পদ্মা সেতুতে রেল নিয়ে সরকার দাতাসংস্থা টানাপড়েন

মোস্তফা চৌধুরী
পদ্মা সেতু নির্মাণে দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। দাতাগোষ্ঠী চাচ্ছে এই মুহূর্তে রেললাইন ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মাণে সহযোগিতা করতে। আর সরকার তথা সেতু বিভাগ কিছুতেই রেললাইন ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণে রাজি নয়। সেতু বিভাগের দাবি হচ্ছে পদ্মা সেতুতে রেললাইন সংযোগ দিতে মাত্র ১৫৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার লাগবে। এ অবস্থায় রেললাইন যুক্ত করেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে হবে।

জানা গেছে, জাপানি দাতা সংস্থা জাইকা ও বিশ্বব্যাংক এই মুহূর্তে রেললাইন ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মাণে সেতু বিভাগকে উপর্যুপরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেতু বিভাগ তা মানছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে বিভাগের একটি সূত্র দাবি করেছে পদ্মা সেতু নির্মাণ বিলম্বিত বা স্থগিত করতে দেশি-বিদেশি একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। দেশীয় এই চক্রটি পদ্মার ওপারে রেললাইন বিস্তৃতির বিরুদ্ধে নেপথ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

সেতু বিভাগ সূত্র দাবি করেছে, রেললাইন ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত হবে না। এ ছাড়া মংলা বন্দরকে সম্পূর্ণভাবে সচল করতে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই। সরকার যে কোনো মূল্যে পদ্মা সেতুতে রেললাইন যুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সূত্র জানায়, এর আগে যমুনা সেতু নির্মাণের সময় একটি মহল ও দাতাগোষ্ঠী যমুনা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু ওই সময় সরকারের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত যমুনা সেতুতে রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল। এদিকে শেষ মুহূর্তে পদ্মা সেতুতে রেললাইন নির্মাণে দাতাদের গড়িমসিতে পদ্মা সেতুর টেন্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে ১১ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ আগামীকাল পদ্মা সেতুর প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার আহ্বানের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও তা পিছিয়ে যাচ্ছে। সূত্রমতে দাতাগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বারবার সেতুর নকশা পরিবর্তনের ফলে সেতু নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সব যখন চূড়ান্ত ঠিক তখনই বিশ্বব্যাংক এবং জাইকা রেললাইন ছাড়াই পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকারকে অব্যাহতভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে সেতু ভবনে দফায় দফায় বৈঠক করেও কোনো ফল হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালেই পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২০০৮ সালের মধ্যেই এই সেতুটি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একটি গ্রুপের অতি আগ্রহে পদ্মা সেতু নির্মাণের স্থান নির্মাণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তৎকালীন একজন পূর্ণ মন্ত্রীর উৎসাহে পদ্মা নদীর আরিচা পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে ওই সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার আগ্রহ না থাকায় বিষয়টি সফল হয়নি। অবশেষে পদ্মা নদীর মাওয়া পয়েন্টেই পদ্মা সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম সপ্তাহ থেকেই পদ্মাসেতু নির্মাণের বিষয়ে বিশেষভাবে তৎপর হয়। বর্তমান সরকার তথা যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এর মধ্যে একাধিকবার মিডিয়ার কাছে আশা ব্যক্ত করেছেন, ২০১৩ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুটি যান চলাচলের চন্য ছেড়ে দেয়া হবে। এখন দাতাদের অসহযোগিতার কারণে হয়তো ২০১৩ সালের মধ্যে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হতে নাও পারে।

এদিকে রেলওয়ে বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, পদ্মা সেতুতে রেললাইন সংযোগ না করলেও সেতু নির্মাণের সময়ই সেতুর দুই পাড়ে রেলওয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তাতে ব্যয় হবে প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ফরিদপুর পুকুরিয়া রেললাইন ভাঙ্গা উপজেলা পর্যন্ত বর্ধিত করে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

[ad#co-1]