স্পিকারকে প্রবাসীদের সংবর্ধনা

জাতীয় সংসদের স্পিকার এ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদকে জাপান প্রবাসী গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘বিজনেস ফোরাম অব জাপান’-এর ব্যানারে এক সংবর্ধনা দেয়া হয়। পাঁচ তারকা হোটেল অকুরা (ঐড়ঃবষ ঙশঁৎধ)-এর দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এই সংবর্ধনা এবং নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন টোকিও বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত আশরাফ-উদ-দৌলা, স্পিকারের সফরসঙ্গী জাতীয় সংসদের চার সাংসদ (মোঃ আতিউর রহমান আতিক এমপি, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি, মোঃ আব্দুল হাই এমপি এবং জিল্লুর হাকিম এমপি) গণ্যমান্য প্রবাসী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ।

বিজনেস ফোরামের সভাপতি সাকুরা সাবেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনাসভা পরিচালনা করেন বিজনেস ফোরামের জেনারেল সেক্রেটারি বেলায়েত হোসেন লিটন। বক্তব্য রাখেন মাইনুল হক দিদার, মোঃ সাইদুর রহমান খান হিরু, মোঃ দেলোয়ার হোসেন, মোঃ জিয়াউল ইসলাম, মোঃ জহিরুল ইসলাম, মীর জেরাউল করীম রেজা, মোঃ জিল্লুর হাকিম এমপি, মোঃ আব্দুল হাই এমপি, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি, মোঃ আতিউর রহমান আতিক এমপি প্রমুখ।
প্রবাসী ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে স্পিকারের কাছে বিভিন্ন সমস্যা এবং দাবি দাওয়া, সেই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শের পাশাপাশি সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।

২০০১ সালে তৎকালীন সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জাপান প্রবাসী গাড়ি ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে বিজনেস ফোরাম গঠন করে সমস্যার মোকাবেলা করে। সেই শিশু সংগঠনটি আজ ১৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক প্রবাসীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায়ীগণ বলেন, অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত ট্রান্সপোর্টের গুরুত্ব অপরিসীম। গত অর্থবছরে সরকার এই খাত থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। এই আদায়কৃত টাকার কিছু অংশ যদি যোগাযোগ খাতে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা যায় তাহলে এই খাত থেকেই সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট গাড়ি বেশি হওয়ার জন্য যানজটের সৃষ্টি হয় বলে আমরা বিশ্বাস করি না। সৃষ্টি হয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, অপ্রতুল রাস্তা এবং চালকদের আইন না মানার প্রবণতা। এইগুলোর দিকে নজর দিলে যানজট অচিরেই মুক্ত হয়।

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করে তাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রবাসীরা তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেছে। উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। কিন্তু স্বদেশেই প্রবাসীরা উপেক্ষিত হচ্ছে। স্বদেশে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নেই। কিন্তু কেন? ভোট দেয়া তো প্রাপ্ত বয়স্কদের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম।

তারা আরো বলেন, কিছু কিছু কাজ প্রবাসীদের জন্য সহজ এবং সুগম করতে হবে, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও ফাইল চালাচালি বন্ধ করতে হবে। রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ এবং দ্রুত পৌঁছানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। গাড়ি পাঠানোর ওপর করারোপ কমাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা উন্নতিসহ দুর্নীতি কমাতে হবে। তবেই প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশে নিয়ে যাবে। বর্তমান সরকারের ভিশন টুয়েন্টি ওয়ান সফল করতে ভূমিকা রাখবে।

সংবর্ধনার জবাবে স্পিকার এ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ তার স্বভাবসুলভ রসিকতার ছলে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আপনাদের কথা শুনে মনে হলো আপনারা দেশকে ভালোবাসেন। ভালোবাসি আমরাও। তাহলে আর চিন্তা কি? বাংলাদেশের উন্নয়ন এবার হবেই। এতদিন আমরা যেটি পারিনি এবার সেটা আমাদের পারতেই হবে। ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ৩৮ বছর পর এখন আর পারব না বলার অবকাশ নেই।

তিনি বলেন, আমি ভালো বক্তা নই। আমি যদি ভালো বক্তা হই তাহলে তো সংসদে অন্য কেহ কিছু বলার সুযোগই পাবে না। তা ছাড়া ভালো বক্তা হলে ভালো স্পিকার হওয়া যায় না। স্পিকারকে শুনতে হয়, বলাতে হয়, বলতে হয় না। বলার সুযোগ করে দিতে হয়।

গাড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা বলেন বাংলাদেশে অনেক গাড়ি। কিন্তু কোথায় গাড়ি? কই, আমি তো গাড়ি দেখি না। যা আছে সবই শহরকেন্দ্রিক। মফস্বল শহরে তো গাড়ি দেখাই যায় না। আমার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ জেলায় জেলা পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার গাড়ি ছাড়া সারা শহরে ১৫/২০টির বেশি গাড়ি হবে না। আপনারা দেশব্যাপী কল-কারখানা স্থাপন করেন, রাস্তাঘাট তৈরিতে বিনিয়োগ করেন। গ্রামে গ্রামে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেন। মানুষ যেন শহরমুখী না হয়। তাহলে দেখবেন আপনারা গাড়ি পাঠাইয়াও কূল পাবেন না। কর বাড়ালেও মানুষ গাড়ি কিনবে। কারণ মানুষ পেট ভরা থাকলে আরাম আয়েশের দিকে একটু নজর দেয়।

প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার এ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ বলেন, আমি জানি আপনারা আমাকে ভালোবাসেন, সম্মান করেন সেই দাবি থেকেই আপনাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করব আমার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিমাসে অন্তত একটি ডলার হলেও বেশি পাঠাবেন, নিজেরা পাঠাবেন অন্যকেও পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করবেন। বৈধভাবে আপনারা বেশি বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠাবেন।

স্পিকার প্রবাসীদের বলেন, আপনারা অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আপনারা আপনাদের নিজ নিজ দলের প্রতি চাপ সৃষ্টি করুন যাতে সবাই দেশের প্রয়োজনে একযোগে কাজ করতে পারে। আপনারা নেতৃবৃন্দদের বলুন যে, বিদেশে রাজনীতিবিদরা একযোগে কাজ করতে পারলে তারা কেন দেশের স্বার্থে এক টেবিলে বসতে পারবে না? নিজ নিজ দলকে বাধ্য করুন। আমি সরকারি দল বা বিরোধী দল বুঝি না, আমি বুঝি দেশের উন্নয়ন। দেশের উন্নয়নে সবাই একযোগে ঐক্যবদ্ধভাবে নিরলস কাজ করতে হবে। আগামী ৪ জানুয়ারি সংসদ বসবে। আমি আশা করব মাননীয় বিরোধী দল সেখানে যোগ দিয়ে তাদের কথা বলবে। আমি জাপানে আপনাদের সামনে কথা দিচ্ছি আমি সংসদে তাদের কথা বলার সুযোগ দেব।

স্পিকার আরো বলেন, আমি সরকারের কেউ নই। তবে আপনাদের কথাগুলো সরকারকে জানাতে পারব। পদক্ষেপ নিতে বলব নিরসনে। তারা যেন প্রবাসীদের দাবি দাওয়ার প্রতি সম্মান দেখান। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে যেন স্বল্প সময়ে সঠিক কাজগুলো করে দিতে পারেন। সরকারের পক্ষে যা যা সম্ভব তা যেন তারা করার ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। এই কাজটি আমি করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছি।

স্পিকার বলেন, বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ। কিন্তু এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে ১৪ কোটি মানুষের ২৮ কোটি হাত। এই ২৮ কোটি হাতকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। জনশক্তিকে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করতে হবে। আপনারা যারা জাপান থাকেন তারা জাপানের আধুনিক প্রযুক্তি দেশে নিয়ে বাংলাদেশের জনশক্তিকে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে কিছুই নেই। আছে আধুনিক প্রযুক্তি। আমাদের অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। সেই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি যোগ হলে দেশের উন্নয়ন না হয়ে পারে না।
স্পিকারের জাপান সফর ছিল ব্যক্তিগত সফর। ১৩ ডিসেম্বর যুবলীগের সভা এবং ১৬ ডিসেম্বর টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত বিজয় দিবস আলোচনাসভাতে যোগ দেন স্পিকার এবং তার চার সফরসঙ্গী। এ ছাড়াও তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে মিলিত হন এবং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। দিকনির্দেশনা দেন। তিনি জাপানের স্পিকারের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। স্পিকার জাপানের ঐতিহাসিক শহর হিরোশিমা পরিদর্শন করেন। ১১ ডিসেম্বর তিনি জাপান পৌঁছেন এবং ১৭ ডিসেম্বর জাপান ত্যাগ করেন।

রাহমান মনি
rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]