বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা ভাষা

হুমায়ুন আজাদ
শরৎচন্দ্র তার চরিত্রহীন উপন্যাসে ব্যারিস্টার শশাঙ্কমোহনের চিত্র আঁকতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, তিনি বিলাত প্রত্যাগত, সুতরাং সাহেব। মেজাজটা ব্রিটিশ। তিনি বাংলা বলেন অশুদ্ধ, ইংরেজি বলেন ভুল। আমাদের সাহেবমনা শিক্ষিতরাও এই ‘গুণের’ অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা শিক্ষক তাদের অনেকেই শুদ্ধ বাংলা বলেন না, শব্দের বানান শুদ্ধ করে লিখতে পারেন না। মাতৃভাষার প্রতি তাদের অপরিসীম অবজ্ঞা। জিজ্ঞেস করলে বলেন যে, বাংলাটা তার ঠিকমতো আসে না। এসব দেখেশুনেই ক্ষুব্ধ হয়ে হুমায়ুন আজাদ এক কলামে বছর দশেক আগে লিখেছিলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা ভাষা’। এতদিনেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। প্রাসঙ্গিক ভেবে লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো

বাঙলাদেশের শক্তিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে বাঙলা ভাষার অবস্থা কিছুটা ভালো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙলা ব্যবহৃত হয় কিছুটা বেশি, মর্যাদাও পায় কিছুটা বেশি : অধিকাংশ শিক্ষক কাশে বক্তৃতা দেন বাঙলায়, ছাত্রছাত্রীরা বাঙলায় লেখা পাঠ্যবই পড়ে বেশি, পরীক্ষায়ও তাদের অধিকাংশ উত্তর দেয় বাঙলায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বাঙলাকেই ব্যবহার করে প্রশাসনের ভাষারূপে। ব্যাপারটিকে শুভ ও চমৎকার ব’লে মনে হয়, কিন্তু এটা একটি ভয়ানক সত্যও নির্দেশ করে যে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রের প্রধান শক্তিকেন্দ্রগুলোর বাইরে অবস্থিত, এবং বাঙলাও রাষ্ট্রের প্রধান শক্তিকেন্দ্রগুলোর বাইরের ভাষা। রাষ্ট্রের যেখানেই শক্তি সেখানেই বাঙলার অনুপস্থিতি, আর ইংরেজির আধিপত্য। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কিছু শক্তির বিভাগ রয়েছে, সেগুলোতেও বাঙলার স্থান প্রায় নেই। অর্থনীতি বা হিশেব বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগ কিছুটা বেশি শক্তিমান, তাই সেগুলোতেও বাঙলার অধিকার নেই। বাঙলাদেশের অসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয়গুলো অবস্থিত অনেকটা বাঙলা ভাষা-এলাকার বাইরে; সেখানে বাঙলার অধিকার নেই; কারণ সেগুলো খুবই শক্তিমান। বাঙলা নেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে; এমনকি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও বাঙলা নেই, যদিও বাঙলাদেশের মাটিতেই ফসল ফলানোর কথা তাদের। এখনো শক্তি ও ইংরেজি অচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িত, বাঙলা ও শক্তিহীনতা জড়িত শাশ্বত সম্পর্কে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙলা ভাষার যে-রূপ ব্যবহৃত হয়, তাকেও বাঙলা ভাষার প্রতি অনুরাগ বা আন্তরিকতা বলা যায় না। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আক্ষরিকার্থেই ঘিরে আছে বাঙলা ভাষা; এগুলোর সমস্ত দেয়াল বাঙলা ভাষার বড়ো বড়ো বর্ণমালায় কারুম-িত। দেয়ালের বাঙলা ভাষার বাক্যে ও বানানে ভুলের শেষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দাগুলো পরিপূর্ণ থাকে বাঙলা ভাষার উচ্চ কোলাহলে; ওই বারান্দাগুলোতে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় অপরিমেয় বাঙলা ভাষা; তবে ওই বাঙলা ভাষায় শিক্ষার বা সংস্কৃতির কোনো ছাপ নেই। যে বাঙলা ভাষায় পাঠ দেয়া হয় বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষে, পড়ানো হয় যে-সব বাঙলা বই, সে-ভাষাও রুগ্ন। প্রশাসনে ব্যবহৃত হয় যে-বাঙলা ভাষা, তা অনেক সময় বুঝে নিতে হয় নিজ জ্ঞানে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-বাঙলা ভাষায় দেয়াল শোভিত হয়, যে-বাঙলা ভাষা উচ্চারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় ও শ্রেণীকক্ষে, যে-বাঙলা ভাষায় চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, তা অশুদ্ধ, অমার্জিত, সাধু-চলতি ও আঞ্চলিকের উৎকট মিশ্রণ। তাতে বাঙলা ভাষার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পায় না, প্রকাশ পায় না নিষ্ঠা। বোঝা যায় বাঙলা ভাষাকে কেউ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি প্রধান ব্যাপার; আর তাতে প্রধান হচ্ছে দেয়ালের লেখন, শ্লোগান ও উত্তেজক বক্তৃতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো হচ্ছে রাজনীতির বিশাল শ্লেট; মনে হয় বিরাটকায় রাজনীতিক শিশুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলোতে অনভ্যস্ত হাতে বাঙলা বর্ণমালা আয়ত্তের সাধনা করছে। তাদের হাতের লেখা খারাপ; শুধু তাই নয়, তাদের অনেক প্রিয় শব্দের বানানও তারা এখনো শিখে ওঠেননি। এখনো তারা ‘গণতন্ত্র’ বানান শেখে নি, যদিও গণতন্ত্রের জন্যে তারা অত্যন্ত আকুল। শব্দটিতে যে একটি মূর্ধন্য-ণ রয়েছে, একে তারা গণতন্ত্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না। তারা দন্ত্য-ন-এর গণতন্ত্র চায়। কয়েক দশক ধ’রে তারা চেয়ে আসছে স্বায়ত্তশাসন; স্বায়ত্তশাসন চাইতে চাইতে তারা স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, কিন্তু ‘স্বায়ত্তশাসন’ বানানটি শেখে নি। ‘ত্ত’-এর নিচে যতেœর সাথে তারা একটি ব-ফলা বসায়, লেখে ‘স্বায়ত্ত্বশাসন’; ভাবে হয়তো এতে বানানটি মজবুত হলো। যেমন তারা ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ বানানও ঠিক লিখতে পারে না; পারে না ‘প্রতিযোগিতা’ বানানও। একটি ছাত্রাবাসের উৎসবের লাল কাপড়ে লেখা হয়েছে ‘আমন্ত্রীত’; বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিখ্যাত বাগানে লেখা রয়েছে ‘ফুল ছিড়িবেন না’ ‘ছিঁড়িবেন’-এ চন্দ্রবিন্দু না দিলেও ফুল ফোটে! ছাত্রদের ভাষা ও বানানের সাথে প্রতিযোগিতা ক’রে চলেছে প-িতদের ভাষা ও বানান। বড়ো বড়ো বর্ণে লেখা রয়েছে ‘উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষনা কেন্দ্র’; সামাজিক বিজ্ঞানীরা মূর্ধন্য-ণ ছাড়াই চমৎকার গবেষণা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দেয়ালে একটি সমাজতান্ত্রিক দলের বিপ্লবী পোস্টারে বড়ো বড়ো অক্ষরে ‘মানুষ’ বানান লেখা হয়েছে ‘মানুস’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় যে-বাঙলা ভাষা উৎপাদিত হয়, তার কোনো মানরূপ নেই। পৃথিবী জুড়েই তরুণেরা এখন মানভাষা বিরোধী; কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের [উভয় লিঙ্গেরই] মধ্যে মানভাষা বিরোধিতা চরম বা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সম্ভবত আটানব্বইয়াংশ ছাত্র মান বাঙলা বলতে বা লিখতে পারে না। তারা কথা বলে আঞ্চলিক বাঙলায়, খুব চিৎকার ক’রেই তারা আঞ্চলিক ভাষা ব’লে থাকে; বিচিত্র টানে তারা মুখর ক’রে রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দা। তারা চলতি ভাষা বলতে পারে না, বলার চেষ্টা করলেই বেরিয়ে পড়ে আঞ্চলিক বা বিকৃত সাধু ভাষা; তারা চলতি বাঙলা লিখতেও পারে না। তারা অধিকাংশ ক্রিয়ারূপই ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। তারা ‘লিখেছি’কে বলে ‘লিখছি’, ‘করেছি’কে বলে ‘করছি’, ‘বলুন’কে বলে ‘বলেন’, ‘আসুন’কে বলে ‘আসেন’, ‘গাইতে’কে বলে ‘গেতে’। দুটি বা তিনটি ব্যঞ্জন যুক্ত হ’লে তারা তা ভেঙে প্রাকৃত উচ্চারণ করে। ‘রবীন্দ্রনাথ’কে তারা বলে ‘রবীন্রনাথ’। শুধু ছাত্ররা নয়, অধ্যাপকেরাও অনেকেই চলতি ভাষা বলতে বা লিখতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা প্রধান অতিথি হয়ে নিয়মিত নানা উৎসবকে উজ্জ্বল ক’রে থাকেন। তাঁদের অধিকাংশের উচ্চারণ যেমন বিভীষিকাজাগানো বাক্যসম্ভারও তেমনি। তাঁরা অনেকে গুছিয়ে কথাই বলতে পারেন না, সাধু-চলতি-আঞ্চলিক মিশিয়ে তাঁরা বিশৃঙ্খল বাক্যে ভাষণ দেন। শিক্ষকদের অনেকেই এ-ধরনের বাঙলা বলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এখন ইংরেজি কেমন লেখেন, জানি না; কিন্তু বাঙলা খুবই খারাপ লেখেন। বিভিন্ন বিভাগের বিজ্ঞপ্তি বোর্ডের দিকে তাকালে চোখে পড়ে শিক্ষকদের ভুল বানান ও বাক্য। এক শিক্ষক লিখেছেন ‘নিচে উল্লিখিত’; তিনি জানেন না ‘উল্লিখিত’ হচ্ছে ‘ওপরে লিখিত’। ছাত্রদের খাতায় যে-বাঙলা পাওয়া যায়, তাতে শুদ্ধতার কোনো স্পর্শ থাকে না। অধিকাংশ ছাত্র বাঙলা যুক্তাক্ষর লিখতেই জানে না; অনেকে লিখতে জানলেও জানে না কী কী বর্ণ যুক্ত হয়েছে অক্ষরটিতে। ‘বিজ্ঞান’-এর ‘জ্ঞ’তে, বা ‘ক্ষমা’র ‘ক্ষ’তে, বা ‘অঞ্জলি’র ‘ঞ্জ’তে, বা ‘ব্রাহ্মণ’-এর ‘হ্ম’তে, বা ‘গ্রন্থ’-এর ‘ন্থ’-এ, বা ‘চট্টগ্রাম’-এর ‘ট্ট’তে কী আছে, জানে না অধিকাংশ ছাত্র। তারা না জেনে এ-অক্ষরগুলো লেখে, অনেকেই ঠিকমতো লিখতে পারে না, তারা জানে না বহু শব্দের শুদ্ধ রূপ। ‘মুমূর্ষু’কে ‘মুমর্ষ’, ‘ঘনিষ্ঠ’কে ‘ঘনিষ্ট’, ‘যথেষ্ট’কে ‘যথেষ্ঠ’, ‘গ্রস্ত’কে ‘গ্রস্থ’, ‘মুখস্থ’কে ‘মুখস্ত’, ‘সার্থক’কে ‘স্বার্থক’, ‘আয়ত্ত’কে ‘আয়ত্ত্ব’; এবং এমন অসংখ্য বানান ও শব্দরূপ তারা লেখে ও বলে। এ-অজ্ঞতার মধ্যে নতুন সমস্যা সৃষ্টি ক’রে চলছেন বিজ্ঞরা। তাঁরা কোথায় শুনেছেন ‘ইতোমধ্যে’, আর ‘ইতোপূর্বে’ শুদ্ধ; তাই প্রচার ক’রে চলছেন শব্দ দুটি। ছাত্ররা বিভ্রান্ত হচ্ছে এতে। বাঙলার জন্যে ‘ইতিপূর্বে’ আর ‘ইতিমধ্যে’ই শুদ্ধ। এ-বিজ্ঞরা শুনেছেন যে ঈ-কারান্ত শব্দের শেষে বহুবচন বা অন্য কিছু যুক্ত হ’লে তা ই-কারান্ত হয়ে যাবে; তাই এখন ‘মন্ত্রিসভা’ খুব চলছে। এ-নিয়মটা বাঙলার নয়, সংস্কৃতের; বাঙলায় ‘মন্ত্রীসভা’ই শুদ্ধ।

যে-সমাজের সমস্ত সূত্রই ভুল, সে-সমাজের ভাষিক সূত্র শুদ্ধ হবে এমন আশা অন্যায়। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙলা ভাষার যে-অবস্থা, তার গভীর সামাজিক, রাজনীতিক ও জ্ঞানগত তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙলা ভাষা চলে, এর সামাজিক রাজনীতিক তাৎপর্য হচ্ছে যে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের রাষ্ট্রের শক্তিকেন্দ্রগুলোর বাইরে অবস্থিত, এবং বাঙলা আমাদের শক্তির ভাষা নয়। বাঙলা ভাষা কারো সামাজিক আর্থিক উন্নতিতে সাহায্য করে না। যে-ভাষা তার ভাষীদের সামাজিক আর্থিক উন্নতির সহায়ক নয়, সে-ভাষাকে কেউ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে না, তার জন্যে যতোই কপট আবেগ থাক। ওই ভাষাকে কেউ শ্রদ্ধাও করে না, তাকে নিয়ে গৌরবও বোধ করে না। এটা নির্মম সত্য যে বাঙালি ইংরেজিকে যতোটা শ্রদ্ধার চোখে দেখে বাঙলাকে সে-চোখে দেখে না। এর কারণ ইংরেজি এখনো আমাদের সামাজিক আর্থিক উন্নতির সিঁড়ি, বাঙলা হচ্ছে অনুন্নতি। বিদ্যার এলাকায়ও দেখা যায় যে-বিদ্যা যতো আর্থিক দিক দিয়ে শক্তিমান, সে-বিদ্যায় ইংরেজির প্রাধান্য ততো বেশি, বাঙলার অনুপস্থিতি সেখানে ততো প্রকট। মানববিদ্যা সবচেয়ে দুর্বল, তাই সেখানে বাঙলার প্রাধান্য, ইংরেজি সেখানে প্রায় নেই; সামাজিক বিজ্ঞান মানববিদ্যার থেকে বেশি শক্তিমান, তাই সেখানে ইংরেজির প্রাধান্য, বাঙলা সামান্য আছে; বিজ্ঞানের বিদ্যাগুলো আরো শক্তিমান, তাই সেখানে ইংরেজির প্রাধান্য; আর চিকিৎসা প্রকৌশল আর্থিক দিক দিয়ে সর্বশক্তিমান, তাই সেখানে বিন্দুমাত্রও বাঙলা নেই। বাঙলা বোঝায় সামাজিক আর্থিক নিম্নতা।

সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙলার যে-অশুদ্ধ প্রয়োগ চলে, তার জ্ঞানগত তাৎপর্য আরো ভয়াবহ। ভাষা শুধু সামাজিক যোগাযোগের সুলভ বাহন নয়, ভাষা মানুষের চিন্তার মূল উপাদান। ভাষা ছাড়া মানুষের পক্ষে সুশৃঙ্খল চিন্তা করা অসম্ভব; শুদ্ধ ভাষা ছাড়া সুষ্ঠু জ্ঞান অর্জন, বিতরণ ও সৃষ্টি অসাধ্য। বাহ্যজগত থেকে মানুষ যে-জ্ঞান অর্জন করে, শিক্ষিত মানুষ তার চেয়ে বেশি অর্জন করে গ্রন্থ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানত গ্রন্থ থেকে জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র। যে-জ্ঞান লিপিবদ্ধ রয়েছে গ্রন্থে, তা শিক্ষার্থীর পক্ষে আয়ত্ত করা, যথাযথরূপে আয়ত্ত করা, সম্ভব নয়, যদি তার ভাষার ওপর অধিকার না থাকে। যিনি ভাষা সুষ্ঠুরূপে প্রয়োগ করতে পারেন না, তাঁর পক্ষে জ্ঞান বিতরণও অসম্ভব। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্যে কোনো একটি ভাষার, বিশেষ ক’রে মাতৃভাষার, ওপর অসাধারণ অধিকার অপরিহার্য। কারণ ভাষা চিন্তাকে জন্ম দেয়, বিকশিত করে, এবং প্রকাশ করে। ব্যাধিগ্রস্ত ভাষার সাহায্যে সম্ভব শুধু ব্যাধিগ্রস্ত চিন্তা। মৌলিক চিন্তার জন্যে দরকার মৌলিক ভাষা। এখানে মৌলিক ভাষা নেই, তাই মৌলিক চিন্তাও নেই; চারপাশে পুরোনো জীর্ণ ভাষায় চলছে পুরোনো জীর্ণ চিন্তা। যে-অশুদ্ধ বাঙলা ভাষা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার সাহায্যে আহরণ ও বিতরণ চলছে অশুদ্ধ চিন্তা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-জ্ঞানচর্চা চলছে, তা যে শুদ্ধভাবে চলছে না, সেটা নিশ্চিত। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা চলছে, কিন্তু তাকে জ্ঞান আহরণ, বিতরণ ও সৃষ্টির সুষ্ঠু বাহনরূপে ব্যবহার করা দরকার। এ-জন্যে দরকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বাঙলা ভাষা শুদ্ধরূপে আয়ত্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয়কে অবিলম্বে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তারা সুষ্ঠুভাবে বাঙলা ভাষা আয়ত্ত করতে পারে। এ-জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুদ্ধ, সুষ্ঠু, জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত বাঙলা শেখানোর জন্যে বিশেষ পাঠক্রম চালু করা দরকার। এ-পাঠ হবে আবশ্যিক, এবং প্রথম বর্ষ অনার্স শ্রেণীতে দু-মাস ধরে এ-পাঠ দেয়া যেতে পারে। আমাদের ব্যাধিগ্রস্ত ভাষা ও চিন্তাকে সুস্থ করার জন্যে এ হচ্ছে জরুরি চিকিৎসা।

সাপ্তাহিক ২০০০

[ad#co-1]