সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে এক সন্ধ্যা

রা হে ল রা জি ব
ভাষার মাস বলতে আমি আলাদাভাবে কোনও মাসকে দেখি না। ভাষার মাস এই কথাটা ঠিক না। ভাষা তো সবসময়ই ভাষা এবং একটা বিশেষ সময়ের, বিশেষ মাসের ভাষা এটা না। এই কথাটা পত্রিকায় বা মিডিয়াতে আসে, এটা ঠিক না। যেখানে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে কাজেই এটাকে কেন্দ্র করে বইয়ের মেলা হচ্ছে ঠিক আছে; কিন্তু ভাষার মাস বলার মানেই হচ্ছে যেন আমরা অন্য এগারো মাসকে উপেক্ষা করছি

শিক্ষক হওয়ার পেছনের ইতিহাস জানতে চাই।

ষষ শিক্ষক হওয়ার ইতিহাস বলতে গেলে অনেক পেছনে ফিরে তাকাতে হবে আমাকে। শৈশব থেকেই আমাদের পারিবারিক আবহ আমাকে শিক্ষক হওয়ার পেছনে বড় রকমের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা পালন করেছে, কেননা সাহিত্যের প্রতি ভালোলাগাটা ছিলই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ যখন পেলাম, তখন এটাকে গ্রহণ করি। এর প্রথম কারণ হল সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কটা রাখতে পারব। দ্বিতীয় কারণ আমি ঢাকায় থাকতে চেয়েছিলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিটা হওয়ার কারণে বদলির কোনও বিষয় থাকল না। তাই নির্র্দ্বিধায় সুযোগটা গ্রহণ করলাম। এছাড়া আরও কয়েকটি কারণ ছিল যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থাকব; এটা তখন অনেক বড় ব্যাপার ছিল আমার কাছে। কেননা তাদের সাহচর্যে আমার নিজের মানসিকতারও উন্নতি হবে। আরেকটি বিষয় যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, যেটি আমি ছাত্রজীবনে ব্যবহার করেছি সেটিকে শিক্ষকজীবনেও ব্যবহার করতে পারব এই লোভটা কাজ করেছিল। চতুর্থ যে-বিষয়টি কাজ করেছিল তা হল নতুন প্রজšে§র সাহচর্যে সব সময় নিজের চিন্তাকে নবায়ন করে নেওয়ার একটা বড় সুযোগ পাব, যেটি আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিল। এইসব কারণ মিলেই আমার শিক্ষক হওয়া।

দিনবদলের সরকার ক্ষমতায়। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার ইশতেহার দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং সে-প্রক্রিয়া শুরু করার কথাও বলছে, যদিও সরকারের প্রায় এক বছর হতে চলল, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?

এই বিষয়ে সরকার খুব একটা আন্তরিক বলে মনে হয় না। কথাবার্তা বলছে, সরকারের অনেক লোকই বলছে আমরা শুরু করব। কিন্তু হয়তো শেষ করে যেতে পারব না। আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে, হয়তো কোনও মতে এটা শুরু করবে। তড়িঘড়ি করে হোক আমরা তা চাই না। গোছালোভাবে এটা হোক। আন্তরিকতা থাকলে প্রথম বছরেই এটা শুরু করতে পারত সরকার। কেননা এক বছর কম সময় না। জনগণের সামনে একটা বিষয়কে এভাবে সামনে রেখে দেশ চালানোর ফলে সরকার বিভিন্নসময় বিব্রতও হচেছ। বহির্বিশ্বের চাপও আছে; সেসবও সামাল দিতে হচ্ছে।

বর্তমান সরকার দাবি করছে যে সংস্কৃতি-বান্ধব। কিন্তু সংস্কৃতির উন্নয়ন করতে গেলে বিভিন্ন প্রকল্পে বাজেট প্রয়োজন, কিন্তু সব সরকারের মতও এই সরকারও বাজেটে সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দ খুব কম রেখেছে।

বাজেট তো অবশ্যই বাড়াতে হবে। আবার শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না। সাংস্কৃতিক অনুরাগ তৈরি না হলে সাংস্কৃতিক জাতি গঠন সম্ভব না। শুধু টাকা দিয়ে সাংস্কৃতিক জাতি গঠন সম্ভব হয় না। এটা সামাজিকভাবে তৈরি হবে, সেখানে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। পরিবার যদি সচেতন হয় তাহলে সন্তান সংস্কৃতিমনস্ক হবে। আর সরকার যদি সহায়তা করে যেমন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য যে অর্থ ও লোকবল প্রয়োজন তা মেটায় তাহলে অবশ্যই সংস্কৃতিবান্ধব জাতিগঠন সম্ভব। যেমন সরকারের যে বিভিন্ন সংগঠন আছে, তারা যদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো উদ্যাপনে সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করে, তাহলেও অনেকটা সম্ভব, যদিও তার উল্টো চিত্রই বরাবর দেখা যায়। বাজেট দিলে টাকা মেরে দেওয়ার একটা চান্স থাকে। তাই টাকা দিয়ে সবকিছু হবে না। বরং উৎসাহ দিতে হবে। ইচ্ছেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। সরকার যদি ইচ্ছে করে, তাহলে এটা সম্ভব।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার জাতি দেখল, এখন জেলহত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কি শুরু করা উচিত না? এই মহান চার নেতা সার্বভৌম বাংলাদেশের অন্যতম কারিগর। তাদের হত্যার বিচারও তো হওয়া উচিত।
ষষ আমরা সবাই তাই চাই। দেশে অনেক সমস্যা আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। তারপরও নৈতিকতার জায়গাটা সবাইকে স্বচ্ছ রাখতে হবে, রাখাটা খুব জরুরি। বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বিচারে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। ঠিক তেমনি এই চার নেতা হত্যার বিচারও এই সরকারকেই করতে হবে।

আওয়ামি লীগের ১৯৯৭-২০০১ শাসনকালে গাছকাটার এবং ছেউড়িয়া থেকে বাউল উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সে-সম্পর্কে জানতে চাই।

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে চার-পাঁচশ গাছ কেটে ফেলার চেষ্টা চলছিল। আমরা সবাই মিলে সেটাকে প্রতিহত করেছি। এটাকে যদি প্রতীকি অর্থে নিই, দেখব, বাংলাদেশের সব জায়গায় খোলাজায়গা, খেলার মাঠগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশের বড়-বড় শহরে বড়-বড় পার্ক ও খেলার মাঠ আছে। আমাদের ঢাকা শহরেও ছিল। কিন্তু ক্রমশ এগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আমরা এটার প্রতিবাদ করেছি। ঢাকার মানুষ আমাদের সঙ্গে ছিল তাই আমরা প্রতিহত করতে পেরেছি। ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়া বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং এর আলাদা একটি আবেদন আছে। সেখানে যারা আসে, থাকে, তাদের জীবনযাত্রা অন্যদের থেকে আলাদা, চিন্তায় এবং কাজে। কিন্তু লালন আখড়ার আন্দোলনে আমরা সফল হইনি। সেখানে ক্ষমতাশালীরা একজোট হয়ে নানাবিধভাবে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সেখানকার মানুষ প্রতিবাদ করলেও শেষাবধি সফল হওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষাকে অন্তভর্ুূক্তি কি সরকারের ভোটরাজনীতির অংশ নয়?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বর্তমানে যারা প্রথাগত রাজনীতি করে, তারা ক্ষমতাদখলের রাজনীতি করে। তাদের মনে রাখা উচিত, জনগণ তাদের দায়িত্ব দিয়েছে দেশচালানোর। সাধারণ আর দশজন মানুষের মতো আমরাও সরকারের কাছে এই বিষয়টি আশা করিনি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিভাজনের মধ্যে ফেলে যে-জাতি তৈরি হচ্ছে, তা পঙ্গু জাতি। সেখানে মাদ্রাসাশিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে তারা ভোটবাণিজ্যই করল। শুধুমাত্র ধর্মীয় কাজ ছাড়া এই শিক্ষায় শিক্ষিতরা অন্য কোনও কাজ করতে পারে না। ফলে তারা নিজেরা যেমন হীনমন্যতায় ভোগে পাশাপাশি সমাজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। যা আমরা দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছি।

মার্ক্সবাদ ও বাংলাদেশের রাজনীতি ভবিষ্যৎ কোথায়? বামদলগুলো নিজেদের মতানৈক্যতার কারণে বিভাজিত হতে-হতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে কেন?

বাংলাদেশে যারা এই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারা প্রকৃত অর্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেই এই রাজনীতি করছে। কিন্তু ক্ষমতা কিংবা নেতৃত্ব ধরে রাখার একটা প্রবণতা আমাদের ভেতরে আছে যার কারণে এই বিভাজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মার্ক্সবাদের সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলা নেই। কেননা পরিবর্তন আসবে ; হয়তো খুব ধীরে।

অমর একুশে বইমেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার আবেদন জানাবেন। অন্যদিকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাজকর্মে, মামলা-মোকদ্দমায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

এটা খুবই সঙ্গত একটা প্রশ্ন। ঘরেই যদি আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তবে বিশ্বে কী করে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করব? ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এইরকম; যেমন, ধরা যাক বিনিয়োগের ব্যাপারে আমরা বলি যে-সরকারই আসুক সে-সরকারই বলে বিদেশি বিনিয়োগ চাই। এখন বিদেশিরা বিনিয়োগ করবে তার আগে তো দেখতে হবে দেশে বিনিয়োগ আছে কিনা। দেশেই যদি তা না থাকে, তাহলে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে আসবে কী করে? বাংলা ভাষা যদি দেশের ভেতরেই প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি না পায় তাহলে তার আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি যেমন আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস আর্ন্তজাতিকভাবে খুব একটা গ্রাহ্য হচ্ছে না। এটা যে ব্যাপকভাবে উদ্যাপিত হচ্ছে, তা নয়। তার কারণ, মাতৃভাষার মর্যাদাটা আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। আর জাতিসংঘে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃত করবে এটা তো গৃহীত হওয়া উচিত এজন্য যে বাংলা ভাষা পৃথিবীর প্রায় ২৫ কোটি মানুষের ভাষা। আবার যদি সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে দেখা দেখা যায়, তাহলে মাতৃভাষার দিক থেকে এর স্থান চতুর্থ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদরে দেশে মাতৃভাষার চর্চা হচ্ছে না। বাঙালিরা মাতৃভাষার চর্চা করছে না। বাংলাদেশেও হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গেও সেভাবে হচ্ছে না, কেননা বাংলা তাদের রাষ্ট্রভাষা না। সেখানে হিন্দি ও ইংরেজির প্রভাব বেশি। সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে, দেশের ভেতরেই আইন আদালত বা উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এবং বিত্তবান যারা, তারা বাংলা ভাষার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। তাদের মধ্যে দেখা যায় ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে। এই বিভাজনে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা কেবল বিভাজন সৃষ্টি করছে না বরং একটি পঙ্গু প্রজš§ তৈরি করছে। জাতিকে বিভক্ত করা হচ্ছে। যাদের আমরা পঙ্গু মনে করছি, তারা কিন্তু নিজেদের পঙ্গু মনে করছে না। এরা মনে করছে, এরাই সবল হবে। কেননা তারা বৈশ্বিক যে ভাষা, আর্ন্তজাতিক ভাষাটা শিখছে। এই বিশ্ব হচ্ছে পুঁজিবাদী বিশ্ব এবং সেই বিশ্বে বাংলা ভাষার স্থান নেই ইংরেজি ভাষার স্থান আছে কাজেই তারা মনে করছে এই শিক্ষার মধ্যে দিয়ে তারা আর্ন্তজাতিক হচ্ছে। কেননা তারা স্থানীয় মানের লেখাপড়া শিখছে না। আর্ন্তজাতিক মানের লেখাপড়া শিখছে বলে এক ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে এবং শৈশব থেকে তাদের মধ্যে এই অহংকারটা গড়ে উঠছে। এবং এরাই যেহেতু বিত্তবান, কাজেই ভবিষ্যতে এরা রাষ্ট্রক্ষমতা পাবে বা এরাই দেশপরিচালনা করবে তারা এটা ভাবছে। কিন্তু সেটা হবে না। যেটা ঘটছে সেটা হল জনগণ তিনভাগে বিভক্ত হচ্ছে। সেই বিভাজনটা হবে শ্রেণী বিভাজন। এই বিভাজনের মধ্যে দিয়ে শ্রেণী বিভাজনকে আরও গভীর করা হচ্ছে। শিক্ষার কাজ হল ঐক্য আনা, সেখানে এই গভীরতার শিক্ষা বিভেদ আনছে। এবং এই বিভাজনটা অরাজকতা সৃষ্টি করবে, ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। যেমন অধিকাংশ লোকই বাংলা ভাষার চর্চা করবে এবং অল্প কয়েকজন যারা ইংরেজি শিখছে তারা সুবিধা করতে পারবে না। এই যে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে এই নৈরাজ্য থেকে মানুষ বেরিয়ে আসবে এবং বাংলা ভাষাতেই মানুষের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এটা ঘটবে, স্বাভাবিকভাবে এটা ঘটবে না। সেজন্য আমি মনে করি, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মূল ধারার শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা উচিত। অর্থাৎ বাংলার সংস্কৃতি, ভূগোল, ঐতিহ্য এগুলো সম্বন্ধে বাধ্যতামূলক থাকবে। তারপরে তারা অন্য বিষয়ে পড়-ক না পড়-ক মূলধারাটা থাকবে। আগে আমাদের ঘরের মধ্যে শক্ত হতে হবে, ঘরের ভিতকে শক্ত করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের দাবিটা জোড়ালো যুক্তি দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারব এবং সেই দাবিটা গ্রাহ্য হবে। তা না হলে, এটা তো ফাঁকা আওয়াজের মতো মনে হবে।

১৯৫৩ সালে অমর একুশের স্মরণ-মিছিলে আপনি সামনের সারিতে ছিলেন। সেই মিছিলে সামনের দিকে স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা/বাংলা চাই’। হঠাৎ পেছনের দিকে স্লোগানটা বদলে দাঁড়াল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই/বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই’। বাংলা ভাষার আন্দোলনের মিছিল থেকে এবং তৃণমূল মানুষের মুখ থেকেই প্রথম ‘বাংলা ভাষার রাষ্ট্র’ তথা বাংলাদেশের উদ্ভব। সেই সোনালি সময়ের স্মৃতিচারণ যদি করেন।

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এটা ছিল মূল দাবি। শুধু তাই নয় বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের দাবিটা আরও গণতান্ত্রিক ছিল। কিন্তু মিছিলে যখন যেতাম, তখন বিষয়টি উহ্য রেখেই স্লোগান দেওয়া হত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। কিন্তু দাবিটা জনগণের ভেতর থেকেই উঠে এল ‘বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই’ এ কথাটা কিন্তু কেউ কাউকে শিখিয়ে দেয়নি। এক. এই আবেগটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। দুুই. এ অনুভূতিটাও ভেতরে-ভেতরে জেগে উঠেছিল। বাংলাই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং তাই যদি হয় তবে সেটা বাংলা ভাষার রাষ্ট্র হবে। স্বাধীনতার কথাটা আগে আসেনি বা বিষয়টা তখনও পরিষ্কার না। কিন্তু ‘বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই’ এর অর্থ হচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। এবং এই দাবিটা কিন্তু অযৌক্তিক ছিল না এই অর্থে যে, পাকিস্তান জুড়ে তখন বাঙালির সংখ্যা শতকরা ৫৬ জন। এবং উর্দু পশ্চিম পাকিস্তানের সকলের মাতৃভাষা না। সেই দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য হলেও বাংলাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত ছিল। তার মানে এই না যে, এই কথার মধ্যে সবসময় স্বাধীনতার কথাটা ছিল। এটা একটা আবেগের মধ্যে এসেছে যে, একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত। সেজন্যেই ভাষার আবেগের কারণে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এবং বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই ধ্বনির প্রতিধ্বনির মতো এসেছে।

অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়েছে। আমাদের ভেতরে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে ঐতিহ্যের সব বিষয় নিয়ে উৎসব যা সময়কেন্দি ক। অর্থাৎ ফেব্র“য়ারি এলেই ভাষা নিয়ে মাতামাতি। বৈশাখ এলেই পান্তা-ইলিশ, ফ্যাশন হাউজগুলোর পোশাক-প্রর্দশনী। অথচ সারাবছর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ভাষার যথেচ্ছ অপব্যবহার হলেও নিশ্চুপ থাকা। এটা কেন হচ্ছে?

ভাষার মাস বলতে আমি আলাদাভাবে কোনও মাসকে দেখি না। ভাষার মাস এই কথাটা ঠিক না। ভাষা তো সবসময়ই ভাষা এবং একটা বিশেষ সময়ের, বিশেষ মাসের ভাষা এটা না। এই কথাটা পত্রিকায় বা মিডিয়াতে আসে, এটা ঠিক না। যেখানে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে কাজেই এটাকে কেন্দ্র করে বইয়ের মেলা হচ্ছে ঠিক আছে; কিন্তু ভাষার মাস বলার মানেই হচ্ছে যেন আমরা অন্য এগারো মাসকে উপেক্ষা করছি। এবং এই দীর্ঘ এগারো মাসের সময়টা বাংলা ভাষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ না। সারা বছরই বাংলা ভাষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এই বোধ সবার ভেতরে থাকা উচিত।

শৈশবে পড়া কোনও বই যা আপনার মনে এখনও দাগ কেটে আছে?

শৈশবে তো প্রচুর পড়া হয়েছে, তবে শরৎচন্দ্রের রামের সুমতি র কথা এখনও মনে পড়ে। বিভূতিভূষণের আম আটির ভেপুঁ

বর্তমানে কী পড়ছেন?

পড়ার জন্য বেশ কয়েকটা বই হাতে। তবে পাকিস্তান দেশভাগের উপর একটা বই পড়ছি।

তরুণ বয়সে যখন আপনার প্রস্তুতিকাল, সে সময়ে কারা আপনার উপর ছড়ি ঘুরিয়েছে?

রবীন্দ্রনাথ, তিনি এখনও ছড়ি ঘোরাচ্ছেন বলতে পারো। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও যাদেও লেখা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে তাদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু অন্যতম একারণে যে, তার গদ্যশৈলী আমার খুব ভালো লাগত। সুধীন্দ্রনাথও ভালো লাগত। যদিও বুদ্ধদেব ও সুধীন ভিন্ন ঘরানার গদ্যশৈলীতে লিখেছেন তবুও ভালো লাগত। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে শিবরাম চক্রবর্তী খুব ভালো লাগত। তার লেখায় যে কৌতুক আছে তা আমার ভালো লাগত।

স্মৃতিময় কোনও গ্রন্থাগার?

ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি। সেখানে প্রায় সব বই পাওয়া যায়। এই লাইব্রেরিতে আমি অনেকটা সময় কাটিয়েছি আমার গবেষণার সময়।

এবার একান্তই ব্যক্তিগত একটি প্রশ্ন, নাজমা জেসমিন চৌধুরী যার সঙ্গে আপনার পথচলা, বেদনার এই নীল রঙ সম্পর্কে যদি কিছু স্মৃতিচারণ করেন।

তার কথা আমি বিভিন্ন সময় বইতেও লিখেছি। আমাদের ভেতর মতাদর্শের একটা ঐক্য ছিল, সেও সৃষ্টিশীল মানুষ ছিল। বড় কথা আমাদের চিন্তাগত মিল ছিল। জীবনে যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতের মিলটা খুব জরুরি বলে আমি মনে করি। মনের মিলও মতের মিলের উপর নির্ভর করে।

Previous Articles

[ad#co-1]