ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী
কালের কণ্ঠ : দুই দেশের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের বিষয়টি কোন পর্যায়ে আছে?
পিআরসি: হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখানে এসে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমি হস্তান্তর এবং সীমানা নির্ধারণ_এই তিনটি সমস্যা ঝুলে আছে। প্রথমে যৌথ সফর করলাম সীমান্ত এলাকায়। স্থিতাবস্থা মেনে নিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। যা বাংলাদেশের কাছে আছে তা বাংলাদেশেরই থাক, আর ভারতের কাছে যা আছে তা ভারতের কাছে থাক। অনেক সময় তো পার হলো। আর কত? দুই পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে। নানা অজুহাতে দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সমস্যাটিকে জিইয়ে রেখেছেন। এরকম করলে তো আরও এক শ বছর লেগে যাবে। এখন সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে, রাজনৈতিক পর্যায়ে সমঝোতা। যেখানে সীমানা চিহ্নিত করা হয়নি, সেখানে যে-অবস্থায় আছে, সে-অবস্থাই থাকবে। এখানে কিছু দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার আছে। আমি তো মনে করি, এখানে বাংলাদেশের হারানোর কিছু নেই। কিছু হারাবে, কিছু অর্জন করবে। ছিটমহলের ব্যাপারে বিষয়টা পরিষ্কার। বাংলাদেশের দখলে যে-কয়টা ছিটমহল আছে, তা বাংলাদেশ পাবে। আর ভারতের দখলে যে-কয়টা আছে, তা ভারত নেবে।

অপদখলীয় জমির ব্যাপারে একটি সমস্যা আছে। এ জমিটা আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার সঙ্গে লাগানো। এ ক্ষেত্রে এখনো আমাদের সম্মত তালিকা নেই। যৌথ জরিপ করে সম্মত তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। চাষাবাদের জন্য দুই দেশের চাষিরাই যাতায়াত করে। বিডিআর-বিএসএফ তাদের যাতায়াত সুবিধা দেয়। জমির মালিকরা জমি ছাড়তে চায় না। তারা বলে, বাপদাদার জমি। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, এখানেও ভারতের দিকেরটা ভারতের এবং বাংলাদেশের দিকেরটা বাংলাদেশ পাবে। এ তিনটি বিষয়েই আমরা প্যাকেজ প্রস্তাব দিয়েছি। এখন দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

কালের কণ্ঠ : এ বিষয়টি দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনার জন্য তোলা হবে কি না?
পিআরসি: বিষয়টি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী জানেন। এবারের বৈঠকে বিষয়টি ওঠবে। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা একটি সমস্যা। আমাদের দিক থেকে সংসদের অনুমোদন আনতে হবে। এটা সমাধান সম্ভব।

পানির বিষয়ে তিস্তা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে গেছে। আমরা একটা সমাধানে পেঁৗছাতে পারব। এ বিষয় নিয়ে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা স্থবির হয়ে যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে চাপ দিতে হবে। তিস্তার ব্যাপারে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা করি। নদীর ব্যাপারে আরও সমস্যা আছে। সীমান্তবর্তী নদী যেমন: ইছামতির ড্রেজিং দরকার। এর ফান্ড কোথা থেকে আসবে, কিভাবে কাজটি হবে? তা ছাড়া পলি পড়ার কারণে নদীর মধ্যস্রোত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এতে সমস্যার সৃষ্টি করছে। এ জন্য নদী শাসন করতে হবে। একসঙ্গে কাজটা করতে হবে। ভাঙন যাতে দুদিক থেকে না-হয়, সে জন্য নদীর তীর সংরক্ষণ করতে হবে। আরও ছোটখাটো কিছু সমস্যা আছে। আমি তো মনে করি যেগুলো করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত করে ফেলা দরকার।

কালের কণ্ঠ : টিপাইমুখ নিয়ে এখানে একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে। বাংলাদেশকে কিছু না-জানিয়ে প্রকল্প করছেন বলে অভিযোগ আছে। আসলে কি হচ্ছে?
পিআরসি: টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে আমরা কোনো কিছুই লুকিয়ে করিনি। এ ব্যাপারে প্রথম প্রস্তাব আসে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের দিক থেকে। তাঁরা বলেছিলেন, বরাক-কুশিয়ারা অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিভাবে করবেন? তখন প্রস্তাব আসে, ওপরের দিকে পানি ধরে রাখার জলাধার করতে হবে। আর জলাধার ভারত ছাড়া হবে না। আরও অনেক গবেষণার পর টিপাইমুখ জায়গা ঠিক করা হয়। এখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ জলাধার হবে। একই সঙ্গে এখানে বিদ্যুৎ প্রকল্প করার চিন্তা আছে।

কালের কণ্ঠ: পানির সুষ্ঠু ব্যবহারে ত্রিদেশি কোনো প্রকল্প হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই এ বিষয়ে বলে আসছিলেন। পিআরসি: বাংলাদেশ যুক্ত হলে আমরা স্বাগত জানাব। আমরা তো এ খাতে বিনিয়োগ করছি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ করছে না। ইচ্ছা করলে করতে পারে। তাহলে বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। আমরা তো কোনো দিন মানা করিনি। বিদ্যুৎ তো দরকার। বাঁধের বিরুদ্ধে এখন বিরাট একটা লবি কাজ করছে। বিশ্বে তো ৫০ হাজারের মতো বাঁধ আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এখানেও হতে পারে।

কালের কণ্ঠ : সমুদ্রসীমা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমস্যা আছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
পিআরসি: এটা সমস্যা নয়। ইতিমধ্যেই এ নিয়ে তিন দফা বৈঠক হয়েছে। আমরা জাতিসংঘে আমাদের প্রস্তাব দিয়েছি। বাংলাদেশ সালিসের প্রস্তাব দিয়েছে। দুই পক্ষ এসংক্রান্ত সালিসগণের নাম দিয়েছে। দুই পক্ষ সম্মত হলে এ বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। একটা সমাধানে পেঁৗছাবে বলে আশা করি।

কালের কণ্ঠ : ট্রানজিট ইস্যু এলেই একটি পক্ষ নিরাপত্তার হুমকি হবে বলে মনে করছে। আপনারা বলছেন, ভারতকে ট্রানজিট দিলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ লাভবান হবে। নিরাপত্তার প্রশ্ন কেন উঠছে?
পিআরসি: এটা নিয়ে অপপ্রচার আছে। যারা দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক চায় না, তারা এ ধরনের অপপ্রচার করছে। এখন সেই যুগ শেষ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করছে। ট্রানজিট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা বাংলাদেশকে নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দেব। নিরাপত্তার প্রশ্ন কেন আসে? এটা একটা অজুহাত। জিনিসপত্র আসবে, এগুলো বাংলাদেশের ট্রাক অন্যত্র নিয়ে যাবে। রাস্তা ভালো না হলে ভালো করতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে। এতে চাকরির সুযোগ হবে। এটা কি খারাপ জিনিস? এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে? ট্রানজিটে সম্মত হলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশই লাভবান হবে। চট্টগ্রাম, মংলাবন্দর যদি ব্যবহার হয়, তাহলে অসুবিধা কি? চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনের কনটেইনারে মালামাল ভারতের অন্য অঞ্চলে নিয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন, আমরা নাকি কনটেইনারে করে অস্ত্র আনা-নেওয়া করব। কেন অস্ত্র আনা-নেওয়া হবে?

কালের কণ্ঠ: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ আছে। আপনারা এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন কি না?
পিআরসি: ৫০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে। রাস্তা খুব খারাপ। এত পণ্য পরিবহন হচ্ছে, অথচ রাস্তায় একটা ট্রাকের বেশি যাতায়াত করতে পারে না। কেন রাস্তার উন্নয়ন করা হচ্ছে না? অবকাঠামোর উন্নয়ন না হলে বাণিজ্য বাড়বে না। মিজোরামে রপ্তানির অনেক সুযোগ আছে। বাংলাদেশ এতে লাভবান হবে। আমরাও এটা চাই।

কালের কণ্ঠ : সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে দক্ষিণ এশিয়া আক্রান্ত। সার্ক সম্মেলনে বারবার সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? পিআরসি: আমার মনে হয়, সবারই চিন্তা করা উচিত, আমরা কি সন্ত্রাসকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে নেব। আমি আরেক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসকে কি একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করব? এটা যদি একটা দেশ ভাবে, আমি সন্ত্রাসকে আমার স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার করব, তখন সে কিন্তু আপনার হাতে থাকবে না। সে ছড়িয়ে পড়বে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে। সন্ত্রাসকে ব্যবহার করে এখন আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে গেছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আরেকটা দেশের সঙ্গে যখন আলোচনা করছি তখন সন্ত্রাসকে ব্যবহার করব না। করলে আমাদের দুঃখ আছে। কাশ্মীরে সন্ত্রাস চলছেই। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ হয়ে গেছে। এটা সবাই বোঝে, সন্ত্রাসকে লালন-পালন করলে ভালো থাকা যায় না।

কালের কণ্ঠ : সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সংশয়ের কথা বলা হচ্ছে। নতুন জোট বিমসটেকের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী? পিআরসি: আমি যেখানে যাচ্ছি_থাইল্যান্ড, বিমসটেকের উদ্যোক্তা তারাই। সার্ক কখনো গতি হারায়, আবার গতি পায়। সার্কের সদস্য দেশগুলো না-চাইলে গতি পাবে না। বাণিজ্য ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়নি।

বিমসটেকে থাইল্যান্ড আছে। এর অন্য একটা সম্ভাবনার দিক আছে। আসিয়ানের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার একটা সেতুবন্ধন হতে পারে। বিমসটেকের একটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। আমরা একটা বড় বাজার পেতে পারি। ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য হতে পারে বিমসটেক দেশগুলোর মধ্যে। বাণিজ্য এখন যা আছে তার দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করেও এ অঞ্চলের দেশগুলো লাভবান হতে পারে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সইয়ের পর ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশকেও এ চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অনেকে বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুক্তবাণিজ্য লাভজনক হবে না। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার এর বিপক্ষ মতও আছে। তারা বলছে, ভারতের পণ্য তো এমনিতেই আসছে। চুক্তি হলেও আসবে। আবার বাংলাদেশ একটি বিশাল বাজার পাবে। জিনিসপত্রের দামও কমে যাবে। অবশ্য স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা ইতিমধ্যেই পাচ্ছে। মুক্তবাণিজ্য হলে আরও বেশি পাবে। কারণ তাতে নেতিবাচক তালিকা আরও ছোট হবে।

কালের কণ্ঠ: সন্ত্রাস দমন ইস্যুতে সার্কের দেশগুলো একসঙ্গে কিছু করতে পারে কি?
পিআরসি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস দমনে একসঙ্গে কাজ করতে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা মনে করি, আগে বিষয়টি দ্বিপক্ষীয়ভাবে হওয়া উচিত। ত্রিদেশীয়ও হতে পারে। বাংলাদেশি কোনো সন্ত্রাসী ভারতে যদি ধরা পড়ে, তাহলে তাকে ফেরত আনার ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয়ভাবেই উদ্যোগ নিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। কমিয়ে আনার জন্য কি পদক্ষেপ নেওয়া যায়? এ ব্যাপারে ভারতের মনোভাব কী? পিআরসি: বাণিজ্য ঘাটতি শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, অন্য দেশের সঙ্গেও আছে। কিন্তু ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিই বেশি আলোচনায় আসে। এটা প্রতিবেশী দেশ বলে হয়তো আলোচনাটা বেশি হয়। এখানে অভিযোগ করা হয়, অশুল্ক বাধা ভারতের দিক থেকে আছে। আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি, কাস্টমসের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হয়। এটা অশুল্ক বাধা নয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ধরুন, পণ্যের মানসংক্রান্ত লেবেল পণ্যের গায়ে থাকতে হবে। এটা ভারতে অত্যাবশ্যকীয়। এটা অনেকে অশুল্ক বাধা মনে করে। আমাদের আইন অনুযায়ী পণ্যটা মানসম্পন্ন কি না তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আমাদের দেশের প্রস্তুতকারকেরাও কিন্তু এ আইনের আওতায় পড়ছেন। আমাদের প্রস্তুতকারকদেরও ব্যুরো অফ স্টান্ডার্ড (বিআইএস) থেকে সনদ নিতে হয়। একইভাবে বিদেশি প্রস্তুতকারকদের নিতে হয়। সিমেন্টের একটা উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে। ভারতে সিমেন্টের ঘাটতি আছে। আমরা বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট কিনছি। এ ক্ষেত্রে একটি আইন আছে। তার সিমেন্ট মানসম্পন্ন হতে হবে এবং এ সংক্রান্ত সনদ নিতে হবে। বাংলাদেশের সিমেন্ট প্রস্তুতকারকেরা কিন্তু বিআইএস থেকে সনদ নিয়েই রপ্তানি করছেন।

তবে বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকেরা বলছেন, বিএসটিআইর সনদ গ্রহণ করুন। আমরা রাজি। তবে বিএসটিআইর পদ্ধতিগুলো আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব। তারা কিভাবে পণ্যের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, কী কী পরীক্ষা করে সেগুলো দেখব। আমাদের প্রতিনিধিদল এসেছিল। আমাদের প্রতিনিধিদল বলেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। এতে বাংলাদেশই লাভবান হবে।

আমরা তো বসে থাকতে পারতাম। কিন্তু না, আমরা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা বিএসটিআইর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে চাই।

কালের কণ্ঠ : দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য বড় দেশ হিসেবে ভারতের দিক থেকে আরও কী করতে পারে?
পিআরসি: বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকা খুব একটা বড় নয়। বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য আমার মতে, তিন-চারটা জিনিস করা যায়। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের ১০১টি পণ্যের একটি তালিকা দিয়েছে। সেখান থেকে আমরা প্রায় ৫০ ভাগ পণ্য নেতিবাচক তালিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছি। যাতে ওটা শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানি করা সম্ভব হয়। এখনো আমাদের নেতিবাচক তালিকায় ৪০০ পণ্য রয়েছে। আরও ছোট করার ব্যাপারে ভারত সম্মত, যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো সুবিধা পায়। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে আমরা আট মিলিয়নের কোটাব্যবস্থা বাংলাদেশকে দিয়েছি। কারণ ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরও টিকিয়ে রাখতে হবে। এটা শেষ হলে আবার বাড়ানো হবে। আমাদের কোটামুক্ত সুবিধার ক্ষেত্রে স্থানীয় শুল্ক আছে। ওটা সবাই দিচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি দিতে হয় না। অনেকে বলছে, স্থানীয় শুল্কও সরিয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশকে দিলে অন্যরা দাবি তুলবে। আমরা মনে করি, এ দাবিটা অযৌক্তিক।

কালের কণ্ঠ : আমরা দেখছি, বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ কি করতে পারে? এ ক্ষেত্রে আপনারা সরকারি পর্যায় থেকে সহযোগিতা করতে পারেন কি?
পিআরসি: ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য শিল্পাঞ্চল করতে পারে বাংলাদেশ। যৌথ বিনিয়োগও হতে পারে। এখানে জিনিসপত্র তৈরি করে ভারতীয় বাজারে সেগুলো রপ্তানি করা যেতে পারে। তাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। ভারতের বিশাল বাজার ধরার জন্য যা যা করা দরকার, তা করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি হচ্ছে কলকাতা পর্যন্ত। এই দৃষ্টিসীমা আরও বাড়াতে হবে। কিছু লোক চেন্নাইতে ব্যবসা করছে। এটা আরও বাড়াতে হবে। মুম্বাই, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোরসহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়তে হবে। ভারতের দক্ষিণে যে ক্রেতা আছে তারা যদি বাংলাদেশি পণ্য দেখতেই না পায়, তাহলে কিনবে কি করে? সে তো দেখবে। বাংলাদেশি পণ্য আছে। তামিলনাড়ুর একজন ক্রেতার জানতে হবে, বাংলাদেশি পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য প্রচার করতে হবে। এ জন্য ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রদর্শনী করতে পারে। তবে একটি কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের অর্থনীতি বিশাল। এতে আছে নানা বৈচিত্র্য এবং বিশাল বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সমান হবে, এটা চিন্তা করাই ঠিক হবে না।

আমি মনে করি, দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে পারলে চোরাচালান কমে আসবে। বৈধপথে বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বাড়বে। কনটেইনারে পণ্য পরিবহন বাড়াতে হবে। পণ্য পরিবহনে গতি আসবে না। সময়ও বেশি লাগবে। খরচ বেড়ে যাবে। এটা তো বিস্ময়কর ব্যাপার, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কনটেইনার সার্ভিস নেই। একটা কনটেইনার বুম্বে থেকে সিঙ্গাপুর যায়, তারপর এখানে আসে। এতে এক মাস লেগে যায়। সরাসরি এলে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। মংলাবন্দরের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাণিজ্য সুবিধা না বাড়ালে পণ্যের দাম কমবে না।

কালের কণ্ঠ : ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল বলেছেন, বড় দেশ হিসেবে ভারতেরই উচিত প্রতিবেশী দেশগুলোকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসা। আপনি কী মনে করেন?
পিআরসি: আমিও তাই মনে করি এবং ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোকে সহযোগিতা করতেই চায়। ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের সাত-আটজন সন্ত্রাসী ফেরত পাঠিয়েছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকে কোটা সুবিধা দিচ্ছে। এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে দেওয়া হয়নি। অন্য দেশের সঙ্গেও এটা করা হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : আপনি তো এখানে দুই দফায় ছিলেন। ফলে এ দেশ সম্পর্কে আপনার একটা ধারণা জন্মেছে। বংলাদেশ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? বাংলাদেশ কি এগোচ্ছে?
পিআরসি: বাংলাদেশে এসে একটা জিনিস সবাই লক্ষ করে। গরিব দেশ হতে পারে, আমরাও গরিব। কিন্তু কিছু করতে চায়। এটাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারলে খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক আশাব্যঞ্জক। আমি মনে করি, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। আর বিনিয়োগ দরকার। বাংলাদেশ গড়ে উঠছে। শিগগিরই বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াতে হবে।

কালের কণ্ঠ: আপনি এ দেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১/১১-এর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
পিআরসি: আমি যখন এলাম তার চার দিন পর এ রকম একটি ঘটনা ঘটল। এ ঘটনাটি পুরোপুরি এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং অভ্যন্তরীণ কারণেই ওই ঘটনার উদ্ভব হয়। আমি এর ভেতরে যেতে চাই না। তবে ভারত সরকার তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ভারত বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাবে। দুই দেশের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ট্রেন তখন চালু হলো। সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নয় বলে একটা ভালো জিনিস আমরা করব না, এটা আমাদের নীতি নয়। সে জন্য আমরা সহযোগিতা করেছি। একই সঙ্গে আমরা এটাও চাইনি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকুক। কারণ একটা অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য ক্ষমতায় এসেছিল। নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন হবে। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

আমি আগেও বলেছি, তখন ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের একটা ব্যাপার হয়েছিল। আমি বিস্তারিতভাবে কিছু বলছি না। তবে ওটা ছিল একটা দুর্বল উদ্যোগ। বাংলাদেশে এ উদ্যোগ সফল হতো না।

কালের কণ্ঠ : আপনি বলতে চান, মাইনাস টু পলিসি?
পিআরসি: আপনি যা-ই বলেন। এটা করে কোনো লাভ নেই। এটা কোনো কাজ করবে না। এখানকার রাজনীতির একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে বাস্তবায়ন করা কঠিন। যাহোক অনেক ঘটনার পর বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে এবং অতীতে এরকম নির্বাচন আর হয়নি। আমি নিজেও প্রত্যক্ষ করেছি। জনগণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ছিল। উৎসবের আমেজ ছিল। এটা এ দেশের বড় প্রাপ্তি।

কালের কণ্ঠ: এ দেশের সঙ্গে আপনার নাড়ীর সম্পর্ক। আপনার বাবা এখানে জন্মেছিলেন। আপনার একটা নস্টালজিয়া নিশ্চয়ই কাজ করে?
পিআরসি: অবশ্যই। আমি নিজের পছন্দে এখানে দুইবার দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। এককালে আমার শেকড় ছিল এখানে। সেই শেকড়ের টানেই হয়তো বারবার ফিরে এসেছি।

কালের কণ্ঠ: আপনাকে ধন্যবাদ।
পিআরসি: আপনাকেও ধন্যবাদ।

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. i appretiate PRC, but in question of Tipaimukh india have to published a transparent data