আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রাচীর ভেঙে মাটি ভরাট

বসুন্ধরার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা, মামলা
তানভীর হাসান, মুন্সিগঞ্জ
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের ভিটিকান্দি এলাকায় বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রাচীর ভেঙে অন্যের জমিতে মাটি ভরাট করার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এ ব্যাপারে তদন্তের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁর প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। গত শুক্রবার রাতে অভিযোগটি গজারিয়া থানায় মামলা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

মামলা হওয়ার আগে বাদী ঢাকার ৬৬ নর্থ সার্কুলার রোড, হাতিরপুল, কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহফুজ মিয়া যাঁদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন, তাঁরা হলেন বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক এনামুল হক, ডিজিএম (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) শফিকুর রহমান চৌধুরী, এম এইচ শরিফ, মান্নান বেপারীসহ তাঁদের সহযোগীরা।

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম সহিদুল ইসলাম জানান, তদন্ত করে অভিযোগটি মামলা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ভিটিকান্দি ও উমেরকান্দি মৌজায় মাহফুজ মিয়ার দুই একর ৯৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে ভিটিকান্দি মৌজায় রয়েছে ২৬ শতাংশ। তাঁর জমির পাশেই বসুন্ধরা গ্রুপের টিস্যু পেপার তৈরির কারখানা রয়েছে। সেখানে বসুন্ধরার রয়েছে প্রায় ১৩ একর জায়গা।
২০০৫ সালে বসুন্ধরা গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক সামসুদ হোসেন আলমগীর একই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি [স্মারক নম্বর ২৯ (১)] তত্কালীন জেলা প্রশাসককে বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে কারখানা সম্প্রসারণে ৫ দশমিক ৯৯ একর ব্যক্তিমালিকানার ভূমি হুকুম দখলের সুপারিশ করেন। এর মধ্যে মাহফুজ মিয়ার দুই একর ৯৫ শতাংশ জমি রয়েছে। তত্কালীন জেলা প্রশাসক ভূমি অধিগ্রহণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ৬ ধারা অনুযায়ী তাঁকে ১১টি নোটিশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাহফুজ মিয়া ২০০৬ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন (রিট মামলা নম্বর ৭৪২৫/০৬) করলে আদালত এর ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন, যা আজও বলবত্ রয়েছে।

মাহফুজ মিয়ার অভিযোগ, আদালতের এই আদেশ অমান্য করে ২০০৯ সালের ১ ও ৯ জুলাই বসুন্ধরার ভাড়াটে লোকজন তাঁর জমিতে জোর করে মাটি ভরাট করে। এ সময় তাঁর জমির সীমানাপ্রাচীর তারা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলে। এরপর তাঁর জমির ওপর দিয়ে তারা কারখানায় প্রবেশের আরেকটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করে। এই নির্মাণকাজ বিরতি নিয়ে দফায় দফায় চলতে থাকে। গত ৩০ জানুয়ারি মাহফুজ মিয়া আবার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন। এটি নির্মিত হওয়ার পর ২ ফেব্রুয়ারি ভোরে বসুন্ধরার লোকজন আবার তা ভেঙে ফেলে। এ ঘটনায় মাহফুজ মিয়া ৩ ফেব্রুয়ারি গজারিয়া থানায় অভিযোগ করেন।

এর আগে প্রথমবার সীমানাপ্রাচীর ভেঙে জমি ভরাটের ঘটনায় মাহফুজ মিয়া গজারিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি তিনি স্থানীয় সাংসদ এম ইদ্রিস আলীকে জানান। সাংসদ ২০০৯ সালের ২৩ জুলাই বর্তমান জেলা প্রশাসককে এ ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।

জেলা প্রশাসক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মাহফুজ মিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে ইউএনওকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিই।’ অভিযোগ তদন্ত করে ইউএনও ফিরোজ আহমেদ গত ১৯ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। জেলা প্রশাসক এই প্রতিবেদন পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ইউএনও জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও জমি পরিমাপ করে তিনি মাহফুজ মিয়ার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক বলেন, তিনি এই প্রাচীর ভাঙা ও মাটি ভরাটের বিষয়ে কিছু জানেন না। এ বিষয়ে শফিকুর রহমান চৌধুরী ভালো বলতে পারবেন।
শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ওই জমির সীমানাপ্রাচীর কারা ভেঙেছে, তা তিনি জানেন না। সড়ক নির্মাণের বিষয়েও তাঁর জানা নেই।

মামলা তুলে নিতে বাদীকে হুমকির অভিযোগ, জিডি
প্রাচীর ভেঙে মাটি ভরাট
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের ভিটিকান্দি এলাকায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রাচীর ভেঙে মাটি ভরাট করার ঘটনায় করা মামলার বাদীকে বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ভাড়াটে লোকজন মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাদী মো. মাহফুজ মিয়া গতকাল রোববার গজারিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

বাদী ঢাকার ৬৬ নর্থ সার্কুলার রোড হাতিরপুল কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘বসুন্ধরার বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ওই গ্রুপের ভাড়াটে লোকজন আমাকে, আমার আত্মীয়স্বজন ও সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। তাই রোববার (গতকাল) থানায় জিডি (নম্বর ২০৬) করি।’ তিনি মামলার আসামিদের অতিসত্বর গ্রেপ্তারের দাবি জানান। শুক্রবার রাতে তালিকাভুক্ত হওয়া মামলার আসামিরা হলেন বসুন্ধরা টিস্যু ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক এনামুল হক, ডিজিএম (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) শফিকুর রহমান চৌধুরী, এম এইচ শরিফ, মান্নান বেপারীসহ তাঁদের সহযোগীরা।
গতকালের জিডিতে বসুন্ধরার ভাড়াটে লোক হিসেবে মান্নান বেপারী, শফিউল্লাহ, শাহাজাদা, নাসির উদ্দিন ও নূর হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম সহিদুল ইসলাম জিডি হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম জানান, তদন্ত চলছে। এর আগেও মাহফুজ মিয়া বসুন্ধরার বিরুদ্ধে গজারিয়া থানায় দুটি জিডি করেন।

[ad#co-1]