শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক মোহাম্মদ নাসির আলী

জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
আসাদ চৌধুরী
ঢাকার বা পূর্ববঙ্গের ছাপাখানার ইতিবৃত্ত, প্রকাশনা নিয়ে ইতিহাসবিদরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। আমাদের সময়ে পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ, অযতেœর ছাপা এসব এখনো আমাকে পীড়া দেয়। ধর্মীয় ও পাঠ্যবইয়ের বাইরে সৃজনশীল সাহিত্য প্রকাশের ব্যাপারে মোহাম্মদ নাসির আলীর বিপুল অবদানের কথা আমরা কীভাবে ভুলে গেলাম? বিশেষ করে প্রবাসী লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসগুলো লেখকের অনুপস্থিতিতে তিনি অনেক যতœ করে ছেপে পাঠককে উপহার দিয়েছিলেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রকাশনা-শিল্পের প্রায়োগিক দিকগুলো হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

মোহাম্মদ নাসির আলী (জন্ম জানুয়ারি ১০, ১৯১০ মৃত্যু জানুয়ারি ৩০, ১৯৭৫) একাধারে শিশুসাহিত্যিক এবং নামি প্রকাশক। তার জন্মশতবার্ষিকী এমন নীরবে নিভৃতে চলে গেল, বোধহয় এ কেবল আমাদের দেশে বলেই সম্ভব হলো। বন্দে আলী মিয়া, গোলাম মোস্তফা এদের জন্মশতবার্ষিকীতেও আমাদের উদাসীনতা আমি লক্ষ্য করেছি।

১৯৬৭ সালেই তিনি শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন, পরের বছরই ইউনেস্কো পুরস্কার। না, পুরস্কার দিয়ে নয়, প্রকৃত পুরস্কার তো পাঠকপ্রিয়তা দিয়েই তার রচনাবলী দু-দুটি প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছে। মৃত্যু তার জনপ্রিয়তা-পাঠকপ্রিয়তার অন্তরায় যে হয়নি, বোধহয় এ কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে।

‘বোকা বকাই’র (১৯৬৩) গল্পাংশ মোহাম্মদ নাসির আলীর রচনা। বইটি আবার দেখার সুযোগ ঘটলো আমার, আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, আমার সেই সময়ের আনন্দ এখনো অটুট রয়েছে। বীরবলের খোশগল্প (১৯৬৪), লেবু মামার মস্তকা- (১৯৬৮), ভিনদেশী এক বীরবল (১৯৭৯) পড়েই, অন্যের কথা নাই বা বললাম, আমি নিজে শিশুসাহিত্য রচনায় উৎসাহী হই। টলস্টয়ের সেরা গল্প (১৯৬২), আলিফ লায়লার গল্প যেমন চিরায়ত সাহিত্য পাঠে উদ্বুদ্ধ করে পাঠককে অবশ্যই পাঠককে বিমলানন্দ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে, তেমনি শিশু-কিশোরদের সাহিত্যবোধটি পাকা করার ভূমিকাও পালন করে। ইতালির জনক গ্যারিবল্ডি (১৯৬৩), মোহাম্মদ বিন কাসেম এসব গ্রন্থে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের বিজয়গাথা রচিত হয়েছে।

আমাদের কায়েদে আজম, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৩৫৫ বাংলা) এই বইটিরও লেখক তিনি। স্বীকার করতেই হবে, আমাদের আগের প্রজন্ম পাকিস্তানের দাবি তুলেছিলেন। এটাও কবুল করতেই হবে, ভারত-বিভাজনের জন্য এককভাবে আজ শুধু জিন্নাহ সাহেবকে নয় নেহরু, প্যাটেলকেও কম দায়ী করা হয় না। বৃটিশদের উস্কানি যে ছিল, হাল-আমলের ইতিহাসবিদরা সেদিকেই ইঙ্গিত করছেন। কট্টরপন্থী বিজেপি নেতার সাম্প্রতিক বইটি নতুন করে ঝড় তুলেই ক্ষান্ত হয়নি গ্রন্থকারকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর সে-সময়ের চল্লিশের মাঝামাঝি সময় থেকে অনেকেই জিন্নাহ সাহেবকে নিয়ে একটি বা দুটি নয়, মেলা পদ্য লিখেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মানতে হবে, আজাদির নয় মাস পেরোতে না-পেরোতেই বাঙালিদের মোহভঙ্গ ঘটে এবং রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চেতনাই জয়ী হয়।

ঢাকার বা পূর্ববঙ্গের ছাপাখানার ইতিবৃত্ত, প্রকাশনা নিয়ে ইতিহাসবিদরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। আমাদের সময়ে পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ, অযতেœর ছাপা এসব এখনো আমাকে পীড়া দেয়। ধর্মীয় ও পাঠ্যবইয়ের বাইরে সৃজনশীল সাহিত্য প্রকাশের ব্যাপারে মোহাম্মদ নাসির আলীর বিপুল অবদানের কথা আমরা কীভাবে ভুলে গেলাম? বিশেষ করে প্রবাসী লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসগুলো লেখকের অনুপস্থিতিতে তিনি অনেক যতœ করে ছেপে পাঠককে উপহার দিয়েছিলেন।

প্রকাশনার ক্ষেত্রে সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রকাশনা-শিল্পের প্রায়োগিক দিকগুলো হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। নিম্নমানের ছাপা গ্রন্থের পাশাপাশি তার নিজের হাতে গড়া নওরোজ কিতাবিস্তানের বই হাতে নিলেই আমার কথার সত্যতা প্রমাণিত হবে। সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই সিরিয়াস মানুষটি নিষ্ঠার সঙ্গে যা করে এসেছেন।

তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কষ্ট করেই লেখাপড়া করতে হয়েছিল তাকে। সেই আমলে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। নিজের চেষ্টায় বিকম পাস করে কলকাতায় হাইকোর্টে যোগদান করেন। দৈনিক ইত্তেহাদের ছোটদের পাতা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতা থেকে ফিরে আজাদের মুকুলের মহফিল পাতা দেখতেন তিনি। দেশ গড়ার লক্ষ্যেই এসব করেছেন বোঝাই যায়। কলকাতায় হাইকোর্টে চাকরি নিয়েছিলেন। দেশভাগের পর চলে এলেন ঢাকায়। হাইকোর্টের চাকরিতে যোগদান করেন। আর ফাঁকে ফাঁকে তিলে তিলে তৈরি করেছিলেন নওরোজ কিতাবিস্তান। তার পুত্র এনায়েত রসুল-এর দুটি লেখা সম্প্রতি পড়ার সুযোগ পেলাম। জানতে পারলাম যে, তিনি কখনো চেঁচিয়ে কথা বলতেন না। ধৈর্য ধারণ করতে জানতেন, শেখাতেনও ছেলেমেয়েদের। নিজের কাজ নিজেই করতেন, অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করতেন। পরিবারের লেখালেখির ধারা দিয়ে গেছেন। ইফতেখার রসুল জর্জ, এনায়েত সবাই লেখালেখি করেন। তার পৌত্রও প্রকাশনা জগতে এসেছেন। এইটিও আমাদের সমাজে এক বিরল ঘটনা।

তার জন্মশতবার্ষিকীতে তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই, তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

আসাদ চৌধুরী: কবি ও উপস্থাপক।

[ad#co-1]