আদালতে বাংলা চালু কঠিন নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা পাকিস্তান আমলেই রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করেছে। কিন্তু একুশের আন্দোলনের আটান্ন বছরেও রাষ্ট্র ও সমাজের ভাষা হতে পারেনি বাংলা। এটা কারও ব্যক্তিগত নয়, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সমষ্টিগত সমস্যা। বাংলা ভাষার বিপদ ও শত্রুকে আমাদের চেনার দরকার। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান, মোবাইল ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে বাংলা ভাষা বিকৃত করা হচ্ছে। এটা ভাষার জন্য আরেকটা বিপদ। এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়াটা কঠিন। বাংলা ভাষার বড় শত্রু হচ্ছে পুঁজিবাদ। বিশ্ব পুঁজিবাদে বাংলা ভাষার স্থান নেই, কেননা বিশ্ব পুঁজিবাদের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা বাংলায় আগ্রহী নন। পুঁজিবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ইংরেজির। যারা এ রাষ্ট্র শাসনের দায়িত্বে থেকেছেন বা আছেন, তারা সেজন্যই বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দেননি বা দিচ্ছেন না। ফলে ভাষা আন্দোলনের আটান্ন বছরেও শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি। পূরণ হয়নি ভাষা আন্দোলনের মূল ও মৌলিক প্রত্যাশা। শাসকরা বাংলা ভাষার ব্যাপারে উত্সাহিত না হওয়ার আরেক কারণ—সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন তারা চান না। পরিবর্তন না হলেই তাদের সুবিধা। কারণ পরিবর্তনটা এলে আর সবাই সমান হয়ে গেলে তাদের ওই সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পরও সমাজে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। সমাজটা আগে যেরকম শ্রেণীবিভক্ত ছিল, এখনও সেরকমই রয়ে গেছে। শ্রেণীবিভাজন সমাজে সংরক্ষিত হচ্ছে পুঁজিবাদের কারণে। সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিত্তবানরা। তারা আছেন মূলত পুঁজিবাদের সঙ্গে। তারা তাই ইংরেজিতে কথা বলেন। বাংলা বললেও তা হয় ইংরেজি মিশ্রিত। মধ্যবিত্তরাও তাই করেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা ছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। সেটা হয়নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। সর্বস্তরে বাংলা চালু হবে না, দেশে অভিন্ন শিক্ষানীতি থাকবে না—এগুলো অপ্রত্যাশিত ছিল। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আন্দোলন হলো অথচ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সর্বস্তরে সেই ভাষা নেই। শিক্ষা বিভক্ত হয়ে গেল তিনটি ধারায়। মানে আমরা তিন ধরনের শিক্ষা পাচ্ছি। ইংরেজির গুরুত্ব বেড়ে গেছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় মাতৃভাষা বা বাংলার ব্যবহার তেমন নেই; যেটুকু আছে, সেটুকুও দুর্বলভাবে।

শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। সেজন্য বাংলায় বই লেখা এবং বিদেশি বই অনুবাদ করা দুটিরই দরকার ছিল। কাজগুলো হয়নি। ফলে বাংলা ভাষায় উচ্চস্তরে শিক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চস্তরের অধিকাংশ বই-ই ইংরেজিতে লেখা। এটাও সত্য, সাহিত্য, প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন বিষয়ের বই বাংলায় প্রচুর লেখা হয়েছে। তবে মৌলিক ও উচ্চশিক্ষার জায়গাগুলোর জন্য বই লেখার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা আছে। উচ্চ আদালতে আজও চালু হয়নি বাংলা ভাষা। আদালতের কার্যবিবরণীর রায়সহ অন্যান্য কাজ বাংলায় করার কথা ছিল, তা হয়নি। এটা বাংলা রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। এখানে আদালতে বাংলা চালু করাটা খুব কঠিন কাজ নয় বলেই আমি মনে করি, তবুও সেটা হচ্ছে না।

বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হয়নি—এটা দেখে বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধ এখনও সম্পন্ন হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন করতে হবে। সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তনই এবারের একুশের কাছে আমার প্রত্যাশা।

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ

http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=1938

[ad#co-1]