রাবেয়া খাতুন সময়ের সহযাত্রী

প্রদীপ বিশ্বাস:
রাবেয়া খাতুন (জ.১৯৩৫) বাংলাদেশের উপন্যাসে বিশিষ্ট, তার শৈলীগত প্রকাশগুণ; মধ্যবিত্ত জীবনাগ্রহের চিত্রায়ণ, স্বাতন্ত্র্য দৃষ্টিকোণ নির্ণয় থেকে।‘মধুমতী’ নদী হলেও এ তীরবর্তী মানুষের মনস্তত্ত্ব, বাঁচার অবলম্বন, দৈনন্দিন জীবনগ্রহ উপন্যাসের উত্থাপিত শিল্পে মুখ্য হয়ে ওঠে। মধুমতি (১৯৬৩) ঔপন্যাসিকের প্রথম উপন্যাস। শিল্পিত সম্ভাবনার সূত্রে লেখকের এ উপন্যাসটিতে আমরা পাই এক ধরনের মনস্বীতা। ঘটনাপ্রবাহে আঞ্চলিক ভাষাচেতনার বয়ানের প্রচেষ্টা আছে। যদিও তার যথাযথ প্রতিফলনের সুযোগ উপন্যাসে ঘটে নি। তবে প্রচেষ্টার আন্তর-প্রবাহে জীবন সমগ্রতার সূত্রগুলো এখানে নিরূপিত। একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে কথিতের মা, নানা, মামা, মামী, খালা, খালু- বিশেষত বয়ানকারীর নানার বাড়ীর ঘটনা; পেশায় অঞ্চলের অনেকেই তাঁত ব্যবসায়ী, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ‘মধুমতী’র হাতে। কিন্তু অঞ্চলের মানুষের সম্প্রীতি, বাঁচার বা মর্যাদার পেছনে তারা খুব ঐতিহ্যানুগ; ইতিহাসকেন্দিীক। কালস্রোতে পেশার বিবর্তন পরিবর্তন ঘটে, বাস্তবতাও একরকম থাকে না কিন্তু চিত্তে অতীতকাতর একটা সুখ থাকে সবার মনে। বর্ণনায় যুক্তিনিষ্ঠা, ভেতর পযার্য়ের অন্তর্দাহ নির্ণয়, আর ভঙ্গুর সামন্তবাদের পদধ্বনি স্পষ্ট ‘মধুমতী’ উপন্যাসে। রাজারবাগ শালিমারবাগ(১৯৬৯) দুটি অংশে বিভক্ত উপন্যাস। “রাজরবাগ” সত্যি শহরতলি থেকে শহর হতে চলেছে। কিন্তু তাদের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক তখন থাকবে কি আশ্চর্য্য পরিহাসের” উঠতি মধ্যবিত্ত ফিরোজ কিংবা রুহির মানসলোক, শালিমারবাগও এ শ্রেণীর সম্প্রসারিত রূপ। ফেরারী সূর্য (১৯৭৫) মেহের আলী (১৯৮৫), অনন্ত অন্বেষণ (১৯৬৭), সাহেব বাজার (১৯৬৯), মন-এক শ্বেত কপোতী (১৯৬৫), অনেকজনের একজন (১৯৭৬), জীবনের আর এক নাম দিবস রজনী (১৯৮০), নীল নিশীথ, পাখি সব করে রব, বায়ান্ন গলির এক গলি (১৯৮৪), নীল পাহড়ের কাছাকাছি (১৯৮৫), বাগানের নাম মালনিছড়া, এই বিরহকাল (১৯৯৫), নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস (১৯৮৫), প্রিয় গুলশান (১৯৯৭), শঙ্খ সকল প্রকৃতি (২০০৫), উপন্যাস সমগ্র-১ (২০০৫), স্বপ্নে সংক্রামিত (২০০৬) প্রভৃতি তার উপন্যাস।

উপন্যাসে খ্যাতিমান হলেও ছোটগল্পে ও তার কৃতির পরিচয় আছে। বাংলাদেশের জীবন আর জীবনাচরণের নানা বিষয় তার গল্পের ভিত্তিমূল গড়ে তুলেছে। যেহেতু জীবন কখনও মসৃণ পথে চলে না, বিভিন্ন সমস্যার চড়াই-উতরাই অতিক্রম করেই জীবনের গতি নির্ণিত হয়, সুতরাং রাবেয়া খাতুন যাপিত জন-জীবনকে সেভাবেই বিচার করে তার উজ্জ্বল ছবি অঙ্কন করেছেন ছোটগল্পে। কথাকার হিসেবে প্রবলরূপে অভিজ্ঞ রাবেয়া খাতুন। বাংলাদেশের গল্প কাঠামোর নিপুণ বুননি তার পরীক্ষায় পরিব্যাপ্ত। কিন্তু গতানুগতিকতা থাকেই তার গল্পে। আয়োজন ইনফর্মাল নয়। তেমন আকর্ষণও সৃষ্টি করে না। কারণ পূনরাবৃত্তি, অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং মূল্যবোধের মাত্রাকে সুষ্ঠুরূপে চরিত্রে কায়েম না করা। বিষয়-নির্ধারণে তার প্রাচুর্য আছে কিন্তু গল্প তৈরি হওয়া কিংবা প্রকাশশৈলীর আড়ষ্টতা সেখানে অকার্যকর নয়। রাবেয়া খাতুন তবুও অনেক বৈচিত্র্যময় গল্পের দ্রষ্টা। সমকাল রাবেয়া খাতুনের মানসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ফলে তার অনুভবে আটকে পড়া জীবন সমাজের সাম্প্রতিক নানা সমস্যা নিয়ে ছোটগল্পে বেশ জীবন্ত রূপ লাভ করে। জীবনের আধুনিক রূপ নির্মাণেও তার যে উপস্থাপনা তাও প্রশংসনীয়। রাবেয়া খাতুন তার গল্পের বিষয় বিবৃতিতে দীর্ঘ বর্ণনা ও দীর্ঘ বিশ্লেষণে অভ্যস্ত। এই প্রবণতা গল্পের রস আহরণে পাঠককে কখনও কখনও বেশ বিড়ম্বিত করে। রাবেয়া খাতুনের ‘মালতীর বাবা’ গল্পে জীবন মৃত্যুর দোলায়িত পটভূমিতে আমাদের নিবিত্ত সমাজের একটি পারিবারিক সুখ-দুঃখের কথা গল্পরূপ পেয়েছে। সেই বহুকাল আগে আবু মিয়া তার স্ত্রী কন্যা নিয়ে একটি সুখের সংসার গড়ে নিয়েছিল। সে সিনেমা হলে গেট কিপারের কাজ করতো। তারপর তার মেয়ে লতিফার জন্ম হল। জন্মের পরপরই বাবার মুখে লতিফা হয়ে গেলো মা-লতি অর্থাৎ মালতী। কাজেই দুটো নাম নিয়েই ছোট্ট মেয়েটি আবুর সংসারে লালিত হতে থাকে। বাপ সিনেমা হলে চাকুরি করে, সুতরাং মেয়ে সিনেমার নায়িকদের মতো আধুনিক চালচলনে অভ্যস্ত না হয়ে পারে না। কিশোরী লতিফা শহরের আধুনিকতার নানা দিকের রোশনাই ছড়িয়ে তরতাজা লাউয়ের ডগার মতো বেড়ে ওঠে। বাপের হল ঘরে প্রায়ই সিনেমা দেখে। সেদিনও দেখছিলো দুর্ভাগ্য আবুর। বাক্সবন্দী হলের ভিতর সিগারেটের আগুন লতিফার শাড়িতে লেগে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। লতিফাকে,- “মালিকদের মোটরে করে মিটফোর্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সব শেষ ততক্ষণে। সারা পথ ছট ফট করে এমারজেন্সির দরজায় পৌঁছাতে না পৌঁছুতে চলে গেলো লতিফা।”

বর্ণনা-প্রধান এই গল্পে লেখিকা আবু মিয়ার মেয়ে লতিফার করুণ মৃত্যুতে কাহিনিতে ট্রাজেডির স্পর্শ আনার চেষ্ঠা করেছেন; কিন্তু তিনি মূল বিষয়টিকে ছাড়িয়ে অনেক অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করেছেন এই গল্পে; এবং সেসব বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে নিজেই প্রায় বাচাল হয়ে পড়েছেন। স্মৃতিচারণায় পুরোনো ঢাকার এককালের সিনেমা পাড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও লেখিকার অতিকথন দোষ তাকে জঞ্জালমুক্ত রাখতে পারেনি। ফলে গল্পটি শিল্পসৃষ্টির কোনও মূল্যবান নিদর্শন নয়।

রাবেয়া খাতুন মুক্তিযুদ্ধের উপর বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। ইয়ামীনের খোঁজে’ গল্পে একজন মুক্তিযোদ্ধার মনের নীরব যন্ত্রণার কথা শুনিয়েছেন তিনি। লেখিকা সরকারি কাজে মফঃস্বলে যান। সেখানে তিনি তাঁর খুব পরিচিত ইয়ামীনের সন্ধান করেন। একজন বলল ইয়ামীন মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছে। কখন সে মারা গেল বে ব্যাপারে কোন গুরুত্ব না দিয়ে তিনি ইয়ামীনের কর্মক্ষমতার কথা ভাবেন। চিন্তায় এবং দক্ষতায় এক অচিন্ত্যনীয় কর্মক্ষম ব্যক্তি ছিল ইয়ামীন। সত্তুরের শুরুতে “বাঙ্গালী চৈতন্য নানা ক্ষোভে ক্ষুব্ধ । একাত্তুর এলা অন্যভাবে। বাহাত্তুর মোর ঘুরিয়ে দিলো জনজীবনের।” দেশের অগনিত দুর্দশা আর অরাজকতার বদ্ধ আবহাওয়ায় আসলে ইয়ামীনের মত শুদ্ধচেত্তের লোকেরা টিকতে পারে না।চমৎকার জীবনঘনিষ্ঠ গল্প ‘সাকিন কেললা লালবাগ’। বাদশাহী আমলের স্মৃতিবাহী ঢাকার এই অঞ্চল এখন আঁস্তাকুড়ের জঞ্জাল যত ছোটলোক অপাংক্তেয়রা আজকাল এ অঞ্চলের অধিবাসী।

লেখিকা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আঁস্তাকুড়ের এসব জঞ্জালদের জীবনের নানা প্রসঙ্গের কথা বলেছেন এই গল্পে। কলকাতার ঝগড়া, ফেরিওয়ালার সঙ্গে বচসা- এসব তো এখানকার নিত্য দিনের ব্যাপার। রহম আলীর স্ত্রী লিলি অর্থাৎ মুন্নীর মা চিরকালের ঝগড়াটে এক নারী। সামান্য কথায় সে পাড়া জাগানো চিৎকার শুরু করে দেয়। সবাই তার ভয়ে তঠস্থ। কিন্তু লিলির মনের দুঃখ কেউ বুঝলো না। গভীর রাতে যখন পাড়াঠন ঝিমিয়ে পড়ে তখন লিলির কানাকাতর দেহ পুরুষসঙ্গ পাওয়ার জন্যে উতলা হয়ে ওঠে; অথচ তার এখন,-“শারীরিক সম্পর্ক বলতে কিছুই নেই স্বামীর সঙ্গে। জটিল যৌনরোগে ভুগছে রহম আলী। স্ত্রী সান্নিধ্যে এলেই অস্থির হয়ে যায়। মৃগী রোগীর মত হয় চোখ মুখের অবস্থা।” এমনি অবস্থায় লিলির মনের খবর পেয়ে তার শরীরের গন্ধে পাগলপারা গয় কিসমত। ঘরে জোয়ান বউ রেখে সে গভীর রাতেলিলির কামজর্জর দেহের সুধা ভোগের তাড়নায় ওঁত পেতে থাকে। লিলি ভাবে, তার শরীরের জ্বালা নিবানোর জন্যে আজকের রাতেও কিসমত ওঁত পেতে আছে কিনা। জীবনের অনিবার্য চাহিদাগুলো সমস্ত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও চরিতার্ধ হওয়ার অবকাশ খোঁজে। সাকিন কেললা লালবাগ’ গল্পে অসাধারণ দক্ষতায় লেখিকা জীবনের সেই অনড় চাহিদা নিবৃত্তির বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেছেন। গল্পটি রাবেয়া খাতুনের সৃজনশীল শিল্প চৈতন্যের এক চমৎকার অভিব্যক্তি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জীবনের নানা দিক থেকে বঞ্চিত উদভ্রান্ত যুবকদের সৃষ্টি-বিনাশী জীবনাচরনের প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা হয়েছে রাবেয়া খাতুনের ‘গতিমুখ’ গল্প। অভাব অনটনে জর্জরিত বাংলাদেশের সমাজজীবনে জীবনধারনের কোন সুস্থ উপায় খুঁজে না পেয়ে ভদ্র পরিবারের অনেক উজ্জ্বল সম্ভাবনার ছেলেরাও নিরূপায় হয়ে বয়ে যেতে বাধ্য হয়। কেননা চোখের সামনে তারা দেখতে পায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা মরতে পারছে ন, স্বেচ্ছামৃত্যু সম্ভব নয় বলেই সে পথে পা বাড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য যুবকদের মত তাদেরও তো সমাজে টিকে থাকতে হচ্ছে। তাই বেঁচে থাকার জন্যে বেলাল তার প্রেমিকা শিমুলকি হারিয়ে ফেলে ছোরা হাতে হাইজ্যাক করার পরিকল্পনা করে। কেননা সমস্যার চাপে জর্জরিত হয়ে ‘টেনশনে ভুগছে গোটা দেশ’। তবু এক টুকরো ভালোবাসরর ছবি বেলালের মনে তার স্নেহময়ী মা আর ভাই বোনদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

উপন্যাস, ছোটগল্প ছাড়াও রাবেয়া খাতুনের পদচারণা রয়েছে শিশুতোষ রচনাতে। দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৬৭), সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮), লাল সবুজ পাথরের মানুষ (১৯৭৯), তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৯৮১)। দেশপ্রেমিক এই লেখিকা ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৯৮০ সালে লাভ করেন লেখিকা সংঘ পুরস্কার। রাবেয়া খাতুন তার লেখনীতে জীবনের যে ছবি অঙ্কন করেছেন, তাতে আমদের দেশের নানা সমস্যায় জর্জরিত মানবজীবন উজ্জ্বল রেখায় ফুটে উঠেছে।

[ad#co-1]