লাভবান হবেন, পাবেন উন্নত পণ্য, আর তাই করপোরেট বিশ্বে পণ্য উৎপাদনের মতোই জরুরি হয়ে উঠেছে পণ্যের ব্র্যান্ডিং।

আমাদের ক্ষেত্রে মুশকিল হয়েছে করপোরেট ব্র্যান্ডিং-এর সম্প্রসারিত হাত, বিপুল অর্থ-ক্ষমতার জোরে ব্র্যান্ড কর্তারা ক্রমেই আরো বেশি করে ব্যবহার করছেন দেশপ্রেমের উপাদান। এই প্রবণতার মধ্যে একটি ইতিবাচক স্বীকৃতি রয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে, দেশভাবনার যে বিশেষ স্থান রয়েছে তার স্বীকৃতি মেলে পণ্য ব্র্যান্ডিং-এ এমত উপাদানের ব্যবহারে।

বিজ্ঞাপন প্রণেতাদের আজ থেকে অনেক আগে, সেই ষাটের দশকে, সমাজবিশ্লেষক ভান্স প্যাকার্ড বলেছিলেন, ‘দি হিডেন পারসুয়েডার্স’, যারা সংগুপ্ত থেকে যোগায় প্ররোচনা। তারপর পণ্য বিপণন ও বিজ্ঞাপন জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, বিজ্ঞাপন কৌশলে বড় জায়গা নিয়েছে ব্র্যান্ডিং, তা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপন-প্রণেতার পূর্বতন ভূমিকায় বিশেষ বদল হয় নি,বরং তা হয়েছে আরো ক্ষুরধার, পরিব্যাপ্ত ও সংগুপ্ত। সেই সাথে প্ররোচনা হয়ে উঠেছে সর্বগ্রাসী। ব্র্যান্ডিং-এর এক পশ্চিমী যুবরাজ বলেছিলেন যে, তার লক্ষ শিশু যেন মা অথবা বাবা শব্দোচ্চারণের সঙ্গে শেখে কোকাকোলা বলতে। এই লক্ষ অর্জনে ব্র্যাণ্ড ইমেজ তো নানাভাবে প্রক্ষিপ্ত হয়, টেলিভিশন তার প্রধান বাহন, সেই সাথে আরো রয়েছে সংবাদপত্র, বিলবোর্ড এবং হরেকরকম নতুন নতুন মাধ্যম, হালে তার সাথে যুক্ত হয়েছে মিডিয়া ইভেন্ট।

তো বাজার অর্থনীতিতে চলবে প্রতিযোগিতার খেলা, ব্র্যান্ডিং-এর জন্য পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে নানা ইমেজ, সত্য ও কল্পনার মিশেলে। প্রক্ষিপ্ত ইমেজের সঙ্গে পণ্যের যোগ বড় প্রশ্ন নয়, বড় বিবেচনা হলো পণ্যের গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি দাঁড় করানো। এই প্রক্রিয়া অর্থনীতিতে চলবে, সেখানে বাধা দেয়ার কেউ নেই। কিন্তু বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ডিং প্রয়াস যেন বাজার অর্থনীতিতে সীমিত থাকে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সমার্থক অথবা সেই প্রয়াসের মধ্যে সঙ্গোপনে প্রযুক্ত না হয়, তেমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার এবং সেই ধরনের অনেক রীতি সব সমাজে রয়েছে। যেমন টেলিভিশনে প্রচারিত নাটকে বিজ্ঞাপন বিরতির ঘোষণা জানিয়ে প্রচারিত হয় পণ্যের গুণকীর্তন। মঞ্চনাটকে বাস্তব বিরতিকে বিজ্ঞাপন বিরতির রূপ দিলে কেউ সেটা বরদাস্ত করবেন না, তা হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতির লঙ্ঘন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হয় নানা ধরনের, কিন্তু কোনো বিজ্ঞাপন যদি সংবাদ বা নিবন্ধের আকার নেয় তবে সেখানে লিখে দিতে হয় ‘বিজ্ঞাপন’, পাঠক যাতে প্রতারিত না হন সেজন্য এই ব্যবস্থা। এটা সব দেশে সব সমাজে পালনীয়, এমন কি বাজার অর্থনীতির পরাকাষ্ঠা দেশেও। জানুয়ারি ২০১০ সংখ্যা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে তিন পাতা জুড়ে ছাপা হয়েছে তুরস্কের পূর্ব উপকূলের নিসর্গ বিষয়ক বিবরণ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পত্রিকারই কোনো নিবন্ধ। কিন্তু লক্ষ্য করা যাবে প্রতি পৃষ্ঠার উপরে লেখা রয়েছে ‘বিজ্ঞাপন’। পর্যটকদের তুরস্ক আগমনে প্ররোচনা যোগাতে সে-দেশের পর্যটন বিকাশ সংস্থার এই চেষ্টা এবং লেখাটি যে বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণীত পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সেটা উল্লেখ করে দিয়েছেন পাঠকের অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে।

ব্র্যান্ডিং-এর জন্য অনেক কিছু করা চলে কিন্তু কোথাও নিশ্চয় এর সীমারেখা টানা আছে। কোনো উপন্যাসে কাহিনীতে ব্র্যাণ্ডের উল্লেখ থাকতে পারে, কিন্তু ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজির অংশ হয়ে কেউ নিশ্চয় উপন্যাস শুরু করবেন না এভাবে, “ডেনিম জিনস ও পোলো শার্ট পরা স্মার্ট তরুণ যখন পকেট থেকে বের করলো রুমালি রুটির মতো পাতলা ও পারস্যের গোলাপের মতো উজ্জ্বল নকিয়া হ্যান্ডসেট তখন সানসিল্কের স্পর্শে মোলায়েম হয়ে-ওঠা চুলের গোছা ঝাঁকিয়ে পাশের তরুণীটি বললো, বাঃ বেশ তো!” সৃজনশীলতার গণ্ডিতে ব্র্যান্ডিং-এর ব্যবহার সামাজিকভাবে পরিত্যাজ্য তবে ভবিষ্যতে কেউ যদি চুক্তিবদ্ধ হয়ে এমন কাজ করতে উদ্যোগী হয় তবে কি ঘটবে আমরা জানি না।

বাংলাদেশে আরো অনেক কিছুর মতো শিষ্টাচারের সীমা মানতে নারাজ ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরিতে বেপরোয়া বহুজাতিক করপোরেট সংস্থা। তারা গুলিয়ে ফেলছেন বা গুলিয়ে দিচ্ছেন ব্র্যান্ড ইমেজ নির্মাণে ব্যবসায়িক প্রয়াসের সঙ্গে সি.এস.আর তৎপরতা। সি.এস.আর ব্যয়িত হওয়ার কথা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে সহায়ক হিসেবে, কিন্তু সামাজিক কর্মকাণ্ডের নামে সংস্থা স্বয়ং হয়ে উঠছে ব্র্যান্ডিং সহায়ক তথাকথিত সামাজিক উদ্যোগের নির্মাতা, সামাজিক বাতাবরণ তৈরি করে পুরো তৎপরতাকে কৌশলে ব্যবহার করছে ব্র্যান্ডিং-এর কাজে। ব্র্যান্ডিং চলুক বাজার অর্থনীতির পরিধিতে, সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বহাল থাকুক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। কিন্তু বাড়তি ফায়দা লুটতে দেশপ্রেম ও সামাজিক অঙ্গীকারের উপাদান নিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডের নামে ব্র্যান্ডিং-এর খেলায় তাদের রত হতে দেয়াটা বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনবে। একুশে ঘিরে তিরিশ মিনিটের ব্র্যান্ড ইভেন্ট সংঘটিত হলো ঢাকায় এবং দেশের আরো কতক শহরে। এজন্য ব্যবহার করা হলো মানুষের অন্তরের সামাজিক আকুতি, একুশের চেতনা। বহুজাতিক করপোরেট সংস্থাই উক্ত ইভেন্টের উদগাতা ও পরিকল্পক, জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে তাদের কাফেলায় শরিক হয়েছেন আরো অনেকে নিজেদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অসতর্ক প্রকাশ ঘটিয়ে। সুন্দর এক উদ্যোগ বটে, তবে সেখানে সবার ওপরে বড় হয়ে উঠলো ব্র্যান্ড সত্য, বিজ্ঞাপনে প্রচার মাহাত্ম্যে ব্র্যান্ড কর্তারাই নির্ধারণ করলেন ইভেন্টের চারিত্র এবং সেই মতো গড়ে উঠলো অনুষ্ঠানের বচন। এই অনুষ্ঠান প্রকৃত অর্থে কোনো সামাজিক আয়োজন ছিল না, বরং দেখা গেল যে সমাজশক্তির ওপর রবীন্দ্রনাথ এমন প্রবল আস্থা অর্পণ করেছিলেন তার বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে করপোরেট পরিকল্পিত ইভেন্ট, সমাজকেও ওয়াল টাইম ইউজের মতো ব্যবহারে পারঙ্গম। ব্র্যান্ড ক্যামপেইন হিসেবে সফল একটি প্রয়াস আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, কিন্তু একুশের চেতনা ও সামাজিক অঙ্গীকারের নিরিখে কী প্রত্যক্ষ করেছি সেটা বোধ করি ভাববার বিষয়। আমরা দেখলাম পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রকাশের সমান্তরালে ব্র্যান্ড ইভেন্টের সূচনা ঘটলো, টেলিভিশনে শুরু হলো বিজ্ঞাপন, রাতারাতি শহর জুড়ে আত্মপ্রকাশ করলো বিলবোর্ড, পরদিন সব জাতীয় দৈনিকের পাতা জুড়ে রঙিন বিজ্ঞপ্তি। ব্র্যান্ডের জন্য চাই রং, চাই শ্লোগান, সেই রঙ ও শ্লোগানকে আবার ব্র্যান্ড ইমেজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তাই একুশে হয়ে উঠলো কাছে আসার শক্তিতে গড়ে-ওঠা ইতিহাস, ব্র্যান্ডের বশংবদ এমন একুশে তো কখনো আসে নি আগে, যেমন আসে নি রোদন-ভরা এ-বসন্ত। ব্র্যান্ড কর্তারা জানেন ইমেজকে এখন হয়ে উঠতে হয় পাসিং-ইমেজ, দ্রুত ধাবমান এই সমাজে ভোক্তার হাতে সময় খুব কম, তার মনোযোগ আকর্ষণ করে চট্জলদি গেঁথে দিতে হবে ইমেজ এবং ইমেজের পরিপূর্ণতার জন্য দ্রুত প্রাপ্তযোগ্য ভাব মেলে ধরতে হবে। তাই তো এখন অনেক বেশি কদর ইন্সট্যান্ট সামগ্রীর, এক মিনিটে মিলবে কফি, তিন মিনিটে নুডলস এবং ইতিহাস নির্মাণেও প্রয়োজন তিরিশ মিনিট আর প্রয়োজন ব্র্যাণ্ড ইমেজকে অন্তরে গেঁথে দেয়া।

কার্ল মার্কস বলেছিলেন যে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে প্রথমে যা ছিল মহান ঘটনা অথবা আনন্দময়, পুনরাবৃত্তিতে তা হয়ে ওঠে প্রহসন বা ফার্স। মার্কস-অনুসারীরা ইতিহাসের এক মহান ঘটনার অবতারণা করেছিল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব সংঘটনের মাধ্যমে, আর সেই বিপ্লবের রূপকার হয়ে উঠেছিলেন প্রতিভাবান মার্কিন সাংবাদিক জন রিড, রচনা করেছিলেন যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’। এখন আমরা একুশে ঘিরে ব্র্যান্ডের শ্লোগানে পেয়েছি তার পুনরাবৃত্তি, এর রূপবিচার কে কীভাবে করবেন জানা নেই। তবে হান্স ক্রিশ্চিয়ান আনদেরসনের সেই ‘উলঙ্গ রাজা’ গল্পের মতো কোনো অপাপবিদ্ধ বালক নিশ্চয় রয়েছে আমাদের সমাজে, রাজার অলীক সাজপোশাকের প্রতি সকলের সোৎসাহ সমর্থন ও মহিমা-কীর্তনের মধ্যে যে উচ্চারণ করতে পারবে, “মহারাজ, আপনি তো উলঙ্গ।”

সকালে শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে চলতে গিয়ে চোখে পড়ে ব্র্যান্ডিং-এর বিশাল বিলবোর্ড, একুশের মহিমাকে গ্রাস করে আপন প্রতিরূপ মেলে ধরেছে বিপুলভাবে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, বিলবোর্ডের নিচে কালো হরফে বড় বড় করে কে যেন লিখে রেখেছে, ‘রক্তে ভেজা ইতিহাস জনতার, কারো ধান্ধাবাজি আর ব্যবসার জন্য নয়।”

জয়তু একুশ!

[ad#co-1]