সমাজের তিনধারা, শিক্ষারও

সি রা জু ল ই স লা ম চৌ ধু রী
শিক্ষার সঙ্গে সমাজের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তো থাকবেই। শিক্ষা সমাজের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সমাজের যে বাস্তবতা, তাকেই প্রতিফলিত করে। কিন্তু সত্য তো এটাও যে, শিক্ষা সমাজকে বদলে দেবে_ এটাই আমরা আশা করি। নইলে ‘শিক্ষা শিক্ষা’ বলে অত আওয়াজ তোলা কেন? আমাদের প্রত্যাশা থাকে, শিক্ষা জাতি গঠনে সাহায্য করবে। তার অর্থ তো শিক্ষা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কিন্তু বাস্তবে যা করছে, সেটা তো দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাপার। ভিন্ন নয়, একেবারে উল্টো। সমাজের ভেতর যে শ্রেণীবিভাজন, শিক্ষা তাকেই বাড়িয়ে তুলছে। শিক্ষার তিন ধারা সমাজের তিন ভাগকে পরস্পর থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। শিক্ষা যত বাড়ছে, বিভাজন ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা একাধারে করুণ ও হাস্যকর।

উচ্চবিত্তদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা আর মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে মিল থাকার কোনো ব্যাপারই আশা করা যায় না। দুটি দুই ধরনের। ইংরেজি মাধ্যমে সবকিছুই চলে ইংরেজি ভাষায়। আর মাদ্রাসায় ইংরেজি যা পড়ানো হয়, তা খুবই সামান্য। কওমি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণী থেকে ওপরের দিকে শিক্ষার মাধ্যম হচ্ছে আরবি, ফারসি ও উর্দু।
কিন্তু ওই যে মাতৃভাষার জন্য উপযুক্ত স্থান নেই, এ ব্যাপারে বড়লোকের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং গরিবের মাদ্রাসা শিক্ষা চমৎকারভাবে কাছাকাছি চলে আসে। এর ফল যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো, উভয় ধারার শিক্ষার্থীই উৎপাটিত হচ্ছে মাতৃভূমির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জ্ঞান থেকে। তাদের কৃত্রিম মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

মাতৃভাষাই হচ্ছে শিক্ষার সহজ, স্বাভাবিক ও কার্যকর মাধ্যম। অন্য ভাষায় যে শিক্ষা, তা সবসময়ই কঠিন, কৃত্রিম এবং অফলপ্রসূ হচ্ছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাদান ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। আর বড়লোক ও গরিবদের স্কুলে মাতৃভাষার স্থান তো খুবই সংকুচিত। অথচ কথা ছিল দেশ স্বাধীন হলে সর্বস্তরে শিক্ষাই হবে মাতৃভাষায়। তিন ধরনের শিক্ষা তো থাকবেই না_ তিনে মিলে এক ও অভিন্ন হয়ে যাবে এবং মাতৃভাষাই হবে তার মাধ্যম। ঠিক এর উল্টোটাই ঘটেছে। মাতৃভাষাই পারত তিনধারাকে এক করতে।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ছিল একেবারেই নগণ্যসংখ্যক। কিন্তু তারপর হইচই করে একেবারে চক্রবৃদ্ধি হারে ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন রাজধানীতে বা প্রধান শহরগুলোতে শুধু নয়, মফস্বলেও তারা ছড়িয়ে গেছে। তাদের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষার চলও আগের সব রেকর্ড ইতিমধ্যে ভঙ্গ করে ফেলেছে। রাষ্ট্র ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। সেখানে রাষ্ট্র পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু সংবিধান থেকে যে দ্রুততায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে ফেলা হয়েছে, ততোধিক ত্বরিত গতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। কাজটা সরকার করেছে, কাজটা বেসরকারিভাবেও করা হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি মাদ্রাসার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে বৈষম্যের কোনো প্রকার অভাব দেখা যাবে। মাদ্রাসা শিক্ষার বেলায়ও তা-ই। দেশে এখন ১৯ হাজার সরকারি মাদ্রাসা আছে; বেসরকারি কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৭ হাজার। এই ১৭ হাজারের মধ্যে মাত্র ২ হাজারের বেশি সরকারি মাদ্রাসাকে মাদ্রাসা বোর্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে। বাকি ১৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ স্বাধীন। যতটা দেখতে পাচ্ছি, তাতে তো মনে হয়, ওই রকমের আজাদি তারা পাকিস্তান আমলেও ভোগ করেনি। তারা যা ইচ্ছা তা পড়ায়; বাংলা ও ইংরেজির প্রবেশকে নিষিদ্ধ করে রাখে। প্রত্যেকে চলে নিজের মতো করে। কী শিক্ষা দেয়, তারাই জানে। কিন্তু এখান থেকে দলে দলে যারা বের হয়ে আসে, তারা মনে করে, খুব শিখেছে। ওদিকে সমাজ তাদের কোনো প্রকার মর্যাদা দেয় না। তারা চাকরি-বাকরি পায় না। কিন্তু শিক্ষার অভিমানটা যেহেতু রয়েছে, তাই কৃষিকাজে যে যোগ দেবে, সেটাও পারে না। আগেও গরিবই ছিল, এখন শিক্ষিত হয়ে আরও বেশি গরিব হয়ে গেল। সরকারি মাদ্রাসার শিক্ষা যে উন্নত, তাও নয়। সেখানকার শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে ইসলামের ইতিহাসের নাম করে আরবদের ইতিহাস পড়ানো হয়; স্থানীয় ইতিহাস পড়ানো হয় না। দেশে ইতিহাস পাঠে এমনিতেই নানা রকম হস্তক্ষেপ ঘটে থাকে। মাদ্রাসাগুলোর হস্তক্ষেপ একটাই_ সেটা হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসকে নামমাত্র পড়ানো।

সব মিলিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা লাভ অভিশাপও। শুধু যে হতভাগ্য শিক্ষার্থীদের জন্যই, তা নয়, গোটা দেশের জন্যই বটে। এ যে কেমন ধরনের এবং কত বড় অভিশাপ, তা আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এখন টের পাচ্ছে।

মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে ইংরেজি স্কুলের শিক্ষার মিলের কথাটা বলছি; গরমিল যে প্রচুর, তাতেও তো কোনো সন্দেহ নেই। ইংরেজি স্কুলে ইংরেজি ভাষায় যে দক্ষতা অর্জিত হয়, মাদ্রাসা শিক্ষা দ্বারা শিক্ষার্থীরা তার ধারেকাছেও পেঁৗছতে পারে না। ফলে ইংরেজি ভাষা জানে বলে ওই নবীনরা চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশ গমনাগমন ও সামাজিক প্রতিপত্তিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠা ও প্রতাপের অধিকারী হয়, মাদ্রাসায় শিক্ষিত তরুণরা তা দেখে নিজেদের অধিকতর ছোট মনে করে; এবং ছোট হয়ে যাচ্ছে দেখে সমাজের যারা অগ্রসর মানুষ, তাদের আক্রমণ করে নিজেদের হীনম্মন্যতা থেকে তৈরি আক্রোশ মেটাতে চায়। তাই উদীচীর অনুষ্ঠান, সিপিবির সম্মেলন, পহেলা বৈশাখের আয়োজন, সিনেমা হল, বিচারক ও আদালত, শামসুর রাহমান, আহমদ শরীফ এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী_ সবাইকে তারা শত্রু মনে করে এবং ধ্বংস করতে উদ্যত হয়।

মাদ্রাসা শিক্ষার, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার ব্যাপারে বদান্যতার কোনো অভাব দেখা যায় না। অথচ প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুল খোলার জন্য টাকা চাইলে পাওয়া যায় না। কারণ এই যে, মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করলে একদিকে যেমন পুণ্য সঞ্চয় ও সামগ্রিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি অন্যদিকে গরিব মানুষকে শান্ত, সন্তুষ্ট এবং প্রতিযোগিতার বলয়ে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে। তাছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার ভেতরে বাণিজ্যিক সুবিধাও রয়েছে। বই ও গাইডবই থেকে শুরু করে চাঁদা সংগ্রহ, সরকারি অনুদানের অপব্যবহার_ সবকিছুই চলে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের আরেকটি ক্ষেত্র রয়েছে_ প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই যে আসল বিশ্ববিদ্যালয়, তা নিয়ে তো কোনো তর্কই নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই। প্রথম কথা, প্রয়োজনের তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অল্প। এগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক। সেখানে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়েই ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছোটে। দ্বিতীয় সত্য এই যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আগমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই, তা তারা খণ্ডকালীন, পূর্ণকালীন, ছুটি নিয়ে আসা যে ধরনের নিয়োগই পান না কেন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক বটে। হাতেগোনা কয়েকটি বাদ দিলে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান, পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যে ধরনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকা চাই, দরকার সেই ধরনের গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, যাতায়াতের সুবিধা, স্থানের প্রশস্ততা, যা কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই আয়োজন করা সম্ভব নয়। পাবলিক মানেই খারাপ, আর প্রাইভেট মানেই ভালো_ এই ধারণা এ ক্ষেত্রে খাটে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে_ এটাও কিন্তু বৈষম্যেরই ফল। ঢাকায় যাদের থাকার মতো বাসা আছে, অর্থনৈতিকভাবে তারা আবাসিক ছাত্রদের তুলনায় সচ্ছল। আবাসিক ছাত্ররা নানা রকম অসুবিধায় থাকে। খাদ্যের মান নিম্ন, বসবাসের জায়গা ঠাসাঠাসি, নিরুপদ্রবে পড়াশোনার সুযোগ অপেক্ষাকৃত সীমিত_ এসব তো আছেই, খরচ চালানোর জন্য কাউকে কাউকে গৃহশিক্ষকতাও করতে হয়। আবার টাকাও খরচ করতে হয় হিসাব করে। এসব অসুবিধা থেকে অনাবাসিকরা তুলনামূলকভাবে মুক্ত।

শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অনগ্রসরতা, এর কারণ সমাজের ভেতরেই রয়েছে। যেখানে যে বৈষম্য ও বিভাজন বিদ্যমান, শিক্ষার ব্যাপারেও তারই প্রতিফলন ও প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই। আরও আছে রাজনীতি। কোনো কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। আমরা তুমুল রাজনৈতিক আন্দোলন করেছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু সমাজ বদলায়নি; এবং সমাজের পাহারাদার যে রাষ্ট্র, সেও আগের মতোই মানুষের পশ্চাদপদতাকে উৎসাহিত করে; এবং চায়, সমাজের শ্রেণীবিভাজন আরও গভীর হোক, যাতে শাসক শ্রেণীর পক্ষে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নিজেদের দখলে রাখা সহজ হয়।

শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার চাই। কিন্তু তার জন্য জরুরি হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা, যাতে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়, যে গণতন্ত্রের ভিত্তিই হচ্ছে মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য গড়ে তোলা। শিক্ষা সাম্য গড়ার পক্ষে কাজ না করে সম্পূর্ণ বিপরীত দায়িত্ব পালন করছে। ট্র্যাজেডিটা এখানেই।

[ad#co-1]