ফখরুদ্দীনের প্রধান উপদেষ্টা পদ গ্রহণ ছিল অবৈধ : ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ছিল। তিনি আমেরিকার নাগরিক। সংবিধানের ৫৮ ধারা মোতাবেক উপদেষ্টা পদ গ্রহণ করতে হলে তাকে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার যোগ্য হতে হয়। কিন্তু ফখরুদ্দীন আহমদের তা ছিল না। এ ছাড়া পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইফতেখার আহমদ চৌধুরীসহ আরো তিনজন উপদেষ্টাও অবৈধ ছিলেন। এরা ছিলেন ফখরুদ্দীনের আত্মীয়।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংস্খা ‘অধিকার’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, তিনি যে অবৈধ ফখরুদ্দীন আহমদ তা জানতেন। তার উচিত ছিল নিজ থেকে পদত্যাগ করা বা প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ না করা। কিন্তু তিনি তার আমেরিকান নাগরিকত্বের পরিচয় গোপন করে এ পদ গ্রহণ করেছেন এবং ধরে রেখেছেন।

ব্যারিস্টার রফিক বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে টাকা আদায় করেছে তাদের বিচার না করলে আবারো ১১ জানুয়ারি ঘটবে। কিন্তু অত্যাচারীদের একজন মাসুদ উদ্দন চৌধুরীকে করা হলো অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত। তিনি এখন দেশের পতাকা উড়াচ্ছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অত্যাচারীদের বিচার না করার উদ্যোগের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার রফিক বলেন, বিদেশ থেকে টাকা ফেরত আনা আহামরি কোনো কাজ নয়। মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের প্রভাব এবং বিচারকদের বিভিন্ন পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে ব্যারিস্টর রফিক বলেন, আজ (শনিবার) ৪০টি বেঞ্চ বদলে ফেলা হলো। যে বিচারপতিরা সরকারের সমালোচনা করেছেন, তাদের সবাইকে আচ্ছামতো সাইজ করেছে সরকার। ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য বিচারপতি নজরুল ইসলামকেও সাইজ করা হয়েছে। বিচারপতি দস্তগীর একদিন বলেছিলেন, আমাদেরও ক্রসফায়ারে দিন। তাকেও গতকাল সাইজ করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতিকে সাথে নিয়ে এটি করলেন। এই হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

অমানবিকভাবে বিচারকদের রিমান্ড প্রদানের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার রফিক বলেন, একজন আসামি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছেন ‘হুজুর দেখুন আমাকে আট দিন আগে রিমান্ডে নেয়ার আগে যে পোশাকে আপনার সামনে আনা হয়েছিল আজো সেই পোশাকে হাজির করা হয়েছে। আজকে আদালতে আনার আগে আমাকে অজু করে তওবা পড়ানো হয়েছে। তওবা পড়ানোর কারণ জানতে চাইলে আমাকে বলা হলো, তাদের কথামতো কথা না বললে আমাকে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। তওবার আগে আমাকে গোসল করতে বললে আমি বললাম আমার তো পোশাক নাই। তারা বলল ল্যাংটা হয়ে গোসল কর।’ ব্যারিস্টার রফিক বলেন, এই বক্তব্যের পরও বিচারক আবার তাকে রিমান্ডে দিলেন। এই হলো আমাদের বিচারক আর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। তিনি আফসোস করে বলেন, কাকে দোষ দেবেন। সরকারকে গালি দিয়ে কী হবে। নিজেদের গালি দেয়া উচিত।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘১১ জানুয়ারির পর যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছে তারা এখনো ওই সব ব্যবসায়ী এবং যাদের ওপর অত্যাচার করেছে তাদের পেছনে সব সময় গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছে। কে কোথায় যাচ্ছেন কী করছেন সব ফলো করছে। সে জন্য অত্যাচারিতরা এখনো মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। মামলা করতে পারছেন না। আবার যদি ধরে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে।

এর প্রমাণ হিসেবে ব্যারিস্টার রফিক বলেন, কিছু দিন আগে আমি বিদেশ যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে একজন ব্যবসায়ী আমাকে এসে বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার কাছ থেকে ৩৫ কোটি টাকা নিয়েছে। তাকে ধরে নিয়ে ১৫ দিন অত্যাচার করার পর তিনি এ টাকা দিতে রাজি হন। তাকে মামলা করার পরামর্শ দেয়া হলে তিনি বললেন, আবার তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে ওরা। এ আলাপের কিছুক্ষণ পরই ডিজিএফআই’র পরিচয় দিয়ে এক লোক ওই ব্যবসায়ী ফোন করে বলল, আপনি চাইলে ওই টাকা এসে নিয়ে যেতে পারেন। কোনো সমস্যা হবে না। তখনই আমি বুঝলাম ওই ব্যবসায়ীর পেছনে গোয়েন্দা লাগানো আছে। সে যে আমার সাথে কথা বলেছে তা তারা জেনে গেছে।’ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আরেক দিন এক ব্যবসায়ী এসে আমাকে দেখালেন তাকে অত্যাচার করে তিনটি দাত ভেঙে ফেলা হয়েছে। নাক ও মেরুদণ্ড আহত করা হয়েছে। আবার তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, তিনিও এখনো সেই আতঙ্কে আছেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমাকে কখনো হুমকি দেয়া হয়নি। তবে বাসায় সব সময় আম পাঠাত। অন্যান্য উপহার পাঠাত। হাসান মশহুদ একবার চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আমি বললাম, গ্রেফতার করবেন না তো? কারণ মানুষ এখন আপনার ভয় দেখিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়ায়।’

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ও হয়রানির সমালোচনা করে ব্যারিস্টার রফিক বলেন, মানহানি মামলায় সাংবাদিকদের গ্রেফতার না করার বিষয়টি সংসদে অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু তার পরও তার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সরকারপক্ষের ২২ জন আইনজীবী পারলে বিচারকের গলা টিপে ধরে মাহমুদুর রহমানকে হয়রানি করা যাবে না মর্মে রায় লেখার সময়।

আইনে বলা আছে, শুধু ক্ষতিগ্রস্তরা মানহানি মামলা করতে পারবে। কিন্তু সারা দেশে মামলা করছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। তা ছাড়া যেখান থেকে পত্রিকা প্রকাশিত হয় সেখান থেকে মামলা করার নিয়ম হলেও সারা দেশে মামলা দেয়া হচ্ছে। একটি বিষয়ে একাধিক মামলা করা যায় না। কিন্তু আদালত মামলা নিচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, নিু আদালতে আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের হাজিরার সময় অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের লোকজন বিচারকদের ওপর যেভাবে চাপ সৃষ্টি করেছেন তাতে মনে হয় তারা সরকারি কর্মকর্তা না হয়ে দলীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ২০০৯ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।

২০০৯ সালের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট রাজনীতি ও সমাজ-বিশ্লেষক কবি ফরহাদ মজহার। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা যেমন প্রজা তেমন রাজাই পেয়েছি। আদালতকে একান্তভাবে রাজনৈতিক গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অধিকার’র সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খানের পরিচালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ডাকসু’র সাবেক ভিপি আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, সাংবাদিক আমীর খসরু প্রমুখ।

[ad#co-1]