মুন্সীগঞ্জে রেকর্ড পরিমাণ আলুর আবাদ কৃষকদের ব্যস্ততা ও মনে আনন্দ

বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সারি সারি সবুজ ছোট গাছ। মুন্সীগঞ্জের ৬ উপজেলায়ই এই সবুজের ছড়াছড়ি। বিস্তীর্ণ জমিতে আলু গাছের যতœ নিয়ে এখানকার কৃষক এখন মহাব্যস্ত। গাছের যতেœ ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণীরা। গ্রামের আঁকাবাকা মেঠো পথ, কাঁচা পাকা রাস্তা যে দিকেই চোখ যাবে সেদিকেই এমন দৃশ্য চোখে পড়বে। এখন মুন্সীগঞ্জের সর্বত্র এমন চিত্র। এই গাছগুলো হচ্ছে আলু গাছ। আলু উৎপাদনের প্রসিদ্ধ এলাকাটির এবার রেকর্ড পরিমাণ আলু আবাদ হয়েছে। সারের দাম কমানো এবং সহজলভ্যতার কারণেই কৃষক এবার সব রেকর্ড ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশী ৩৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে। মুন্সীগঞ্জে এবছর আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৯ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশী জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। জেলার কেওয়ার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়,কৃষক আমিন উদ্দিন আরও ১০/১২ জন নিয়ে আলুর জমিতে আগাছা সরাচ্ছেন। এখানে কাজ করতে আসা কৃষানী আলেয়া বলেন, এই আলুই আমাদের বেঁেচ থাকার অবলম্বন। চাষ ভালো হলে আমারাও ভালো থাকবো। বজ্রযোগিনী এলাকার ভাঙ্গামোলের কাছে আলুর জমিতে পানি ছিটাচ্ছেন মো. আলম। তার জমির আলু গাছের কিছু পাতা হলদে রং হয়েছে। কৃষি বিভাগের লোকজন এসে পানি ছিটানোর জন্য বলেছেন। এমন আশপাশের আরও কয়টি জমিতে বিচ্ছিন্নভাবে গাছের সমস্যা দেখা দিয়েছে। রামাশংয়ের কৃষক রমিজ মিয়া রোগবালাই হওয়ার আশঙ্কায় আগাম ওষুধ ছিটাচ্ছেন জমিতে।

চরকেওয়ারের আলীমিয়া এবার আলু চাষ করেছেন গেলবারের চেয়ে দ্বিগুণ কেন এবার বেশী চাষ করলেন? উত্তরে বলেন, এইবার আলুর দর বেশী আর ৮৫ টাকা কেজির টিএসপি ২২ টাকা, ৭৫ টাকা কেজির এমওপি ২৫ টাকা কেজি দরে এবার সার পেয়েছি যথাসময়ে। তাই এইবার চাষ বেশী করছি। কিন্তু দাম ঠিকমত পাইলেই হয়। কারণ হিসাবে তিনি জানান, মধ্যস্বত্বভোগীরা এখানে বেশ সক্রিয়। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন দৃশ্যই লক্ষ্য করা গেছে। সকালে শিশিরে ভরে থাকা আলুর মাঠ দেখলে মনে হবে সবুজের উপর কেউ সাদা আবরণ দিয়ে রেখেছে। আস্তে আস্তে ফোঁটা ফোঁটা শিশির ঝরার দৃশ্যও চমৎকার।

কৃষক মুক্তি মিয়া জানান, এবার হল্যান্ডের বাক্স আলু বীজ বলে অনেক বীজ চড়া দামে কৃষকের হাতে এবার তুলে দিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। বীজগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো বীজ আলু নয়। তারপরও একশ্রেণীর অসাধু আমদানীকারক এই বীজ বিক্রি করে কৃষকের সর্বনাশ করেছে। তাই কিছু জমিতে এই বীজের আলুর অঙ্কুর গজায়নি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক একেএম আমিনুর রহমান জানান, জমিতে রস কম থাকায় গাছে ইউরিয়া সারের অভাব দেখা দেয়ায় বিচ্ছিন্নভাবে ৫০৬ একর জমিতে কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে এখন জমিতে পানি দেয়ায় সমস্যা কেটে যাচ্ছে। আর কিছু বীজ দিয়ে কৃষককে প্রতারিত করার বিষয়টি দুঃখজনক। আলু গবেষণা উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজিজুল হক জানান, আবহাওয়া ও মাটি অনুকুলে থাকায় প্রতি হেক্টরে ৩০ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে গড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের এবার ন্যাশনাল আলুর গড় উৎপাদন ধরা হয়েছে সাড়ে ১৬ টন। তাতেই বোঝা যায় কত বেশী আলুর জন্য উপযোগী এই এলাকা। আলুর এই গড় উৎপাদন জানা মতে বিশ্বের কোথাও এত বেশী নেই। এর আগে ২০০৮ মৌসুমে এই জেলায় এর আগে রেকর্ড পরিমাণ ৩৬ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে ১০ লাখ ৮১ হাজার ৩৫০ টন আলু উৎপাদন হয়। গত মৌসুমে ৩৫ হাজার ৫৮৭ হেক্টর জমিতে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৪ টন আলু আবাদ হয়।

কৃষি অফিস জানায়, এবারও প্রায় ১১ লাখ টন আলু আবাদ হবে। কিন্তু এই জেলার ৬৯টি হিমাগারের মধ্যে ৬৩টি চালু রয়েছে। এগুলোর ধারণ ক্ষমতা চার লাখ টন। বাকি আলু সংরক্ষণ নিয়েও কুষকের চিন্তা নিবারণে এবং সঠিক দাম যাতে প্রকৃত কৃষক পেতে পারে সে লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন।

নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মুন্সীগঞ্জে আলু রোপন শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। আর আলু উঠানো শুরু হবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে। সার পেলেও মানসম্মত বীজের অভাব ছিল এবারও। বিএডিসি ৭৪ হাজার টন আলু বীজের বিপরীতে মাত্র ১৪৫০ টন বীজ সরবরাহ করে। তাই হল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত বাক্স আলু বীজ রোপন করা হয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে কৃষকের সংরক্ষিত বীজ মানসম্মত হয় না হিমাগারের কারণে। এখানকার হিমাগারগুলোর কোনটিই বীজ রাখার জন্য উপযুক্ত নয় বলে বিএডিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়া অনেক কৃষকই ব্যাংকের ঋণ না পেয়ে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আলু আবাদ করেছে। আবাদ ভালো না হলে সেব কৃষকের কষ্টের শেষ নেই। এসব কারণে আলু চাষীদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া এবং মুন্সীগঞ্জে আলু বীজ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন অনেক কৃষক।

[ad#co-1]