রতনপুরের সূর্যমুখি

ই ম দা দু ল হ ক মি ল ন
জায়গাটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। হুবহু আমার নাটকের পটভূমি। যেন এই জায়গা ঘুরে গিয়েই নাটকের গল্প সাজিয়েছিলাম।
আশ্চর্য ব্যাপার!
এ কী করে সম্ভব!
সঙ্গের লোকজন কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে জায়গাটা দেখি।
বিশাল মাঠের ধারে গাছপালা ঘেরা গ্রামের বড়লোক বাড়ি। বাড়িতে চৌচালা টিনের চারখানা ঘর। মাঝখানে সাদা মাটির নিকনো উঠোন। উঠোনের কোণে ধানের গোলা, পায়রার খোপ। দূর থেকেই পায়রাদের বাকবাকুম শব্দ পাচ্ছিলাম।

মাঠের পাশ থেকে বাড়ির কাছারি ঘরের দিকে চলে গেছে সরু একখানা পথ। পথের দুধারে গাছপালা ঘেরা বাগান। নানা রকমের ফুল ফুটে আছে বাগানে।

অদূরে মাঠের কোণে তিন চারটি খড়ের গাদা। খড়ের গাদা ছাড়িয়ে গ্রাম জনপদের মতো করে সাজানো কয়েকটি দোকানপাট। একটি চায়ের দোকানও আছে।

এসবের ঠিক উল্টোদিক, মাঠের শেষে বাঁধানো ঘাটলার চমৎকার পুকুর। পুকুর ধারে নানা রকমের গাছপালা, ফুল পাতাবাহারের ঝাড়। বিশাল বিশাল গাছপালা।

এই পুকুরের পশ্চিমে মধ্যবিত্ত গ্রামগৃহস্থের বাড়ি। বাঁশের বেড়ার ঘর, গোয়াল। বাড়িতে ঢোকার মুখে ছোট্ট বাংলাঘর। ঘরের চালা ছেয়ে আছে মাধবীলতায়। অতি শান্ত øিগ্ধ, মনোরম পরিবেশ।

আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আর মনে মনে শুটিং প্লান করি। বড়লোকে বাড়িটা হবে শমী কায়সারদের। অর্থাৎ তালুকদার বাড়ি। পুকুরের পশ্চিমের মধ্যবিত্ত বাড়িটি হবে তৌকিরদের। কে কোথা দিয়ে হেঁটে আসবে, কোথায় মিট করবে, মনে মনে ঠিক করি আমি।
কিন্তু চম্পাদের বাড়ি হবে কোনটা?
চম্পার চরিত্রে অভিনয় করবে শাম্মি নামের একটি মেয়ে। দেখতে মোটামুটি ভাল মেয়েটি। অভিনয় কেমন করে জানি না। আগে দুএকটি নাটকে অভিনয় সে করেছে। আমি দেখিনি।

চম্পা চরিত্রে প্রথমে যে মেয়েটির অভিনয় করার কথা ছিল, অভিনয়টা সে করল না। আগে থেকেই ভেবেছিলাম এই চরিত্রে একটি নতুন মেয়েকে নেব। ডিরেক্টর এবং ক্যামেরাম্যানকে বলায় তাঁরা, দুজনেই একটি মেয়ের কথা বললেন। আমার এসিস্টান্ট মেয়েটিকে খবর দিল। খালা এবং ছোট বোনকে নিয়ে মেয়েটি এল আমার সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু তাকে আমার পছন্দ হল না। পছন্দ হল ছোট মেয়েটিকে। আমার চম্পা চরিত্রের সঙ্গে মেয়েটির বেশ মিল।
কিন্তু একথা বলি কী করে?
তাছাড়া বড় মেয়েটি তৈরি হয়ে এসেছে।
মন খারাপ করে তাকে স্ক্রিপ্ট পড়তে দিলাম। মনিরা না কী যেন নাম মেয়েটির। বেশকিছু টিভি নাটকে নাকি অভিনয়ও করেছে।

কিন্তু তার স্ক্রিপ্ট পড়া দেখে আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম। সাধারণ পড়াটাই ঠিক মতো পড়তে পারছে না। এই মেয়ে অভিনয় করবে কী করে!
কিছু না ভেবেই ছোট মেয়েটিকে দিলাম স্ক্রিপ্ট পড়তে। আশ্চর্য ব্যাপার, স্ক্রিপ্ট সে শুধু পড়লই না, সঙ্গে সঙ্গে চমৎকার অভিনয়ও করে গেল।
আমি তো মুগ্ধ।
বড় মেয়েটিকে এবং তার খালাকে বললাম, আমি ওকে নিতে চাই।
শুনে তাদের দুজনেরই মুখ কালো হয়ে গেল।
কিন্তু ছোট মেয়েটি খুব উৎসাহী। সে রাজি।
খালা বলল, কাল আপনাকে ফোনে জানাব।
পরদিন ফোন করে মানা করে দিল। ওর তো পরীক্ষা। এখন নাটকে গেলে পরীক্ষা খারাপ হবে। বড়টাকে নিলে নিতে পারেন।

পলিটিক্সটা আমি বুঝলাম। বুঝে সরাসরি মানা করে দিলাম। না, ঠিক আছে। আমি অন্য কাউকে নিয়ে নেব।
তারপর শাম্মিকে খুঁজে বের করে দিলেন আমার ক্যামেরাম্যান লালভাই।
কিন্তু শাম্মিদের বাড়ি হবে কোনটা?

আমার সঙ্গে আট নাটকের ডিরেক্টর রিয়াজ সাহেব, ক্যামেরাম্যান লালভাই আর আমার এসিস্টান্ট হারুন। ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছি। মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে মাঠের ধারে। খানিক আগে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এই শুটিংস্পটের কেয়ারটেকার আবুল। রিয়াজ সাহেবের বিশেষ পরিচিত সে। তার সঙ্গেই কথা বলছিল।
লালভাই বললেন, স্পট পছন্দ হল?

আমি কথা বলবার আগেই রিয়াজ সাহেব বললেন, পছন্দ হওয়ার কথা। কারণ স্ক্রিপ্ট আমি পড়েছি। স্ক্রিপ্টের সঙ্গে স্পটটা বেশ মিলে যাচ্ছে। স্ক্রিপ্ট পড়ার পরই কিন্তু জায়গাটা আমি চয়েস করেছি।
রিয়াজ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি গভীর গলায় বললাম, থ্যাংক য়্যু ভেরিমাচ। পারফেক্ট জায়গাটা বের করেছেন। কিন্তু চম্পাদের বাড়ি হবে কোনটা?

আছে। একদম ওরকম একটা বাড়িই আছে।
তাই না কী! চলুন দেখি।
আগে আবুল ভাইর সঙ্গে কথাটা শেষ করি।
জ্বি প্লিজ।
আমরা তো চারটা বোথ শিফট করতে চাচ্ছি, না?
হ্যাঁ। তিনটে রাত এখানে সবাই থাকবে। থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
আবুল বলল, তা করতে পারব। তবে থাকতে হবে একটু কষ্ট করে।
কেন?
কাল থেকে একটা ফিল্ম ইউনিটও থাকবে।
রিয়াজ সাহেব বললেন, গানের সিকোয়েন্স না কি?
বলতে পারি না।

গানের সিকোয়েন্স হলে আমাদের রেকর্ডিংয়ে প্রবলেম হবে।
যাতে না হয় সেভাবে ব্যবস্থা করে দেব। চিন্তা করবেন না।
বুঝলাম আবুল লোকটি সবদিক ম্যানেজ করে চলতে পারে। এই ধরনের লোক আমার বেশ ভাল লাগে।
বললাম, আপনি তাহলে সেভাবেই সব ব্যবস্থা করুন। পরশু থেকে রেকর্ডিং করব আমরা। আজ বিকেলে জিনিসপত্র সব চলে আসবে আমাদের। এসিস্টান্ট এবং টেকনিশিয়ানরা থাকবে। আমরা আসব পরশু সকালে।
আসেন, কোনও অসুবিধা নাই।

আমি তারপর রিয়াজ সাহেবের দিকে তাকালাম। চলুন তাহলে ওই বাড়িটা দেখি।
আবুল বলল, ওখানে শুটিং চলছে।
রিয়াজ সাহেব বললেন, কিসের শুটিং?
সিনেমার। আজই ওদের কাজ শেষ হবে। কাল থেকে অন্য পার্টির কাজ।
শুটিংয়ের সময় বাড়িটা আমরা দেখতে পারব না?
তা দেখতে পারবেন।
চলুন তাহলে যাই।
চলুন।
বড়লোক বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে লাগলাম আমরা। এদিকে বাউন্ড্রি ওয়াল। লোহার বেশ বড় একখানা গেট আছে। গেটে তালা দেয়া ছিল। কোমর থেকে চাবি বের করে তালা খুলল আবুল। আমরা বেরিয়ে এলাম।

গেটের বাইরে পুবে পশ্চিমে একখানা মেঠো পথ। দুদিকেই পথ হারিয়ে গেছে মাজারি বনের ভেতর। পথের উত্তরে সবুজ ঘাসের ছোট্ট একখানা মাঠ। মাঠের পশ্চিমে পরিপাটি সেগুন বাগান, উত্তরে কলা বাগান। পুবদিকে হতদরিদ্র এক গৃহস্থবাড়ি। চারটে কুঁড়েঘর বাড়িতে। বারবাড়ির সামনে ভাঙাচোরা গোয়াল ঘর, দুটো খড়ের গাদা।
দেখে আবার মুগ্ধ হই আমি।

এই তো চম্পাদের বাড়ি। এই তো আমার লেখার মতো বাড়ি!
এই বাড়িতে বেশ একটা ভিড় লেগে আছে এখন। উঠোনে ক্যামেরা। ক্যামেরার পাশে ক্যামেরাম্যান এবং ডিরেক্টর। দুজনের মাথার ওপর ছাতা ধরে আছে দুজন বয়। পশ্চিম দিককার কুঁড়েঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নায়িকা।
বাড়ির ভেতর উঁকি মেরে উৎফুল্ল হলেন রিয়াজ সাহেব। আরে বেলাল আহমেদের ছবি না কী! বেলাল আমার বন্ধু। চলুন যাই। শুটিং চলা অবস্থায়ও পুরো বাড়ি ঘুরে দেখতে পারবেন। কোনও অসুবিধা নেই।
আমরা বাড়িতে ঢুকলাম। রিয়াজ সাহেবকে দেখে হৈ হৈ করে উঠলেন বেলাল আহমেদ। আরে, আমার দোস্ত এসে পড়েছে। দশ মিনিটের জন্য শুটিং প্যাকাপ।

বেলাল আহমেদের সঙ্গে রিয়াজ সাহেব আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
আমি তারপর নায়িকাটিকে চেনার চেষ্টা করলাম। চিনতে পারলাম না। নতুন মেয়ে। আজকাল প্রচুর নতুন মেয়ে সিনেমার নায়িকা হয়ে আসছে। প্যাকেজ নাটকেও প্রচুর নতুন ছেলেমেয়ে আসছে, কিন্তু চোখে পড়ার মতো একজনও নেই। এ জন্য আমার নাটক আমি শমী, তৌকিরকে নিয়েই করছি।
বেলাল আহমেদ বললেন, চা খাবে না কি রিয়াজ?
রিয়াজ সাহেব বললেন, এটা আবার জিজ্ঞেস করছ?

সঙ্গে সঙ্গে চা এল। উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। ঠিখ তখুনি মহিলাকে চোখে পড়ল। উত্তর দিককার কুঁড়েঘরটির পৈঠা লেপছে। হাতের কাছে ছোট্ট একখানা বালতি। বালতিতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে ভিজিয়ে তুলছে সে আর অতিযতেœ পৈঠা লেপছে। সাদা থান পরা। মাথায় গৃহস্থবাড়ির বউঝিদের মতো ঘোমটা দেয়া। লেপাগোছার কাজ করছে কিন্তু শাড়িতে ময়লা লাগেনি। ফলে চট করে দেখেও বাড়ির ঝি তাকে মনে হয় না।
এসব কারণেই কী না কে জানে, আমি বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মহিলাকে দেখতে থাকি। ষাটের কাছাকাছি হবে বয়স। বয়সের ছাপ বেশ ভালভাবেই পড়েছে মুখে। ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে কয়েক গোছা চুল। সেই চুলের প্রায় পুরোটাই সাদা। তার এত কাছে সিনেমার শুটিং হচ্ছে কিন্তু একবারও তাকে সেদিকে তাকাতে দেখি না। আপনমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।

ততক্ষণে বেলাল আহমেদ সাহেব আবার শুটিং শুরু করেছেন। বারান্দায় দাঁড়ানো নায়িকার ওপর আলো ফেলা হয়েছে। বারান্দার ছায়াকে প্রখর আলোয় ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। দিনের আলোর সঙ্গে মিলেমিশে আশ্চর্য এক আলোকিত ভাব বাড়িতে। এই আলোর অদূরে সেই মহিলা আপনমনে পৈঠা লেপছে। তার জীবন তার পরনের শাড়ির মতোই বিবর্ণ। মাত্র কয়েক হাত দূরের আলোকিত জগৎ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
আলোর পাশে অন্ধকার কি এভাবেই থাকে!

সিনেমার নায়িকার অদূরে জীবন সিনেমায় মার খাওয়া, সম্পূর্ণ ব্যর্থ আরেক নায়িকা তার মতো করে তার কাজ করে যায়। একটিমাত্র ক্ষেত্রে তাদের দুজনের বড় মিল। কাজ করে রোজগার করা, খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। একজনের কাজ অভিনয় দেখিয়ে মানুষের মনোরঞ্জন, আরেকজনের কাজ যেখানে দাঁড়িয়ে নায়িকা অভিনয় করবে সেই জায়গাকে লেপেপুছে পরিচ্ছন্ন রাখা।

এসব ভেবে ভেতরে ভেতরে একটু হাসিও পায় আমার। যাহ্ বাবা, প্যাকেজ নাটকের শুটিং স্পট দেখতে এসে যে ফিলোসফার হয়ে গেলাম!

রিয়াজ সাহেব ততক্ষণে একটা মোড়ায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন। তাঁর পাশে লালভাই। হারুন এবং মাইক্রোবাসের ড্রাইভারও আছে এখানে। সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে শুটিং দেখছে।

রিয়াজ সাহেব হাসি হাসি মুখ করে বললেন, একটা মোড়া দিতে বলি। আপনিও বসুন। আধঘণ্টাখানেক শুটিং দেখি।
বললাম, আপনারা দেখুন। আমি বরং চারদিকটা একটু ঘুরে দেখি।
প্লিজ।
আমি তারপর সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। কলাবাগানের পাশে যে সবুজ মাঠ সেই মাঠে উদাস হয়ে হাঁটতে থাকি। ঘুরে ফিরে মহিলার কথা মনে হয়। কেন কে জানে!
খানিক পর মহিলাকে দেখি ধীর, নরম ভঙ্গিতে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে আসছে। কাজ শেষ করে বুঝি হাত ধুয়েছে। এখন শাড়ির আঁচলে হাত মুচছে।
আমার খুব ইচ্ছে করে মহিলার সঙ্গে কথা বলি। সে কি এখানেই থাকে না কী দূরের কোনও গ্রাম থেকে এসে কাজ করে যায়। সংসারে কে কে আছে! কী নাম?

আস্তে ধীরে হেঁটে মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
মহিলা একটু আরষ্ট হল। মাথায় ঘোমটা দিল, সেই ঘোমটা আরও যতেœ টানল। কুণ্ঠিত গলায় বলল, কী কথা বাবা?
তেমন জরুরি কিছু না। আবুল কি আপনার কিছু হয়?
এখানকার ম্যানেজার আবুলের কথা বলছেন?
জ্বি।
না সে আমার কিছু হয় না। আমি এখানে কাজ করি।
কী কাজ?
মাটির ঘরগুলোর লেপাপোছার কাজ। উঠোন লেপাপোছার কাজ।
বেতন পান কতো?

সাতশো টাকা পাই।
সপ্তাহে কদিন কাজ করেন?
রোজই করি।
বলেন কী? রোজ?
হ্যাঁ বাবা।
কতক্ষণ কাজ করতে হয়?
কোনও কোনওদিন সারাদিন করি। কোনও কোনওদিন একবেলা। যেদিন যেমন কাজ থাকে।
আজ কতক্ষণ করবেন?
আজ আর করব না। আজকের কাজ শেষ।
এখানেই থাকেন আপনি?

না বাবা। আমাদের বাড়ি এখান থেকে দেড়মাইল দূরে। গ্রামের নাম রতনপুর।
শুনে খুবই অবাক হলাম। দেড়মাইল দূর থেকে রোজ কাজে আসেন? মাত্র সাতশো টাকা বেতন! এতে আপনার পোষায়?
মহিলা মৃদু হাসল। না পোষালেই বা কী করব বাবা! এই টাকায়ই কষ্টপিষ্ট করে চলতে হয়।
সংসারে কে কে আছে আপনার?
মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেউ নাই।
জ্বী?
হ্যাঁ বাবা। আপন বলতে কেউ নাই আমার।
স্বামী, ছেলে মেয়ে?
না কেউ নাই। একটা মেয়ে ছিল আট নয় বছর বয়সে মারা গেছে। খুব জ্বর হয়েছিল। জ্বরের ঘোরে কখন মারা গেল টেরই পেলাম না।

আপনার স্বামী?
সে মারা গেল বাবা যুদ্ধের সময়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। মিলিটারিরা মারল।
কোথায়?
আমাদের গ্রামেই। আমাদের গ্রামে বেশ কয়েক ঘর হিন্দু ছিল। গরিব হিন্দু। কামার, কুমোর, মুচি। আমাদের ছিল বাবা কুমোর বাড়ি। মিলিটারিরা তো হিন্দু মেরে একেবারে সাফা করে ফেলতে চাইল। রতনপুরে ঢুকে চারদিক দিয়ে হিন্দু পাড়াটায় আগুন দিল। তার আগেই যে যেদিকে পারে ছুট দিয়েছে। নয়নতারার বাবা ছিল ল্যাংড়াখোঁড়া মানুষ।
নয়নতারা কে?
আমার মরা মেয়ে।

বুঝেছি। বলুন, তারপর? কীভাবে ল্যাংড়া হয়েছিল সে?
মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাস আগ থেকে ডানপায়ের হাঁটুতে খুব ব্যথা হতো।
মাঝে মাঝে পা একেবারে নড়াতেই পারতো না, হাঁটতে পারতো না। তার কাজকর্ম করতে হতো আমার।
কী কাজ?
কুমোরদের যা কাজ? মাটির হাঁড়ি কলসি তৈরি করা।
পারতেন?
মহিলা হাসল। পারব না কেন? আমরা কুমোর বাড়ির মেয়ে না? আমার বাপ দাদারা কুমোর ছিল, শ্বশুর দিককার সবাই কুমোর। কুমোর বাড়ির মেয়েরাও এসব কাজ করে।
কথা বলতে বলতে, হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন গ্রামের বড়লোক বাড়িটির সামনের মাঠে চলে এসেছি। দুপুর তখন ফুরিয়ে এসেছে। রোদ নরম হতে শুরু করেছে। চারদিকে গাছপালা মাঠ এবং ঘরের চালায় রোদের রঙ বদলে গেছে।
মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, তারপর?

আমাদের গ্রামে জলধর ডাক্তার নামে একজন ডাক্তার ছিল। নয়নতারার বাবার পা দেখে তিনি বললেন, হাড়ের ভেতর যক্ষ্মা হয়েছে। অষুধে ভাল হবে না। ঢাকায় একটা পঙ্গু হাসপাতাল আছে সেখানে নিয়ে অপারেশন করাতে হবে। আমরা বাবা গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। আমরা অত দামি চিকিৎসা কীভাবে করাব? আমাদের তেমন কোনও আত্মীয়স্বজনও নাই যে সাহায্য করবে।
আত্মীয়স্বজন নেই মানে? আত্মীয়স্বজন ছাড়া মানুষ হয় না কী! আপনার দিককার, নয়নতারার বাবার দিককার কোনও আত্মীয় আপনাদের নেই?

এক সময় ছিল বাবা। অনেকই ছিল। কুমোরের কাজে পোষায় না দেখে পেশা বদল করেছে। বাড়িঘর বিক্রি করে একেকজন চলে গেছে একেকদিকে। পেটের আহার জোটাতেই জান যায় একেকজনের। কে কার খোঁজ রাখবে। নয়নতারার বাবার পাটা নষ্ট না হলে সেও পেশা বদলাতো। ঢাকায় গিয়ে অন্য কোনও কাজ করত। কুমোরের কাজে দিন আর চলছিল না বাবা। মাটির জিনিসের আজকাল আর কদর নেই। সবাই এলুমিনিয়ামের জিনিস চায়, কাঁচের জিনিস চায়। আমাদের দুজন মানুষের সংসার, দুজনে কাজ করেও সংসার ঠিকমতো চালাতে পারতাম না। নয়নতারার বাবা যখন ভাবছে এই পেশা ছেড়ে অন্যদের মতো সেও গ্রাম ছাড়বে তখনই পায়ের অসুখটা হল। তার কিছুদিন পর শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় কে কোথায় যাবে? কী কাজ করবে? তার ওপর আমরা হলাম হিন্দু মানুষ! হিন্দু শুনলেই মিলিটারিরা গুলি করে মারে। রাজাকার, শান্তিবাহিনীর লোকরা মারে। খেয়ে না খেয়ে আমাদের তখন ঘরে বসে দিন কাটে। এই সময় একদিন মিলিটারি এল গ্রামে। হিন্দুপাড়ায় আগুন দিল। যে যেদিকে পারে জান নিয়ে পালাল। কিন্তু নয়নতারার বাবার পায়ে ব্যথা। এমন ব্যথা, ব্যথার চোটে জ্বর এসেছে। কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে ঘরে। নড়াচড়ার শক্তি নাই। মিলিটারিদের আগুনে জ্যান্ত মানুষটা চিতায় উঠল।
মহিলার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। আনমনা হয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
বললাম, আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

আমার কোনও হুঁশজ্ঞান ছিল না বাবা। এখন যা বয়েস এর অর্ধেক বয়েস তখন। শুনেছি মেয়েছেলে পেলে জানে মারে না মিলিটারিরা। অন্যভাবে যে মারা মারে তারচে হাজারবার মরে যাওয়া ভাল। সেই ভয়ে বাবা নয়নতারার বাবার কথা ভুলে যেদিকে দুচোখ যায় ছুটতে শুরু করেছিলাম। ফিরে আসি সন্ধ্যার দিকে। এসে দেখি হিন্দুপাড়ায় কিচ্ছু নাই। চারদিকে শুধু ছাই, ধিকিধিকি আগুন। পাড়াটা যেন চিতাখোলা হয়ে গেছে। কোথায় মিশে গেছে নয়নতারার বাবা!
খানিক চুপ করে থেকে বললাম, তার মানে এখন আর কেউ নেই আপনার?
না। আমি একা।
বাড়িঘর আছে তো?
মহিলা দুঃখের হাসি হাসল, বাড়িঘরের কথা কী বলব বাবা! সে আরেক কাহিনী।
বলুন, শুনি।

আমাদের ছিল বারো শরিকের বাড়ি। বারোঘরের মানুষদের জন্য একখানা উঠান। পুড়ে বাড়িটা যখন চিতাখোলা হয়ে গেল, চিতাখোলায় মানুষ থাকে কী করে? নতুন করে ঘর উঠাবার সামর্থ্যও নাই কারও। যে যেদিকে পারে, যার বাড়িতে পারে গিয়ে আশ্রয় নিল। আশপাশের গ্রামের মুসলমানরাই জায়গা দিল আমাদেরকে। আর সেই ফাঁকে বাবা যে কাণ্ডটা হল, কী বলব, আমাদের বারো শরিকের বাড়িটা, পুরো বাড়িটাই বেদখল হয়ে গেল।
বলেন কী? কারা করল?
নাম বলব না বাবা। তাদের কানে যদি যায় যে আমি লোকের কাছে বলে বেড়াচ্ছি আমাদের বাড়ি তারা বেদখল করেছে, আমাকে তাহলে বাবা জানে মেরে ফেলবে। আমরা কেউ তাদের নাম বলতে সাহস পাই না।
কোথাকার লোক তারা?
আমাদের গ্রামেরই।

মুসলমান?
মুসলমান।
বাড়িটা তারা বেদখল করল কখন? স্বাধীনতার পর?
না। যুদ্ধের সময়ই। বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার দিন সাতেক পরই। তখন তারা খুব ক্ষমতাবান ছিল। শান্তি কমিটির লোক।
স্বাধীনতার পর তো তাহলে বাড়ি আপনাদের ফিরে পাওয়ার কথা।
পাইনি।
কেন?
স্বাধীনতার পরও দেখি তারা আগের মতোই ক্ষমতাবান। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। প্রথম প্রথম কিছুদিন একটু নরম দেখেছি তাদের। আমরা সবাই দল বেঁধে গিয়েছি যাতে বাড়ি ছেড়ে দেয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কয়েক মাস ঘুরিয়েছে। তারপর একদিন আগের চেহারা ধরেছে। খবরদার যদি আর কোনওদিন বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখি তোদের তাহলে একজনেও জান নিয়ে ফিরতে পারবি না। প্রত্যেকের লাশ ফেলে দেব। আমরা বাবা গরিব মানুষ, কেমন করে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। তারপর থেকে যে যার জান নিয়ে সরে থাকি। বাড়ির ত্রিসীমানায় আর যাই না।
একটু থেমে সে বলল, একখানা কথা বলব বাবা?

বলেন।
পাকিস্তানি মিলিটারিদের মতো অনেক লোক এখনও আছে এই দেশে। গোপনে গোপনে কত মানুষ যে তারা মারে, কেউ টের পায় না। কতজনের ঘরবাড়ি দখল করে নেয়, কত মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করে, কেউ দেখে না।
মহিলার কথা শুনে আমি চমকে উঠি। দারুণ বলেছেন। বেশ তাৎপর্যপূর্ণ কথা। কিন্তু এই নিয়ে আর কথা বলি না। জিজ্ঞেস করি, এখন তাহলে কোথায় থাকেন আপনি?

রতনপুরেই থাকি। এক মুসলমান বাড়িতে। বাগানের দিকে তারা আমাকে ছোট্ট একখানা ঘর তুলে দিয়েছেন। সেই ঘরে থাকি। আগেও মাটির কাজ করতাম, এখনও তাই করি । তবে তখনকার কাজটা ছিল এক রকম, এখনকারটা আরেক রকম। সাতশো টাকা বেতনে জীবনটা কোনও রকমে চলে যায়।
যে বাড়িতে থাকেন তারা লোক কেমন?

তাদের কোনও তুলনা হয় না। তারা মানুষ না, দেবতা। ভগবানের পৃথিবীতে বাবা দেবতাও থাকে অসুরও থাকে। এক অসুরে স্বামী মেরেছে আরেক অসুরে করেছে বাড়ি দখল কিন্তু আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে মানুষের মতো চেহারার একজন দেবতা।

এত ভাল লাগল মহিলার কথা! প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই যে একজন দার্শনিক থাকে অনেকদিন পর তা টের পেলাম।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এত কথা বললাম, মহিলার নামটা এখনও আমার জানা হয়নি। বললাম, আপনার নামটা আমার জানা হয়নি।

সে লাজুক গলায় বলল, সূর্যমুখি।
শুনে সোফিয়া লোরেনের একটি ছবির কথা মনে পড়ল আমার।
সানফ্লাওয়ার। গভীর প্রেমের ছবি। চমৎকার যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য ছিল ছবিতে। এই ছবিতে যুদ্ধ ছিল সূর্যের ভূমিকায়, মানুষজন ছিল সূর্যমুখি ফুল। যুদ্ধ তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সূর্য যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সূর্যমুখি ফুলকে। যখন যেদিকে ঘোরে সূর্য, নিজের মুখ সেদিকে ঘোরায় সূর্যমুখি।
রতনপুরের সূর্যমুখির জীবনটাও অনেকটা সানফ্লাওয়ারের নায়িকার মতো। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করেছে তার জীবন। স্বাধীনতার সূর্য যখন যেদিকে ঘুরেছে সূর্যমুখিও তার মুখ ঘুরিয়েছে সেই দিকে।
তখন পুরোপুরি বিকেল। সূর্য ঢলেছে পশ্চিমে। সূর্যমুখির সঙ্গে কথা বলতে বলতে শ্যুটিং স্পটের বাইরের রাস্তায় চলে এসেছি। এই রাস্তাটি পুবে পশ্চিমে।
সূর্যমুখি বলল, আমি তাহলে যাই বাবা?

আসুন। অনেক কথা বললাম আপনার সঙ্গে। কিছু মনে করবেন না।
না মনে করব কেন? আমারও তো ভাল লাগল বলতে। অনেকদিন পর নিজের সব কথা একজনকে বলতে পারলাম।
সূর্যমুখি তারপর পশ্চিমদিকে মুখ ফেরাল। এইদিকে রতনপুর।
আকাশের সূর্য তখন পুরোপুরি ঢলেছে পশ্চিমে।

[ad#co-1]