চেতনার বইমেলা

ইমদাদুল হক মিলন
আমাদের বইমেলা হচ্ছে একুশের চেতনার সঙ্গে যুক্ত একটি মেলা। কী রকম চেতনা? চেতনা হচ্ছে, পৃথিবীতে আমরা একমাত্র জাতি, যে জাতির তরুণ ছেলেরা ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছে। সুতরাং আমাদের একুশে বইমেলায় বাণিজ্যপ্রধান ব্যাপার নেই, আছে চেতনার ব্যাপার। আমাদের একুশে বইমেলা জাতীয় চেতনার একটি উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক অনেক বছর ধরে আমরা দেখছি, যত দিন যাচ্ছে, একুশে বইমেলা ততই বড় হয়ে উঠছে। সারাদেশ মেতে আছে এই বইমেলা নিয়ে। লেখক পাঠক প্রকাশক সাধারণ মানুষ বইপ্রেমী মানুষ_সবাই এই মেলাকে জাতীয় উৎসব মনে করে অংশগ্রহণ করেগত বইমেলার ঘটনা। আমাদের একুশে বইমেলার কিছুদিন আগে অর্থাৎ জানুয়ারির শেষ বুধবারে কলকাতা বইমেলার উদ্ভোধন হয়। বিবিসি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করল ওভার টেলিফোন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কথা বলেন কথাসাহিত্যিক শংকর। বাংলাদেশ থেকে তাঁরা আমাকে নির্বাচন করলেন কথা বলার জন্য। তাঁরা আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কলকাতার বইমেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলার ব্যবধান কী?’ উত্তরে আমি বললাম, পশ্চিমবঙ্গ বইমেলা বা কলকাতার বইমেলা একটি বাণিজ্যিক মেলা আর আমাদের বইমেলা হচ্ছে একুশের চেতনার সঙ্গে যুক্ত প্রাণের মেলা। কী রকম চেতনা? চেতনা হচ্ছে, পৃথিবীতে আমরা একমাত্র জাতি, যে জাতির তরুণ ছেলেরা ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের একুশে বইমেলায় বাণিজ্যপ্রধান ব্যাপার নেই, আছে চেতনার ব্যাপার, আছে প্রেমের সম্বন্ধ, ভালোবাসার। আমাদের একুশে বইমেলা জাতীয় চেতনার একটি উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক অনেক বছর ধরে আমরা দেখছি, যত দিন যাচ্ছে ততই বড় হয়ে উঠছে প্রাণের এই মেলা । সারা দেশ মেতে আছে এই বইমেলা নিয়ে। লেখক পাঠক প্রকাশক সাধারণ মানুষ বইপ্রেমী মানুষ_সবাই এই মেলাকে জাতীয় উৎসব মনে করে অংশগ্রহণ করে।

স্বাধীনতার পর আমরা দেখেছি, ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে বাংলা একাডেমীতে বিশাল একটা প্যান্ডেল করে সেখানে আমাদের কবি-লেখকরা জড়ো হতেন। এক দিকে কবিতাপাঠের আয়োজন হচ্ছে, আরেক দিকে গান হচ্ছে। এই ছিল বাংলা একাডেমীতে একুশ উদ্যাপনের একটি ব্যাপার। ১৯৭৩ বা ‘৭৪ সালে আমরা লক্ষ করলাম, একজন মানুষ, তিনি একটা সাদা ফরাসের চাদর একাডেমী চত্বরের সবুজ ঘাসে বিছিয়ে কিছু বই নিয়ে বসে গেছেন। সেই মানুষটিই চিত্তরঞ্জন সাহা, পুঁথিঘর-মুক্তধারার সত্ত্বাধিকারী। এই যে ভদ্রলোক কিছু বই নিয়ে ফরাস বিছিয়ে বসলেন, আমাদের বইমেলা কিন্তু তখন থেকেই শুরু হয়ে গেল। পরের বছর দেখা গেল, আরো কোনো কোনো প্রকাশক বইয়ের স্টল দিয়ে বসলেন। সেখানে আগত কেউ কেউ কবিতা শুনছে, গান শুনছে, কেউ আবার বই নেড়ে চেড়ে দেখছে। এভাবেই সেই ছোট্ট বইমেলা আজ বিশাল একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন সারা বছর ধরে লেখক-পাঠক-প্রকাশক অপেক্ষা করছেন এই বইমেলার জন্য। এখনকার বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার যে জগৎ, তা এই মেলাকে কেন্দ্র করেই বিকাশ লাভ করছে।

এই সব গেল একটা দিক। আরেকটা দিকও আছে। যত দিন যাচ্ছে, বাংলা একাডেমীর চত্বরটি ততই ছোট হয়ে আসছে। একসময় ১০টি, ৫০টি বা ১০০টি স্টল মেলায় অংশ নিত। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। জায়গা বাড়েনি বাংলা একাডেমীর। বরং আগের চেয়ে জায়গা কমেছে। এ অবস্থায় এত বড় একটা আয়োজনের জন্য স্থান সংকুলান কঠিন হয়ে পড়ছে।

কিছুদিন আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা হয়ে গেল। মেলাটি ছিল বাংলা একাডেমীর গেটের উল্টো দিকে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বিশাল একটা চত্বর নিয়ে মেলার আয়োজন। আমি সেই মেলায় গিয়ে অভিভূত হয়েছি। জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি, বাংলা একাডেমী আমাদের জাতীয় চেতনার জায়গা, আমাদের আবেগ-অনুভূতির জায়গা। এই আবেগের জায়গাটা ঠিক রেখে বাংলা একাডেমীর বইমেলার চত্বরটিকে আরো প্রসারিত করা যায় কি না। একসময় বাংলা একাডেমীর সামনের রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়ে সেখানেও মেলা হতো। কিন্তু সেখানে খাবারের দোকান, পোস্টার, ক্যাসেট ও অন্যান্য বারোয়ারি জিনিস বিক্রি হতো; বই বিক্রি হতো না। হলেও পাইরেটেড বা চোরাই সংস্করণ বই সেখানে বিক্রি হতো। যা হোক, এখন প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে লেখক ও পাঠকের সংখ্যাও। বাংলা একাডেমীর পাশে আণবিক শক্তি কমিশনের কার্যালয় আছে, যার প্রধান কার্যালয় সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা বলে আসছি বইমেলার স্থানটি সম্প্রসারণ করে আণবিক শক্তি কমিশন চত্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর মাঝখানে শুধু একটি দেয়াল। দেয়ালটি ভেঙে ফেললেই জায়গাটি বেড়ে যায় এবং বইমেলা বাংলা একাডেমী চত্বরের মধ্যেই থাকে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বাংলা একাডেমী চত্বর থেকে শুরু করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত
বিস্তৃত করা যায়। আমাদের এই সব প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ কতটা আমলে নেবেন, সেটা অবশ্য তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। সম্প্রতি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের একটি টক শোতে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক (ডিজি) শামসুজ্জামান খান, আমি এবং একজন প্রকাশক উপস্থিত ছিলাম। সেখানে ডিজি সাহেব জানিয়েছেন, বইমেলাকে সম্প্রসারণ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই এ বছরও বইমেলা বাংলা একাডেমী চত্বরেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
আমি আশা করছি, এ বছর মেলা আরো বড় আকার ধারণ করবে। তার কারণও আছে। আমরা জানি, বর্তমান সরকার বইপ্রেমী সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও একজন লেখক। তিনি ভালো পাঠকও। বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন তিনি। বাংলা একাডেমীর বইমেলা নিয়ে তিনি ভাবেন। শিল্প-সাহিত্যের খোঁজ-খবর রাখেন তিনি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এবারের বাংলা একাডেমী বইমেলা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আমি আশা করব, আগামী বছর বইমেলার স্থান সম্প্রসারণ করা হবে। তা না হলে প্রকাশক, পাঠকের ভিড়ে বইমেলায় দমবন্ধ অবস্থার সৃষ্টি হবে।

বইমেলায় লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তেমনই একটা ঘটনার কথা বলি। ঘটনাটা ১৯৯৩ সালের বইমেলায় ঘটেছে। সেই মেলায় আমার একটা বই বেরোল ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’। সেই বছরই প্রথম বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ স্থির করল যে প্রতি সপ্তাহে মেলার সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকা তৈরি করবে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। সৌভাগ্যক্রমে আমার ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ ্বইটি প্রথম সপ্তাহে সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের শীর্ষে ছিল। ফলে প্রচার-প্রচরণা এমন হলো যে বইটি নিয়ে ক্রেজ সৃষ্টি হলো। এমনও দিন গেছে, আমাকে পুলিশ দিয়ে পাহারায় রাখতে হয়েছে। শিখা প্রকাশনী ছিল বইটির প্রকাশক। আমি ওই স্টলে গিয়ে বসতাম। হাজার হাজার পাঠক লাইন দিয়ে বই কিনত। মেলায় বইটি ৬৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। ১৬-১৭টা এডিশন ছাপা হয়েছে বইটির। এমনকি ওই বইয়ের জন্য মেলায় মারামারি পর্যন্ত হয়েছে। যা হোক, ওই মেলায় আমার কিছু বন্ধু ‘বিনোদন’ নামে একটি স্টল নিয়েছিল। সেখানে তারা আর সব বই বাদ দিয়ে শুধু আমার বই দিয়ে স্টল সাজায় এবং আমাকে তাদের স্টলে বসতে বলে। একদিন সেখানে বসে আছি, বই বিক্রি করছি, অটোগ্রাফ দিচ্ছি। হঠাৎ দেখি, একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ ধরে আমার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু ফাঁকা হতেই আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি কোনো বই নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন? তিনি বললেন, ‘না। আমি আপনাকে একটা কথা বলব।’ এরপর তিনি আমাকে বললেন, “আপনি যখন লেখালেখি শুরু করলেন, যখন জার্মানিতে চলে গেলেন, সব খবর আমি রাখি। আপনার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’। একটা ভালো গল্পের বই লিখেছিলেন ‘নিরন্নের কাল’। জার্মানিতে গিয়ে লিখলেন ‘কালো ঘোড়া’, আবার দেশে ফিরে এসে লিখলেন ‘পরাধীনতা’ ও ‘ভূমিপুত্র’র মতো উপন্যাস। আমি ভেবেছিলাম, আপনি ওই লেখাগুলোই লিখবেন, ও রকম লেখাই আমি আশা করেছিলাম। যে লেখাগুলোতে এ দেশের মাটি-মানুষ, গ্রামের নিরন্ন মানুষের কথা থাকবে, তাদের ক্রাইসিসের কথা থাকবে। আপনি ওই জায়গা থেকে সরে গেছেন। এই কথাটি বলার জন্যই আমি দাঁড়িয়ে আছি। এই যে আপনি ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ লিখছেন, ভালো বিক্রি হচ্ছে; কিন্তু এতে কি কিছু যায়-আসে?” মহিলার কথাগুলো শোনার পর আমি খুব বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। একজন মানুষ আমার লেখার এ রকম খোঁজখবর রেখেছেন এবং আমাকে জানিয়ে গেলেন যে জনপ্রিয়তার ইঁদুরদৌড়ে আমাকেও কেন দৌড়াতে হবে? বিষয়টি আমাকে অনেক ভাবিয়েছে। আমি কেন জনপ্রিয় ধাঁচের লেখাগুলো লিখি? অনেক ভেবে আমি যেটা পেলাম, তা বহু জায়গায় বলেছি। আমি বাংলাদেশের প্রথম লেখক, শুরু থেকেই লেখাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। ১৯৮৪ সালেই, আমার ত্রিশ বছর বয়সের আগেই। ভেবেছিলাম, জীবনে যে কাজ করতে যাই_চাকরি করতে যাই_সেখানে সমস্যা হয়, ব্যবসা করতে গেলে লোকসান হয় ইত্যাদি। লেখালেখি ছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই আমি দাঁড়াতে পারছি না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই, লিখেই আমি জীবন ধারণ করব। কিন্তু লিখে জীবন ধারণ করতে গেলে ‘ভূমিপুত্র’, ‘কালো ঘোড়া’, ‘পরাধীনতা’র মতো উপন্যাস লিখলে হবে না। সারা বছরে এই বইগুলো হয়তো ৫০০ কপিও বিক্রি হয় না। ফলে কী রয়ালটি পাব, জীবন ধারণ করবই বা কী করে! এর ফলেই কিন্তু একধরনের জনপ্রিয় বই লেখার দিকে আমাকে ঝুঁকে যেতে হয়েছে। এবং এই ঝুঁকে যাওয়ার ফলে মানুষের প্রচুর কথাও শুনেছি, আবার তরুণ শ্রেণী বা এক শ্রেণীর মানুষের প্রচুর ভালোবাসাও পেয়েছি।

জনপ্রিয় ব্যাপারটা আমি খুব উপভোগ করি। ‘জনপ্রিয় লেখক’ বললেই তাঁকে আমরা কিন্তু অবহেলা করার চেষ্টা করি। আমরা ভাবি, ও তো জনপ্রিয় লেখক, ওর তো কিছু হয় না। শরৎচন্দ্রকেও এটা বলা হতো। বলা হতো, শরৎচন্দ্র জনপ্রিয় লেখক। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যদি জনপ্রিয় লেখক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মতো একাধারে বড় লেখক আর কজন আছেন বাংলা ভাষায়? তারাশঙ্কর তাঁর সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। কিন্তু তাঁর মতো বড় লেখক আর কে? বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ কি কম জনপ্রিয় লেখা? পৃথিবীতে অনেক বড় লেখক আছেন, যাঁরা একাধারে জনপ্রিয় লেখক, আবার ক্লাসিকও। আমাদের দেশে বিষয়টা ভিন্ন। যে মানুষেরা লিখে অন্য মানুষদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন, পাঠকের হৃদয় জয় করতে পারেন_তাঁরা ফেলনা নন। তাঁরা অবশ্যই প্রতিভাবান। প্রতিভাবান না হলে জনপ্রিয় হওয়া যায় না। ধরা যাক, হুমায়ূন আহমেদের একটা বই ৪০ হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে একটা মেলায়। এই ৪০ হাজার পাঠকের সবাই কি মূর্খ? অবশ্যই না। এদের মধ্যে অনেকেই আমাদের চেয়ে ব্রিলিয়ান্ট। সুতরাং তারা কিন্তু না বুঝে বইটি কিনছেন না। তাই জনপ্রিয় লেখকের তকমা দিয়ে কোনো কোনো লেখককে অবহেলা করার প্রবণতা, আমার মনে হয়, এটা দূর করা উচিত।

লেখকরা সাধারণত আড়ালের মানুষ। তাঁরা পেছনে থাকেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন টেলিভিশনের কল্যাণে লেখকরা পরিচিত মানুষও হয়ে উঠেছেন। কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিয়ে আসেন বই কিনতে। তাদের মধ্য দিয়ে এক শ্রেণীর নতুন পাঠক গড়ে উঠছে। সেই সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। এই নতুন পাঠকদের মধ্য দিয়ে বাংলা বইয়ের জগৎ আরো বিস্তৃতি লাভ করবে। আরো নতুন, ভালো লেখক তৈরি হবে। এটাও আমাদের একুশে বইমেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

এ তো গেল পাঠক ও লেখকের কথা। প্রকাশকের সঙ্গেও লেখকের একটা সম্পর্ক থাকে। আমার মনে হয়, লেখক ও প্রকাশকের সম্পর্কটা হওয়া উচিত স্বচ্ছ। আমার প্রকাশক সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বিচিত্র। প্রথম বই বের হওয়ার পর প্রকাশক আমাকে ৪০০ টাকা দিয়েছিলেন। তখন ওই ৪০০ টাকা মানে আমার কাছে অনেক। বইটি দুই হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। দাম ছিল চারটাকা। এমন প্রকাশকও আছেন, যিনি বিশ বছর আগে নতুন প্রকাশনায় এসে আমাকে তিন লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। তখন তিন লাখ টাকা এখনকার ৩০ লাখ টাকার সমান। আবার এমন প্রকাশকও আছেন, মাত্র ১৬০০ টাকা হাতে ধরিয়ে ১০ বছরের জন্য আমার দুটি উপন্যাসের স্বত্ব লিখে নিয়েছেন। তবে সব মিলিয়ে আমার প্রকাশক ভাগ্য খুব ভালো।

আবার বইমেলায় ফিরে আসি। ইদানীং আমাদের বইমেলা হচ্ছে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক। একটা সময় বইমেলা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল না। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সারা দেশে বইমেলার আয়োজন করত। আমরা লেখকরা দল বেঁধে যেতাম ঢাকার বাইরে বইমেলায় অংশ নিতে। সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, এমনকি টেকনাফেও বইমেলা হয়েছে। আমি সেখানে গিয়েছি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় একসময় বইমেলা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা কমে গেছে। এখন বইমেলা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক। আশার কথা, এ বছরই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসকে উপলক্ষ করে সারা দেশের সব জেলায় ১০ বা ১৫ দিনের একটি বইমেলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এটাকে আমি খুব বড় একটা উদ্যোগ বলে মনে করি। তার মানে, ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী যে বইগুলো প্রকাশিত হবে, মার্চ মাসে সেই বইগুলো সারাদেশে ওই মেলার মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউট হবে। পাঠক প্রত্যন্ত এলাকায় বসেও বই সংগ্রহ করতে পারবেন। এটাকে আমি একটা রিমার্কেবল ঘটনা বলে মনে করি।

সব শেষে আরেকটা কথা বলতে চাই, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বইমেলায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা, লস এঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক, টোকিও, দিলি্ল বইমেলায় আমি গিয়েছি। সেসব বইমেলা আর আমাদের বইমেলার মধ্যে অনেক পার্থক্য। সেসব দেশে বইমেলায় বইগুলো সাধারণ পাঠকদের কাছে বিক্রি করা হয় না; শুধু প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়। ডিস্ট্রিবিউটররা বইয়ের ক্যাটালগ দেখে বইয়ের অর্ডার দেন এবং সেসব বই সারা বিশ্বে বিক্রির দায়িত্ব তাঁদের। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বইমেলায় বই বিক্রি করা হয়। তবু আমাদের বইমেলা অনন্য। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের এমন একটি মিলনমেলা_যার জন্য সারা বছরের অপেক্ষা_তা এক কথায় অতুলনীয়। বাংলা একাডেমীর বইমেলা আমাদের জাতীয় চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শ্রুতিলিখন : মাহমুদ শাওন

[ad#co-1]