মার্কিন নাগরিকত্ব গোপন করে ফখরুদ্দীন প্রধান উপদেষ্টা হন : অভিযোগ পেলে তদন্ত করবে দুদক

জরুরি অবস্থার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আয়কর দাখিলে সম্পদের তথ্য গোপন ও আমেরিকান নাগরিকত্ব গোপন করে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে ড. ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে মামলা দায়ের করবে কিনা জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আমার দেশকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করব।

ব্যক্তিগত আয়কর নথিতে সম্পদের তথ্য গোপনের বিষয়টি আয়কর আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। তত্কালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ নিয়ন্ত্রিত ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে জরুরি অবস্থার সরকারের সময় গঠিত ক্যাঙ্গারু আদালত আয়কর নথিতে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে সর্বোচ্চ ৩ বছরের সাজা দিয়েছেন।

সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কাছে আয়কর আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে আমার দেশকে বলেন, আয়কর আইন অনুযায়ী সম্পদের তথ্য গোপন করলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত জরুরি অবস্থার সরকারের সময় ক্যাঙ্গারু আদালতে এই আইনে অনেকেরই সর্বোচ্চ ৩ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগত আয়কর হিসাবে আমেরিকায় বাড়ি ও আমেরিকান ব্যাংকে টাকা থাকার কথা উল্লেখ করেনি। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে অবশ্যই আয়কর আইনে মামলা হওয়া উচিত।
এদিকে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গত শনিবার মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অভিযোগ করে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ড. ফখরুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার অযোগ্য। কারণ, ফখরুদ্দীন আহমদ মার্কিন নাগরিক। আমেরিকায় তার বাড়িও রয়েছে। আমেরিকান ব্যাংকে লেনদেন করছেন। আমেরিকান নাগরিকের পরিচয় গোপন করে ফখরুদ্দীন আহমদ জরুরি অবস্থার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন। বিদেশি নাগরিকত্ব যাদের রয়েছে সংবিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। সংবিধান লঙ্ঘন করে ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ ২(গ) অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকত্ব যাদের রয়েছে তিনি সংসদ সদস্যপদে নির্বাচনের অযোগ্য। সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা যার নেই সংবিধান অনুযায়ী সরকারের উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতাও তার নেই।

মওদুদ আহমদ বলেন, সংবিধানের ৫৮(গ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করেই বলা আছে কিভাবে কে প্রধান উপদেষ্টা হবেন। ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার সময় এই অনুচ্ছেদটিও লঙ্ঘন করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু সম্পদ এবং আমেরিকান নাগরিকত্ব গোপন করেই সংবিধান লঙ্ঘন করেনি, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার যোগ্যতাও সংবিধান তাকে দেয়নি।

৫৮(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা হতে হলে সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি অথবা তার আগে অবসর গ্রহণকারী কোনো প্রধান বিচারপতি হতে হবে। এ ধরনের কাউকে না পাওয়া গেলে আপিল বিভাগ থেকে সর্বশেষ অবসর গ্রহণকারী বিচারপতি বা তার আগে অবসর গ্রহণকারী বিচারপতি হতে হবে। এ ধরনের কাউকে না পাওয়া গেলে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। কিন্তু ড. ফখরুদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে গুটিকয়েক সেনা অফিসারের ইচ্ছায়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ফখরুদ্দীন আহমদ সরকারের সময়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর ৩ বছর অতিক্রম না করলে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া যাবে না। সেই হিসাবেও ফখরুদ্দীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন না। কারণ, ফখরুদ্দীন যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন তখন চাকরি ছাড়ার পর ৩ বছর পার হয়নি। এছাড়া অধ্যাদেশটিতে বলা হয়নি ফখরুদ্দীন আহমদের বিষয়ে এ আইন প্রযোজ্য হবে না। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, যেদিন এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে সেদিনই ফখরুদ্দীন আহমদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল।

গতকাল দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয় আমেরিকায় থাকা সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ফখরুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং মামলা করা হবে কিনা। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলে তদন্ত করব। তবে সম্পদ বাংলাদেশের ভেতরে এবং দুদকের এখতিয়ারের আওতার মধ্যে থাকতে হবে। ব্যক্তিগত আয়কর দাখিলে আমেরিকার সম্পদ গোপন করার বিষয়ে দুদকের কোনো এখতিয়ার নেই উল্লেখ করে গোলাম রহমান বলেন, ‘আমরা যদি সম্পদের হিসাব চাইতাম এবং সেখানে সম্পদের তথ্য গোপন করা হতো সেক্ষেত্রে অবশ্যই মামলা করতাম।’ তিনি বলেন, এখন যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসে, যেই ব্যক্তিই হোক না কেন সেই অভিযোগ অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।

[ad#co-1]