‘চাঁদের পাহাড়’ পড়লে এখনো শিউরে উঠি

ছোটবেলার প্রিয় বই
ছেলেবেলার প্রথম প্রিয় বইটির কথা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। বইটির নাম ‘চাঁদের পাহাড়’। লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটি আমার বাবা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। তখন আমি ঢাকায় থাকি। এর আগে থাকতাম গ্রামে। যখন আরো ছোট ছিলাম, তখন থেকেই প্রচুর বই পড়তাম। আমাদের এলাকায় একটা লাইব্রেরি ছিল, সেখানে বসে পড়তাম। বাড়িতে এনে পড়তাম।

আমার বই পড়ার অভ্যাস দেখেই বাবা একদিন ‘চাঁদের পাহাড়’ বইটি কিনে দিয়েছিলেন। মানে বাবার কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলাম আর কি! উপহার পাওয়া বইয়ের সেই কপিটা এখনো আমার সংগ্রহে আছে।

‘চাঁদের পাহাড়’ প্রথম যখন পড়লাম, তখন আমি সেভেন বা এইটের ছাত্র। সময়টাকে অবশ্য ছেলেবেলা না বলে কিশোরবেলা বলাই ভালো হবে। সে বয়সে বইটি প্রথমবার পড়ে আমি এতটাই মুগ্ধ হলাম যে তখনই পরপর কয়েকবার পড়ে ফেললাম। কিন্তু তাতেও মুগ্ধতা কমল না। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর, কলেজ জীবনে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েও বইটি বারবার পড়েছি। তারও পরে আমার কর্মজীবনে এসেও বইটি বারবার পড়েছি। আমার বাচ্চারাই এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তার পরও কিশোরবেলার সেই মুগ্ধতার রেশ কাটেনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ‘চাঁদের পাহাড়’ হাতের কাছে পেলেই আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়তে শুরু করি। মাস ছয়েক আগেও বইটি একবার পড়েছি।

ছেলেবেলা থেকে একটা বইয়ের প্রতি এমন ভালো লাগা থেকে যা বুঝেছি, প্রকৃত অর্থে ছোটদের জন্য যে ভালো লেখা, সেটি আসলে শুধু ছোটদের জন্য নয়, এগুলো হচ্ছে সর্বজনীন। শুধু কিশোর-কিশোরী নয় সব বয়সীরাই এসব বইয়ের পাঠক। তবে তখন তো আর সাহিত্যমূল্য বোঝার বয়স হয়নি, তার পরও বইটি ভালো লেগেছিল। শংকর নামের পশ্চিমবঙ্গের একটি ছেলে রেলের চাকরি নিয়ে হঠাৎ আফ্রিকার গহিন অরণ্যে চলে যায়। এর মধ্যে যে অ্যাডভেঞ্চারের ছোঁয়া তা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। লেখাটির প্রতি বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ। কেউ একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ছাড়তেই পারবে না।

এখন ভাবি, ভারতে বসে একজন লেখক সেই আফ্রিকার গহিন বনের এমন গা শিউরে ওঠা বর্ণনা কী করে লিখেছিলেন! ছেলেবেলায় বইটি পড়ে যেমন শিহরিত হতাম, আজও ঠিক ততটাই শিহরিত হই। বারবার পড়ার পরও বইটিকে আমার কখনোই পুরনো মনে হয়নি। বইয়ের ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে একেবারে ছবির মতো ভেসে ওঠে। আমিও যেন আফ্রিকার সেই গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাই। কল্পনার পর্দায় দেখতে থাকি, শংকর ঘুমিয়ে আছে। তাকে যে কোয়ার্টারে থাকতে দেওয়া হয়েছে, সেখানকার একটি ঘরে। সেই এলাকায় ব্ল্যাকমাম্বা নামে এক ধরনের সাপের খুব উপদ্রব। পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ ব্ল্যাকমাম্বা।

শংকর ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ কেমন অস্বস্তি অনুভব করল। ঘুম ভেঙে গেল তার। সে জেগে দেখতে পেল, তার বিছানার পাশে মেঝেতে একটা বিশাল ব্ল্যাকমাম্বা ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ছোবল দিতে প্রস্তুত। শংকর উত্তেজনায় ঘামতে থাকে।

ঘামতে থাকি আমিও। শরীরে এক ধরনের শিহরণ খেলে যায়।

সাপটা শেষ পর্যন্ত আর শংকরকে ছোবল দেয় না। কিন্তু তার পরও আমার আচ্ছন্নতা কাটে না। আমি নিজেও ছোটদের জন্য এমনভাবে লেখার চেষ্টা করি যেন কোনো কিশোর পাঠক লেখাটি পড়ে ততটাই শিহরিত হয়, ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়ে আমি নিজে যতটা হয়েছিলাম।

[ad#co-1]