মাহবুব হাসানের কবিতা

সরকার মাসুদ
বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে সত্তরের দশকে এসেছিল কবিদের বিশাল একটি ঝাঁক। ওই কালপর্বের মাঝামাঝি নাগাদ লেখকদের উন্মেষ ঘটে। অনেকেই বয়সোচিত ও তারুণ্যদীপ্ত সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ১৫-২০ বছর যেতে না যেতেই কবিতার ভুবন থেকে ঝরে গেছেন বেশ কিছু তরুণ। আজ অন্যূন ৩৫ বছর পর, দেখা যাচ্ছে, অবশিষ্টদের মধ্যে মাত্র ১০-১২ জন কবি লেখাজোকা অব্যাহত রেখেছেন। মাহবুব হাসান, কোনো সন্দেহ নেই, সেই স্বল্পসংখ্যক কবির একজন, যিনি সৃষ্টিশীল আগ্রহে নিয়মিত লিখে চলেছেন গদ্য-পদ্য।

এ পর্যন্ত তার আটটি কাব্যগ্রন্থ, সাতটি উপন্যাস এবং চারটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া ২০০১ সালে বেরিয়েছে ১১ ফর্মার কাব্যসংগ্রহ ‘মাহবুব হাসানের কবিতা’।

‘তন্দ্রার কোলে হরিণ’ নামের গ্রন্থ দিয়ে মাহবুব হাসান প্রবেশ করেছিলেন বাংলা কবিতার অঙ্গনে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থ (প্রকাশক-শিল্পতরু) প্রবল রোমান্টিক ভাবধারার স্বাক্ষরবহ। পরিচ্ছন্ন কল্পনাচিন্তা, ভিন্নতাকামী উপমা এবং কল্পচিত্রের প্রয়োগ একজন তরুণ কবির প্রাথমিক সামর্থ্যকেই প্রকাশ করেছে উজ্জ্বলভাবে।
ক. এক পরাক্রান্ত সময়ের দিকচিহ্নহীন ঘড়িঘরে/কাটিয়ে দিচ্ছি আমি জীবনের সোনালী সময়গুলো তোমার আকাক্সক্ষায় (তোমার উদ্দেশে)

খ. চারদিকে ন্যাড়া, স্তব্ধ জ্যোৎস্নার জানালা খুলে/দিগন্তের মতো গলা বাড়িয়ে রেখেছিলো পোড়ো ধানী জমি (শহীদ কাদরীর জন্য)
গ. আমার হৃদয়ে গিট্টু খেয়ে আছো তুমি (একদিন)
ঘ. আমার কৈশোরকাল/হৃদয়ের জানালা পথে দেখা/ছেলেদের হুড়মুড় করে বল খেলার মতন এলোমেলো (বিস্মৃতি)
ঙ. একটি গানের ভেতর দিয়ে হরিণের পা ছটুছে লেকের ধারে/জ্যোৎস্নার কফিন থেকে গলগলিয়ে বেরুচ্ছে/বন্য কেয়া, কাঠমল্লিকা আর/হাস্নাহেনার রহস্যমদির সুগন্ধি রুমাল (কয়েকটি ফুলের গল্প)

পাঠক, লক্ষ করুন, মাহবুব হাসানের বর্ণিত জ্যোৎস্না শুধু স্তব্ধ নয়, ‘ন্যাড়া’ও। তার শৈশব ছোট ছেলেদের বল খেলার মতো এলোমেলো। অন্যত্র, ‘একটি রাত্রির উদ্দেশে’ কবিতায় তিনি বলেছেন, গ্রাম্যবালাগণ ‘কলমীর মতো নরম’। নিঃসন্দেহে নতুন ও শক্তিমান উপমা। উপমা কবিতার সবকিছু নয়, তবে অনেক কিছু। কিন্তু একটি নিরুপম কবিতাও, শুধু উপস্থাপনার অভিনবত্বের কারণে, পাঠকচিত্ত জয় করতে পারে। এসব সদর্থকতা ও দীপ্ত সম্ভাবনার চিহ্ন নিয়ে মাহবুব হাসান দৃঢ় পায়ে এগিয়েছেন সৃজনশীলতার সুদীর্ঘ পথ। আজ তিনি পঞ্চাশ ও ষাটের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে।

বছরসাতেক পরে (১৯৯০) প্রকাশিত তৃতীয় কবিতার বই ‘নিসর্গের নুন’ অনেকখানি পরিণত কাব্যমনস্কতার পরিচায়ক। আমার বিশ্বাস, একজন কবির ভাবনার বৃত্তটি যতই প্রসারিত হোক, চিন্তায় ও কল্পনায় যতই পরিণতি আসুক না কেন, প্রথম বইয়ের অনেক সৃজনচিহ্নই অক্ষুণœ থাকে উত্তরকালেও। সেসব বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও ‘নিসর্গের নুন’ অন্তত ৫/৬টি কবিতার জন্য বারবার পাঠযোগ্য। কবিতাগুলো হচ্ছে ‘ক্ষুরের পোঁচ’, ‘কাক’, ‘ঢাকায় নতুন ভোর’, ‘নিসর্গের নুন’ ও ‘নিসর্গের ফাঁদ’।

লেখকের সেরা কবিতাগুলোর একটি ‘ক্ষুরের পোঁচ’। অসাধারণ উপমা আর ইমেজারি সঙ্গে নিয়ে ঋদ্ধ হয়েছে এ রচনা। দেখুন ‘বাতাসে ভাসলো রোদ,/ছিটপিঠার মতো ছড়িয়ে পড়লো ছত্রাকারে,/শিশির ভেজানো রক্ত’। বেদনাময় জীবনাভিজ্ঞতা আকৃতি পেয়েছে এভাবে ‘মানুষের আহাজারি/গাছের বাকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো/ রক্তমাখা হাওয়ায়’।

‘কাক’ নামের কবিতাটি মনে পড়িয়ে দিয়েছে ‘টেড হিউজকে’। এ সাদৃশ্য শুধু থিম এবং গভীর ভাবনাকেন্দ্রিক। ভাবনার ও তার প্রকাশভঙ্গির ধরন কিন্তু দুজনের দুরকম। এটা হচ্ছে সেই কবিতাগুলোর অন্যতম, যেখানে মাহবুব হাসানের কবিপ্রতিভা শিখর স্পর্শ করেছে। আরো ভালো হতো যদি লেখক এর নাম রাখতেন ‘কাকের আত্মকথা’ কিংবা এ জাতীয় কিছু। কেননা কাক এখানে নিজের জবানিতে কথা বলছে। টেডের কাক কিন্তু উত্তমপুরুষে বক্তব্য পেশ করে না। কবিতাটির প্রথম ছ’ পঙ্ক্তি এ রকম ‘পৃথিবীর সমস্ত উচ্ছিষ্ট ভক্ষণের জন্যে তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো/ আপ্লুত আঁধার রাঙিয়ে/আমার স্বভাবের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়েছো অবিশ্বাসের নগ্ন-ত্রুর-চতুরতা/আর আমার রক্তাভ চোখের কার্নিশে/লোভের বিদ্যুত ঝুলিয়ে দিয়ে করেছো সৃষ্টি/কলহমুখর পাখিদের সাথী করে;’। শেষ তিন পঙ্ক্তি কবিতাটিতে যোগ করেছে ভিন্নতর ব্যঞ্জনা, কেননা কাকের আর্তিময় উচ্চারণ সাকার হয়ে উঠেছে এখানেই ‘আমার এসব কিছু সৃষ্টি করেছো তুমি ব্রহ্মা-ের তীব্রতম নিষ্ঠুর মশলায়,/আমাকে নাগরিকের ঘৃণা আর তামাশায়/কেন বন্দী রেখেছো হে অদৃশ্য ঈশ্বর।’ গোটা কবিতা মাত্র ষোলো লাইনে সম্পন্ন। অথচ তা ধারণ করছে বৃহৎ এক ভাবপরিধি। এর বিপরীতে ‘ঢাকায় নতুন ভোর’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ ঢিলেঢালা। লেখক অনেক বেশি পঙ্ক্তি খরচ করেছেন এখানে। ‘জোনাকির পেট থেকে খসে পড়া নিয়ন’ কিংবা ‘ফুল গাছের কানায় কানায় থোকা থোকা জমে থাকা কুয়াশার ঢেউ’-এর মতো লাইনগুলো অবশ্য এ কবিতার পজিটিভ দিক। তার চেয়েও বড় কথা রচনাটি নাটকের ক্লাইম্যাক্সের মতো শেষাংশে এসে অর্জন করেছে ব্যক্তি অভিজ্ঞার গহন দ্যোতনা। এ অভিজ্ঞতা, কোনো সন্দেহ নেই, নগরবাসী আধুনিক মানুষের। আর সেই মানুষটি নিয়তিচক্রে একজন সংবেদী মানুষ। নগরজীবনের মেকি প্রলেপ, একঘেয়েমিভরা যান্ত্রিক ও নির্বেদ বেশ যোগাযোগসক্ষম উপায়ে চিহ্নিত হয়েছে এখানে ‘আমার চৌদিকে ঢাকাই মসলিনে জড়ানো শীতের কুয়াশা-ভোর/নতুন দোর খুলে দাঁড়িয়ে আজ ঢাকা/প্রথম আগুনে-রাঙা সূর্যের আলোয়/আমি বাস থেকে কংক্রিটে অতীত-বর্তমান/মিশিয়ে ঢালাই হতে থাকি,/আর কেবলই যান্ত্রিক স্রোতে মিশে যেতে থাকি/এই সরলেগরলে ঠাসা ঢাকার অন্তরে।’

‘আমার আকাশ’ কাব্যগ্রন্থে (১৯৯৮) ‘আমার আকাশ’ নামে চারটি দীর্ঘ কবিতা আছে। তার মধ্যে তুলনামূলক বিচারে, ‘আমার আকাশ-৩’ কেই আমার শ্রেষ্ঠ মনে হয়েছে। কবিতাটির কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গ মায়ের মৃত্যু এবং সেই বিয়োগজনিত বেদনাবোধ। দীর্ঘ কবিতার, বিশেষত বাঙালির রচিত দীর্ঘ কবিতার, একটি সাধারণ ত্রুটি হচ্ছে ভাবাবেগের অতিরেক ও পঙ্ক্তির শৈথিল্য। এর অন্যতম মুখ্য কারণ বাঙালি খুব আবেগি জাতি। মাহবুব হাসান, স্বভাবতই এর ঊর্ধ্বে নন। তার ওপর ‘আমার আকাশ-৩’ দাঁড়িয়ে আছে মায়ের মৃত্যুর মতো অতিস্পর্শকাতর একটি বিষয়ের ওপর। কিন্তু এহেন স্পর্শকাতরতা এই মন ভেঙে দেয়া আবেগ আবার হয়ে উঠেছে কবিতাটির প্রাণবীজ, অন্তত মাহবুব হাসানের ক্ষেত্রে। ‘আমি শুনি/কান পেতে শুনি/মায়ের মমতা’। ঠিক পরের স্তবকেই বলছেন, ‘কষ্ট পুঁতেছি মাটিতে/স্বপ্ন পুঁতেছি মাটিতে/হৃদয় পুঁতেছি মাটিতে/আত্মা পুঁতেছি মাটিতে’। প্রার্থনার ভঙিতে রচিত শেষ স্তবকটি কবিতার এক টার্নিং পয়েন্ট, যেখানে বিশ্বাসী মনের আকুতি আর লোকান্তরিত মায়ের জন্য হাহাকার একসূত্রে গাঁথা পড়েছে ‘তোমার বর্ণময় আলোক আঁধার ঘেরাটোপের রাজপথ/আর বন্দরে বন্দরে/মেঘের ডানায় ডানায়/ঘুরছি/তুমি কবুল করো হে আমার আকাশ’

এবার আমি সেই কবিতাটির প্রসঙ্গে যাবো যার শিরোনাম ‘পাগল’। পাগল যে কত রকমের এবং মানুষের পাগলামিটা কোন কোন জায়গায়, তা লেখক তুলে এনেছেন স্বাবলীলভাবে। এই পাগল কেবল ‘দাঁতনখমুখহীন ভিড়’-এ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না, সে চৌর্যবৃত্তির সঙ্গেও জড়িত। তার লিপ্ততা আছে ‘ধোঁয়াশা মোড়ানো রাজনীতি’র সঙ্গেও। কিন্তু লেখকের ব্যতিক্রমী ভাবনার প্রতিভাস আছে ‘স্বপ্ন সেও এক পাগল পর্যায় মানুষের’ এই পঙ্ক্তির দার্শনিকতাযুক্ত উপলব্ধির ভেতর। স্বপ্নের কারণে পাগল তো শুধু সৃষ্টিশীল মানুষ। তার চোখের দ্যুতিতে আছে ‘রৌদ্রগন্ধদিন আর নিশিবর্ণ রাত’। তার ‘পাগলামি মুদ্রাদোষে আক্রান্ত’ এবং তিনি এক নিরুপায় কবি ‘বিপন্ন বিশ্বের’। ‘ভালোবাসি’ নামে মাহবুব হাসানের আরেকটি চূড়াস্পর্শী কবিতা আছে। তার আরো কিছু কবিতার মতো এটিও উজ্জ্বল কল্পচিত্র ও অনিন্দ্য বাকপ্রতিমার কারণে বেশ আলাদা। পুরো লেখাটাই উদ্ধৃতিযোগ্য। তবু মাঝখানের কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি ‘চাঁদের ধুসর জ্যোৎস্না মাখে ঈর্ষা-ভালোবাসা;/আমি ভালোবাসি কলের নৌকার ফটফটানি; যেন সে এক দুরন্ত টিট্টিভ,/আমাদের সাফল্যের ডাল ধরে ঝুলেছে অপার/বানরের স্বভাব তাই রপ্ত করেছি চিরকাল,/ঝুলেছি গাছে ও বাঁশে/নগ্ন হয়েছি বাণিজ্যসম্ভব তরিকায়; কারণ/বিশ্বাসী সন্তের মতো গহনমাফিক ঢেলেছি জল তোমার পায়ে।/আমি সর্বত্র রাষ্ট্র করি এ কথা/ভালোবাসি ঈর্ষা/বিক্রি করি ঈর্ষা/ মেছোবাজারের কর্দমের রঙে ঝিলিমিলি ঈর্ষা,’

বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু সনেট রচনা করেছেন এই কবি। ‘স্বপ্ন বিক্রি হয়ে গেছে’ (১৯৯৯) কাব্যগ্রন্থে আমরা পাচ্ছি এমন কয়েকটি সনেট যেগুলো যুগপৎ সচেতন কান ও সজ্ঞান কবিমনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরেছে। দুটি উদাহরণ দেবো ক. ‘লোকজ শরমে নারী অঙ্গে ধরো প্রেমের কবিতা/তোমার রূপের বন্যা পলিময় করেছে আমাকে/রাতের আঁধার থেকে উঠে আসে পরানের সীতা/অসংখ্য তারার মাঝে ফুটে আছো হৃদয়ের বাঁকে।’ (বাংলাদেশ আমার কবিতা)।

খ. ‘জ্যোৎস্না নিয়ে বহুদিন, অন্ধকার নিয়ে বহুদিন/আমার কবিতা-খেলা, দুইবেলা কবিতার খেলা/মেখেছি তারার ঘ্রাণ, কারুকাজে হয়েছে-যে লীন/প্রেমিকা আমার তুমি রিনি নাম বেহুলার ভেলা!’

এসব লেখায় সনেটের প্রথাগত রূপই ফুটে উঠেছে। প্রথাগত কিন্তু পরিপক্ব। আবার তার মধ্যেই কোথাও কোথাও প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্বও ধরা পড়েছে, যেমন ‘তোমার রূপের বন্যা পলিময় করেছে আমাকে’। আধুনিক কবিতায় এক্সপ্রেশন এবং অ্যাপ্রোচ দুই-ই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাহবুব হাসানের কবিতা বিশেষ করে কিছু কিছু কবিতা, বারবার পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, এই দুটি ক্ষেত্রে তার বিশেষত্ব আছে। এবং এ জন্যই তিনি তার প্রজন্মের অপরাপর অনেক কবির চেয়ে এগিয়ে আছেন। ‘কুড়িপঙ্ক্তির ভোজ’ কবিতার এই লাইনটি খেয়াল করুন ‘তাই গাছে গাছে বারান্দা বাগানজুড়ে হাসে অচেনা সুবাসে’। অথবা ‘নীলের সরোদ শুনি শাদার দু’পাশে’। ছন্দ-মাত্রার সুমিত প্রয়োগের ভেতর পুরো স্তবকটি ধরা পড়েছে এভাবে ‘নিঃশেস হবে কী এই পৃথিবী ভূগোল? তাই গাছে গাছে/বারান্দা বাগানজুড়ে হাসে অচেনা সুবাসে/কতো ফুল! নীলের সরোদ শুনি শাদার দু’পাশে/খেলা করে চৈতালি দুপুর! ফাঁসে মানুষি সন্ত্রাসে।’ (কাব্যগ্রন্থ : তিনি কথক ছিলেন)। ২০০১ সালে প্রকাশিত এ বইটিতে কিছু ছোট ছোট কবিতা আছে। কয়েকটি বেশ ভালো। উদাহরণ দেবো ‘মনের বারান্দা’, ‘তিন টুকরো-২’ এবং ‘মৃত্যুময়’ থেকে। বাস্তবের সত্য রূপায়িত হয়েছে কাব্যিক সত্যে, ‘যেমন নগর তো কাকের শহর!’ কিংবা ‘মিথ্যের স্বভাব বাজপাখির মতো ছোঁ মারা’। সেই সত্যই যখন দার্শনিকতার মাত্রা অর্জন করে তখন তা হয়ে ওঠে অনুপমÑ ‘জীবনের চেয়ে বড়ো স্বপ্ন নেই কোনো/মৃত্যুর চেয়ে সুসংবাদ।’ এবার ছোট কবিতার লিরিক স্বাচ্ছন্দ্যের একটি দৃষ্টান্ত : ‘বসন্ত এলো বলে আর কটা দিন সবুর করো না/বসন্তপুরে শীত এখনো জেঁকে বসে আছে/পুকুরের মাছ আর পালানের শাক-সবজি রসনার আহলাদে বোনা/মিথ্যে আশ্বাসে, শোনো রফিক, কখনো কলকাতা যাবো না!’ (তিন টুকরো-২)।

মাহবুব হাসানের কবিতায় বিষয়বৈচিত্র্যও লক্ষ্যযোগ্য। অসংখ্য প্রেমের কবিতা লিখেছেন তিনি; লিখেছেন শৈশবস্মৃতি নিয়ে, একান্ত ব্যক্তিক সুখ-দুঃখ নিয়ে, মেকি সভ্যতার জারি জুরি নিয়ে, নগরজীবনের জটিলতা ও যন্ত্রণা নিয়ে। পশুপাখির ওপরেও নিবদ্ধ হয়েছে তার দৃষ্টি। তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘কাক’ কবিতাটি, যা ইতিমধ্যে আলোচিত। সেনাবাহিনী নিয়েও তার একটি ভালো কবিতা আছে, সেখানে লেখক বলেছেন ‘আর আছে শিং মাথার মগজে’।
১৯৯৫-৯৬ সালের পর মাহবুব হাসানের কবিতায় উল্লেখযোগ্য বিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হয়। আগে রোমান্টিক প্রণোদনা ও আবেগের অতিরেক লক্ষ্য করা গেছে মাঝে মাঝে, যা উত্তরকালে অনেক কমে এসেছে। লক্ষণীয়, এ পর্যায়ে তিনি অনেকটাই স্থির ভাব-কল্পনার বেলায়, শব্দ প্রয়োগের বেলায় অনেকখানি সংযমী। গোড়ার দিকের বইগুলোতে আড়া (ঝাড়), নামা (ঢালুজায়গা), গিট্টু (গিট), বাতা (চালসংলগ্ন লম্বা কাঠ), বাসনা (সুঘ্রাণ)-র মতো বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দ প্রযুক্ত হয়েছে। লোক ঐতিহ্যের স্মারক এসব শব্দ লেখক সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন, যদিও উত্তরকালে তার কবিতায় এগুলোর প্রয়োগ তেমন একটা নজরে পড়ে নাক. ‘গ্রামের আড়ায় পাখি শিকারে বেরিয়ে তুমি/ পড়েছিলে গিয়ে প্রকৃতির রহস্যের খোঁপায়; (শহীদ কাদরীর জন্য/গ্রন্থ : তন্দ্রার কোলে হরিণ)

খ. ‘রান্না করা ইলিশের বাসনার মতো/ভালোবাসি স্বপ্নলোক, (পাগল/গ্রন্থ : আমার আকাশ)
‘তিনি কথক ছিলেন’ কাব্যগ্রন্থে ‘শেয়ার বাজারে আমার কবিতা‘ নামে একটি কবিতা আছে। মাহবুব হাসানের কবিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা, উত্তরকালে, কতটা পরিপক্ব হয়েছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ এ কবিতা। আমি এখন রচনাটির প্রথম সাত পঙ্ক্তি এবং শেষ চার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করবো ‘দোয়েলের শিসে ভরা আমার রৌদ্রনীল কবিতাগুলো/তপ্ত কংক্রিকেটর রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছে পুরুষের পাশে/আমার কবিতা কি সুন্দরী নারী?/নাকি স্ফুটোন্মুখ রোদেলা কিশোরী?/নদী আর ঘাস ফড়িংয়ের চঞ্চলতা নিয়ে আমার কবিতা/মতিঝিলের তপ্ত ফুটপাথ মাড়িয়ে তরতর করে ঢুকে পড়ে/রোদে-ঠাসা শেয়ার বাজারে।’….

(শেষ চার লাইন) ‘আমার কবিতা শিস দেয়/দোয়েলের তীক্ষè তীব্র শিসে জ্বর আসে/মূল্যসূচকের মতো ধা-ধা বাড়তে থাকে/জ্বরতপ্ত শেয়ার বাজার।’

লিখিত কাব্যালোচনায় অথবা কবিতাকেন্দ্রিক আড্ডায় যখন সত্তরের দশকের কবিতার প্রসঙ্গ ওঠে, আমার ধারণা, ঢালাওভাবে মন্তব্য করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের এ প্রজন্মের কবিতা সম্বন্ধে সত্যিকার দায়িত্বপূর্ণ কথাবার্তা আজঅবধি আমার চোখে পড়েনি। সন্দেহ করি, কি অগ্রজ, কি অনুজ কবি-সমালোচক কেউই সত্তরের দশকের কবিতা যথেষ্ট ভালো করে পড়ে দেখেননি। গত দু’তিন বছরে নানা কাজের ফাঁকে, আমি এ প্রজন্মের ১০/১২ জন কবির রচনা বারবার পড়েছি, প্রায় গবেষকের সন্ধিৎসা নিয়ে। এদের কারো কারো কবিতার ওপর ইতিমধ্য আলোচনাও করেছি।

তিরিশের কবিদের চর্চিত আধুনিকতায় ভিন্নতর রূপ আমরা গৌণত চল্লিশের দশকে এবং মুখ্যত পঞ্চাশের দশকে দেখতে পেয়েছিলাম। বাংলা কবিতার সেই অর্জিত উঁচু মান পরবর্তীকালের কবিরা ধরে রাখতে পারেননি। এ আমাদের সকলেরই ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে এ কথাই স্বীকার করে নিতে হবে। কিন্তু পঞ্চাশের পর যা লেখা হয়েছে তার সবই কি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে? পাঁচ/দশটি চকমকি পাথরও কি নেই? আমার তা মনে হয় না। এ যুগ একজন ইয়েটস, একজন রবীন্দ্রনাথ কিংবা একজন জীবনানন্দ দাশের যুগ নয়। একাল হচ্ছে মাঝারি প্রতিভার কাল। বরঞ্চ সত্য এই, মাঝারি মাপের আয়নাও খুব বেশি চোখে পড়ে না। আর কণ্ঠস্বরের স্বাতন্ত্র্যের কথা যখন-তখন না বলাই ভালো। তার কারণ কবিতার মতো সূক্ষ্ম হৃদয়শিল্পের প্রকাশ যে ধরনের ব্যক্তিত্বচিহ্নিত ভাষায় সচরাচর ঘটে থাকে, সেখানে কণ্ঠস্বরের প্রকৃত নিজত্ব দেখা যায় এক শতাব্দীতে বড় জোর দু’চারজন লেখকের ক্ষেত্রে। এসব জিনিস বিবেচনায় রাখলে গত চল্লিশ বছরের বাংলা কবিতার পাঠ ও বিচার অনেকখানি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তখন আর মাহবুব হাসানের মতো কবিদের কৃতিত্বকে তুচ্ছ করে দেখার অবকাশ থাকে না।

[ad#co-1]