আশ্রয় ও অবলম্বন হিসেবে মাতৃভাষার বিকল্প নেই

বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীকে যদি মাধ্যমিক স্কুল খুলতে বলা হয়, তাহলে সাড়া দেবে না। কেননা কাজটা কঠিন এবং ওই কাজে কোনো মুনাফা নেই। কিন্তু তাদের ভয়ঙ্কর উৎসাহ দেখা যায় মাদ্রাসা খোলাতে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আমাদের বাংলা ভাষা ভাবের ব্যাপারে বেশ চিন্তিত মনে হয়, যে জন্য অভিধানে ভাবের একাধিক অর্থ রয়েছে। একটা অর্থ তো ভাবনা-চিন্তা। ভাবের অন্য একটি অর্থ একেবারে ভিন্ন ধরনের। সেটা হচ্ছে_ভান করা। যেমন, আমরা বলি_বন্ধুর ভাব করে এসেছে বটে, কিন্তু লোকটা আসলে বন্ধু নয়; শত্রু। ভাবের অপর একটি অর্থও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে ভাবের অর্থ হচ্ছে সদ্ভাব, যেখানে ভান থাকে না, সত্যি সত্যি ভাব থাকে, সম্পর্ক থাকে সৌহার্দ্যের। এই তিন ধরনের ভাবই আমাদের সংস্কৃতি ও সমাজে বেশ কার্যকর।

ভান তো চলেই। ভান করি কিছু বলছি বলে। আওয়াজ দিই, গলা চড়াই, বকবক করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা গেল, কিছুই বলিনি। আওয়াজটা শূন্যকম্ভের। ধ্বনির ভেতর বস্তু কিছু নেই, সেখানে ভাবের পুরোপুরি অভাব। সবটাই প্রতারণা। শ্রোতার সঙ্গে, হয়তো বা নিজের সঙ্গেও। আর যেসব বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ভাবনা-চিন্তা থাকে। বস্তুত ভাবই সেখানে ভাষাকে মর্যাদাবান করে তোলে। ভাষার জাদু নয়, চিন্তার মূল্যই মূল্যবান করে বলাটাকে।

আর ওই যে ভাবের তৃতীয় একটি অর্থ, তার গুরুত্ব অস্বীকার করবে কে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, পারস্পরিক সদ্ভাব, আদান-প্রদান, যৌথ অনুশীলন_এসব ছাড়া সমাজ চলে না, ভাবেরও উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে না, আর ভাষাও শক্তিশালী হয় না। ব্যক্তিই প্রকাশ করে, কিন্তু ভাবনাগুলো আকাশ থেকে পড়ে না, উঠে আসে জনজীবন থেকে_যেখানে দ্বন্দ্ব চলছে নানা শক্তির, শ্রম চলছে নিরন্তর। শ্রম ছাড়া সৃষ্টি নেই, তা ভাবের সৃষ্টিই হোক কিংবা হোক ভাষার অথবা একত্রযোগে উভয়ের।

ওই যে সামাজিক সদ্ভাব, সামাজিকভাবে ভাব থাকা, তার ভেতর দ্বন্দ্বও থাকতে পারে। পারে কী, দ্বন্দ্ব তো থাকবেই। দ্বন্দ্ব ছাড়া অগ্রগতি নেই। কিন্তু দ্বন্দ্বও একটা সম্পর্ক বটে। ভালোবাসা যেমন একটা সম্পর্ক, ঘৃণাও তেমনি এক ধরনের সম্পর্ক। উভয় ক্ষেত্রেই দু’পক্ষের ভেতর যোগাযোগটা থাকা চাই। যোগাযোগ না থাকলে ভালোবাসা যেমন অসম্ভব, অসম্ভব তেমনি ঘৃণাও। আর এটাও তো অমোঘ সত্য যে, ভালোবাসার ভেতর ঘৃণা লুকিয়ে থাকে। ঘৃণাহীন ভালোবাসা আসলেই অলীক; হয়তো বা ভানই শুধু। সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধিতা_সবই হচ্ছে শ্রম; যৌথ শ্রম অনেক সময়, সামাজিক শ্রম কখনো কখনো। এই শ্রম, ওই যোগাযোগ_এরা না থাকলে ভাব তৈরি হয় না, ভাষাও হয়ে যায় নীরব। বড়জোর তোতলামোটা চলতে পারে।

যোগাযোগটা কেবল যে বর্তমানের সঙ্গে তা নয়, অতীতের সঙ্গেও।

এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে যে নয়, তাও বলা যাবে না। আর এটা ঘটে ভাষার মধ্য দিয়েই। ভাষা তো নদীর মতো সতত প্রবহমান। তাতে বহু স্রোত এসে মেশে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের চিন্তা-ভাবনা-অনুভূতি ভাষার স্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। পুরোটাই পরিণত হয় ঐতিহ্যে, সমষ্টিগত উত্তরাধিকারে। নতুন নতুন চিন্তা মানুষকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করে।

পাকিস্তান আমলে আমাদেরকে একটা সমষ্টিগত বিশেষ ভাবনা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেটা ছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। ভাবনাটা ছিল একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা তো অবশ্যই দেশপ্রেমিক। সেই সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটা ছিল গণতান্ত্রিকও। কেননা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শতকরা ৫৬ জন অধিবাসীই ছিল বাংলাভাষী। তাদের দাবিকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রের একমাত্র ভাষা করার চেষ্টা ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। তদুপরি ভাষা হচ্ছে সব সময়ই একটি গণতান্ত্রিক সত্তা_সে শ্রেণী, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি বিভাজন মানে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন জাতীয়তাবাদের সেই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দিকে যাত্রা শুরু করল। এই পথটা ছিল গণতান্ত্রিক অর্থাৎ বৈষম্যহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে যাত্রা। এই যাত্রার তাৎপর্যটা প্রথমে স্পষ্ট হয়নি, পরে হয়েছে। শুরুতে দাবি ছিল বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি আরেকটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকারের। ক্রমাগত অগ্রগমনের ধারাবাহিকতায় তা পরিণত হয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে, যার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। আমরা সমষ্টিগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দ্বারাই পরিচালিত হয়েছি; ভাষা আমাদেরকে পথ দেখিয়েছে।
আমাদের সেই দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এখন বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবের ঘটনা যে অন্য রকম, তার আরো অনেক প্রমাণের একটি হলো এই_রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা যদিও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু তা এখনো রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়নি। দুটি বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অত্যন্ত পরিষ্কার, একটি হচ্ছে উচ্চ আদালত, অপরটি উচ্চশিক্ষা। উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক। বাংলা ব্যবহার না করাটা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পরিভাষার কথা বলা হয়। কিন্তু পরিভাষা তো আছে; আদালত, আর্জি, জবানবন্দি, রায়, জেরা, নথি, মুসাবিদা সবই তো বাংলা শব্দ; পরিভাষা নয়। অসুবিধাটা অন্যত্র। সেটা হচ্ছে সদিচ্ছার অভাব। ভাব নেই, অভাব রয়েছে। সদিচ্ছা না থাকার কারণ এক নয়, একাধিক হতে পারে। বাংলা ব্যবহারের অভ্যাস নেই, অন্যরা ব্যবহার করে না, কেউ একলা করলে সেটা টিকবে না, বরং কৌতুককর হতে পারে, ব্যবহার করা হয়তো কষ্টের ব্যাপার হবে, শ্রমসাধ্য হওয়া অসম্ভব নয়_এসব চিন্তা উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

কিন্তু এসবের নিচে আরো একটি গভীর কারণ আছে। সেটি হলো_ওই যে মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব স্থাপনের কথা বলছিলাম, সেটা স্থাপন করতে অনীহা। উচ্চ আদালতে বাদী-বিবাদী, বিচারক-উকিল সবাই বাঙালি, সবার মাতৃভাষাই বাংলা। সংবিধান বলছে, রাষ্ট্রের সব কাজ চলবে বাংলা ভাষায়, কিন্তু চলছে না। এর চেয়ে অবাস্তব, করুণ ও হাস্যকর ঘটনা আর কী হতে পারে? এমন দিন হয়তো আসবে, যখন মানুষ এই ইতিহাস পাঠ করে হাসবে, আজ যেমন আমরা হাসি বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা নাকি উর্দু এ নিয়ে এক সময় বিতর্ক হয়েছিল শুনে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ইংরেজি চলছে, বাংলা চলছে না। এ ক্ষেত্রে কাজটা অবশ্য কিছুটা কঠিন। কেননা বই লিখতে হবে। অনুবাদ করতে হবে। তার জন্য সংগঠিত শ্রম দরকার এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় বংলা প্রচলন করলে শিক্ষার মান নেমে যাবে_এর চেয়ে ভ্রান্ত ধারণা আর হতে পারে না। বিশ্বের বহু দেশে মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের শিক্ষার মান নিচু_এমন অভিযোগ শোনা যায়নি। সুইডিশ ভাষীর সংখ্যা এক কোটিরও কম, তাঁরা যদি তাঁদের মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিম্নাভিমুখী না হয়ে থাকে, তবে বাইশ-তেইশ কোটি বাংলাভাষীর ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন ঘটনা ঘটবে। ওসব যুক্তি অসার। আসল ব্যাপার হলো, আবারও সেই সদিচ্ছার অভাব। কার সদিচ্ছা নেই? এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছা নেই গোটা শাসকশ্রেণীর। তার কারণ একাধিক। প্রথমত, এই শ্রেণী চায় না উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটুক। এদেশের শাসকশ্রেণী অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার পক্ষে কাজ করেনি। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে শাসকশ্রেণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। উচ্চশিক্ষার সঙ্কোচনও এদের কাম্য। কেননা ওই শিক্ষা যত বিস্তৃত হবে, ততই তাদের শ্রেণী-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এদের নিজেদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। উচ্চশিক্ষা তারাই পাবে_ভাবখানা এ রকমেরই। তাছাড়া ঔপনিবেশিক ভূতইবা শাসকদের এত সহজে ছাড়বে কেন। ছাড়েনি। চেপে বসে আছে। ইংরেজি ভাষা এখনো এদের কাছে বীরের ভাষা।

কেবল ভূত কেন, ঔপনিবেশিকতা তো এখন নব্য সাম্রাজ্যবাদের আকারে সারা পৃথিবীকে শাসন করছে। ভেতরে রয়েছে পুঁজিবাদের সেবক। পুঁজিবাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয়, ইংরেজি বটে। তাই তারা পারুক না-পারুক ইংরেজির চর্চা করাকে সঙ্গত মনে করে। কথাবার্তাও বলে ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে। প্রমাণ করতে চায় যে, তারা সাধারণ নয়, অসাধারণ বটে।

বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীকে যদি মাধ্যমিক স্কুল খুলতে বলা হয়, তাহলে সাড়া দেবে না। কেননা কাজটা কঠিন এবং ওই কাজে কোনো মুনাফা নেই। কিন্তু তাদের ভয়ঙ্কর উৎসাহ দেখা যায় মাদ্রাসা খোলাতে। মাদ্রাসা খোলাটা খুবই সহজ, খরচাপাতি যৎসামান্য। আর মুনাফা লাভের সম্ভাবনা বহুমুখী। পরকালে পুণ্যসঞ্চয়, ইহকালে সুনাম।

টাকা-পয়সা নিয়ে দুর্নীতি করার সুযোগও রয়েছে। আর রয়েছে শিক্ষাদানের নাম করে গরিব মানুষকে গরিব করে রাখার সুযোগ। মাদ্রাসা খোলায় যেমন, তেমনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তৈরিতেও খুবই আগ্রহ দেখা যায় এই শ্রেণীর মানুষের। প্রয়োজনটা এক ও অভিন্ন। মুনাফার লোভ। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে আয়ের সম্ভাবনা প্রচুর। বিনিয়োগ দ্রুত উঠে আসে এবং অল্প দিন পরেই মুনাফা গোনার অবকাশ দেখা দেয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যে দ্রুত গজিয়ে উঠছে তার পেছনেও লোভ এই মুনাফারই। শিক্ষাবিস্তার নয়, কাজটি হচ্ছে ব্যবসা। শপিংমল খোলার চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সুবিধা বেশি। নগদ আয় তো রয়েছেই, সম্মানও বাড়ে; দোকানের মালিক এই পরিচয়ের চেয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান_এই পরিচয়ে মানটা অনেক বাড়ে। সেই মান ভাঙিয়ে দেশে তো বটেই, বিদেশেও সুবিধা আদায় করা চলে।

উচ্চশিক্ষার কথা বলছিলাম, এই যে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা খুবই প্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সে শিক্ষাও বাংলা ভাষার মাধ্যমেই হওয়ার কথা ছিল। ইংরেজরা এসে আমাদের দেশ দখল করে নেওয়ার আগে ঘটনাটা ছিল সেই রকমেরই। উচ্চমানের দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা এখানে চালু ছিল_ আয়ুর্বেদীয় ও ইউনানি চিকিৎসকরা ছিলেন, তাঁরা দেশীয় পদ্ধতিতে দেশীয় ওষুধ ব্যবহার করে রোগের চিকিৎসা করতেন। শিক্ষা ও চিকিৎসা দুটোই চলত বাংলা ভাষার মাধ্যমে। ঔপনিবেশিক আধিপত্য সব কিছু চুরমার করে দিল। ইংরেজি বই, ইংরেজ ডাক্তার এসে হাজির হলেন। তাঁরা মেডিক্যাল কলেজ খুললেন, ওষুধ এল ইংল্যান্ড থেকে, যন্ত্রপাতিও সেখান থেকেই। বিদ্যাটাও তাদেরই, তাদের ভাষাতেই। দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থা দেশের তাঁতশিল্পের মতোই ধ্বংস হয়ে গেল।

রোগী দেশি, রোগও তাই। চিকিৎসকও এখানকারই, তবে কেন শিক্ষাটা চলবে ইংরেজি ভাষাতে? চলছে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের কারণে এবং দেশপ্রেমের অভাবের দরুন। দেশে শিক্ষিত হয়ে অনেক চিকিৎসক বিদেশে চলে যান, সেখানে বিদেশিদের চিকিৎসা করেন, অধিকাংশই অবশ্য দেশে থাকেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের সঙ্গে তাঁদের সৌহার্দ্য স্থাপিত হয় না; চিকিৎসার জন্য যা অপরিহার্য প্রথম শর্ত। বিচ্ছিন্নতা থাকে। বলাবাহুল্য, চিকিৎসা পেশা ঠিকই, কিন্তু মোটেই ব্যবসা নয়, হওয়া উচিত নয়।

আইনজীবীদের অনেক সময় আইন ব্যবসায়ী বলা হয়, কিন্তু চিকিৎসা ব্যবসায়ী বলে কোনো কথা এখনো চালু হয়নি। চিকিৎসাবিদ্যা অর্জনে তাঁদেরই যাওয়া উচিত, যাঁদের ভেতর মানুষের প্রতি স্বাভাবিক মমতা রয়েছে। চিকিৎস ও প্রকৌশলীতে যে দুস্তর ব্যবধান সেটা অস্বীকার করবে কে। তবে প্রকৌশলীকেও দেশপ্রেমিক হওয়া চাই, নইলে তাঁদের কৌশল দেশের ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসকের জন্য শুধু দেশপ্রেমিক হওয়া নয়, মানবপ্রেমিক হওয়াটাও অত্যাবশ্যক। যে বিদ্যা তিনি অর্জন করেন তা মানুষের প্রতি তাঁর অন্তর্গত ভালোবাসাকে আরো যাতে সমৃদ্ধ করে সেটাই লক্ষ্য রাখার বিষয় হওয়া চাই। এর জন্য দরকার মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা। রোগীকে বোঝার, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার, এমনকি রোগ জানার জন্যও মাধ্যম তো মাতৃভাষাই। তাহলে? বিদ্যার অনুশীলন কেন ঘটবে অন্য ভাষাতে? কিন্তু ঘটছে তো তাই। সেই সঙ্গে এটাও তো সত্য যে, কোনো জ্ঞানই জ্ঞানার্থীর নিজস্ব সম্পদ হয় না, যদি সেটা মাতৃভাষার মধ্য দিয়ে না আসে।

মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারটা আবারও স্মরণ করা যাক, যেখানে মাতৃভাষার চর্চা সামান্য। ওই শিক্ষা যথার্থ না হওয়ার সেটি প্রধান কারণ। মাদ্রাসা শিক্ষা মৌলবাদের বিকাশকে যে উৎসাহিত করছে, তার পেছনেও মাতৃভাষার চর্চার ব্যাপারে অনীহাটা কার্যকর। শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতি থেকে। তাদের সঙ্গে ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষিতদের মিল আছে, এদিক থেকে। পার্থক্যটা এখানে যে, ইংরেজি বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা নেই, তার বদলে আয়োজন রয়েছে বিজ্ঞান শিক্ষার; তাই শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন কৃত্রিম, ও অপূর্ণাঙ্গ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু মৌলবাদী হচ্ছে না। মাদ্রাসার দ্বারা পশ্চাৎপদতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, তেমনি তথাকথিত আধুনিকতাও দলিত-মথিত করছে বাংলাদেশের কৈশোর ও যৌবনের একাংশকে। ধরা যাক মোবাইল ফোনের ব্যাপারটা। এই ফোন যোগাযোগের জন্য নিশ্চয়ই উপকারী, কিন্তু এর আকর্ষণ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যে নেশা সৃষ্টি করছে তা মোটেই উপকারী নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলাপ চলে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে। অপচয় ঘটে সময়, মেধা ও অর্থের। অর্থের অপচয়টা বিপুল। এই তো চলে গেল আধুনিক ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। ফেব্রুয়ারি মাসে আসে, একুশে ফেব্রুয়ারির সাত দিন আগে, এমন ভাব করে যে একুশকেই গ্রাস করে ফেলবে। ভালোবাসা দিবসকে আনা হয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থে, পণ্য বিক্রি এবং পণ্যের বিজ্ঞাপন দুটোই ভালোভাবে চলে। আরো একটা অভিপ্রায় থাকে ভেতরে, সেটা হলো তরুণকে ব্যস্ত রাখা, তারা যাতে বিদ্রোহী না হয়, যাতে অগ্রসর না হয় বিপ্লব অভিমুখে।

সব মিলিয়ে তাহলে আমরা কোন সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়াচ্ছি? সত্য একটাই, সেটা এই যে, আমরা যাই ভাবি না কেন, ভাবটা যাই হোক না কেন, আমরা স্বাধীন হইনি। এর একটা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হচ্ছে_বাংলা ভাষার অপ্রচলন। ভাষার লড়াইটা আসলে অন্য কিছুই নয়, একটি রাজনৈতিক লড়াই ভিন্ন। দ্বন্দ্বটা শাসকের সঙ্গে শাসিতের। অতীতে শাসকদের ভাষা বাংলা ছিল না, জনগণ ওই শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। সংগ্রামের একটা লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের ভাষা করা। বিদেশি শাসকরা হটে গেছে, তাঁদের জায়গায় দেশি শাসকরা সুযোগ পেয়েছে বসার। কিন্তু জনগণের ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও যথাযথ স্বীকৃতি এখনো পায়নি। বাংলা ভাষা আগে যেমন ছিল এখনো তেমনই দরিদ্র মানুষের ভাষা হয়ে রয়েছে। ভাষার নিজের ভেতরেও দৈন্য দেখা গেছে। তার স্বাস্থ্য ভালো নয়। তার ভাবসম্পদ আশানুরূপ বাড়তে পারছে না।

পুঁজিবাদকে পরাভূত করতে না পারলে আমাদের জন্য মুক্তিলাভের কোনো আশা নেই। ওই লড়াইটা যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিক। আসলে এই দুই ক্ষেত্রের ভেতর কোনো চীনের প্রাচীন দাঁড়িয়ে নেই। একটি অপরটির সঙ্গে যুক্ত। আর উভয় লড়াইতেই বাংলা ভাষা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পাথেয়। শিক্ষা, বিচার, স্বাস্থ্য, শাসন, প্রশাসন সব ক্ষেত্রে আমরা বাংলা চালু করতে চাই। চালু করাটা হবে আমাদের জন্য স্বাধীনতার প্রমাণ এবং যুক্তির প্রতিশ্রুতি। সেই সঙ্গে এটাও সত্য হয়ে থাকবে যে, ওই রাজনৈতিক সংগ্রামটা কিছুতেই গভীর হবে না, যদি তার পেছনে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি না থাকে। সাংস্কৃতিকভাবে এগোনোর জন্য বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি দরকার, দরকার তার ভাবসম্পদের উন্নয়ন এবং চাই ভাব ও ভাষার যে দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে উভয়ের উপকার হয় তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

ভান ও ভণিতা নানারকমের, কিন্তু আসল সত্যটা যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, সেটা যেন কিছুতেই না ভুলি। পুঁজিবাদই আমাদের দরিদ্র, পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং অসামাজিক করে রেখেছে। তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে। দেশের ভেতর ঐক্য থাকবে, ঐক্য থাকবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। দেশের ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাটা হচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা। আশ্রয় ও অবলম্বন হিসেবে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক