আলুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা খুশির মধ্যেও শঙ্কায় কৃষক : উত্পাদন কোটি টনে পৌঁছতে পারে : সরকারের কোনো প্রস্তুতি এখনও নেই

আহমেদ করিম
দেশে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার আলুর উত্পাদন কোটি টনে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে। আলুর মৌসুম সামনে রেখে তাই কৃষকের চোখে-মুখে এখন খুশির ঝিলিক। কিন্তু ভরা মৌসুমে আলুর উত্পাদন খরচ তুলে লাভ পাবে কিনা—এ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক। এদিকে দেশে বিপুল আলু উত্পাদন হতে চললেও এ নিয়ে কোনো পূর্ব প্রস্তুতি নেই সরকারের। আলু সংরক্ষণ বা রফতানি নিয়ে সরকার এখনও কিছুই ভাবেনি। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীরা আলুর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হিমাগারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ, বন্ধ হিমাগার চালু ও রফতানিতে ইনসেনটিভ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, আলুর বাম্পার ফলন দেশে খাদ্য চাহিদায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আলু উত্তোলনের ভরা মৌসুম শুরু হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, এ বছর দেশে আলু চাষ হয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার হেক্টর জমিতে। এবার উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭০ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন হলেও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উত্পাদন হবে অনেক বেশি। কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, এবার আলু চাষাবাদের সময় প্রয়োজনীয় বৃষ্টি না হলেও গত বছরের চেয়ে দীর্ঘ ও বেশি শীত আলু ফলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া গত বছর আলুর বাজারে মূল্য বেশি পাওয়ায় কৃষকরা বেশি সংখ্যায় আলু চাষে ঝুঁকেছেন। সব মিলিয়ে এবার আলুর উত্পাদন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১ কোটি মেট্রিক টনে পৌঁছবে।

জানা যায়, দেশে গত ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯২ লাখ মেট্রিক টন আলু উত্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু সে বছর ব্যবস্থাপনার অভাবে এবং উত্পাদন খরচ না পেয়ে অনেক আলুই কৃষকের মাঠে পচে গেছে। ফলে অনেকেই চাষাবাদ থেকে বিরত থাকে। এতে উত্পাদন কম হওয়ায় গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাজারে আলুর দাম ৩৪ টাকা পর্যন্ত কেজি বিক্রি হয়েছে। এবার উত্পাদিত বিপুল পরিমাণ আলু নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

দেশে সাধারণ খাদ্য হিসেবে আলু ব্যবহার হয় ৩০ লাখ মেট্রিক টন। বাকি আলু দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চিপসসহ অন্যান্য খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার এবং সরাসরি রফতানি হয়ে থাকে। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং রফতানির জন্য আলু সংরক্ষণে দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হিমাগারও নেই। বিদ্যুতের অভাবে বেসরকারি খাতও হিমাগার তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিএডিসির হিমাগারে বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ১৪ হাজার টন আলু সংরক্ষিত হয়। আর প্রাইভেট সেক্টরে সাড়ে ৫ লাখ টন বীজ আলুসহ সংরক্ষণ করা যায় ১৮ লাখ টন আলু। সব মিলিয়ে দেশে সর্বোচ্চ ২৪ লাখ টন আলু হিমাগারে সংরক্ষণ সম্ভব হয়। দেশে বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহারের ৩০ লাখ টন, সাধারণ খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের ৩০ লাখ টন এবং বীজ আলু হিসেবে ৬ লাখ টন বাদ দিলে বাকি আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাবে। যদি দ্রুত রফতানির ব্যবস্থা না করা যায়, তাহলে বাড়তি আলু কৃষকের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দেখা দেবে, যার ফলে আলুর সঠিক বাজার মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। জানা যায়, এ বছর ভারত এবং পাকিস্তানেও বেশি পরিমাণে আলু উত্পাদন হওয়ায় তারাও রফতানির জন্য ব্যাপক তত্পরতা চালাচ্ছে। ভারতে আলুর দাম বর্তমানে মাত্র ৩ টাকা কেজি এবং রফতানির জন্য সে দেশে যত মূল্য তত ইনসেনটিভ ঘোষণা করেছে। অর্থাত্ ৩ টাকা কেজি বিক্রি করলে ৩ টাকাই সরকার থেকে পাচ্ছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশে আলু রফতানিতে মাত্র ১০ ভাগ ইনসেনটিভ রয়েছে। এ সুবিধা বাড়িয়ে ২০ ভাগ করা হলেই বাংলাদেশ আলু রফতানিতে এগিয়ে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। কিন্তু আলু রফতানি বা সংরক্ষণে সরকার এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

জানা গেছে, দেশে বেসরকারি খাতের ২৬টি হিমাগার বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে। মালিকানার দ্বন্দ্ব অথবা ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন সমস্যার কারণেই হিমাগারগুলো অচল হয়ে আছে। সরকার দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করলে হিমাগারগুলো যে কোনো সময়ে চালু করা সম্ভব বলে ব্যবসায়ীরা জানান। এছাড়া দেশে ৪টি পটেটো ফ্লেক্স শিল্প কারখানা রয়েছে, যা চালু করা হচ্ছে না। এগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেয়া হলে আলু প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বছর মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও জয়পুরহাট এবং রংপুরে আলুর উত্পাদন অনেক বেড়েছে। আলু উত্পাদনে শীর্ষ জেলা মুন্সীগঞ্জে এবার ১৩ লাখ টন আলু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রায় সমপরিমাণ উত্পাদন হবে জয়পুরহাটে। এসব এলাকার কৃষক এবং কোল্ডস্টোর মালিকরা জানান, সরকার ব্যাংক থেকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা না করলে তা কৃষকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। জানা যায়, এসব এলাকায় কোল্ডস্টোর মালিক ও ব্যবসায়ীরা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের জন্য এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোতে আবেদন করলেও এখনও তা পাননি। ফলে তারা আলু কেনা শুরু করতে পারছেন না।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোঃ জসিম উদ্দিন জানান, দেশে উত্পাদিত বিপুল আলু সঠিকভাবে ব্যবহার করতে তারা হিমাগারে বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্ধ হিমাগার চালু, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দ্রুত ছাড় করা, রফতানিতে ২০ ভাগ ইনসেনটিভ ঘোষণা এবং ৪টি পটেটো ফ্লেক্স শিল্প চালুর দাবি জানিয়েছেন। সরকার এ ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আলু নিয়ে কৃষক বা ব্যবসায়ীরা কোনো বিপাকে পড়বে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, আলু ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। কী করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তা-ভাবনা করছে। দেশে এবার আলুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন আমার দেশকে বলেন, এবার ভারত ও পাকিস্তানে আলু বেশি হয়েছে। তাই সরকার আলু নিয়ে যা যা করতে চায়, তা দ্রুত করা উচিত। কৃষকরাও যাতে হতাশ না হয়ে পড়েন, সে দিকে বিশেষ নজর দেয়া দরকার।

[ad#co-1]