সবই আছে শুধু নেই হামীম

ঢাকার কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রভাতি শাখার বাংলা মিডিয়ামের কেজি ক্লাসের ছাত্র ছিল হামীম। ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে বাসচাপায় মারা যায় এই লিটল ফ্লাওয়ার
এম মামুন হোসেন হামীম
প্রতিদিনের মতো বুধবারও স্কুলে যাওয়ার আগে চিপসের জন্য বায়না ধরেছিল হামীম। মা সনিয়া আক্তার একমাত্র ছেলের বায়না রাখতে সেদিনও মহল্লার দোকান থেকে চিপস কিনে দিয়েছিলেন। চিপস খাওয়া শেষ করে যেতে পারেনি ইয়াসিন হামীম শেখ। অর্ধেকের বেশি চিপস ভরা প্যাকেট রেখে দিয়েছিল স্কুল ব্যাগে। স্কুল থেকে ফেরার পথে রিকশায় বসে চিপস খেতে খেতে বাসায় ফিরবে। কিন্তু তার আগেই ঘাতক বাস কেড়ে নেয় সাড়ে চার বছরের ছোট্ট হামীমের প্রাণ।

দুর্ঘটনায় আহত হামীমের মা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ফিরে এসেছে বাড়িতে। কিন্তু ফিরে আসেনি তার হামীম। ঘরময় তার চোখ শুধু খুঁজছে তার আদরের ধনকে। বাকরুদ্ধ সনিয়াকে চারপাশে ঘিরে সান্ত¡না দিচ্ছেন তার স্বজনরা। কারো কথাই যেন তার কানে পৌঁছছে না । ঘরময় ছড়ানো খেলনা, পোশাকসহ সবখানে সন্তানহারা মা খুঁজে ফিরছেন কোথায় তার হামীম!

ঢাকার কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রভাতি শাখার বাংলা মিডিয়ামের কেজি ক্লাসের ছাত্র ছিল হামীম। স্কুলের জন্য হামীমকে তৈরি করে স্কুলে নেয়ার জন্য প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হতো মা সনিয়া আক্তারকে। দীর্ঘদিনের এ অভ্যাসবশত এখনো ঠিক ওই সময়ই ঘুম থেকে জেগে ওঠেন তিনি। আহত সনিয়ার ঘুমের জন্য চিকিৎসক তাকে ইনেজকশন দিলেও সারা রাত জেগে ছিলেন তিনি। শেষ রাতে ওষুধের ক্রিয়ায় চোখ খানিকটা লেগে এলেও প্রতিদিন হামীমকে তৈরি করার সময়টিতে তার ঘুম ভেঙে যায়।

হামীমের বাসা পুরনো ঢাকার নাজিরা বাজারের লুৎফর রহমান লেনে গিয়ে মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশের প্রচলিত আইনের নির্মম পরিহাসের। গত বছরের মার্চ মাসে কাকরাইলে একটি ঘাতক বাসের ধাক্কায় মারা যায় মা ও মেয়ে। সেই মেয়ের বাবা হাবীবুর রহমান সাংবাদিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করান।

হাবীবুর রহমান বলেন, আমার আজ সংসার নেই। আমি নিঃস্ব, একা। কোনো বিচার হয়নি। একটি জীবনের দাম মাত্র বিশ হাজার টাকা জরিমানা। বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালিয়ে মাত্র বিশ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যায় একজন খুনি। আপনারা কেউ বুঝবেন না হামীমের পরিবারের যন্ত্রণা। আমি বুঝবো, তাই খবরটা জেনে আর থাকতে পারিনি। এ কেমন আইন, এ কেমন বিচার! এ ধরনের সংবাদ না ছেপে বরং একটু লিখুন আর কোনো হামীম যেন মারা না যায়। যারা শুধু ভাষণ দেয় তাদের একটু বলুন এ কোন ধরনের আইন খুন করে জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়। হামীমের আত্মীয়রা জানান, বিভিন্ন মোবাইল নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে হুমকি দিচ্ছে বাস মালিক পক্ষ। শনিবার সিএমএম কোর্টে মামলাটি উঠছে।

হামীমের মামা রিয়াজউদ্দিন শিপলু বলেন, আপনারা দয়া করে কোর্টে আসবেন। হয়তো আপনারা থাকলে টাকা দিয়ে পার পাবে না আসামি। প্রতিদিনের মতো বুধবার স্কুল ছুটির পর মায়ের হাত ধরে রিকশার জন্য নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়েছিল হামিম। সকালে হঠাৎ পেছন থেকে মধুমতি পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-১৩৮৭) একটি বাস তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই হামীম মারা যায়।

বৃহস্পতিবার স্কুল গেটে কালো কাপড়ে সহপাঠীরা লিখে রেখেছিল শোকের বাণী। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক সবাই শোকে ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। হামীমের নামানুসারে স্কুলের একটি লাইব্রেরির নামকরণ করা হয়। শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হামীমের হত্যার বিচারের দাবিতে তার সহপাঠীরা স্কুলের সামনে মানববন্ধন করে।

হামীমের নানু জানান, ২০০২ সালে ১৭ মে মুন্সীগঞ্জের গার্মেন্ট ব্যবসায়ী মোতালেব শেখের সঙ্গে বিয়ে হয় সনিয়া আক্তারের। ২০০৫ সালের ২২ জুলাই তাদের একমাত্র সন্তান হামীম আসে ঘর আলো করে। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু কেড়ে নিল সাড়ে চার বছরের ছোট্ট হামীমের জীবন। দুর্ঘটনার দিন বাদ এশা মহল্লার জামে মসজিদে জানাজা শেষে হামীমকে কবর দেয়া হয়েছে আজিমপুর কবরস্থানে। হামীমের বাবা বাকরুদ্ধ মোতালেব শেখ বলেন, আমার সব শেষ, আমার কিছু নেই। আমার কিছু বলার নেই। তবে আর যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।

হামীম হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন

হামীমের ঘাতকের বিচার দাবিতে রোববার উইলস্ লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভি-ভাবকদের মানববন্ধনে যোগ দিয়েছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো আরো অনেক বাবা-মা। স্কুল ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে এ মানববন্ধন গিয়ে ঠেকে কাকরাইল প্রধান সড়কে। মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে হারানো সন্তানদের স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হামীমের নিকট আত্মীয়সহ সন্তানহারা অন্য মা-বাবারা। তাদের কান্নায় গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। এ সময় তারা পৃথক আইন করে ঘাতক ড্রাইভারদের ন্যূনতম শাস্তি যাবজ্জীবন করার দাবি জানান। সেই সঙ্গে তারা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শোককে শক্তিতে পরিণত করার অঙ্গীকার করেন।

এদিকে হামীমের মৃত্যুর পর গোটা ঢাকায় সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেও থেমে থাকেনি সড়ক দুর্ঘটনা। চারদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীতে সুমিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো ১১ জন মারা গেছে।

হামীম হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে অনেকের সঙ্গে শামিল হয়েছিলেন অভিনেত্রী ও সংসদ সদস্য তারানা হালিমও। স্কুলের সামনের রাস্তায় তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বড় বোন সামিয়া হালিম। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে এ সময় কয়েক দফা মূর্ছা যান তিনি। গত বছর কোরবানি ঈদের আগের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় সামিয়া হালিমের ছেলে সাইফ আহমেদ (২০)। কোরবানির গরু নিয়ে বাসায় ফেরার পথে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে।

সামিয়া হালিমের পাশেই দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন আনিসুর রহমান। তিনি একা এসেছেন। অন্য মায়েদের কান্না দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আনিসুর রহমান বলেন, তার বড় মেয়ে ঢাকা সিটি কলেজের এইচএসসিপড়–য়া মেধাবী ছাত্রী সাদিয়া প্রিন্স সূচী ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রাস্তা পার হতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এ নিয়ে একটি মামলাও করেছিলেন। কিন্তু দুই মাস জেলহাজতে থাকার পর ওই ঘাতক ড্রাইভার ছাড়া পেয়ে যায়। একটা মৃত্যুর জন্য মাত্র দুই মাসের সাজা বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি। তিনি বলেন, সরকার এর কোনো বিচার না করলে আরো মায়ের বুক খালি হবে। আরো বাবা মেয়েকে খুঁজে বেড়াবে। না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে ধুকে ধুকে মরবে। আনিসুর রহমান তার ক্ষোভের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘বিচারের আশায় থানায় গেলে থানার কর্মকর্তা বলেন, এসব দুর্ঘটনার নাকি শাস্তি হয় না।’

তারানা হালিম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথক আইন করার জন্য পার্লামেন্টে নোটিশ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার হার ভয়াবহ বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় যতো দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে জানান।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পৃথক আইন করার জন্য তিনি পার্লামেন্টে এ বিষয়ে কথা বলবেন। মানববন্ধনে হামীমের বাবা মোতালেব শেখ, নানি আফসানা বেগম, মামা শিবলু, চাচা মো. শহীদসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। স্কুলের সামনের রাস্তায় গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে এ নির্মম হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে হামীমের বন্ধুরাও।

মানববন্ধন থেকে উঠে এসেছে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি দাবি। দাবিগুলোর মধ্যে আছে হামীম শেখের প্রাণ হরণকারী মধুমতি পরিবহনের ড্রাইভার ও মালিকের ফাঁসি, স্কুলের সামনে স্পিডব্রেকার তৈরি, ফুটওভার ব্রিজটি ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য বাংলালিংক টেলিকোম্পানির বিলবোর্ড ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানো, হামীম হত্যার বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মধুমতি পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল, হামীম শেখের স্মৃতি রক্ষায় কাকরাইলের এ সড়কের নাম হামীম শেখ সড়ক রাখা, সড়ক দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাঁসির বিধান চালু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, বাস চালকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি করা প্রভৃতি।

উল্লেখ্য, বুধবার সকাল ১১টায় কাকরাইলে নিজ স্কুলের সামনের সড়কে মধুমতি পরিবহনের একটি বাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় হামীম শেখ (৬)। আর শুক্রবার আরো একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় সুমি।

[ad#co-1]