মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন

একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সঠিক মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য সবার আগে দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। তিনি বলেন, মুদ্রানীতি হওয়া উচিত সুস্পষ্ট, যাতে নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা আর্থিক সূচকগুলোর গতিধারা সম্পর্কে আভাস পেতে পারেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রক্রিয়াসহ সার্বিক বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত ছিল।

অর্থনীতির সার্বিক বিষয়ে নিজের ভাবনা এবং গভর্নর থাকাকালীন কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি কথা বলেন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক টিটু দত্ত গুপ্ত ও মজুমদার বাবুর সঙ্গে। আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বিশ্বমন্দার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুদ্রানীতির প্রচলন সম্পর্কে বলুন?
ড. সালেহউদ্দিন : ২০০৬ সালে আমিই প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরু করি। মূলত সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য পূর্বাভাস হিসেবে এটা করা হয়। অর্থনীতির মৌলিক সূচক_যেমন প্রবৃদ্ধি কত হবে, মূল্যস্ফীতি কেমন হবে, বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন থাকবে তার ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সময় কী কী করবে। এতে সুবিধা হলো_কোন লক্ষ্যে কাজ করতে হবে তা ব্যবসায়ীরা সহজে বুঝতে পারেন। আমার চার বছর মেয়াদে আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। বর্তমান গভর্নর আতিউর রহমান সাহেব যে মুদ্রানীতি দিলেন, সেটাও স্বায়ত্তশাসন প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা।

কালের কণ্ঠ: ঘোষিত মুদ্রানীতির জন্য চ্যালেঞ্জ কী?
ড. সালেহউদ্দিন : প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো_আমাদের ‘স্লাগিশ ইনভেস্টমেন্ট’। আমাদের বিনিয়োগ হচ্ছে না। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ মুদ্রাস্ফীতির চাপ। মাঝখানে এটা কমে গিয়েছিল, এখন আবার পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে বেড়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা ছিল, বছর শেষে মুদ্রাস্ফীতি ৬ থেকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি পেঁৗছতে পারে। এর কারণ হলো, বিনিয়োগ না হওয়ায় আমাদের প্রকৃত প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে না। একদিকে টাকা অলস থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে এই অর্থ মানুষের ‘স্পেকুলেটিভ পারপাস’-এ ব্যয় হচ্ছে। অলস টাকা দিয়ে মানুষ জমি কিনছে, ফ্ল্যাট কিনছে। কৃষিতে মোটামুটি বাম্পার ফলন হয়েছে ঠিক, কিন্তু এতে প্রবৃদ্ধি তেমন বাড়বে না। কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ এবং সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। আর আমাদের প্রবৃদ্ধিতে শিল্প ও সেবা খাতের অবদানই বেশি। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানো দরকার। আমার মনে পড়ে, একসময় বেসরকারি খাতে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তখন কিছুটা মূল্যস্ফীতি ছিল, কিন্তু প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছিল।

কালের কণ্ঠ : বর্তমান মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। আপনি কী মনে করেন?
ড. সালেহউদ্দিন : বর্তমান মুদ্রানীতিকে বলা হচ্ছে সংকুলানমুখী। এখন প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো_এর বাস্তবায়ন করা। এ জন্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগের জন্য ইনফ্রাস্ট্রাকচার, লজিস্টিকসগুলো দিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা এখন সরকারের ব্যাপারে কিছুটা আশ্বস্ত। সরকার যে এসব চাহিদা মেটাতে আগ্রহী_এ আস্থা সৃষ্টি হওয়ায় বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে বিনিয়োগকারীরা কখনোই দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করবেন না। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের আইন ও নীতিমালার সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছুটা সংস্কার হয়েছে, কিন্তু ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন, বিনিয়োগ বোর্ড, পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে আমরা খুব বেশি দূর এগোতে পারব না।

তৃতীয় বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। আজ এটা করলাম, কাল সেটা করলাম_এভাবে চললে হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার নীতির ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। আমাদের সমস্যা হলো, সরকারকে খুশি করতে আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করি, সেটা করার চেষ্টা করি…। এই প্রবণতা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে বেরিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে কাজ করে। হাউস অব কংগ্রেসও তাদের ডাকতে পারে না। এমনকি ট্রেজারি সেক্রেটারির কাছেও তারা জবাবদিহি করে না। ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই রকম স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও যথেষ্ট স্বাধীন।… বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এখনই এ ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তা হলে এটি একসময় অর্থমন্ত্রণালয়ের অংশে পরিণত হবে।

কালের কণ্ঠ : সার্বিকভাবে নতুন মুদ্রানীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. সালেহউদ্দিন : এবারের মুদ্রানীতিতে কতগুলো ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কিভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করবে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। মূদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মনোযোগের একটা কেন্দ্র নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন, তাও করা হয়নি। সরকারি খাতে ঋণ নেওয়া কম হচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। বাংলাদেশের মতো দেশে ফিসক্যাল অপারেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইভেট এক্সপেন্ডিচার গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তাতে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে না। গভর্নমেন্ট এক্সপেন্ডিচারে অর্থাৎ মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সুতরাং পাবলিক এক্সপেন্ডিচারেও জোর দিতে হবে। এই মুদ্রানীতিতে সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো উচিত ছিল_আপনাদের ঋণ কমেছে, কারণ এডিপির বাস্তবায়ন হচ্ছে খুবই মন্থরগতিতে। একই সময় সরকারের রেগুলার এক্সপেন্ডিচারও খুবই ধীর। সরকারের ব্যয়ের গুণগত মানও দেখতে হবে। সরকার যদি মনে করে, বেতন-ভাতাদি বাড়ালে ব্যয় বাড়বে, তাহলে তো হবে না। পাবলিক এক্সপেন্ডিচার বাড়াতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিসিক_এসব প্রতিষ্ঠানকে এনফোর্স করতে হবে। হালকা প্রকৌশল খাতকে তারা এনফোর্স করতে পারত। সরকার কেন যে হঠাৎ এক্সপেন্ডিচার কমিয়ে দিচ্ছে, সেটা আমার বোধগম্য নয়।

এবার বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি তৈরির কথা বলা হলেও মুদ্রানীতিতে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। মুদ্রানীতি আরো একটু কংক্রিট হওয়া উচিত।

কালের কণ্ঠ : কৃষিঋণে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া সম্পর্কে আপনার মত কী?
ড. সালেহউদ্দিন : কৃষিঋণে আমিই প্রথম বেসরকারি খাতকে নিয়ে আসা শুরু করি। আমি দেড় হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলোকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়েছিলাম; ব্যাংকগুলো মোটামুটি সাড়াও দিয়েছিল। এর আগে কিন্তু বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো টার্গেট ছিল না। বর্গাচাষিদের জন্য যে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হলো_সেটা আমার সময়েই করা। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, কৃষিঋণ প্রকৃত বর্গাচাষির পাচ্ছেন কি না। আমি চট করে দশ-পনের হাজার কোটি টাকা জোগাড় করলাম, কিন্তু নেওয়ার লোক নেই। এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট ইজ নট এনাফ_এটা বোঝা উচিত। ক্রেডিট আমি দিলাম কৃষককে; সঙ্গে সঙ্গে যদি আমি নিশ্চিত না করি যে, তিনি ন্যায্য দামে ইনপুট অর্থাৎ কীটনাশক, সার ও পানি পাবেন; দ্বিতীয়ত, আমি যদি নিশ্চিত না করি যে, তিনি ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন_তাহলে কৃষিঋণ দিয়ে বর্গাচাষিদের জীবনমানের পরিবর্তন করা যাবে না। বরং তাঁদের আরেকটি ঋণের জালে বাঁধা হবে। যে বছর কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে, সে বছর উৎপাদনও বাড়বে। আবার যে বছর কমবে, সে বছর উৎপাদনও কমে যাবে। কৃষকের জন্য ঋণ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সার, কীটনাশক, পানি ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়নি। আপনি কৃষিঋণ দিয়ে যাচ্ছেন অথচ বাজার সুসংহত করছেন না। এটা কিন্তু একটা ব্যর্থতা।

[ad#co-1]