ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা

জয়নুল আবেদীনমেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না, যে-সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করে দ্বিজাতিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়েছিল, সুদীর্ঘ পাকিস্তান আমলে তা বজায় থাকল। সফল ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার বলে বিবেচিত মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচেতনার মানুষের চেষ্টা, নবপ্রেরণায় যুবশক্তির উত্থান এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা ব্যতীত শ্রেণীবৈষম্য এবং শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে না

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহী ধনিক-বণিক ও গুটিকয়েক কোটিপতি ব্যবসায়ী ও বুর্জোয়া শোষকশ্রেণী শোষণের সুবিধার্থে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশকে ভাগ করেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চল পাকিস্তান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বাসস্থান হিন্দুস্তান বা ভারতবর্ষ এই নামে পরিচিত হলো। মূলত শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্বের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো। দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর দেশভাগ হলেও শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হলো। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক এবং ভাষাগত ও জাতিগত দ্বন্দ্ব। মজার ব্যাপার হলো, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রধান গুরু মওদুদী প্রবলভাবে পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন এবং ভারতবর্ষে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখছিলেন। অবশেষে দেশ যখন প্রকৃতই ভাগ হচ্ছে তখন মওদুদী বললেন, দেশ যখন ভাগ হচ্ছে তখন আমরা পাকিস্তানে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করব। ভারতের কোটি কোটি মুসলমান সম্পর্কে মওদুদীর মন্তব্য ছিল, আপনারা হিন্দুস্তানে রামরাজত্ব কিংবা কৃষ্ণ কিংবা মনুর রাজত্ব কায়েম করেন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। আপনাদের শাস্ত্রানুযায়ী রচিত শাসনতন্ত্রে মুসলমানদের যদি শূদ্র বা ম্লেচ্ছ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের যদি কোনো নাগরিক অধিকার না-ও দেওয়া হয় তাতেও আমাদের আপত্তি নেই। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে মওদুদী পাঞ্জাবে প্রায় ৫০ হাজার কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের শাসনামলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মওদুদীর বিচার হয়। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মুনীর কাদিয়ানিদের হত্যা ও তাদের ধনসম্পদ লুটপাটের অভিযোগে মওদুদীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। সৌদি বাদশাহর হস্তক্ষেপে তাঁর জীবন রক্ষা পায়। ১৯৪৭ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হলো। গরিব চাষি, মজুরশ্রেণীর মুসলমানরা মনে করেছিল, দেশভাগ হলে মুসলমানরা জমিজমা খেত-খামারের মালিক হবে। অধিকাংশ হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতে চলে গেলে তাদের সম্পত্তির মালিক হলো সাম্প্রদায়িক মুসলিম শাসকশ্রেণী ও আমলারা। শোষিত শ্রেণী যে-তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল।

কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করল ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’ প্রকৃতপক্ষে, কমিউনিস্টরা পাকিস্তানবিরোধী ছিল না, তাঁরা চেয়েছিল পাকিস্তানের শোষিত-বঞ্চিত চাষি-মজুরদের অর্থনৈতিক মুক্তি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের বেশিরভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই লীগ শাসকদের একটা সুবিধা ছিল, সব আন্দোলনের মধ্যে হিন্দু ও কমিউনিস্টদের ভূত দেখা। অবশ্য, ব্রিটিশ রাজত্বে কমিউনিস্ট পার্টি তেভাগা আন্দোলন, নানকার আন্দোলনসহ শোষিত মানুষের সব আন্দোলনে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছে, পাকিস্তান হওয়ার পরও পার্টি কৃষাণ মজদুর ও শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। ভাষা আন্দোলন সংঘটিত করতেও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুসলিম লীগ কমিউনিস্ট কর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে এবং বহু নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে। নেতাদের কেউ কেউ আত্দগোপনে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে লাগলেন। লীগ সরকারের বর্বরোচিত নির্যাতনে অনেক নেতাকর্মী ভারতে চলে যেতে বাধ্য হলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম লীগ দেশবাসীর সামান্যতম কল্যাণমূলক কাজ করার পরিবর্তে জোতদার, জমিদার ও মহাজনদের পক্ষ নিয়ে চাষি-মজুরদের চরম নির্যাতন শুরু করল। তাদের নির্যাতনের নিষ্ঠুরতম উদাহরণ হলো নাচোলে তেভাগা আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আদিবাসী সাঁওতাল কৃষক ও হিন্দু-মুসলমানসহ শত শত কৃষককে নির্মম নির্যাতন, নারীধর্ষণ, লুণ্ঠন ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়াসহ কয়েকশ কৃষক, নারী-পুরুষকে হত্যা করা। খুলনার কালসীতেও মুসলিম লীগ একইভাবে কৃষক নারী-পুরুষদের নির্যাতন করল।

এমনি পরিবেশে ভাষা আন্দোলনকে নুরুল আমিন সরকার হিন্দু ও কমিউনিস্টদের আন্দোলন হিসেবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
মওলানা আকরম খাঁ ও তাঁর পত্রিকা আজাদ মুসলিম লীগের দালালি করলেও ভাষার দাবিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির পক্ষে অবস্থান নেন। আগে থেকে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রশাখা ছাত্র ফেডারেশনের কর্মকাণ্ড পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় ১৯৫১ সালের ২৭ মার্চ ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রগতিশীল যুবসমাজকে নিয়ে যুবলীগের জন্ম হয়। মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় বসেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চেয়েও একধাপ এগিয়ে ব্যাপক শিক্ষা সংকোচন নীতি চালু করল। বেশ কিছু স্কুল বন্ধ করে সরকারি দপ্তর বসাল। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল স্কুল ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের বেতন বৃদ্ধি করল। ফুঁসে উঠল ছাত্র-যুবক ও সচেতন নাগরিক সমাজ। নাজিমউদ্দিন ঘোষণা করলেন, ইসলামী তমদ্দুন ও জাতীয় সংহতি রক্ষার জন্য একমাত্র উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হওয়া দরকার। তাঁদের মতে, বাংলা হিন্দুদের ভাষা এবং হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের ভাষা সংস্কৃত থেকে বাংলার উৎপত্তি। অতএব, পাক মুসলমানের জন্য বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী জনগণকে নিরক্ষর, পশ্চাৎপদ রাখার জন্য বাংলার ওপর আরবি হরফ চাপানো এবং রোমান হরফে বাংলা বর্ণমালা চালুর চেষ্টা করল এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে জনগণের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আবার বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলেন। ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ-ধর্মঘট করে এবং বিরাট মিছিল বের করে। ৩১ জানুয়ারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনা কমিটি’ গঠিত হয়। ৪ জানুয়ারি ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট এবং সারা ঢাকা শহর মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মিছিলের স্লোগান ছিল_’বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানায়।

এদিকে মুসলিম লীগ সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজনীতিবিদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের নিষেধ সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে, গাজীউল হকের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা জনসভা করে বিশাল মিছিল বের করে। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ মিছিলে নুরুল আমিন সরকারের পুলিশ ও মিলিটারির মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ শুরু হলো। হাসপাতাল ও হোস্টেলেও গুলি, লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল বর্ষণ করল। বরকত, সালাম, জব্বার, সফিউদ্দিন ও সালাহউদ্দিন ঘটনাস্থলেই নিহত হলো। সালাহউদ্দিনের মাথার খুলি উড়ে গেল। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে জানতে পারি, ২৬ নিরীহ ছাত্র-জনতাকে পুলিশ হত্যা করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারির মর্নিং নিউজ সরকারি মুখপাত্রের বিবরণীতে লিখেছে, ‘শুধু হিন্দুদের দোকানগুলো বন্ধের ভেতর দিয়েই ওইদিনের হরতাল পালিত হয়।’ সরকারি প্রেসনোটেও বলা হয়, এটা পূর্ব পাকিস্তানবাসীর আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনের নেতা হিন্দু ও কিছু কমিউনিস্ট। ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকারি পত্রিকা মর্নিং নিউজ আরো মিথ্যা ও কুরুচিপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করে যে ভারত থেকে ১০০ কমিউনিস্ট পূর্ববঙ্গে এসেছে এবং তাদের নেতৃত্বে হিন্দুরা পাকিস্তানের যানবাহন ও রেলগাড়ি চলাচল বন্ধ করেছে। এই সাম্প্রদায়িক মিথ্যা অপপ্রচারের ফল হলো হিতে বিপরীত। নৃশংস ছাত্রহত্যা ও বর্বর নির্যাতন এবং লীগ সরকারের কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচারে সরকারের জনসমর্থন শূন্যের কোঠায় নেমে এল। সাম্রাজ্যবাদ, জমিদারশ্রেণী ও মুষ্টিমেয় কোটিপতি ব্যবসায়ীর স্বার্থরক্ষাকারী নুরুল আমিন সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠল। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বুর্জোয়া শাসক আর শোষিত মেহনতি কৃষক-শ্রমিকের দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে উঠল। ভাষা আন্দোলনের সাফল্যে হক-ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নৌকার গণজোয়ারে নুরুল আমিন সরকারের ভরাডুবি হলো। যুক্তফ্রন্টের ভোটযুদ্ধে ল্যান্ডস্লাইড বিজয় অর্জিত হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, শোষক আর শোষিতের দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি।

মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না, যে-সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করে দ্বিজাতিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়েছিল, সুদীর্ঘ পাকিস্তান আমলে তা বজায় থাকল। সফল ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার বলে বিবেচিত। মুষ্টিমেয় ধনিক-বণিকের স্বার্থরক্ষাকারী সরকারগুলোর শাসকশ্রেণীর মদদপুষ্ট মৌলবাদীদের দ্বারা সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা পাকিস্তান আমলে যেমন সক্রিয় ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশেও সে-ধারা অব্যাহত রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৌলবাদীদের আরো বেগবান, শক্তিশালী মনে হয়। লাখ লাখ বীরের রক্তস্রোত, মাতার অশ্রুধারা আর চার লাখ জায়া, ভগি্ন, মাতা, কন্যার সম্ভ্রমহানির পরও মৌলবাদীদের আস্ফালন বাংলার মাটিতে প্রত্যাশিত নয়। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচেতনার মানুষের চেষ্টা, নবপ্রেরণায় যুবশক্তির উত্থান এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা ব্যতীত শ্রেণীবৈষম্য এবং শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে না।

লেখক : শিক্ষা গবেষক

[ad#co-1]