মধ্য ডিসেম্বর_উনিশ শ একাত্তর

রাবেয়া খাতুন
বম্বিং হচ্ছে। বিকট শব্দ। এবং কিছুক্ষণ পর পর। কোনদিকে কোথায় দেখার অবকাশ নেই। আমরা ছুটছি। বলতে গেলে ছোট একটি দল। আমরা পাঁচজন। সুফিয়ারা ছ’জন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরো কিছু লোক। যাদের চিনি না, কিন্তু বুঝি বাঙালি। পাকিস্তানিরা বর্বর প্রথার বুড়িগঙ্গা ও আশপাশের গ্রামে বোমা মারছে। আমরা কখনো বিরাট গাছতলা কিংবা পরিত্যক্ত ভিটায় আশ্রয় নিচ্ছি। তখনি মনে পড়ছে আজ সকালটা। কোনোমতে নাশতা সেরে বেরিয়েছি। আমাদের মতো অনেকেই সামান্য মালসামানসহ রিকশায় ছুটেছে বুড়িগঙ্গার দিকে। উদ্দেশ্য গ্রাম। দুই পাশের রাস্তায় বিচ্ছিন্নভাবে আমুদে দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে বিহারি এবং উর্দুওয়ালারা। তাদের মুখে বিদ্রূপ ও টিটকারি। বোমার ভয়ে আমরা পালাচ্ছি। সদরঘাটে নামার উপায় নেই। ভিড় আর ভিড়। পানির ওপর নৌকায় মানুষ। নিচে ভাসন্ত লাশ। বাদামতলীর দিক থেকে ছৈহীন একমালাইতে উঠেছি আমরা। সঙ্গের টাকা-পয়সা নিরাপদ করেছি কোরআন শরিফের ভেতরে রেখে। গহনাগুলো পেট-কোমরের থলিতে। খাবার যা সঙ্গে এনেছি তাও রেখেছি লুকিয়ে।

নৌকা এগোচ্ছিল পুব দিকে। কিছু দূর গিয়েই মুখ ঘোরাতে হলো। পুবে কোনো অবকাশ নেই। দাউ দাউ করছে শুধু আগুন। ঘুরতিপথে এগিয়েও লাভ হলো না। পাইনার খাল বলে ডিসেম্বরে দুর্বল একটি চোরাপথে নৌকা ঢুকেছে। হায়রে সেখানেও থেকে থেকে লাশ। পাকিস্তানি সৈন্যরা একই খুঁটিতে দশ-বারোজনকে বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। কোথাও গেরস্তের ঘাটে ভাঙা কলসিসহ উপুড় হয়ে পড়ে জননী ও শিশু। ভেতরের দিক থেকে চাপা আর্তনাদ ভেসে আসছে। গত হ্নায় জিনজিরা, রোহিতপুর আক্রান্ত হয়েছিল পাকবাহিনীর বিষাক্ত ছোবলে। আমরা থাকতাম বাসাবোর তিনতলা এক ফ্ল্যাটে। আগুন দেখেছি। আর্তনাদ আন্দাজ করেছি। প্রায় প্রতিদিন ডিসেম্বরের শুরু থেকে। বাড়ির কর্তা বেরিয়ে আর ফেরেনি। কোনো বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে তরুণী কন্যাদের। বাসাবো তখন শহরের বাইরের অংশ। স্থানীয়জনেরা বলত, ‘ঢাকা যাই’। ভেতরের দিকেও বটে। খানসেনারা সহজে ঢুকতে চাইত না। মুখে রুমাল বাঁধা কিছু আলবদর, রাজাকার, আলশামস তাদের পথ দেখাত। পাড়ার খবরাখবর দিত। জলপাই রঙের জিপ এসে দাঁড়াত যে বাড়ির দোরগোড়ায় সেখান থেকে মাতম উঠত। অবিরাম গুলি, যখন তখন কারফিউ। আমরা সহজে কেউ লাইট জ্বালাতাম না। মোমের আলো, হ্যারিকেন নিরাপদ মনে করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে হলে ট্রানজিস্টর কাঁথা দিয়ে ঘেরাও করে লো ভলিউমে চালাতাম। টিভি, সংবাদপত্র বলতে গেলে অচ্ছুৎ হয়েছিল। বাজার-হাটও প্রতিদিন বসত না। কদমতলীর অপারেশনের পর খানসেনারা বেশ ভয় পেত। সন্ধ্যার পর পাবলিক বাসে করে এলাকায় ঢুকত। রাজাকারদের সহযোগিতায় ধরপাকড়, লুট চালাত। একমাত্র আজানের সময় ছাড়া ফাঁকা গুলির আওয়াজ চলত মুড়ি-মুড়কির মতো।

গত কয়েক মাসে এর মধ্যেও পাড়ার ছেলেরা যুদ্ধে গেছে। তাদের জন্য অন্য একটি দল বাড়ি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করছে কাপড়, কম্বল, হাতে বোনা সোয়েটার, মোজা, মাফলার। বাঙালিদের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ। চারদিকে বিভীষিকা। যারা চাকরি-বাকরি করত তারাও আতঙ্কিত থাকত। কখন কোন ছুতোয় ক্যান্টনমেন্ট চালান হয়ে যাবে।
জীবিকার জন্য আমাকে মাঝে মাঝেই বেরোতে হতো। সাগরের আব্বা ওপারে চলে গিয়েছিল যুদ্ধের শুরুর দিকে। চার ছেলেমেয়ে সাগর, কেকা, প্রবাল, কাকলীকে নিয়ে আমি ছিলাম ছোটবোন সুফিয়ার বাসায়। ওর বর ব্যাংকার ছিল। ছোটখাটো বিপদ ওর ওপর দিয়েও গেছে। নেহাত বাসাটা বড়। সম্ভবত সেই কারণে হামলার শিকার হতে হয়নি। তবু আকবর বেরোনোর সময় সুফিয়া সূরা পড়ে ফুঁ দিয়ে দিত। কদমতলী আক্রান্ত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে আশ্রয় নিয়েছিল পাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে। এদের পরিচয় ছিল পরিবারের ছেলে ভাই বা হাউস টিউটর। আমাদের বাসায় দু’একজন এসেছিল। এরা কোথাও দু’এক রাতের বেশি এক জায়গায় কাটাত না। দোতলার এক পোয়াতি মেয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বামী পরিচয় দিয়ে ভয়ঙ্কর দানবের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। গুলিস্তানের পেছনের ফাঁকা জমিতে তখন বসত দেশি কাপড়ের অসংখ্য দোকান। মুক্তিরা সেখানেই ছদ্মবেশী থাকত। কেউ কেউ রিকশা চালাত। কারো কারো কথাবার্তায় যেন টের পেতাম। কেননা আমাকে প্রায়ই বেরোতে হতো। দৈনিক পত্রিকাগুলোর অবস্থা তখন খুবই কাহিল। সাজানো সংবাদে ভরা কাগজ কেউ রাখত না। স্টাফদের বেতন অনিয়মিত ছিল। সাংবাদিকরাও। যেতাম কখনো দৈনিক বাংলায়। দেখা হতো আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। আহসান হাবীবের রুমে বসতাম। খুব দুঃখ করত, লেখকদের পাওনা দিতে পারছে না বলে। তখন লেখার বিষয় ছিল প্রেম, গ্রামজ কাহিনী, পরিবার পরিকল্পনা। আহসান হাবীব বলতেন, তোমরা লিখো না। আমি যেমন করে হোক ম্যানেজ করে নেব।

চিত্রালীর এস এম পারভেজ শুধু বলত, আমার এখানে মাসে দু-একটা গল্প দেবেন। পেমেন্ট দিতে পারব।
আসল রোজগারটা ছিল আমেরিকান অ্যামবাসিতে। সেটা ছিল প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে। ওখানেই দেখা হতো কিছু সাহিত্যিক এবং বেতার-টিভির লোকের সঙ্গে। নাট্য বিভাগের খোন্দকার রফিকুল হক এদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন। আমাকে দিতেন ছোটগল্পের কালেকশন। সেগুলো থেকে অনুবাদ করে নাট্যরূপ দিতাম। পনেরো মিনিট কিংবা আধঘণ্টার নাটক, পেমেন্ট ভালো।

সেসব গল্প, যেটা থাকত আমেরিকার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ওপর। এমনিতেই ৯টার পর পাড়া নীরব, আলোহীন হয়ে যেত। শব্দের মধ্যে শুধু থেমে থেকে গুলির আওয়াজ। কুকুরের আত্দঘাতী করুণ আর্তনাদ আর আচমকা পাখিদের ঝাঁক বেঁধে আকাশে উড়ে যাওয়া। বলতে গেলে ভয়ঙ্কর ভুতুড়ে আতঙ্কিত রাত্রি। সেই সময় আমি মোমের আলো আড়াল করে লিখছি অপর দেশের গৃহযুদ্ধ। অদ্ভুত নিশি জাগরণ। আরো অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির জগৎ।

এই সময় পাড়ার গৃহবধূদের কেউ কেউ আসত পেট, কোমরে অলঙ্কার লুকিয়ে। উদ্দেশ্য বিক্রি। মাত্র পঞ্চাশ টাকা ভরি। যুদ্ধের আগে সোনা ছিল একশ’ বিশ টাকা। এখন পঞ্চাশেও কেউ নিতে চাচ্ছে না। নগদ টাকা যার ঘরে আছে, তা দিয়ে যদ্দিন চলে। যুদ্ধকাল কদ্দিন থাকবে কেউ বলতে পারে না। কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচার চেষ্টা। অত দুঃখেও হাসি পেত_কে কার সোনা কিনবে। সবার ঘরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কারো ঘরে নিদারুণ হাহাকার। গত রাতে হয়তো সে বাড়ির ছেলেটি কাউকে না বলে যুদ্ধে চলে গেছে। পরিবারের জন্য ডবল শোক। প্রচণ্ড কান্নায় মা ভেঙে পড়লে অন্য সন্তানরা সতর্ক করে। খানসেনারা যদি কান্নার শব্দ শোনে সর্বনাশের শেষ থাকবে না। বাড়ির সবাইকে সেই অপরাধে তুলে নিয়ে যাবে ক্যান্টনমেন্টে।

বাজারঘাটে সহজে কেউ যেত না। সেখানেও ধরাধরি হতো, জিজ্ঞাসাবাদ চলত। বাঙালি পুলিশরা তখন বিরাট এক ভূমিকা পালন করেছে। কিশোররা তরুণদের শিখিয়ে দিতো, ধরলে সোজা উত্তর দেবে স্কুল বা কলেজে যাচ্ছি।
বিশ্বের চোখে ধাপ্পা দেওয়ার নানা ছলনার একটা জোর করে স্কুল চালানো, দোকানপাট খোলা। বাজারগুলো সচল রাখা। চালের মণ চলি্লশে ছিল, বছরের শেষের দিকে পঞ্চাশে উঠেছে। তবু পাঁচ-ছয় টাকার বাজারে মধ্যবিত্ত গেরস্তের ভালোই চলত। খাসির গোস্ত আড়াই টাকা, একটা মুরগি পাঁচ সিকে, একটা ইলিশ ওই রকমই দাম। আকবরের ভাইপো আক্তার মাঝে মাঝে তবু খালি ডুলায় ফিরে আসত। ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে শতটুকরো লাশ। কর্ম কাদের সবাই জানে, তবু ধরাধরি চলছে দোকানদারদের, পথিকদের।

শ্বাসরুদ্ধকর নাগরিক জীবন। এর মধ্যে শোনা যাচ্ছিল মার্কিন আণবিক যুদ্ধ রণতরী বহর এন্টারপ্রাইজ ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে। চীন তো পাকিস্তানিদের সাহায্য করছিলই। এদের নিয়েও নানামুখী গুঞ্জন।

গেরিলাযুদ্ধ, ভারতের সহযোগিতা বুকের ভেতর বাতি জ্বালায়; কিন্তু নগরবন্দী মানুষের জন্য নিত্যনতুন প্রহসন। ডিসেম্বরের পয়লা তারিখে মাইকে মাইকে ঘোষিত হলো যেসব এলাকায় বোমা ফাটবে, তার কাছাকাছি বাস করা লোকদের কাছ থেকে পিটুনি কর আদায় হবে। বাঙালি বিহারির অসম লড়াইয়ের খবর আসছে। ব্ল্যাকআউটের রাত নয়, তবু কারফিউ। তার ভেতর বোমা ফোটে। ছলে বলে নিরপরাধ লোকদের ধরে নিয়ে যায়। তিন তারিখ সন্ধ্যাবেলা ইন্দিরা গান্ধী বক্তৃতা দিয়েছেন। নাড়াচাড়া পড়েছে নতুন করে বিশ্ববিবেকে। জুলুমবাজ পাকিস্তানি সরকার প্রাক্তন এয়ারফোর্স কর্মীদের ডেকে পাঠিয়েছে। আকবর একসময় এয়ারফোর্সে ছিল। সাড়া না দিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। দেশে পালানোর কথা ভাবা হচ্ছে তাই।

রাত বারোটার পর প্লেনের শব্দ। শেলিংয়ের আওয়াজ। পুরনো এয়ারপোর্টের দিকে অবিরাম ঝরছে আগুনের গোলা। ঢাকা তখন হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে শোভিত নয়। তিনতলার জানালা থেকে পুরো পরিবার গোলাগুলি দেখি। তাহলে ভারতীয় বিমান, নৌ অ্যাকশন এবং বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ কমান্ডের দুর্বার আক্রমণ সত্যি শুরু হলো। সারারাত চলল ঢাকা বিমানবন্দর ও কুর্মিটোলা সৈন্য ঘাঁটি আক্রমণ।

চার তারিখ এক অবর্ণনীয় অলৌকিক সকাল। কুমিল্লার দিক থেকে বীর ভঙ্গিতে উড়ে এলো কিছু প্লেন। কী দুর্দান্ত সাহস! প্রকাশ্যে দিনের আলোয় বম্বিং করছে। পাইলট দুই বাঙালি যুবক। নগরবাসী কেউ ঘরে নেই। রাজপথ, ছাদ থেকে যে যা পারছে ওড়াচ্ছে আকাশের দিকে। চিৎকার করছে, পিটুনি ট্যাক্স আদায় কর। কোথায় গেলি শালারা।
ওদিকে আমেরিকার বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসেছে। যুদ্ধবিরতির মার্কিন প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় সোভিয়েত রাশিয়ার ভেটো প্রদানে। ঢাকার আকাশে চলছে বিজয়ী বিমানের ডিগবাজি খেলা। উল্লাসে নাওয়া-খাওয়া ভুলেছে নগরবাসী। আমাদের জিনিসপত্র বাঁধা-ছাদা হয়ে গেছে। ঘরের প্রতিটি জিনিস, বইপত্র, রেডিও, টিভি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছি। আর হয়তো ছোঁয়া হবে না। পাল্টে যাবে ঢাকার নাকনকশা। কদ্দিন গ্রামের বাড়ি থাকা হবে কে জানে?

বোমা পড়া তখনো চলছে। ক্লান্ত আমরা আশ্রয় নিয়েছি এক গেরস্তের বাইরের বারান্দায়। সেখানে মুড়ি ভাজা চলছে। আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত। কোন ভোরে বেরিয়েছি দুটো রুটি খেয়ে। ওরা মুড়ি দেবে কয়জনকে। আরো ছোট ছোট দল এসে বসেছে। ক্লান্তিতে কেউ কেউ মাটিতে শুয়ে পড়েছে। আমাদের সঙ্গে খাবার ছিল এক টিফিন ক্যারিয়ার। সুফিয়া ডালে চালে কাঁচা তরকারিতে একটা লাবড়া মার্কা খাবার তৈরি করেছিল। তাও খোলা যাচ্ছে না। এত মানুষ, কাকে রেখে কাকে দেব। ক্ষুধা পেটে আবার হাঁটা। বোমা তখন পড়ছে না। চাষিরা মাঠে নেমেছে। পৌষ মাস। মাঘী সরষে ভরা ক্ষেত। হালকা হলদে ফুলে ফুলে সয়লাব। গোল আলুর ক্ষেত ঘন সবুজে ভরা। ধুলা উড়ছে। বড় গাছপালার পাতা ধূলায় ধূসরিত। অবশেষে বিকেলে এসে দাঁড়ালাম ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে। নৌকা হাতে গোনা। যে যেটা পারছে নিয়ে যাচ্ছে। ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ। মাঝিদের বক্তব্য, আমাদের রোজগারপাতি নাই। ভাত নাই। আছে খালি কান্দন আর কান্দন।

বড় একটা নৌকা পাওয়া গেল দশ টাকা ভাড়ায়। তাও বাড়ি পর্যন্ত যাবে না। সূর্য চলে গেলে সেও তার আরোহীদের নামিয়ে দেবে। নইলে বাড়ির মানুষরা ভয়ে ভুগবে। মাঝ ধলেশ্বরীতে সুফিয়া খাবার খুলে জনে জনে ভাগ করে দিল। পেট ভরল না। তবে শান্ত হলো। গ্লাসভর্তি নদীর ঠাণ্ডা পানি পান করে।

সেই যে মুড়িভাজা বাড়ি, সেখানে দলের ভেতর কারা যেন বলছিল, এরপর ফন্দিবাজ খানসেনারা ব্যারাকে থাকবে না। পাড়ায় পাড়ায় ঘুসে যাবে। মুক্তি ভাইয়েরা ম্যাপ দেখে দেখে বোমা ফেলছে। তখন তারা বিপদে পড়বে।
কেউ বলছিল, বজ্জাতের বাচ্চাগুলো শুনিছি এর মধ্যেও আরো একটা কিলিংয়ের ব্যবস্থা করছে।

পাক শত্রুর চেয়ে ভয়ঙ্কর এখন বাঙালি গাদ্দাররা। ওরা নদীনালা চিনত না। পানিতে পাঞ্জাবিদের দারুণ ভয়। ওই হারামিরা এখনো সাহস জোগাচ্ছে। দেশ যদি সত্যি স্বাধীন হয় এই শয়তানদের কী হাল হবে। ওপেন স্ট্রিটে ফাঁসি। না সবার সামনে জবাই? ওই যা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বেলা। কেউ কেউ তো চেহারা বদলেও রেহাই পায়নি। এরাও পাবে না। এই সময় মাঝি চিৎকার করে উঠল, হেই সাহেবরা ইবার আপনেগোরে নামন লাগব।

বলে কী! ঘাটবাট নয় জঙ্গলের মতো একটা জায়গা। মাঝি বলছে সেখানে নামতে হবে।

আমরা অনুরোধ করলাম আরো খানিকটা এগিয়ে যেতে।

মাঝি মাথা নাড়ল, আমি তো আগেই কয়া লইছিলাম। আন্ধার গাংগে নাও চালাইতে পারুম না। পরিবারের নিষেধ আছে। সায়ম বেলা শেষ হয়ে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। ছৈয়ের তলায় ছোটরা ঘুমিয়েও গেছে। জোর করে ওঠানো হলো। খাড়া পাড়। কাদা-জংলা বিরূপ সামনের পথ। পথ কোথায়? চষা ক্ষেত। কোথাও কাটা ধানের গোড়া। রক্ষা চাঁদের আলো ছিল। ফিকে জোছনায় ক্ষেতের আল ধরে সার বেঁধে সবাই চলছি।

শুনেছি এদিকটা মুক্ত হয়ে গেছে দিন পনেরো আগে। পাহারাদার হয়েছে মুক্তি সেনারা। পরিচয় দিয়ে ছাড়া পাওয়া। ঘন গাছের তলায় বা দেয়ালের আড়ালে সজাগ হয়ে সারারাত জাগত তারা।

লম্বা-চওড়া, সর্বাঙ্গ কম্বলে মোড়া একজন পথরোধ করে দাঁড়াল। কম্বলের আড়াল থেকে বেরোলো রাইফেল_কে যায়?

স্বর বেশ কর্কশ। তবু আকবর চিনল। ওর ভাগ্নে কোহিনূর। কোহিনূর বলল, মামা শহর থেকে নানা কিসিমের লোক আসছে। দুশমনের বাচ্চাগুলোও গোঁফ কেটে পালানোর চেষ্টা করছে।

ও আমাদের কিছু পথ এগিয়ে আবার ফিরে গেল পাহারায়।

শিশিরে ভেজা পথ। দুরন্ত শীত। নেশার ঘোরে তবু রাস্তা চলা। এবং রাত দুটোয় গোবিন্দপুর পেঁৗছানো।
ওদের বাড়িটা একতলা, সিঁড়িওয়ালা। ছাদ থেকে ধলেশ্বরী দেখা যায়। দেখা যায় আগুনের ঝলক। ভিটেমাটি কাঁপে। বাড়ির পাশ দিয়ে প্রতিদিন গ্রামে ফেরা লোকজন যায়। তাদের ডেকে ঢাকার খবর শোনা হয়। কেকা সারাপথ বয়ে এনেছে ঢাউস সাইজের একটা রেডিও কাম ট্রানজিস্টর। খবরের টাইমে সবাই এক জায়গায়। সাগর ছোটাছুটি করে আশপাশের গ্রামগুলোতে। সেখানে মুক্তিসেনারা আসে। বক্তৃতা করে। প্রবাল পাঠশালায় পড়ায়। কাকলীর সময় কাটে খেলাধুলায়।

এলো পনেরোই ডিসেম্বর। দারুণ উত্তেজনা ষোলো তারিখ নিয়ে। সন্ধ্যায় খবর এলো। বিবিসি থেকে জানা গেল পাকিস্তানের পক্ষে নিয়াজী আত্দসমর্পণ করেছে। জগজিৎ সিং অরোরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে। রেসকোর্সে বিপুল জনপ্রবাহকে সামনে রেখে। নিঝুম গ্রাম গমগম হয়ে ওঠে। ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে। টিন পিটিয়ে মিছিল বের হয়। খোঁয়াড় থেকে ধরা হয় মুরগি। শিকা থেকে নামে কালিজিরা চাল। ঘরে করা ঘি। সারা পল্লীর বাতাসে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু ছেলেমেয়েদের সমবেত সংগীত ছাড়া_আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।…

লেখক : কথাসাহিত্যিক

[ad#co-1]