সরকারের এক বছর পূর্তির সাফল্য

জয়নাল আবেদীন
গত বছর ৬ জানুয়ারি বর্তমান সরকার শপথগ্রহণ করে। প্রথম কর্মদিবস ছিল ৭ জানুয়ারি। গত বছরের আমার ব্যক্তিগত ডায়েরির ৭ জানুয়ারির পাতায় এ সম্পর্কে শিখেছিলাম ‘নবগঠিত মন্ত্রিসভার আজ প্রথম কর্মদিবস। ৭ (৭) হলো সৌভাগ্যের প্রতীক। মঙ্গলবারে গঠিত ও সৌভাগ্যের প্রতীক লাকি ৭-এ কর্মদিবস_ আশা করি মন্ত্রিসভা জাতির জন্য ভাল কিছু করতে সক্ষম হবে।’

আমার আশা অনেকটাই পূর্ণ করেছে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ। প্রথমে বলতে হয় কৃষি নিয়ে। ভর্তুকি দিয়ে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইএমএফকে ভর্তুকির ব্যাপারে নাক না গলাতে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন আমাদের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১৯৭৫ সালের পরে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফের অঙ্গুলি নির্দেশে আমাদের নতজানু সরকার কৃষি-অর্থনীতির নীতিমালা প্রণয়ন করত। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আওয়ামী লীগ পরিচালিত অতীত ও বর্তমান সরকার। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে চাননি। কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে ও কৃষিঋণ সহজলভ্য করে সরকার যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। এর পরেই আসে শিক্ষা। শিক্ষামন্ত্রী সময়োপযোগী একটি শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিয়েছেন। আগের সরকারগুলো শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, কমিশন গঠন করেছেন; কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকারই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছে। মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা সনাতনী ব্যবস্থায় ছিল শুধু আরবি শিখে মিলাদ ও জানাজা পড়িয়ে জীবিকা অর্জনের উপায়। বর্তমান শিক্ষানীতিতে আরবির সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, অংক ও কম্পিউটারে জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে একজন মাদ্রাসা পাস ছাত্র শুধু মিলাদ, জানাজা পড়িয়ে জীবিকা অর্জনের পরিবর্তে সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাবে। শিক্ষানীতির আলোকে প্রথমবারের মতো পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা গ্রহণ খুবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে ছোট শিক্ষার্থীরা খুবই খুশি। টিভি ক্যামেরায় ২ আঙ্গুলের ভি (ঠ) চিহ্ন দেখানোতে তাদের আনন্দই প্রকাশ পেয়েছে। এর পরে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো নতুন বই পেঁৗছানো বড় কাজ হয়েছে। সরকার গঠনের ১ মাস ২০ দিনের মাথায় পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ঠা-া মাথায় সামাল দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে।

এত বড় দুর্ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে অতীতে কখনও ঘটেনি। ঠা-া মাথায় বিদ্রোহী বিডিআর জওয়ানরা প্রায় অর্ধশত মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে শেখ হাসিনার ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রনায়কের তুল্য। তিনি নরম-গরম বক্তৃতা দিয়ে উভয়কূল সামাল দিয়েছেন। পরে সেনাকুঞ্জে সেনাকর্মকর্তাদের মনের কথা, নানা প্রশ্ন ধৈর্য ধরে শুনে দ্বিতীয়বার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। বিডিআর বিদ্রোহের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে জাতি বিশ্বাস করে।

এছাড়াও জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের হত্যার বিচার সমাপ্ত করে খুনিদের ফাঁসি কার্যকর করার পদক্ষেপে রাজনৈতিক হত্যাকা- আর ঘটবে না বলে ধারণা করি।

সর্বোপরি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত, গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া যেন কোনভাবেই ব্যাহত না হয় সেদিকে সরকারের তীক্ষ্ন নজর রয়েছে। বর্তমান সরকারের কোন মন্ত্রী ও দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার দুর্নীতির খবর এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-এমপিদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন। দুর্নীতি সর্বদা উপর দিক থেকে প্রসারিত হয়। প্রধানমন্ত্রী, তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন দুর্নীতিমুক্ত তাই এর প্রভাব মন্ত্রিপরিষদ ও এমপিদের ওপরও পড়বে।
গত বিএনপি-জামায়াত আমলে সরকারের বিকল্প ‘হাওয়া ভবন’ গড়ে উঠেছিল। বর্তমান আমলে এমনটি ঘটেনি। শুধু দু-এক স্থানে ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়াবাড়ির খবর পত্রিকায় এসেছে। যা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। মোটা ভাত, মোটা কাপড় ও রাতে শান্তিতে ঘুমানো ছাড়া বেশি মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আশা করি সরকার এ সামান্য প্রত্যাশা পূরণে অবশিষ্ট চার বছর আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

[ad#co-1]