অন্য আলোকে জ্যোতি বসু

নূহ-উল-আলম লেনিন
আমার বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার একটি চরণ এ রকম : “পার্টির সিদ্ধান্ত ছাড়া কমিউনিস্টরা বাঁচেও না মরেও না।” উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসুর জীবনাবসান হয়েছে পার্টির সিদ্ধান্ত ছাড়াই। এই প্রথম তিনি তাঁর পার্টির সিদ্ধান্ত অমান্য করলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) পলিটবু্যরোর সদস্য কমরেড জ্যোতি বসুকে মৃতু্যবরণের ছাড়পত্র দেয়নি। বরং তার ৯৬তম জন্মদিনে দীর্ঘায়ু কামনা করে অভিনন্দন জানিয়েছে। সিপিএম-এর নেতৃস্থানীয় অনেকেই ঘটা করে জীবিতাবস্থায় জ্যোতি বসুর জনু্মশত বার্ষিকী পালনের নানা পরিকল্পনার কথা ভেবেছেন।

আমরা জ্যোতি বসুকে বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম সৃহৃদ ও বন্ধু হিসেবে দেখেছি। ত্াঁর শেকড় যে বাংলাদেশে, তাঁর শৈশব কেটেছে পৈতৃক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বারদী গ্রামে, এ নিয়ে আমাদের গর্বের অন্ত নেই। প্রায় দুই যুগ ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হলে হবে কি, সে যে পূর্ববাংলা তথা ‘বাংলাদেশের মানুষ’! হিন্দুকুলে জন্ম, তিনি কমিউনিস্ট, নাস্তিক_ এর কোনটিই তাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের বাঙালীর অনাত্মীয় করতে পারেনি। কোন ধর্মবোধ বা সাম্প্রদায়িকতা জ্যোতি বসুকে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। সবকিছুর মূলে রয়েছে জাতিসত্তার শেকড়াশ্রয়ী একাত্মতাবোধ। রাষ্ট্রসত্তা থেকে ওই বোধ আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের যে কোন বাঙালীর আন্তর্জাতিক েেত্র খ্যাতি অর্জনে, এমনকি ভারতে কোন শীর্ষ অবস্থানে গেলে আমরা বাংলাদেশে বাঙালীরা পুলকিতবোধ করি। গর্ব হয়। আনন্দে আত্মহারা হই। শুনেছি ওঁদেরও আমাদের ব্যাপারে এ রকমটি হয়। কেন? কারণ বাঙ্গালিত্ব; ভিন্ন রাষ্ট্র কিন্তু অভিন্ন জাতিসত্তা।

জ্যোতি বসুর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসা এবং বাংলাদেশ নিয়ে জ্যোতি বসুর স্মৃতিকাতরতা ও ভালবাসা অভিব্যক্ত হয়েছে তাঁর রচিত রাজনৈতিক আত্মকথন ‘যতদূর মনে পড়ে’ গ্রন্থে। ১৯৮৭-এর জানুয়ারি এবং ১৯৯৬-এর নবেম্বরে ঢাকা সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “…একচলি্লশ বছর পর ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের সোচ্চার অভ্যর্থনায় আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। ঢাকায় যাবার পরদিন গিয়েছিলাম আমার পৈতৃক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বারদীতে। হেলিকপ্টারে মেঘনা নদী পেরিয়ে। সকালে হেলিকপ্টার নামার পরই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ এসেছেন, আমাকে দেখতে। তাঁরা আমাকে মনে রেখেছেন! গাঁদা ফুলের পাশাপাশি গোলাপ ফুলের তোড়ায় চাপা পড়ে যাবার যোগাড়।

বুকভরা ভালবাসা আমাকে যেন শৈশবে পেঁৗছে দিয়েছিল। ওখানে আমাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। ছোটবেলায় ছুটির সময় বাবার সঙ্গে বারদীর বাড়িতে যেতাম। সেই বাড়ি, ঘর, বারান্দা। পাল্টে যাওয়া চারপাশ। সে এক আলাদা অনুভূতি।”

১৯৯৬ সালের ২৭ নবেম্বর ঢাকা সফর প্রসঙ্গে বলেছেন, “বাংলাদেশ সরকারের আতিথ্যের কথা নতুন করে বলার নয়। সে দেশের মানুষ আমার প্রতি, আমাদের রাজ্য সরকারের প্রতি যে শ্রদ্ধা-ভালবাসা দেখিয়েছেন তাতে আমি অভিভূত।”

জ্যোতি বসুর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব শুনে আমরা উৎসাহিত হয়েছি। সিপিএম পলিটবু্যরো বিরোধিতা করায় ভারতের প্রথম বাঙালী এবং প্রথম কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না জ্যোতি বসু। বাংলাদেশে রাজনীতি সচেতন মানুষকে এ জন্য সিপিএমের ওপর ুব্ধ হতে দেখেছি।

না কেবল বাঙালী বলেই না। ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও জ্যোতি বসুকে নিয়ে আমাদের একটু অন্যরকমের আত্মীয়তাবোধ ছিল। এই বোধ সৃষ্টি করেছেন, সংক্রমিত করেছেন স্বয়ং জ্যোতি বসু। তাই তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মৃতু্যতে সংসদে উত্থাপিত শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি আমার একজন অভিভাবককে হারালাম।’

বঙ্গবন্ধু-কন্যার অভিভাবক জ্যোতি বসু! কেমন করে সম্ভব? এটা কী কেবল শিষ্টাচার বা সৌজন্য? দু’জনে দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ। ভাবাদর্শগতভাবে দুই বিপরীত মেরুর মানুষ। জ্যোতি বসু দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাসী ‘আন্তর্জাতিকতাবাদী’। শেখ হাসিনা একজন ধর্মবিশ্বাসী, উদার গণতন্ত্রী এবং ‘জাতীয়তাবাদী’। একজন প্রলেতারীয় দর্শনের, অন্যজন ‘বুর্জোয়া’ দর্শনের অনুসারী।

কিন্তু রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত পৃথক অবস্থান সত্ত্বেও জ্যোতি বসু ও শেখ হাসিনা উভয়েই দেশপ্রেমিক, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থাশীল, সেকুলারিজম ও মানবতাবাদে বিশ্বাসী। জ্যোতি বসু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের দৃঢ় প্রবক্তা ছিলেন। এসব কারণেই ১৯৭১ সালে তিনি এবং ভারতের কমিউনিস্ট ও অপরাপর বামপন্থীরাও কংগ্রেসের পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সুদৃঢ় সমর্থন জানিয়েছেন। সাধ্যমতো সর্বতোভাবে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ও ভারতের সকল প্রগতিশীল শক্তি নিন্দা জানিয়েছেন। এটা যে সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনপুষ্ট সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাজ তাদের এই মূল্যায়নে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা ছিল না। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর, সেই ঘোর দুর্দিনে শেখ হাসিনার ভারতে যখন নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন, তখন থেকেই ব্যক্তিগতভাবে জ্যোতি বসু ছিলেন তাঁর ও শেখ রেহানার প্রতি সহানুভূতিশীল। ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার প্রতি অকৃত্রিম দরদ, সহানুভূতি এবং ওঁদের কল্যাণচিন্তার কারণেই তিনি শেখ হাসিনার অভিভাবক হতে পেরেছিলেন।

জ্যোতি বসু জানতেন একটি ধর্মনিরপে, গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য কতখানি সহায়ক। আর এ কারণেই তিনি গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তির ব্যাপারে শেখ হাসিনার সরকারকে সহায়তা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বুঝিয়েছেন। জ্যোতি বসুর সহায়তা ও পরামর্শ ছাড়া গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি সম্পাদন করা সম্ভব হতো না। গঙ্গায় পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে জ্যোতি বসু তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “…এই চুক্তি নিয়েও কিছু কিছু মহল উস্কানি দিচ্ছিল, দু’দেশেই। এ রাজ্যে কংগ্রেসীদের একাংশ ব্যাপারটা নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে। ওদের সঙ্গে বিজেপি-ও ছিল। ওঁদের তো কোন দায়িত্বজ্ঞান নেই। তাই ঐ চুক্তির তাৎপর্য ওঁরা বুঝতে চাননি। তা না চান, সাধারণ মানুষ_ দু’দেশেই, জলবণ্টন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেটাই বড় কথা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক জোরদার করতে ঐ চুক্তিকে আমি গুরুত্বপূর্ণ পদপে বলব। এর ফলে দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।”

১৯৯৯ সালে আমি কলকাতার মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে সাাত করি। কোন রাজনৈতিক বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। কমিউনিস্ট পরিবারে জন্মের সুবাদে এবং রাজনৈতিক জীবনের বড় সময়টা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তরুণ বয়স থেকেই জ্যোতি বসু আমার কাছে ‘রোল মডেল’ ছিলেন। আওয়ামী লীগে যোগদান করার পরও জ্যোতি বসুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং আকর্ষণবোধ একটুকুও কমেনি। এ জন্য এ মানুষটিকে কাছে থেকে দেখা এবং তার সঙ্গে কথা বলার একটা অদম্য আকাঙ্া ছিল আমার। আমার এই ইচ্ছের কথাটা আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ব্যক্ত করি। তিনি আমাকে উৎসাহিত করেন এবং একটা অনানুষ্ঠানিক ‘উপল’ করে দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহার হিসেবে তাঁর রচিত এক সেট বই ও একটি শুভেচ্ছাপত্র মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে পেঁৗছে দিতে বলেন। কলকাতাস্থ বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশন অফিস আমার সাাতকারের ব্যবস্থা করে।

সংপ্তি সাাতকার। শেখ হাসিনার দেয়া উপহার ও শুভেচ্ছাপত্রটি পেয়ে তিনি তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ শিশুর সারল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। এ যেন পিতার কাছে পুত্রীর অমূল্য উপহার। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘হঁ্যা, ও (শেখ হাসিনা) লেখে-টেখে। পড়াশোনাও করে। খুব ভাল, খুব ভাল, খুব ভাল।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আর কতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন? তিনি সহসা কণ্ঠে একটু বিরক্তির সুর এনে বললেন, “আমি চাই নাকি! ওরা ছাড়ে না। পার্টির সিদ্ধান্ত তো মানতে হবে।” গঙ্গাচুক্তিতে সহায়তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। বলি, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।” আবার চোখে মুখে পিতৃসুলভ স্নেহের উদ্ভাস। এবার বেশ উদ্বেগ নিয়ে বললেন, “চুক্তি তো হয়েছে। জল ঠিকমতো পাওয়া কঠিন। গঙ্গায় জল কোথায়? বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের একই সমস্যা।”

আমি বললাম, বাংলাদেশে যাবেন না? আরেকবার বারদী ?

তিনি বললেন, “হঁ্যা যেতে তো ইচ্ছে করে। সময় কই!”

মৃদু্যভাষী তিনি। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। জানতে চাইলেন মানুষ কী ভাবছে। বন্যা ব্যবস্থাপনায় শেখ হাসিনার সরকারের দতার প্রশংসা করলেন। আমি তাঁর ছবি তুললাম। তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে সুযোগ দিলেন। হঠাৎ কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই আবেগবশত আমি একটা কাণ্ড করে বসলাম। জ্যোতি বসুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। বিব্রত হয়ে তিনি বললেন, “না না আমরা কমিউনিস্টরা এসব পছন্দ করি না।”

আমি তাকে বলিনি আমিও কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিলাম। জীবনে আমি আমার মা, শ্বশুর ও শাশুড়িকে ছাড়া আর কাউকে পা ছুঁয়ে সালাম করিনি। জ্যোতি বসু একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাকে আমি প্রণাম করলাম। প্রণাম বা কদমবুছি করা আমিও পছন্দ করি না। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল, একজন মহৎ মানুষকে প্রণাম না করলে যেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্পূর্ণ হয় না। বলা যেতে পারে, এও এক ধরনের ভক্তিবাদী দেশাচার। একেবারে বাঙালিপনা! কিন্তু আমার ভাল লেগেছিল। ওই ভাল লাগাটুকু আমার মনে আজও অম্লান।

জ্যোতি বসু ও সিপিএম সম্পর্কে আমার কিছু ভিন্ন মূল্যায়ন আছে। নির্মোহ মূল্যায়ন। আমার মতে, জ্যোতি বসু ও সিপিএম বিশ্বাসে ও তত্ত্বে এক রকম এবং বাস্তব কাজে আরেক রকম। সারা ভারতে যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সিপিএম কার্যত জাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক দল। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মস্কো-পিকিং বিভাজনের সূচনায় সিপিএম চীনা (পিকিং) পন্থী ছিল। কিন্তু চীনারা মাওসেতুং-এর প্রভাবে ভারতে (পশ্চিমবঙ্গে) নকশাল আন্দোলনকে সমর্থন জানালে সিপিএমও বামফ্রন্ট পিকিং লাইন ত্যাগ করে। তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। জ্যোতিবসু এই লাইনের অন্যতম প্রবক্তা। বস্তুত এক ধরনের স্বাধীন নীতি।

১৯৮৩ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে আমি চিকিৎসার্থে সস্ত্রীক সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করি। মস্কোতে চিকিৎসা শেষে বিশ্রামের জন্য আমরা কৃষ্ণসাগর তীরবতর্ী চমৎকার স্বাস্থ্যনিবাস সোচিতে এক সপ্তাহ ছিলাম।

সোচিতে তখন স্ত্রী-পুত্রসহ বিশ্রামে গিয়েছিলেন সিপিএম পলিটবু্যরোর সদস্য দণি ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা বাসব পুন্নাইয়া। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। বাসব পুন্নাইয়ার স্ত্রী কলকাতায় বড় হয়েছিলেন। তিনি বাংলা জানতেন। আমার স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাতে ভাল লেগেছিল তাঁরও।

বাসব পুন্নাইয়ার সঙ্গে ভারতের এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রসঙ্গে অনেক কথা হয়। আলাপচারিতায় আমার মনে হলো তিনি পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে যেন কিছুটা রিজার্ভ। বাসব পুন্নাইয়া ছিলেন সিপিএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপত্র পিপলস ডেমোক্রেসির সম্পাদক। তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর পাতায় পাতায় তাঁকে লাল কালি দিয়ে দাগ দিতে এবং পত্রিকার মার্জিনে মন্তব্য লিখে রাখতে দেখেছি। দলের প্রধান তাত্তি্বক ছিলেন তিনি। তত্ত্বের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী ছিলেন বাসব পুন্নাইয়া। “কমরেড জ্যোতি বসু ইজ ভেরি মাচ প্র্যাগমেটিক।” তাঁর এই মন্তব্যের নিহিতার্থ আমি তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি।

সত্যি সত্যি জ্যোতি বসু প্র্যাগমেটিক ছিলেন। দৃশ্যত পুন্নাইয়ার মতো তত্ত্বের খাঁচায় বন্দী এই মানুষটি ছিলেন প্রখর বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার চালাতে গিয়ে কোন ইউটোপিয়ার দ্বারা পরিচালিত হননি। তিনি যে কাজগুলো করেছেন তা করার জন্য কমিউনিজম অপরিহার্য নয়। ভূমি সংস্কার যেটুকু করেছেন তার সঙ্গে ক্যাসিক্যাল সমাজতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নেই। অনেক অকমিউনিস্ট দেশে এর চেয়েও র্যাডিক্যাল সংস্কার হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও কোন কমিউনিস্ট শাসনের মডেল নয়। দীর্ঘ তিন দশকের শাসনে পশ্চিমবঙ্গে সমাজের কোন মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু যেটুকু সংস্কার তিন স্তরবিশিষ্ট পঞ্চায়েতের মাধ্যমে হয়েছে, বিশেষত হতদরিদ্র মানুষের মতায়ন, ভূমিসংস্কার এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন তা সম্ভব হয়েছে প্র্যাগমেটিক নীতি-কৌশল এবং জ্যোতি বসুর মতো নির্লোভ, প্রাজ্ঞ ও ক্যারিসমেটিক নেতা ও সিপিএম-এর তৃণমূল পর্যন্ত সুদৃঢ় সংগঠনের জন্য। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক উদার গণতন্ত্রী কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের অমতা, ভেতর থেকে এই দু’টি দলের অধিকাংশ নেতা-কমর্ীর আদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দেউলিয়াত্বই এতদিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম ও বামফ্রন্টের কোন গ্রহণযোগ্য বিকল্প দাঁড়াবার অন্তরায় হয়ে ছিল। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এটা পশ্চিমবঙ্গের বাম ও গণতান্ত্রিক ঐত্যেহ্যের কারণে।

সিপিএম দীর্ঘদিন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কেন্দ্রের বিমাতাসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এজিটেট ও সংগঠিত করেছে। এই কেন্দ্র বিরোধী অবস্থানটিই, আমার মতে, জ্যোতি বসু ও সিপিএম-এর জাতীয়তাবাদী এ্যাকশনের বহিপর্্রকাশ।

আমাকে পশ্চিমবঙ্গের অনেক খোলা মনের বাম নেতা ও বুদ্ধিজীবী বলেছেন, সিপিএম হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের আওয়ামী লীগ। কেবল স্বাধীনতা ছাড়া তারা সবই চেয়েছে। আর জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের ‘বঙ্গবন্ধু’।

রসিকতা করে প্রতীকী অর্থে বললেও এ কথায় কিছুটা সত্যতা আছে। আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের মতো শিথিল সংগঠন বটে। তবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সর্বশ্রেণীর দল হলেও গরিব মানুষ এই দলের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক। সিপিএম দৃশ্যত রেজিমেন্টেড এবং তত্ত্বাতভাবে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি হলেও, সিপিএম-এর গ্রামীণ শক্তিভিত গরিব মানুষ এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্ত রুরাল এলিট হিসেবে ক্রমোবর্দ্ধমান। জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের গরিব মেহনতী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃহদাংশের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করেছিলেন সংস্কারমূলক (মাকর্সবাদী তাত্তি্বক পরিভাষায় ‘বুর্জোয়া সংস্কার’) কাজের ভেতর দিয়ে।

জীবনের শেষ দিকটায় জ্যোতি বসু অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ভারতের জাতীয় নেতার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলেন। সঙ্গতভাবেই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তাবে ব্যক্তিগতভাবে সম্মত ছিলেন। তত্ত্বের খাঁচায় বন্দী ছিলেন না বলেই তিনি এটাকে “ঐতিহাসিক সুযোগ’ যেমন বলেছিলেন, তেমনি তার কূপমন্ডূক পার্টির পলিটবু্যরো এই প্রস্তাব নাকচ করলে তিনি একে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেছেন।

জ্যোতি বসু বিংশ শতাব্দীর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বাইরে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামোয় সবচেয়ে সার্থক। একটি প্রাদেশিক সরকারের প্রধান হলেও চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরের অপরাপর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি জনসংখ্যা অধু্যষিত ভারতীয় প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট সরকারের প্রধান ছিলেন তিনি। কমিউনিস্ট দুনিয়ার বাইরে আর কোন দেশে এত দীর্ঘকাল আর কেউ একটি নির্বাচিত সরকারের প্রধান ছিলেন না। স্বাধীন-সার্বভৌম না হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ছিল তৃতীয় বৃহত্তম কমিউনিস্ট শাসিত ভূখণ্ড।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন বামপন্থীদের কোয়ালিশন বা যুক্তফ্রন্টের এত দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাও পৃথিবীতে বিরল। ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা জর্জি ডিমিট্রভ ইউনাইটেড ফ্রন্টের যে ধারণা তুলে ধরেছিলেন, সেই ধারণারই বর্ধিত রূপায়ন আমরা দেখতে পেলাম পশ্চিমবঙ্গে। শুরু হয়েছিল কেরালা দিয়ে। কিন্তু কেরালায় একটানা দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট শাসন টেকেনি। পশ্চিমবঙ্গে তিন দশকজুড়ে এই বামপন্থী কোয়ালিশন দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্যশাসন করে চলেছে। বর্তমানে তার সামনে অশনিসঙ্কেত দেখা গেলেও, কোয়ালিশনের এই অসাধারণ সাফল্যের রূপকার জ্যোতি বসু। একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষ বছরটির সূচনায় তার জীবনাবসান ঘটলেও, জ্যোতিবসু ছিলেন যুদ্ধ, শান্তি, বিপ্লব ও পতন অভু্যদয়ের শতক_ বিংশ শতাব্দীরই সর্বশেষ সফল দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রনায়কের অন্যতম। অন্যজন ফিদেল ক্যাস্ত্রো, বস্তুত যিনি এখনই ইতিহাসের অংশ। ‘জ্যোতি বসু’ একাধারে এ যাবতকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী কমিউনিস্ট রাষ্ট্রনায়ক এবং ভারতের সর্বজনশ্রদ্ধেয় জাতীয় নেতা। বাংলাদেশের সুহৃদ।

লেখক : আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা

[ad#co-1]