মৌলবাদের বিরুদ্ধে হুমায়ুন আজাদ একটি প্রতিরোধ -লতিফা কহিনূর

হুমায়ুন আজাদ এক সাহসের নাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার পদচারণা নেই এ রকম শাখা হয়তো কমই আছে। ধর্মান্ধতা আর মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে আপসহীন এই কলম-সৈনিক এক নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন ফ্যাসিবাদী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে। আর সে কারণেই ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মৌলবাদী ঘাতকের আক্রমণে আহত হন। এরপর সুস্থ হয়ে জার্মানিতে যান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা করতে। আর সেখানেই রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। তবে তার থেকেও আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, কত শত লোক একুশে পদক পেয়েছে, আরো পাবে, তবে তাদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদের নাম নেই। এই জাতি প্রকৃত বীর, সময়ের প্রয়োজনীয় মানুষদের কবে দেবে তার প্রাপ্য সম্মান? হুমায়ুন আজাদের কাছের মানুষ, আপন মানুষ লতিফা কহিনূর রাজকূটের কাছে বলেছেন সেসব কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যিশু মহমমদ

: মৌলবাদীদের দ্বারা হুমায়ুন আজাদকে হত্যার চেষ্টা মামলার কোনো চার্জশিটের তথ্য এযাবৎ আপনাদের কাছে এসেছে কি?

: আমাদের প্রথম চার্জশিট দিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের নভেম্বরে। বিএনপির আমলে আমাদের কোনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে বিএনপি-জামায়াত একদম নীরব ছিল, কিছুই করেনি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক আমলে যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল তা আমাদের কিছু ক্ষেত্রে মনঃপূত হয়নি। সেখানে লেখা ছিল, হুমায়ুন আজাদকে হত্যার চেষ্টায় ছিল জেএমবির শায়খ আবদুর রহমান, সানি, মিনহাজসহ আরো দুই-তিনজনের নাম। মিনহাজ এখনও কারাগারে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে বলেছিল, হুমায়ুন আজাদ ইসলামের বিরুদ্ধে লেখে, তাই তারা হামলা করেছিল। তারা ব্লাসফেমি আইন করে এ ধরনের লেখালেখি বন্ধ করার কথাও বলেছিল। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছিল বিষয়টা দায়-দায়িত্বহীনভাবে অন্য খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছিল। আমাদের মনঃপূত না হওয়ার কারণ, জেএমবিসহ মৌলবাদী যেসব জঙ্গিবাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয় তাদের পেছনে কে ছিল? এদের তো পেছন থেকে অদৃশ্য শক্তি লেলিয়ে দেয়। সেই পেছনের বা নেপথ্যের আদেশদাতা আসল খুনিকে বিচারের মুখোমুখি আনতে হবে, আমরা তার বিচার চাই। জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তো সংসদে দাঁড়িয়েই হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে বলেছিল, এটা সবাই জানে।

: মৌলবাদীদের আঘাতের পর হুমায়ুন আজাদকে চিকিৎসার জন্য কারা কারা এগিয়ে এসেছিল? তৎকালে বিএনপি সরকারের এ ব্যাপারে ভূমিকাকে কিভাবে দেখেন?

: হামলার পরপর বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংগঠন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হুমায়ুন আজাদকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা বলেছি, না। চিকিৎসার দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। তিনি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দায়িত্ব নেবে। তারপর তো আপনারা দেখেছেন বিএনপি সরকার জনগণের চাপে, ছাত্রদের আন্দোলনের চাপে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেরা আন্দোলনে নেমেছে, সারা দেশ প্রতিবাদী হয়েছিল। মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি তো একটা প্রতিরোধ।

: মামলার অগ্রগতির বিষয়ে বর্তমান সরকারের কোনো সহযোগিতা বা আশ্বাস পেয়েছেন কি?

: ওভাবে কিছু জানানো হয়নি। আশা রাখি একটা সুষ্ঠু বিচার পাব। আগের চার্জশিটে আপত্তি তোলার পর কিছু দিন আগেও তদন্তকারীরা এসেছিলেন। যেখানে যেখানে যাওয়া দরকার তাঁরা নাকি গিয়েছিলেন। আমি বলেছি, তাহলে চার্জশিট দেওয়ার আগে কিন্তু আমাকে দেখাতে হবে। বোধহয় আসছে মার্চ মাসে এ বিষয়ে জানব। আমাদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করল আপনারা কাউকে সন্দেহ করেন কি না? এখন আমরা সন্দেহ করব কাকে, আমরা তো নিজে দেখিনি। পত্রিকার মাধ্যমে যা জেনেছি, সারা দেশ যাদের সন্দেহ করেছে, আমরা তাই বলেছি। তাঁকে চিকিৎসা শেষে ফিরে আসার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, আপনারা সাঈদী, নিজামীকে জিজ্ঞাসা করুন। আসলে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটা হচ্ছে মূল কারণ। তিনি ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, পাক সার জমিন সাদ বাদ, আরো আরো বই মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখা। মৌলবাদীরা দেখল তারা তাঁকে হুমকি দিয়েও তার লেখনি থামাতে পারছে না। তিনি খুব সাহসী ছিলেন, এমন সাহসী হয়ে কেউ তো লিখত না, তাই তারা খুন করতে চেয়েছে। একেবারে শেষ করে দিলে তাদের ভালো হয়। নইলে তো বইটা ব্যান্ড করে দিলেই হতো। যদি তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে বললে মৌলবাদীদের অনুভূতিতে লাগে, তাহলে তারা তো পাল্টা লিখে প্রতিবাদ করতে পারত। ইসলাম ধর্ম তো কোনো দুর্বল ধর্ম নয় যে, একটা বইয়ের কারণে তার ক্ষতি হবে। এ জন্য মানুষকে মেরে ফেললে তাদের কি কোনো অনুভূতিতে লাগে না? খুনোখুনি করবে কেন? আমার মনে হয় কি, তাঁর নারী বইটি যেমন নিষিদ্ধ করে রাখা যায়নি, তেমনি কোনো বইও নিষিদ্ধ করে রাখা যাবে না। তাই যেন আর না লিখতে পারে এজন্য তারা হামলা করেছিল। মামলার ব্যাপারে আমরা আস্তে আস্তে এগোচ্ছি। তাড়াতাড়ি করার জন্য আমাদের সঙ্গে কেউ তো এগিয়ে আসবে না। তবে সুষ্ঠু বিচার পাব কি না সন্দেহ। হুমায়ুন আজাদ তো কোনো পলিটিক্যাল ফিগার নয়। আমরা এখন খুব সাবধানে থাকি।

: জার্মানিতে হুমায়ুন আজাদের আকস্মিক মৃত্যুকে আপনারা কিভাবে দেখছেন? কোনো সন্দেহ জোগায় কি?

: জার্মানিতে গিয়েছিলেন কবি হাইনরিকের ওপর গবেষণা করার জন্য। ওখান থেকে মৃত্যুর পাঁচ দিন পর আমাদের কাছে খবর আসে, মিউনিখ শহরে তার নিজস্ব কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে হত্যা করার পেছনে অনেকেই সন্দেহ করে, খুনিরা জার্মানিতেও গিয়েছিল। আমিও কিছুটা সন্দেহ করি এ কারণে, জার্মানি থেকে যে রিপোর্ট দেয় সেখানে লেখা ছিল তার ওখানে ঘুমের ট্যাবলেট পাওয়া গিয়েছিল। তিনি আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে মারা যান। হার্টফেল করেছেন। তখন তো ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ ছাড়া অন্য ওষুধ খাওয়ার প্রশ্ন আসে না। আর মূল ব্যাপারটা তো হলো তাকে এখানে এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে যে আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। হয়তো ওষুধের কারণে দুই-একদিন সাময়িক ভালো ছিলেন। তার ভেতরের জখমটা পুষে রেখেছিলেন, কাউকে জানাননি, যদি আমরা দুশ্চিন্তা করি।

: চিকিৎসা শেষে ফিরে আসার পর মানসিক অবস্থা কী ছিল? জার্মানি যাওয়ার পেছনে কি কোনো নিরাপত্তাহীনতা কাজ করেছিল?

: ব্যাংকক থেকে যখন চিকিৎসা করিয়ে ফিরে এলেন তখনও বিভিন্ন জায়গায় মৌলবাদীরা হইচই করেছিল। তাকে মেরে ফেলার হুমকি আসত, ফোনে হুমকি দিত, প্রায় দিনই বলত বোমা মেরে বাড়ি উড়িয়ে দেওয়া হবে, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, ছেলেকে ধরে নিয়ে যাবে। তখন তিনি খুব বিপর্যস্ত হয়ে গেলেন, বলতেন, ‘এসব কিছু হচ্ছে আমার জন্য? ঠিক আছে তাহলে আমি চলে যাই।’ তারপর আমাদের আত্দীয়-স্বজনও বলল, যাক, বাইরে থেকে ঘুরে এলে তিনিও ভালো থাকবেন; হইচইটাও কমবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার চলে আসবেন দেশে। তখন বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু সংগঠন, লন্ডন থেকে একটা পেন ক্লাব সপরিবারে আশ্রয় দিতে চেয়েছিল, তোমার দেশে থাকা তো ঠিক হবে না, তুমি চলে এসো। একবার ভাবলেন কোথাও যাবেন না, আবার ১১ দিনের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলেন জার্মানি যাবেন। কিভাবে এত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করলেন জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, আগেই নাকি অ্যাপলাই করেছিলেন। এখন আহত হয়েছে জেনে তারা তাড়াতাড়ি নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। বললেন, জার্মানি থেকে এসে সিদ্ধান্ত নেবেন কী করবেন? কিন্তু গিয়ে তো আর ফিরলেন না।

: এ দেশ, রাষ্ট্র তাকে কতটা মর্যাদা দিতে পারছে বলে আপনি মনে করেন? ভবিষ্যতে স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি?

: আমি একটা সত্যি কথা বলি, আমি কারো নিন্দা করছি না, সমর্থনও করছি না। যদি কেউ মূল্যায়ন করে থাকেন, তিনি তো একুশে পদক পাওয়ার যোগত্যা রাখে, কই, এ বিষয়ে কি কোনো ঘোষণা এসেছে? বাংলা একাডেমীতে প্রতি বছর বইমেলার ২৭ তারিখে হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়, এ দিনকে হুমায়ুন আজাদ দিবস হিসেবে পালনের জন্য অনেকে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটাও হচ্ছে না। তাকে যেখানে হামলা করা হলো, সেখানে একটা স্তম্ভ করতে তো পারে, কিন্তু করবে না। হুমায়ুন আজাদের বইগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত, মৌলবাদীরা যেন এ বইগুলোকে নিষিদ্ধ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু কই, কেউ তো মূল্যায়ন করছে না? ওই যে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল করতেন না, নির্দলীয় ছিলেন। তিনি যদি কোনো দলের হতেন তাহলে তো ঠিকই দিত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর যে বহুমাত্রিকতা, সেই মূল্যায়ন কী তিনি পাবেন অন্তত রাষ্ট্রীয়ভাবে? আমরা ‘হুমায়ুন আজাদ কবিতা পুরস্কার’ এ বছর আগস্ট মাসেই প্রথমবারের মতো দিচ্ছি। তারপর গ্রামের বাড়ি রাঢ়িখালে হুমায়ুন আজাদ প্রথম যে স্কুলে পড়েছিলেন সেখানে আমরা গরিব-মেধাবীদের মধ্যে একটা বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করব বলে ভাবছি। আর দেশের মুক্তমনা মানুষ তো আছে, তাঁর বিশাল পাঠক গোষ্ঠী আছে, তারা তো তাকে মূল্যায়ন করছেই, জ্ঞান তো আর আটকে রাখা যাবে না। মানুষটা যুদ্ধ করতে করতেই যেন মারা গেলেন, কোনো কিছুর প্রতি হার মানতেন না, এত সাহসী ছিলেন!

[ad#co-1]